বাংলালাইভ রেটিং -

কোন ছবি, সেটা একটু পরে বলছি, দাঁড়ান। তার আগে ছবি দেখতে গিয়ে একের পর এক যে খটকা, সেগুলোর কথা একটু বলে নিই।

খটকা তো একেবারে প্রথম থেকেই শুরু। মাছের ঝোল রাঁধতে নেমেছেন, ঠিক আছে। কিন্তু ঝোল কী করে রাঁধতে হয়, কী ভাবে রান্না করলে স্বাদটা জম্পেশ হয়ে খোলে, প্রথম থেকেই খটকা হচ্ছিল যে, ভদ্রলোক জানেন তো সেটা আদৌ?

ভদ্রলোক মানে প্রতিম ডি গুপ্ত, ছবির ডিরেক্টর। ছবির শেষে যাঁর নামের আগে ‘আ ফিল্ম বাই’ না লিখে লেখা হচ্ছে ‘কুক্‌ড বাই’।

শেষের কথা পরে হবে, আপাতত ছবির শুরুতে আসুন। শুরুর ওই সিনটা মনে আছে তো? প্যারিসে দেভ ডি ওরফে দেবদত্ত সেনের (ঋত্বিক চক্রবর্তী) অ্যাপার্টমেন্ট, সেখানে লেপের তলায় ঢুকে লিভ-ইন বান্ধবী সিমোনকে (কায়া ব্লকসেজ) আদর করছে ও। দুজনের শরীরের তুলকালামে উথাল-পাথাল হচ্ছে লেপের টোপোগ্রাফি, আর সেটা দেখতে দেখতে থতমত খেয়ে যাচ্ছি আমি। তখন মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে এই প্রথম বোধহয় নারী-পুরুষকে লেপের তলায় ঢুকিয়ে সিনেমায় মিলনদৃশ্য শুট করলো কেউ।

কেন ডিরেক্টরবাবু? ভয় পেয়েছিলেন, লেপ না থাকলে সিনটা সিবিএফসি কেটে দিতে পারে বলে? আগের ছবি ‘সাহেব বিবি গোলাম’ সিবিএফসি-র চক্করে ফেঁসে যাওয়ার ট্রমা থেকে এখনও বেরতে পারেন নি বুঝি? তো বেশ তো, সেক্স করার সিন না-ই রাখতে পারতেন এখানে! অন্যভাবেও তো সাজানো যেত সিকোয়েন্সটা। তা না, রাখবেনও বটে, আবার ব্যাপারটা লেপের তলায় লুকিয়েও দেবেন বটে! এভাবে আন্ডারলাইন করে ‘সেন্সর বোর্ডকে আমি ভয় পেয়েছি গো’ বলায় ছবিটার আর আপনার নিজেরও স্মার্টনেস খুব বেড়ে গেল বুঝি ভাই প্রতিম?

কোথাও কোথাও একটা লজিক শুনছি যে, প্যারিসে নাকি এত ঠাণ্ডা যে লেপের তলায় না ঢুকে উপায় থাকে না কোন। কিন্তু প্যারিসে দুটো আর নিউ ইয়র্কে একটা রেস্তোরাঁ চালায় যে সেলিব্রিটি শেফ, বাড়িতে ঠাণ্ডার চোটে সত্যি তাঁকে এরকম লেপের তলায় সেঁধিয়ে থাকতে হয় নাকি প্রতিম? সেন্ট্রাল হিটিং বলে কোন ব্যাপার বাড়িতে লোকটা রাখে না কেন বলুন তো? 

এবার আসুন এই সিনের পরের দিকে। ঢেউয়ের মতো উঠছে-পড়ছে লেপ, ঠিক এই সময় পাশেই রাখা দেবদত্তের মোবাইল বাজতে শুরু করলো। স্ক্রিনে নাম ফুটে উঠছে দেখলাম, ‘মাসি’। এখন নর্মাল রিয়্যাকশন তো বড় জোর এইটে হতে পারে যে, কাজকর্ম থামিয়ে লেপ থেকে মুখ আর হাত বের করে ফোনটা অ্যাটেন্ড করা। এখানে কী হচ্ছে, শুনুন। ওটা ফোন বাজছে না সকালে ঘুম থেকে ওঠার অ্যালার্ম বাজছে বোঝা যাচ্ছে না কিছু। কারণ, মাসির ফোন আসায় লেপ থেকে পুরো বেরিয়ে এসে শার্ট পরে বেরনোর জন্যে রেডি হয়ে যাচ্ছে দেবদত্ত। ভাবটা যেন এমন যে, নাও, অ্যালার্ম বেজেছে, চলো চলো এখন অফিস যেতে হবে!

