পয়লা জানুয়ারি বলে কথা ! কেক ভক্ষণ নইলে বাঙালির চলবে কেন ?

এক বাঙাল পোলাও কেক কিনতেন কলকাতার নামী বেকারি থেকে | তখন মধ্যবিত্ত পরিবারে অত কেক-পেস্ট্রির প্রচলন ছিল না | যাই হোক‚ তিনি কেক কিনে গাড়ি চালিয়ে সোজা চলে যেতেন বিশেষ এক জনের বাড়ি | সেদিন সেই বিশেষ জনের জন্মদিন | আর কেউ মনে রাখুক বা না-ই রাখুক‚ ভুল হতো না বাঙাল পোলার | ফি বছর শুরুর দিনটা সেই বিশেষ জনের সঙ্গে বিকেলের চা পান করতেন কেক দিয়ে |

বাঙাল পোলা আর কেউ নন‚ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় | আর ওই বিশেষ জন হলেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস | তাঁর শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই | তিনিও স্যর-এর প্রিয় ছাত্র |

হোঁচট খেলেন ? 
খাওয়ারই কথা | 
যাঁর নাম বললেই কানের কাছে ভেসে ওঠে সেই অমোঘ আব্দার  মাসিমা মালপো খামু সেই কমেডিয়ানের সঙ্গে কি আর প্রখ্যাত পদার্থবিদের সম্পর্ক ভাবা যায় ? 

এটাও কি ভাবা যায় যমালয়ে জীবন্ত মানুষ একসময় সক্রিয় বিপ্লবী আন্দোলন করতেন ? তখন তিনি পরিচিত সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায় বলে | বাংলা ছবির ভানু তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে |

যে ঢাকা বিক্রম পুরে জন্ম ১৯২০ সালের ২৬ অগাস্ট‚ তা ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল দেশভাগের আগেই‚ চারের দশকের শুরুতে | জন্মস্থানের পাশাপাশি ফেলে আসতে হয় স্বদেশী আন্দোলনের দিনগুলিও | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সাম্যময় চাকরি নেন কলকাতার আয়রন অ্যান্ড স্টিল কন্ট্রোল বোর্ডে |

সেইসঙ্গে চলতে থাকে স্ট্যান্ড আপ কমেডি | অতীতে এটা তিনি ওপার বাংলায়ও করতেন | ১৯৪৩ সালে প্রথম তিনি তা রেকর্ড করেন | এত জনপ্রিয় হয়‚ প্রতি বছর পুজোয় নতুন কমেডির রেকর্ড প্রকাশ করতে হতো |

মাইক্রোফোনের পিছন থেকে ক্রমে জায়গা করে নিলেন পর্দায়‚ বাংলা ছবিতে | প্রায় সব জায়গাতেই তিনি কথা বলছেন পূর্ববঙ্গীয় টানে | প্রথম ছবি ১৯৪৭ সালে‚ জাগরণ | তবে প্রথম স্মরণীয় কাজ নির্মল বসুর পরিচালনায়  পাশের বাড়ি ছবিতে | মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫২ সালে |

অভিনয় করেছেন ৩০০-র বেশি ছবিতে | তারমধ্যে বলতেই হবে ভ্রান্তিবিলাস‚ পাশের বাড়ি‚ মিস প্রিয়ম্বদা‚ ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট‚ আশিতে আসিও না‚ যমালয়ে জীবন্ত মানুষ‚ পার্সোন্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট‚ পাত্রী চাই‚ সাড়ে চুয়াত্তর‚ ওরা থাকে ওধারে‚ ছেলে কার‚ টনসিল‚ টাকা আনা পাই‚ সাহেব বিবি গোলাম‚ ভানু পেল লটারি‚ লৌহকপাট‚ নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে ‚ বর্ণচোরা‚ হাটেবাজারে‚ আপনজন‚ সাগিনা মাহাতো‚ হারমোনিয়াম‚ শহরের ইতিকথা‚ সংসার সীমান্তে‚ বিন্দুর ছেলে‚ রামের সুমতি এবং গল্প হলেও সত্যি ছবিতে তাঁর অনবদ্য কাজ |

চুটিয়ে অভিনয় করেছেন যাত্রার খোলা মঞ্চেও | তাঁর নিজের যাত্রাদলের নাম ছিল মুক্ত মঞ্চ | এই প্রতিভাবান অভিনেতার স্ত্রী নির্মলা ( বিয়ের আগে মুখোপাধ্যায় ) ছিলেন সুদক্ষ গায়িকা | প্লে ব্যাকে যখন কেরিয়ার করার মুখে‚ তখনই বিয়ে হয়ে যায়‚ ১৯৪৬ সালে | তারপরেও গান গেয়েছেন বেশ কিছু ছবিতে | মিউজিক কম্পোজ করতেন স্বামীর সব যাত্রাপালা এবং থিয়েটার জয় মা কালী বোর্ডিং-এ | আধুনিক‚ পল্লীগীতি‚ নজরুলগীতি‚ কীর্তন-সহ সঙ্গীতের বিভিন্ন বিভাগে রেকর্ড আছে নির্মলার | আতা গাছে তোতা পাখি‚ ইলশে গুড়ি‚ ইলিশ মাছের ডিম তাঁর জনপ্রিয় রেকর্ড |

ভানু-নির্মলার দুই ছেলে‚ এক মেয়ে | বড় ছেলে গৌতম অভিনয় করেছেন অর্ধাঙ্গিনী‚ কাঞ্চনমূল্য ছবিতে | পরবর্তী সময়েও বিনোদন জগতের সঙ্গে জড়িত | ছোট ছেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে দীর্ঘদিন শিকাগোবাসী | ভানুর মেয়ে বাসবীও অভিনয় করেছেন একাধিক ছবিতে | তাঁর অভিনীত ছবি হল অতিথি‚ অর্ধাঙ্গিনী‚ শুভরাত্রি এবং নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে | বিয়ের পরে পরবর্তী জীবনে বাসবী একজন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষিকা |

পর্দায় যতই দর্শককে আমোদিত করুন না কেন‚ ঘরে কিন্তু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যথেষ্ট শাসন-অনুশাসনেই বড় করেছেন তিন সন্তানকে | দায়িত্ববান বাবার ভূমিকায় কোথাও এতটুকু ফাঁকও ছিল না | ঠিক যেমন নিশ্ছিদ্র ছিল পর্দার নিখাদ অভিনয় | তাঁর মতো অভিনেতারা ছিলেন বলেই উত্তম-সুচিত্রার স্বর্ণযুগ এত রত্নখচিত হতে পেরেছিল |

বাংলা ছবিকে বর্ণ ও জৌলুসহীন করে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অস্ত গিয়েছিলেন ১৯৮৩-র ৪ মার্চ | তাঁর অস্তমিত রাগে এখনও উদ্ভাসিত বাংলা চলচ্চিত্রের দিগন্ত | 

আরও পড়ুন:  আদপে শিব-পার্বতীর জন্য স্বর্ণলঙ্কা বানিয়েছিলেন বিশ্বকর্মা‚কিন্তু সেটি ভোগ করলেন রাবণ

NO COMMENTS