ভিলেনদের বোধহয় হিরোদের মহিমা বেশি গৌরবান্বিত করার জন্যই সৃষ্টি করা হয় | এরকমই একজন, মহিষাসুর | তবে খলনায়ক হলেও তাঁর পেডিগ্রিও কিছু কম না | তিনি নিজেও একজন রাজার ছেলে | অসুররাজ রম্ভার পুত্র | রম্ভা এবং মহিষরূপী শাপগ্রস্ত রাজকুমারি শ্যামলার মিলনেই জন্ম মহিষাসুরের |

দেবতা-অসুরের যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্রের হাতে নিহত হন রম্ভা | তার প্রতিশোধ নিতেই স্বর্গ থেকে দেবতাকে তাড়িয়ে দেন মহিষাসুর | এরপরের ইতিহাস বহু চর্চিত | টানা ন’ দিনের যুদ্ধে মা দুর্গার হাতে তাঁর নিধন…ইত্যাদি ইত্যাদি |

এবার বরং দেখে নেওয়া যাক মহিষাসুরের অন্য ইতিহাস | কিছু কিংবদন্তি বলে,মহিষাসুর মোটেও খলনায়ক নন | বরং তিনি মা দুর্গার নিষ্ঠাবান ভক্তদের মধ্যে অন্যতম |

কালিকাপুরাণ অনুযায়ী,মা দুর্গা তাঁর মাতৃশক্তি দিয়ে পরিচালনা করেন সারা পৃথিবী | একসময় সীমাহীন ক্ষমতা পেয়ে দেবীর চোখের সামনেই বিপথে চলে যান দেবতারা | তাঁদের শিক্ষা দিতে মহিষাসুরকে বেছে নেন দেবী | বলেন,মহিষাসুর যদি দুর্গাকে দেবী রূপে পুজো করেন তাহলে হাজার বছরের পুণ্য অর্জন করবেন |

তাতে সম্মত হন রম্ভা-পুত্র | জন্ম নেন দৈত্য রূপে | দেবীর নির্দেশে দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন | একে, তাঁর উপর বর্ষিত হয়েছে আদ্যা শক্তির কৃপা | তার উপর স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মার আশীর্বাদ | ফলে কোনওমতেই তাঁর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারলেন না দেবতারা |

শেষে কয়েকশো বছর ধরে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত থাকার পরে দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হলেন দেবতারা | দেবী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিলেন স্বর্গ ফিরিয়ে দেওয়ার |

অবশেষে দেবীর মহিষাসুর নিধন | এবং মহিষাসুর মর্দিনী রূপ লাভ | সেইসঙ্গে দেবতাদেরও শিক্ষা দেওয়া হল | যে তোমরা যতই পুরুষ হও না কেন, শেষ অবধি মাতৃশক্তির কাছে আসতেই হবে সাহায্যের জন্য |

মৃত্যুর আগে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন মহিষাসুর | দেবী তাঁকে বর দেন,মর্ত্যে যতদিন তাঁর আরাধনা হবে, পুজো করা হবে অসুরকেও |

সেই জন্যেই বোধ হয় মা দুর্গার পায়ের তলায় গাঁদার মালা(ছোট হলেও) ঝোলে অসুরের গলাতেও | তাঁর মুখেও দশমীর দিন গুঁজে দেওয়া হয় মিষ্টি | তাঁর পায়েও বই ঠেকিয়ে প্রণাম করে খুদেরা | ছিঁড়ে নেয় মালার ফুল |

আরও পড়ুন:  প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় জানেন সাফল্যের মিঠে স্বাদ কীভাবে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে হয়

অবশ্য দাক্ষিণাত্যে ছবিটা অন্যরকম | সেখানে এত হতশ্রদ্ধার পুজো নয় | বলা হয়, মহীশুর শহরের নামই এসেছে মহিষাসুরের নাম থেকে | টিপু সুলতানের শহরে চামুণ্ডি পাহাড়ে তাঁর মূর্তিও আছে |

কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর জানা যায় না | দশমীতে মা দুর্গার সঙ্গে বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয় অসুরকেও | তারপর কৈলাসে গিয়ে কী হয়? কাঠামো জলের ডোবার পরেই তাড়াতাড়ি পা সরিয়ে নেন মা? তুলে নেন বিঁধে থাকা ত্রিশুল? তিনিও তো মা | ছেলে যতই অবাধ্য হোক, বেশি শাস্তি কি আর দিতে পারেন…

NO COMMENTS