এখনও ছবির ভেতরে ঢুকি নি, শুধু শুরুর দিকের একটা সিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। তাতেই কতগুলো ভুল বেরচ্ছে দেখুন। ছবির জন্যে স্ক্রিপ্ট যখন লিখতে বসেন, আর সেই স্ক্রিপ্ট নিয়ে যখন শুটিং করতে যান, তখন এগুলো একটু মাথায় রেখে দিতে পারেন তো, প্রতিম?

কাগজে একটা ইন্টারভিউতে আপনাকে বলতে দেখলাম, মোটে বারো দিন নাকি সময় পেয়েছিলেন ছবিটা শুট করার জন্যে। তার থেকে বেশি সময় অ্যালাউ করে নি প্রোডিউসার। কিন্তু স্ক্রিপ্ট লেখায় তো আর কেউ কোন ডেডলাইন দ্যায় নি আপনাকে? ওটা তাহলে এরকম ঝুলে গেল কেন?

তখন আসা মাসির ফোনটা কী নিয়ে ছিল, সেটা এবার শুনুন। কলকাতায় দেবদত্তের মায়ের হঠাৎ নাকি শরীর খারাপ হয়েছে খুব, ‘এপিলেপটিক সিজার’ হওয়ায় ভর্তি করাতে হয়েছে হসপিটালে। এটা শোনামাত্র তৎক্ষণাৎ প্যারিস থেকে কলকাতা আসার ডিসিশন নিয়ে ফেলছে দেবদত্ত সেন, আর ডিরেক্টর মশাই স্ক্রিনের এককোণে লিখে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে এর ঠিক ১৬ ঘণ্টা পর দেবদত্ত পৌঁছে যাচ্ছে ৭৮৫১ কিলোমিটার দূরের কলকাতায়।

শুধু এটুকু শুনলে অবাক লাগবে না ততটা। মনে হবে মায়ের জন্যে ছেলের এই পাগল-পাগল ভালবাসা তো স্বাভাবিক আর সুস্থ ব্যাপার খুব।

আর হেঁচকি উঠবে এর পরে, যখন শুনবেন মা একবার হসপিটালে ভর্তি হতেই এরকম মাতৃপ্রেম উথলে উঠলো যাঁর, সেই দেবদত্ত ভদ্রলোকটি এর আগে বারো বছর সাত মাস তেরো দিন মায়ের মুখটাই দ্যাখেন নি আদৌ!

আরও পড়ুন:  কঙ্গনা চান তাঁর মানসিক শান্তি নষ্ট করার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান হৃতিক

কেন জানেন? আরে মায়ের মুখ দেখবে কী করে, ও তো থাকতোই না এখানে কলকাতায়! সেই যে একযুগ আগে কেরিয়ারের স্বপ্ন সফল করবে বলে প্যারিস গিয়ে পৌঁছেছিল, ভাবতে পারেন তারপর আর কখনও একদিনও নাকি ওর মনে হয় নি, কয়েক দিনের জন্যে হলেও দেশে ফিরে মায়ের মুখটা দেখে আসি একবার বলে।

আর এখন সেই তাঁরই এমন আদিখ্যেতার চরম!

বাবার ওপর দেবদত্তের রাগ ছিল খুব, জানি। কিন্তু মায়ের সঙ্গে ভাব-ভালবাসাও তো দারুণ ছিল, ভাই? এতদিনে একবারও সেই মায়ের সঙ্গে দ্যাখা করতে ইচ্ছে হল না? আর এখন মা’কে একবার হসপিটালে যেতে হয়েছে শুনেই মাঝপথে মিলন থামিয়ে ষোল ঘণ্টার মধ্যে কলকাতায় পৌঁছতে হল এসে?

