বিসর্জন শেষে বাড়ি ফিরে স্নান করছিলেন বাড়ির কর্তা | কলকাতার অন্যতম সেরা বনেদি বাড়ির পুজো বলে কথা ! বিসর্জনের ঝকমারি তো কম নয় | বাড়ির উঠোনের কলঘরে স্নান সারছিলেন কর্তা দুর্গাচরণ লাহা | কিন্তু শান্তিতে স্নান করার জো আছে ! সমানে এক বালিকা কোত্থেকে এসে ভিক্ষা চেয়ে যাচ্ছে | বিরক্ত হয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন দুর্গাচরণ |

কিছু পরেই কেমন যেন মনে হল তাঁর | স্নান মাঝপথে রেখেই খোঁজ করলেন বালিকার | কিছু ভিক্ষা দেবেন বলে | কোথাও দেখতে পেলেন না | বাড়ির সদর দ্বার হাট করে খোলা | দুর্গাচরণ নিশ্চিত‚ দরজা বন্ধ ছিল | এবং ওই বালিকার পক্ষে একা অতবড় দরজা খোলা অসম্ভব | বাড়ির কোনও লোক‚ চাকরবাকর‚ কেউ বলতে পারল না বালিকাকে নিয়ে | কেউ তাকে দেখেনি |

দুর্গাচরণ উপলব্ধি করলেন‚ ওই বালিকা আর কেউ নয়‚ স্বয়ং মা দুর্গা | তিনি হায় হায় করে উঠলেন | মা দুর্গা তাঁকে দেখা দিয়েছিলেন ভিখারিণী বালিকা রূপে | তিনি কেন তাঁকে বিমুখ করলেন ? লাহা পরিবারের এই কর্তার অনুতাপ জীবনে যায়নি |

তাঁর সময় থেকে শুরু হল এই পরিবারের দুর্গাপুজোর এক নতুন নিয়ম | বিসর্জনের সময় বন্ধ থাকে বাড়ির সব দরজা এবং জানাল | প্রধান দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায় দুর্গা প্রতিমা | তারপর বন্ধ হয়ে যায় সেই দ্বার | বাড়ি ফিরে কর্তা সদর দরজার বাইরে থেকে তিনবার চেঁচিয়ে প্রশ্ন করেন মা কি আছেন বাড়ির ভিতরে ?’

গৃহকর্ত্রী আড়াল থেকে উত্তর দেন‚ পরিবারিক দেবী জয় জয় মা ফিরে গেছেন ঠাকুরঘরে | আর মা দুর্গা রওনা হয়েছেন কৈলাসের পথে | এই উত্তর পেয়ে গৃহকর্তা প্রবেশ করেন বাড়িতে |

দুর্গাচরণের অন্তত তিন পুরুষ আগে লাহা বাড়িতে শুরু হয় দুর্গোৎসব | কেউ বলেন রাজীবলোচন লাহা‚ আবার কেউ বলেন তস্য পুত্র প্রাণকৃষ্ণ লাহা পত্তন করেছিলেন দুর্গাপুজোর | ২০০ থেকে ২৫০ বছর আগে | আজ‚ লাহা পরিবারের বহু শাখাপ্রশাখা | ছড়িয়ে আছে উত্তর কলকাতার নানা প্রান্তে | পালা করে দুর্গাপুজো হয় সবার বাড়িতে |

এই পরিবারে মা দুর্গা দশভুজা হয়ে আসেন না | তিনি আসেন হরগৌরী রূপে | দুর্গা বসেন স্বামী শিবের কোল | শিবের বাহু বেষ্টন করে থাকে তাঁকে | দুর্গার দু চোখ বন্ধ | পরিবারের গৃহদেবীও দুর্গা ‚ অষ্টধাতুর সেই মূর্তির নাম জয় জয় মা | পুজোর কয়েকদিন তিনিও পূজিত হন ঠাকুরদালানে | পুজোর পরে তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ঠাকুরঘরে |

বৈচিত্র আছে লাহা পরিবারের ভোগ নিবেদনেও | এই পরিবারে পুজোর ভোগ শুধু মিষ্টি | নানা রকমের নাড়ু-সহ ২১ রকমের মিষ্টি পরিবেশিত হয় | একাধিক শরিকে বিভক্ত এখন লাহা পরিবার | কিন্তু এই বনেদি পরিবারের আভিজাত্য‚ নিষ্ঠা এবং ঐতিহ্য বিভক্ত নয় | এখনও অটুট | যে বাড়িতেই পুজো হোক না কেন‚ পালিত হয় প্রাচীন রীতিনীতি‚ যা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে এই বাড়ির শারদোৎসবের সঙ্গে‚ দু শতক ধরে |

আরও পড়ুন:  করবা চওথ ব্রত পালন করে বিপাকে হরভজনের মডেল-অভিনেত্রী গিন্নি

NO COMMENTS