‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ তে একটা সাক্ষাৎকারের জন্য প্রায় দুমাস ধরে চেষ্টা করে শ্রীকৃষ্ণের আপ্তসহায়ক সুদামাকে ধরে ওনার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করতে পেরেছি আমরা। আমাদের প্রতিনিধি জলদ গুপ্তের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ –    

 

জলদ – এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ‘বাংলালাইভ’এর পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

কৃষ্ণ – আপনাদেরও অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের পত্রিকা আমার ভাল লাগে। আমি পড়ি। আপনাদের বিষয় নির্বাচনের মধ্যে একটা নতুনত্ত্ব আছে।

জলদ-  বলছেন ? আসলে এই ভ্যালেন্টাইন্স ডে সংখ্যাটা করার জন্য আমরা আমরা একজন সর্বজন স্বীকৃত প্রেমিকের সন্ধান করেছি, এই সংখ্যায় যার সাক্ষাৎকার যাবে…কিন্তু দুঃখের বিষয় আপনাকে ছাড়া …

কৃষ্ণ – আর কাউকে খুঁজে পেলেন না ?

জলদ-  না, সত্যিই এমন একজন কাউকে পেলাম না যিনি সব বয়সের মানুষের কাছে এককথায় প্রেমের প্রতীক…

কৃষ্ণ – দেখুন এটাই হচ্ছে প্রচারের গুন। সারা বিশ্ব আমাকে প্রেমের দেবতা হিসেবে চেনে।প্রেমের ব্যাপারে কোনো কথা উঠলেই আমার নামটা উঠে আসে। কিন্তু এটা কোনোকালেই আমার দপ্তর নয়,এটা চিরকালই মদন দেখে…

জলদ- হ্যাঁ এটা মদনবাবুর দপ্তর সেটা ঠিক, কিন্তু  মানুষের কাছে চিরকালই প্রেম মানেই আপনি…প্রথম এবং শেষ কথা।

জলদ – কেন বলুন তো ? এর কারণটা কি? আমি কি সারা জীবনটাই প্রেম করে বেড়িয়েছি বলে আপনার মনে হয় ? ইতিহাস তাই বলে ? একেবারে ছোট থেকেই যুদ্ধ করতে করতে বড় হয়েছি।পুতনা,বক,অঘ,অরিস্ট বা  কালিয়ানাগকে মারতে আমাকে তুমুল যুদ্ধ করতে হয়েছে। ধর্মের জন্য,সাধারণ মানুষকে সংগঠিত রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নিজের মামা কংসকেও ছাড়ি নি। আমার দাদু উগ্রসেন খুব প্রজাবৎসল  রাজা ছিলেন। মামা রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতাদখলের জন্য তাঁকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন। অনেকটা আপনাদের শাহজাহান ঔরংজেবের মত। আমার মনে হয়েছিল এই অন্যায়ের একটা বিহিত দরকার। তাই আমি মামাকে হত্যা করে রাজ্যে রাজনৈতিক স্থিতাবস্তা ফিরিয়ে আনি। নাহলে সেই সময় আমার মামার মত বীর পৃথিবীতে আর ছিল না। তারপর ধরুন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ, সারা বিশ্বে এত বড় যুদ্ধের উদাহরণ আর নেই। একটু খেয়াল করলে দেখবেন এই যুদ্ধের প্রতিটা মুহূর্ত আমার লিখিত বা অলিখিত নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে। প্রতিটা চরিত্রের বাঁচা মরা নির্ভর করেছে আমার ওপর। জন্মের প্রথম দিন থেকেই আমার একমাত্র কাজ ছিল দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন। যতদিন মর্তে ছিলাম সাধারণ মানুষের জন্য নিরলস ভাবে এই কাজটা করে এসেছি।এরপরও আমায় বলবেন আমি প্রেমের দেবতা !

আরও পড়ুন:  হোলি কব হ্যায় ? কব হ্যায় হোলি ?