আমি বলতে চাইছি না কিছু। আপনি নিজে একবার ভেবে বলুন, এগুলো শুনতে আপনার ঠিক লাগছে কিনা।

ছবির ক্যারেক্টারগুলো কোন সিচুয়েশনে কে কী রকম বিহেভ করবে, সেটা ঠিকভাবে না বুঝেই কি স্ক্রিপ্ট লিখতে শুরু করে দ্যান নাকি আপনি প্রতিম? হতে পারে লোকার্নো না কোথায় যেন আপনার লেখা একটা স্ক্রিপ্ট সিলেক্ট হয়েছিল বছর আষ্টেক আগে। কিন্তু সেটা নিয়ে এখনও এরকম আত্মতুষ্টিতে ভুগতে থাকবেন না প্লিজ। একটা স্ক্রিপ্ট লিখতে শুরু করার আগে, ছবির ক্যারেক্টারগুলোকে রক্ত-মাংসে ছুঁয়ে দেখুন একটু, তাঁদের সঙ্গে ঘর-গেরস্থালি করুন কিছুদিন ধরে।

তাহলে দেখবেন, গল্পের মধ্যে এরকম বিরাট সব ছ্যাঁদা থাকছে না আর। যেটা লিখছেন, সেটা একই সঙ্গে আবেগ আর যুক্তিগ্রাহ্য হচ্ছে।

এবারের এই ‘মাছের ঝোল’ থেকেই আরও বলছি, শুনুন। মায়ের শরীর খারাপের খবর মাসির ফোনে শুনতে হল, কলকাতায় ফিরে হসপিটালে গিয়েও মায়ের কেবিনের বাইরে সেই মাসির সঙ্গে দ্যাখা, এই অবধি ভালোই ছিল পুরোটা। কিন্তু খটকা লাগলো কোথায় জানেন? মালা নামে সেই মাসি (অভিনয়ে মিঠু চক্রবর্তী) চব্বিশ ঘণ্টা দেবদত্ত’র পৈতৃক বাড়িতে থাকেন কেন! মাসির আর কোন থাকার জায়গা নেই নাকি যে দিদি-জামাইবাবুর সংসারে ডেরা বেঁধে বসে থাকতে হয় গিয়ে?

মা যখন হসপিটালে, তখনও বাড়িতে কেবল বাবা এবং মাসি!

প্রায় তেরো বছর পর ছেলেকে দেখে ছেলের কাছে মাছের ঝোল খাওয়ার আবদার করলেন হসপিটালে ভর্তি অসুস্থ মা।

নিশুত রাতে মাল খেয়ে টলতে টলতে গাড়ি ঘুরিয়ে যখন নিজের বাপের বাড়িতে এসে ঢোকে দেবদত্ত, তখনও সামনে সেই মাসি! আবার ভর দুপুরে যখন সেই বাড়ি থেকে বয়াম ভর্তি বড়ি লুঠ করার জন্যে সেখানে যায় দেবদত্তের সহকারী ম্যাগি (অভিনয়ে সৌরসেনী মৈত্র) তখনও সামনে সেই মাসি!

আমি তো দেখতে গিয়েই হোঁচট খাচ্ছি, আর সিনগুলো ভাবতে, লিখতে, শুট করতে গিয়ে ডিরেক্টরের কোথাও খটকা লাগলো না কোন?

আরেকটা উদাহরণ দিই, শুনুন। প্রতিম একবার দ্যাখাচ্ছেন, খবর কাগজের জনৈক রিপোর্টারকে সিকিউরিটি ডেকে ঘাড় ধাক্কা মেরে হোটেলের লাউঞ্জ থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে দেবদত্ত, ছোকরাটি হঠাৎ করে এসে ওর ইন্টারভিউ করতে চেয়েছিল বলে। তার একটু পরেই আবার দেখাচ্ছেন, রাস্তার বাস স্টপে সেই ছোকরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকেই আবার গাড়িতে তুলে নিজের স্যুইটে নিয়ে গিয়ে জামাই আদর করে খাইয়ে-দাইয়ে ইন্টারভিউ দিতে বসছে ও! কোন কারণ ছাড়াই প্রোটাগনিস্টের মানসিকতায় অ্যাত্ত বড় চেঞ্জ? এটা কি স্ক্রিপ্ট হচ্ছে নাকি ফাতরামি হচ্ছে, বলবেন একটু প্লিজ?

