সদ্য তরুণ রবির গালে দাড়ি মোটেও ভাল লাগত না তাঁর | স্পষ্ট করে সে কথা কবিকে বলেওছিলেন তরুণী | সমসাময়িক গড়পড়তা মেয়েদের থেকে এগিয়ে থাকা এই কন্যার সপ্রতিভতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন মহর্ষির কনিষ্ঠ পুত্র | স্বভাব লাজুক রবি তরুণীর কাছে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি | একতরফা এই দূরত্বের মধ্যেই মরাঠি দুহিতার নাম দিয়েছিলেন নলিনী | অন্নপূর্ণা তড়খড়ের তুলনায় নলিনী নামেই আন্তরিকতার ছোঁয়া বেশি |

বম্বেতে মরাঠি সমাজের শিরোমণি ছিলেন আত্মারাম পাণ্ডুরঙ্গ | গভীর অধ্যাত্মবাদে বিশ্বাসী এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক | শুরু করেছিলেন প্রার্থনা সভা | কিন্তু তাঁর বাড়িতে বইত পাশ্চাত্য বাতাস | সেই পরিবারকেই উপযুক্ত বলে মনে করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর | ছোট ভাই রবির জন্য | যাতে ইংল্যান্ডে পড়তে যাওয়ার আগে বিদেশি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হতে পারেন তিনি | 

১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে দু মাসের জন্য সত্যেন্দ্রনাথের বিশেষ বন্ধু আত্মারামের বাড়িতে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ | ইংল্যান্ডে পড়তে যাওয়ার আগে কথ্য ইংরেজি এবং বিলেতি সহবতে অভ্যস্ত হতে | তাঁকে শেখানোর ভার পড়েছিল আত্মারামের মেজো মেয়ে‚ সদ্য বিলেতফেরত অন্নপূর্ণার উপরে | 

রবি তখন ১৭ | অন্নপূর্ণা ২০ | যদিও কেতকী কুশারী ডাইসনের বইয়ে বলা হয়েছে অন্নপূর্ণা রবির থেকে ৬ বছরের বড় ছিলেন | অন্নপূর্ণার তত্বাবধানে তাঁর ছাত্র ইংরেজিতে কতটা এগিয়েছিল‚ তার খতিয়ান নেই | তবে শিক্ষিকার অনুরোধে ছাত্র তাঁর নামকরণ করেছিলেন নলিনী | লিখেছিলেন কবিতা | তাতে বসিয়েছিলেন সুর |

সেই সুর বেশি অনুরণিত হওয়ার আগেই বন্দরে শোনা গেল জাহাজের ভোঁ | ইংল্যান্ডের জাহাজে উঠে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ | শেষ হয়ে গেল দু মাসের নলিনী-সখ্যতা |

আত্মারাম পাণ্ডুরঙ্গ ও কন্যা অন্নপূর্ণা

এর দু বছর পরে ১৮৮০ সালে বিয়ে অন্নপূর্ণার | পাত্র স্কটিশ সাহেব হ্যারল্ড লিটলহেড | বরোদা হাই স্কুল ও কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল | বিয়ে করে ইংল্যান্ড চলে যান রবির নলিনী | 

বিদেশবাস বা দাম্পত্য দীর্ঘ হল না তাঁর | কোথাও বলা হয়েছে‚ বিয়ের এক বছর পরেই তাঁর মৃত্যু হয় | কোথাও দাবি‚ ১০ বছরের দাম্পত্য শেষে প্রয়াত হন ৩৩ বছর বয়সী অন্নপূর্ণা | আমৃত্যু সাহিত্যচর্চার সময়ে ব্যবহার করতেন রবির দেওয়া নলিনী নাম | নিজের এক ভাইপোর নামকরণও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ |

তিনি বলতেন‚ রবির কথা আর সুর নাকি তাঁকে মৃত্যুশয্যা থেকেও ফিরিয়ে আনবে | তা সত্যি হয়নি | যেমন ফলেনি তাঁর আর এক অনুরোধ | সে অনুরোধ উপেক্ষা করেই রবি দাড়ি রেখেছিলেন ব্রাহ্ম ধারা অনুসরণ করে | তাঁর অনুরোধ উপেক্ষিত হচ্ছে‚ সেটা দেখে যেতে পারেননি নলিনী | এ কথা রবি নিজেই উল্লেখ করেছিলেন | 

১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন নলিনী | তবে ফাঁকা রাখলেন এর উৎসর্গের জায়গাটি | শূন্য রিক্তই রয়ে গেল সেই পৃষ্ঠা |

এখানেই শেষ হয়ে যেত কবি ও নলিনী পর্ব | বাকি থাকল আর একটু সংযোজন | ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় এসেছিলেন আত্মারাম পাণ্ডুরঙ্গ (The Myriad Minded Man by  Dutta & Robinson ) | সঙ্গে অন্নপূর্ণা এবং আর এক কন্যা | জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এসেছিলেন তাঁরা | রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছিল আত্মারাম ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের | কোনও সাক্ষী ছিল না তাঁদের সাক্ষাতের |

কল্পনাপ্রবণ মন ভাবতে ভালবাসে তাঁর মেজো মেয়ের সঙ্গে মহর্ষির কনিষ্ঠ পুত্রের বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন আত্মারাম | কিন্তু তা নস্যাৎ করেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর | ভিন প্রদেশের বয়সে বড় মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ের সম্বন্ধ মেনে নিতে পারেননি উদারমনস্ক এই ব্রাহ্ম প্রাজ্ঞ ?  নাকি আদৌ সেসব কোনও কথাই হয়নি দুজনের ? উত্তর জানে শুধু জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অলিন্দ | ইচ্ছে হলে একবার কৌতূহলী কান পাততে পারেন |

আরও পড়ুন:  বয়সে ছোট স্বামী পরনারীতে আসক্ত‚ ছেলে অভিযুক্ত প্রেমিকার আত্মহত্যায়‚ যেমন আছেন চিতচোর-নায়িকা
- Might Interest You

NO COMMENTS