জলদ-  না…মানে,আসলে ওই রাধাদেবীর ব্যাপারটা একটু ……

কৃষ্ণ –  (খুব জোরে হেসে উঠে…সেই ভুবন ভোলানো হাসি। এসময় কফি নিয়ে রুক্মিণীদেবী আসেন।পাশে বসেন। হাসতে হাসতেই কথা বলতে থাকেন ) নিন কফি খান। আপনি এত ইতস্তত করছেন কেন ? আমি জানি এই একটা বিষয়ের জন্য আমি বিশ্বপ্রেমিক হয়ে গেছি। হ্যাঁ,রাধা আমাকে ভালবাসত,আজও ভালবাসে। কিন্তু সেটা তো খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। একটু ভেবে দেখুন সমাজ,ধর্ম, নিয়ম কানুনকে সরিয়ে রেখে আমি কিন্তু রাধাকে বিয়ে করি নি। ওই সময় আমার যা ক্ষমতা ছিল বা মানুষ যেভাবে আমাকে ভালবাসত তাতে সেটা আমি অনায়াসেই করতে পারতাম। কিন্তু আমি সবসময় ধর্ম,সমাজকে আদর্শগত দিক থেকে গুরুত্ব দিয়েছি।এই রুক্মিণীকে আমি স্বয়ংবর সভা থেকে অপহরণ করে এনে বিয়ে করেছি, কিন্তু সেটা কখনই তখনকার রাষ্ট্রব্যবস্থার আইন কানুনকে লঙ্ঘন করে নি।আমার অন্যান্য তিন স্ত্রী সুশীলা,সত্যভামা বা জাম্ববতীকে বিয়ে করার ক্ষেত্রেও আমি ধর্ম,সমাজ বা  সামাজিক আইনকে লঙ্ঘন করি নি। কিন্তু আপনি যদি ওই সময়ের অন্যান্য দেবতা যেমন ইন্দ্র বা চন্দ্রদের দেখেন তাহলে বুঝবেন…

জলদ  – কিন্তু রাধা দেবী এবং আপনার সম্পর্কটা কি সেই সময়ের প্রেক্ষিতে একটু হলেও সাহসী ছিল না ?

কৃষ্ণ – না, সাহসী নয়…আমি বলবো আধুনিক ছিল, সর্বকালীন ছিল। আসলে আমার মনে হয় প্রেম মানেটাই অনেকে জানে না। আমাদের দেবতাদের মধ্যেই অনেকে প্রেম শব্দটার ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। মর্তেও খুব কম মানুষ প্রেম শব্দটাকে সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছেন। এ সম্পর্কে আপনাদের রবিঠাকুরের কথা বলা যেতে পারে,উনি সত্যিই প্রেমকে বুঝতেন, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন। ওনার শেষের কবিতা তো আমাকে আর রাধাকে নিয়েই লেখা। আমাদের দুজনকে নিয়ে অনেক লেখা,গান,সিনেমা,নাটক ইত্যাদি হয়েছে…হচ্ছে,কিন্তু শেষের কবিতার মত লেখা আর পেলাম না…অসাধারণ। দেখুন কোনো একটি নির্দিষ্ট তত্ত্ব দিয়ে প্রেমের সংজ্ঞা তৈরি করা যায় না।এটা অনেকটা পাহাড় থেকে নেমে চলা ঝর্নাধারার মত সাবলীল,স্বাভাবিক।এখানে কোনো কৃত্রিমতা  নেই,আবার কোনো পরিণতিও নেই।প্রেম মানে শুধুই অনুভব এবং অনুভব। রাধার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই অনুভবই প্রধান বিষয় ছিল। আমরা দুজন দুজনকে খুব সাবলীলভাবে অনুভব করতে পারতাম,আজও পারি । এখানে আর একটা বিষয় ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল,সেটা হল সঙ্গীত। দেখুন আমি বিশ্বাস করি সঙ্গীত ব্যতীত প্রকৃত প্রেম অসম্পূর্ণ। তার মানে একজন প্রেমিক বা প্রেমিকাকে ভাল গাইয়ে বাজিয়ে হতে হবে এমন নয়। তাদের মধ্যে সুর থাকতে হবে,ছন্দ থাকতে হবে। রাধা খুব বড় একজন সঙ্গীতপ্রেমী ছিল। আর আমি বাঁশি বাজাতে পারতাম এটা তো আপনারা জানেন। ইন ফ্যাক্ট এই ইন্সট্রুমেন্টটাকে আমিই জনপ্রিয় করেছি। এই বাঁশির সুর দিয়েই আমাদের আলাপ,ভাললাগা,ভালোবাসা এবং অনুভব।      