নিজে মন দিয়ে দ্য টেলিগ্রাফ পড়ে দেবদত্ত। তবে ওর ইন্টারভিউ নিতে আসে সকালবেলার রিপোর্টার, দ্য টেলিগ্রাফ-এর নয়।

হোটেল ‘সুইসোটেল’-এর খাওয়ার জায়গায় বসে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পড়ছে দেবদত্ত, এরকম একটা সিন দেখিয়েছেন আপনি। তা’ যে শহরে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর মতো বড় একটা কাগজ আছে, সেখানে কিনা ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রিটি দেবদত্ত সেনের ইন্টারভিউ নিতে সাংবাদিক এলো ‘সকালবেলা’ থেকে? ওই খুচরো সাংবাদিক পলাশ (অর্জুন চক্রবর্তী – জুনিয়র) ছাড়া আর কেউ জানতেই পারছে না ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রিটি দেবদত্ত সেন বারো বছর পর এই প্রথম শহরে এসেছে এবং দিনের পর দিন এখানে থাকছে বলে! হয় কখনও এটা? আর ‘সকালবেলা’ মানে কি সারদা চিটফান্ডের সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কাগজ? কোন আক্কেলে এই গল্পের মধ্যে সেটাকে ধরে টানতে গেলেন আপনি?

বুঝতে পারছেন, জায়গায় জায়গায় ছড়িয়েছেন কেমন আপনি?

ফুড ফিল্ম বানাচ্ছেন বলে আপনার ফোকাসটা অন স্ক্রিন রান্না-বান্না দ্যাখানোর দিকে থাকছে, ভাল। কিন্তু তাই বলে পারিপার্শ্বিকের এমন বারোটা বাজিয়ে ছাড়লে যে সিনেমা তৈরিটাই গুবলেট হয়ে যাবে, ভাই?

খুব কেতা মেরে তো এটা শুনিয়েছেন যে প্যারিসে আর নিউ ইয়র্কে দেবদত্তের রেস্তোরাঁগুলো হল ‘মিশেলিন স্টার’ পাওয়া রেস্তোরাঁ। কিন্তু এই যে নিজের বিরাট ব্যবসা ছেড়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে কলকাতায় এসে মায়ের জন্যে মাছের ঝোল বানানোয় মেতে উঠলো দেবদত্ত – ওর অনুপস্থিতিতে প্যারিসে আর নিউ ইয়র্কে ওর ব্যবসাপাতি সামলালো কে, সেটা নিয়ে একটা লাইনও বললেন না কেন কোথাও?

আরও পড়ুন:  ১৬ বছর বয়সে পালিয়ে বিয়ে করেন দিদির ৩১ বছরের সেক্রেটারিকে...জন্মদিনে অজানা আশা

যে লম্বা সময়টা কলকাতা এসে থাকলো দেভ ডি, তার মধ্যে বার কয়েক শুধু প্যারিস-বাসিনী প্রেমিকার আবেগে চুবনো ফোন। তাকে দিয়ে মায়ের অসুস্থতার রিপোর্ট দেখিয়ে প্যারিসের বড় ডাক্তারের মত নেওয়াটাও আছে। কিন্তু এটা ছাড়া আর কোন কিচ্ছু না। একবারও মনে হয়েছে যে, ওর ওই বিশাল ব্যবসাটা ওকে ছাড়া কী ভাবে চলছে, সেটা নিয়ে দেবদত্তের আদৌ কোন মাথাব্যথা আছে বলে?

শুধু কি ব্যবসা? দেবদত্ত তো বাবার চাপে নাকি পনের-ষোল বছর আগে বিয়েও করেছিল একটা! আর তিন বছর সংসারও করেছিল নাকি দিব্যি! কিন্তু ওই তিন বছরেও বৌয়ের সঙ্গে তেমন করে চেনাশুনো নাকি হয়েই ওঠে নি ওর! তাই ‘কর্ডন ব্লু’তে রান্না-বান্না শেখার সুযোগ পাওয়া মাত্র সেই বৌ’কে ছেড়ে দূর বিদেশে হাঁটা লাগাতে এক বিন্দু দেরি লাগায়নি ও!

তিন বছর একসঙ্গে সহবাস করার পরেও দুজনের দাম্পত্য নাকি এমন ছিল যে এক কথায় স্ত্রীকে ছেড়ে যেতে বাধে নি দেবদত্তের!

কাণ্ড বুঝুন! ডিভোর্স তো করলোই না, বৌ শ্রীলা (পাওলি দাম) কলকাতায় একা খরচ চালাবে কী করে, সেটা নিয়ে ভেবে দ্যাখার দায়ও আর টের পেল না কিছু! ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সেই বৌটি যে প্রেগন্যান্ট, আর পরে যে ওর একটা বাচ্চাও হয়েছে, সে সব খবরও – বুঝতেই পারছেন নাদান দেভ ডি-র অজানাই রয়ে গেল! সিনেমায় প্রতিম দ্যাখাচ্ছেন, একদিকে সেই বাচ্চার খরচ চালাতে সুপার সেলিব্রিটি দেভ ডি-র গরিব বৌ শ্রীলা শহরতলির একটা স্কুলে মাস্টারি করে বেড়াচ্ছে, আর আরেক দিকে বারো বছর সাত মাস তেরো দিন পর কলকাতা ফিরে ‘মাম্মি’ ‘মাম্মি’ বলে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাছের ঝোল রেঁধে বেড়াচ্ছে ছবির হিরো দেভ ডি।

ন্যাকামি আর ধ্যাস্টামির লেভেলটা ভাবুন এই বাংলা সিনেমার, ভাই!

বারো-তেরো বছর পর ছেলেকে দেখতে পেলেন সবে। এসময় কেমন হওয়া উচিৎ হসপিটালের বেডে শুয়ে থাকা মায়ের (মমতাশঙ্কর) রিয়্যাকশন? প্রতিম এখানে যে রিয়্যাকশন দ্যাখালেন সেটা তো প্রায় এরকম যে, মাঝের এই বছরগুলোয় এবেলা-ওবেলা দুজনের দ্যাখা আর আড্ডা হতো যেন।

তাই ছেলের কাছে আর কিছু বলার নেই, অভিমানে নীরব হয়েও যাওয়া নেই, উলটে মায়ের আদুরে আবদার, পঁচিশ বছর আগে যে মাছের ঝোলটা আমায় রেঁধে খাইয়েছিলি, সেটা আবার করে রেঁধে খাওয়াতে পারবি বাবু? ব্যাস, ছেলেও অমনি উঠে-পড়ে লেগে গেল সেই মাছের ঝোল রেঁধে খাওয়ানোর জন্য।

জগতে জীবনে আর কোথাও তখন কোন সমস্যা নেই, শুধু এই নতুন রাঁধা মাছের ঝোলের টেস্টটা পঁচিশ বছর আগের মতো হচ্ছে না কেন, এই একটা ব্যাপার ছাড়া!

ফুড ফিল্মের জন্য গল্প আপনি কী ভাবে ফাঁদবেন, সেটা আপনার ব্যাপার প্রতিম, শুধু আপনি বলুন তো সিরিয়াসলি, এটা কোন গল্প হয়েছে কিনা।

গোটা গল্পটায় মাটির সঙ্গে কোথাও কোন যোগ নেই যেন জাস্ট! ওই সিকোয়েন্সগুলো ভাবুন, যখন একটার পর একটা মাছের ঝোলের রেসিপি ট্রাই করছে দেবদত্ত আর ওর মা খেয়ে মাথা নেড়ে বলছেন, খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু সেই পঁচিশ বছর আগের মতো হয় নি। মাটির সঙ্গে যোগ থাকলে তখন প্রথম তো দেবদত্তের মাথায় এই কথাটা আসা উচিৎ ছিল যে, পঁচিশ বছর আগের দুনিয়ার টেস্ট কাট-পেস্ট ওরকম ফেরত পাবে কী করে তুমি, মা?

এই পঁচিশ বছরে খাবারে যে পরিমাণ রাসায়নিক সার আর কীটনাশক এসে ঢুকেছে, এখন সে সব সরিয়ে তোমায় আমি পঁচিশ বছর আগের স্বাদ ফেরত দেবটা কী করে, মা?

কিন্তু এই লজিকটা প্রতিমের ছবিতে এলোই না কখনও!

তলিয়ে ভাবতে গেলে এরকমই গোলমেলে আর নড়বড়ে লাগে ‘মাছের ঝোল’-এর ভিত!