আরও পড়ুন:  হোলি কব হ্যায় ? কব হ্যায় হোলি ?

জলদ – তার মানে আপনি বলছেন বিয়েতে পৌঁছে আর প্রেম থাকে না ?

কৃষ্ণ –  না,না, তা কেন হবে ? থাকতেই পারে আবার না থাকতেই পারে। আসলে প্রেমের আগে পিছে আর কোনো শব্দ নেই,থাকে না। আপনি বিয়ে মানে প্রেমের একটা পরিণতি ভাবছেন,চাইছেন ও। আমরা সব কিছুরই একটা পরিণতি চাই,পরিণতি বুঝি কিন্তু আমি বলছি প্রেমের কোনো পরিণতিই হয় না,সেটা বিয়ে হোক বা না হোক। সেই অর্থে প্রেম তার নিজের তৈরি কক্ষপথেই সম্পূর্ণ…চলমান। রাধা আর আমার সম্পর্কটা প্রেমের এই সর্বকালীন ভাবনাকেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছে,সময়ের হিসেবে সেটা হয়ত একটু বেশি আধুনিকই ছিল।  

জলদ -আজকের পৃথিবীতে প্রেমের প্রকৃত সংজ্ঞাটাই বোধহয় বদলে যাচ্ছে,আপনি কি বলবেন?

কৃষ্ণ –না,আমি এই ভাবনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। সময়,সামাজিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটে,প্রেমের বাহ্যিক ভাবধারারও পরিবর্তন ঘটছে,ঘটবে… কিন্তু তার মুল দর্শন বদলাবে কী করে? ধরুন আপনি আপনার পাড়ার একটা মুদিখানার দোকান থেকে সারা মাসের মুদিখানার মাল কিনতেন,এখন সেটাই একটা শপিং মল থেকে কিনছেন। সময় আপনার রুচি,ভাবনা,স্টাইলকে বদলে দিয়েছে কিন্তু মুল কারণ তো সারা মাসের খাওয়াদাওয়ার জোগাড় করা, সংসার চালানো…এই জায়গা থেকে কি আপনি সরতে পেরেছেন? প্রকৃত প্রেমও ওই পেটের জ্বালার মতই সাবলীল। সে তখনও যেমন ছিল এখনও ঠিক তেমনই আছে।

জলদ – প্রেম যদি আগের মতই সাবলীল থাকে তবে আজকের পৃথিবীতে এত সন্ত্রাস কেন ? এত মারামারি কাটাকাটি কেন ? মানুষে মানুষে এত বিদ্বেষ কেন ?