হ্যাঁ, এবার রাস্তা থেকে জামাই আদর করে উঠিয়ে আনা সেই ছোকরা রিপোর্টারের গল্পে ফেরত যাই, চলুন। কেন প্রথমে ঘাড় ধাক্কা মেরে তাড়ানোর পরেও তাকে ওরকম খাতির করে ডেকে আনা হল, জানেন? কেন আবার, দেবদত্তের সামনে ও ওরকম কোশ্চেন হাতে হাজির না হলে পাবলিককে দেবদত্তের জীবনের গল্প ডিরেক্টরবাবু শোনাবেন কী করে বলুন?

সাংবাদিক অদিতির কাছে নিজের জীবনের বেশিটাই খুলে ধরেছিলেন সুপারস্টার অরিন্দম। তৈরি হয়েছিল নায়ক (১৯৬৬)

ঠিক ধরেছেন, এটা সেই ‘নায়ক’ (১৯৬৬) ছবির স্টাইল। সেই সেখানে যেমন সিনেমার স্টার অরিন্দম মুখার্জির সামনে পেন আর কাগজ হাতে হাজির হয়েছিলেন সাংবাদিক অদিতি সেনগুপ্ত, আর প্রথমটায় তাকে এড়িয়ে গেলেও পরে সেই তার কাছেই নিজের মনের সব জানলা হাট করে খুলে দিয়েছিলেন বাংলা ছবির নায়ক, একদম সেই প্যাটার্নটা এই ছবিতেও টোকা।

আরও পড়ুন:  একজন সন্ন্যাসী হয়ে কি না তিনি আমিষ খাচ্ছেন !

পেশাদার জার্নালিস্ট হিসেবে সারা দুনিয়ার ছবি আর টিভি সিরিজ নিয়ে তো ফি দিন ইংরেজি কাগজের সাপ্লিমেন্টারিতে কলম-বাজি চালাতে দেখি প্রতিমকে। সেই তাঁকে কিনা টুকতে হল ৫১ বছরের পুরনো এক বাংলা ছবি থেকে?

নিজের মাথা থেকে ভেবে বের করতে পারলেন না কিছু? বা অ্যাটলিস্ট দূরের কোন দেশের সিনেমা-ফিনেমা হলেও হত, ঝেঁপে মারার কেসটা অন্তত এত চট করে ধরা পড়ে যেত না তাতে। 

‘নায়ক’-এর সঙ্গে এ ছবির শেষটা অবধি এক! সুপার সেলিব্রিটির এত সব গোপন কথা জানতে পেরেও স্রেফ বিবেক-বোধের চোটেই নাকি সে সব কিছু ছাপতে পারছে না সেই রিপোর্টার পলাশ! ফারাক বলতে এটুকু যে ’৬৬ সালের সিকোয়েন্সটায় অদিতির মুখে রায়মশাই যে ডায়ালগ লিখেছিলেন, সেটা আজকের দিনে পৌঁছে প্রায় আইকনিক হয়ে গেছে। আর এখানে, ওই দৃশ্যে রিপোর্টার পলাশের মুখে পরিচালক যে সংলাপ গুঁজে দিলেন, সেটা শুনে মনে হচ্ছিল, ঢের হয়েছে ভাই, ডায়ালগ লেখার জন্যে এবার একটু সুখেন দাশের কাছে ক্লাস করে এসো প্লিজ।

আরও গণ্ডগোল কোথায় হয়েছে শুনুন। ‘নায়ক’ ছবির অনেকটা জুড়েই যে নায়ক অরিন্দমের সামনে হাজির রিপোর্টার অদিতি, হিসেব মতো তো এতে অসুবিধে ছিল না কোন, কারণ, দুজনে এক ট্রেনেই দিল্লি যাচ্ছে, আর ট্রেনের সময়টুকু তো বাধ্য হয়েই কাছাকাছি না কাটিয়ে উপায় নেই কিছু। এখন এই ‘মাছের ঝোল’-এ তো আর সে রকম কোন জার্নি নেই যে, রিপোর্টারের সঙ্গেই বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হবে দেভ ডি’কে। ওদিকে রিপোর্টারের সিকোয়েন্স চট করে ফুরিয়ে গেলেই বা চলবে কী করে, কারণ রিপোর্টারের ডায়ালগে ভর করে তবেই না দেবদত্তের ব্যাক স্টোরি দ্যাখানোর সুযোগ!

এই সংকট থেকে ডিরেক্টর প্রতিম ডি গুপ্ত কী ভাবে মুক্তি পেলেন, শুনুন। হোটেল রুমে বসে রিপোর্টারের সামনে দেওয়া ইন্টারভিউটাকেই কেটে টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিলেন পুরো ছবিতে!

ফলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই রকম যে সরল ন্যারেটিভে ভর ক’রে ছবিটা শুরু হল বটে, কিন্তু কিছুটা এগোনোর পর, হঠাৎ করে ন্যারেটিভ এলোমেলো করে দিতে হল, শুধু রিপোর্টারের সূত্র ধরে ধরে ছবিতে ফ্ল্যাশ ব্যাক আনতে হবে বলে। রিপোর্টারের সঙ্গে একটা সিটিংয়েই যেটা ঘটে গেছে, বারবার সেই ফুটেজের একটা টুকরো দ্যাখাতে হচ্ছে, সেটা ছাড়া দেবদত্তের ব্যাকস্টোরি দ্যাখানোর আর কোন উপায় ডিরেক্টর খুঁজে পাচ্ছেন না বলে।

সত্যজিৎ থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণ ঘোষ পর্যন্ত যে সমস্ত জনগণ বাংলা ছবির স্ক্রিপ্ট লিখে গেছেন আগে, তারপর তো এরকম ভাটের স্ক্রিপ্ট থেকে তৈরি ছবি দেখতে বসাটাও রীতিমতো শাস্তিভোগের মতো।

আর আছে ওই অনুপম রায় নামে ভদ্রলোকের গান। বাংলার আরবান ফিল্মের মিউজিক মানেই তো এখন অনুপম। তা সে ‘জুলফিকার’-এ খিদিরপুরের মাফিয়া গুণ্ডা হোক, বা ‘পোস্ত’য় শান্তিনিকেতনের দুষ্টু পুঁচকে হোক, বা এখানে এই প্যারিসের মহা-কেতামারা মাস্টার শেফ-ই হোক – সব জায়গায় গান মানেই অনুপম জুড়ে দেওয়া। মাইরি বলছি, মাছি মারা কেরানির মতো এত শর্টে কাজ সারবেন না, বাংলায় অন্য গলাও আছে, অন্য সুরও আছে, একটু চারপাশটা এক্সপ্লোর করার চেষ্টা করুন প্লিজ। 

প্রায় নবাগতা সৌরসেনীর উপস্থিতি ছবিতে যেন রিলিফের কাজ করে

তবে এরকম প্রায় ল্যাজে-গোবরে মার্কা একটা ছবিরও কিছু কিছু অংশ বেশ ভাল। যেমন চারবার চার রকম ভাবে মাছের ঝোল বানানোর সিকোয়েন্সগুলো দিব্যি লাগে দেখতে। ওই অংশগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও তো বেশ কান ভরিয়ে দ্যায়।

আর ভাল লাগে ক্লোজ শটে সৌরসেনী মৈত্রকে। এক মুখ দেখে দেখে চোখ পচে যাওয়ার পর আর কিছু না হোক ফ্রেশ একজন সুন্দরী দেখে রিলিফ তো অন্তত পেলাম।

কিন্তু আপনি বলুন তো সত্যি করে, এই ২০১৭ সালে, একটা বাংলা ছবি মানে কি শুধু এইটুকুনি নাকি? আর কোন কিচ্ছু নয়?

ডিরেক্টরের পেটোয়া কিছু লোকজনকে দেখলাম ফেসবুকে ছবিটা নিয়ে ধন্য-ধন্য করতে।

তখন মনে হচ্ছিল বাংলা ছবির সর্বনাশের জন্য শুধু আকাট নির্বোধ ডিরেক্টররাই নয়, গামবাট ওই চামচাগুলোও দায়ী।

1 COMMENT

  1. If a person does not like a film, he/she has every right to criticize it. But on the other hand, if someone appreciates the same film, they should not be addressed as dumb or gumbut and that also on a public forum. I feel that these kind of bad comments should not even be published.