কৃষ্ণ – এই প্রশ্নের উত্তরে আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করবো…বলুন তো পৃথিবীতে সন্ত্রাস,মারামারি,কাটাকাটি কখন ছিল না ?  আপনি যদি পৃথিবীর ইতিহাস দেখেন তাহলে দেখবেন মানুষের উদ্ভব থেকেই মানুষ সন্ত্রাস,মারামারি,কাটাকাটি করে বেঁচে থেকেছে। আপনারা আজকের পৃথিবী নিয়ে ঘাবড়াচ্ছেন…আমি বলব আজকের পৃথিবী বরং অনেক বেশি শান্ত। আজকের মানুষ অনেক বেশি যুক্তিনির্ভর,যুদ্ধবিরোধী। কিছু মানুষের হঠকারিতায় মাঝেমধ্যে সমস্যা তৈরি হলেও সেটাকে নিয়ন্ত্রন করা বা দমিয়ে রাখার মানুষের সংখ্যাই আজ বেশি। কিন্তু আপনি অতীতের কথা ভাবুন। তখন চারদিকে শুধুই যুদ্ধবিগ্রহ,মারামারি,হানাহানি,সন্ত্রাস। সেই সময় পৃথিবীতে নির্দিষ্ট একটা জাতিই ছিল যাদের ধর্ম বা কাজই হল যুদ্ধ করা। যুদ্ধ করে,মানুষ মেরে কোন দেশ বা এলাকার দখল নেওয়াই ছিল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা বা বিখ্যাত করার একমাত্র পথ। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রাণের কোন মুল্যই তখন ছিল না। সাধারণ মানুষও নিঃশব্দে রাজার ইচ্ছে অনুযায়ী চলতো। রাজার ইচ্ছেতেই তাদের প্রাণ যেত বা থাকত। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব ও পাণ্ডবদের মিলিত সৈন্য সংখ্যা ছিল আঠারো অক্ষৌহিণী।এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছে অনিচ্ছের কি কোন দাম ছিল ? পৃথিবীর সব ছোট বড় যুদ্ধের ক্ষেত্রেই এই ভাবনা প্রাসঙ্গিক। আজও কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম হলেও কোথাও একটা সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগদান আছে,একটা মতামত আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মত আজ অনেকবেশি গুরুত্বপুর্ন। তাই আমি বলব মানুষ আজ অনেক বেশি সভ্য,অনেক বেশি সুশৃঙ্খল,অনেক বেশি শান্তিকামী।

আরও পড়ুন:  হোলি কব হ্যায় ? কব হ্যায় হোলি ?

জলদ – আজকের চারদিকে এই ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে এত আলাপ আলোচনা, এত উৎসব…এটা আপনি কীভাবে দেখেন ?

কৃষ্ণ – ভাল…প্রেম কে বিষয় করে কোনো উৎসব হতেই পারে, এতে সবসময়ই আমার সমর্থন আছে। সারা জীবন ধরে বহু যুদ্ধ করলেও আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি একমাত্র প্রেমের মাধ্যমেই যেকোন জীবকে দখল করা যায়। কিন্তু তাই বলে সবকিছুই উৎসব সর্বস্ব যেন না হয়। লক্ষ্যের থেকে উপলক্ষ্য বড় হলে কার্য-কারণ সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। প্রকৃত সত্য হারায় অন্ধকারে, তাই প্রেম বিষয়টাকে সঠিকভাবে জেনে উৎসবে সামিল হলে প্রেমেরই প্রতিষ্ঠালাভ হবে। সব জীবের কাছে তাই আমার একটাই বক্তব্য…ভালবাসুন,শুধুই ভালবাসুন।

জলদ  – প্রণাম…বাংলালাইভের পক্ষ থেকে আমাদের সবার প্রণাম গ্রহণ করুন। আপনার কাছে আমাদের শেষ প্রশ্ন, যদি প্রেম নিয়ে একটি বাক্যে কিছু বলতে বলা হয় আপনি কী বলবেন !

কৃষ্ণ – আমার নিজের কথা তো অনেক বলেছি,আপনারাও অনেক শুনেছেন। এখন আপনাদের রবি ঠাকুরের ভাষায় বলি…

“ সুন্দরী তুমি শুকতারা রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ

 স্বপ্নে যে বাণী হল হারা, জাগরনে করো তারে পূর্ণ” ।   

জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

1 COMMENT