অতনু ভট্টাচার্য
অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক | পাঠদানের মূল বিষয় সংস্কৃত ও বাংলা | পড়ানোর পাশাপাশি গভীর আগ্রহ ভারতীয় সংস্কৃতি এবং সনাতনী ধর্মের নানা শাখাপ্রশাখায়, ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ গড়ার ফাঁকে তাঁর অবসর যাপনের মূল উপজীব্য বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি |

(প্রথম পর্বের পরে…)

আচার্য বৌধায়নের মতে নদীতীরে তর্পণ করাই শ্রেয় | নাভিদেশ পর্যন্ত জলে গিয়ে তর্পণ করা বিধেয় | তবে প্রতিষ্ঠিত পুষ্করিণী বা স্থলেও তর্পণ করা যায় | খেয়াল রাখতে হবে বৃষ্টির জলমিশ্রিত জলে তর্পণ করা চলবে না | তর্পণ করার সময় বৃষ্টি হলে ছাতা ব্যবহার করতে হবে | আর স্থলে তর্পণ করলে তর্পণজল তামার পাত্রে ফেলতে হবে এবং শেষে তা নদী, পুষ্করিণী বা পবিত্র স্থানে ফেলতে হবে | জলে দাঁড়িয়ে‚ নদীতীরে বসে বা বাড়িতে বসে যেখানেই তর্পণ করা হোক না কেন তর্পণজল সর্বদা ৮-৯ ইঞ্চি ওপর থেকে ফেলতে হবে |

তর্পণ করার আগে স্নান করে তিলকধারণ (মাটি বা জল দিয়ে) আচমন ও বিষ্ণুস্মরণ করে নিতে হবে | দেবতর্পণ ও ঋষিতর্পণে পূর্বমুখে যবমিশ্রিত (মতান্তরে যব ছাড়া) জলে তর্পণ করতে হয় | তর্পণজল অর্পণ (দান) করা হয় হাতের আঙুলের দিক দিয়ে অর্থাৎ অঙ্গুলির অগ্রভাগ দিয়ে | তবে মনুষ্য তর্পণে উত্তরমুখে (সামবেদীগণের ক্ষেত্রে পশ্চিমমুখে) উপবীতকে গলায় মালার মতো ঝুলিয়ে কনিষ্ঠ অঙ্গুলির মূলভাগ দিয়ে ( অর্থাৎ হাতের তালুকে একটু কাত করে) জলদান করতে হবে | এছাড়া দিব্য পিতৃতর্পণে দক্ষিণমুখে প্রাচীনাবীতী অর্থাৎ উপবীতকে দক্ষিণ স্কন্ধে ঝুলিয়ে পিতৃতীর্থ (তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠের মধ্যভাগ) দিয়ে জলদান করতে হবে তবে কৃষ্ণ তিল-সহ | পিতৃতর্পণের শুরুতে পিতৃগণকে আবাহন করা হয় — ‘ওঁ আগচ্ছন্তু মে পিতর ইমং গৃহ্ণন্তু অপোহঞ্জলিম’ মন্ত্রে |

সনাতন হিন্দু ধর্মের যে উদারতা আমরা দুর্গাপূজায় দেখতে পাই — দেবীর দ্বাদশ মৃত্তিকা স্নানে বেশ্যা দ্বারমৃত্তিকার আবশ্যকতায় | অর্থাৎ সর্বজনীন দুর্গাপূজার মহোৎসবে বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, মানুষে মানুষে পার্থক্যের যে বেড়াজাল প্রচলিত তাকে পূর্ণমাত্রায় শ্লথ করার প্রয়াস, যা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ধ্বনিত ‘ মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা/মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা/সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে/এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে |’

মানুষে মানুষে বিভেদ মোচনের সেই সুর আমরা দেখতে পাই তর্পণের মধ্যেও | এককালে যে মুনি-ঋষিগণ শূদ্র জাতিকে অস্পৃশ্য করে রেখেছিলেন তাঁরাই আবার পুত্র-পৌত্রহীন ভীষ্মতর্পণের পর উচ্চারণ করেন —
যেহ বান্ধবাবান্ধবা বা, যেহন্যজন্মনি বান্ধবাঃ |
তে তৃপ্তিমখিলাং যান্তু, যে চাস্মত্তোয় কাঙ্ক্ষিনঃ |

আরও পড়ুন:  দেবী দুর্গাকে কী নামে ডাকতেন রাবণ-পত্নী মন্দোদরী ?

অর্থাৎ যারা বন্ধু নয় (শত্রু) বা বন্ধু অথবা যারা অন্য জন্মে বন্ধু ছিল এবং যারা আমাদের কাছে জলের প্রত্যাশা করে তারা (এই জলে) সম্পূর্ণ তৃপ্তিলাভ করুক |

এরপর সম্পূর্ণ তর্পণে অক্ষম ব্যক্তিগণের পক্ষে বিধেয় ‘রামতর্পণ’-এও আমরা দেখি —
ওঁ আব্রহ্ম ভুবনাস্লোকা দেবর্ষি পিতৃমানবঃ |
তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্বে মাতৃ-মাতামহাদয়ঃ |
অতীতকুলকোটীনাং সপ্তদীপ নিবাসিনাং |
ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ম |

অর্থ হল,ব্রহ্মলোক অবধি যাবতীয় লোকে অবস্থিত যক্ষণাগাদি জীবগণ,ব্রহ্মাদি দেবগণ, মরীচ্যাদি ঋষিগণ,অগিষ্বাত্ত প্রভৃতি পিতৃগণ‚ সনকাদি মনুষ্যগণ‚ পিতৃ পিতামহাদি এবং মাতামহাদি প্রভৃতি সকলে তৃপ্ত হোক | ( আমার কেবল এক জন্মের নয় এবং কেবল আমারও নয়) আমার যে বহুকোটি কুল ( যার সংস্পর্শে যুক্ত বিশ্বের প্রতিটি লোক এমনকী কীটাদি পর্যন্ত) বহু জন্মান্তরে গত হয়েছে সেই সেই কুলের পিতৃপিতামহাদি ও সপ্তদ্বীপবাসী সমুদায় মানুষের পিতৃপিতামহাদি এবং ত্রিভুবনের যাবতীয় পদার্থ আমার প্রদত্ত জলে তৃপ্তিলাভ করুক |

এই ভাব আমরা লক্ষণতর্পণে সংক্ষেপে অথচ ব্যাপকতরভাবে দেখতে পাই —
‘ওঁ আব্রহ্মস্তম্বপর্যন্তং জগৎ তৃপ্যতু |’
অর্থাৎ ব্রহ্মা থেকে তৃণ পর্যন্ত সমস্ত জগৎ তৃপ্ত হোক |

প্রাচীন মুনি ঋষিগণ এতেও ক্ষান্ত হননি | এতেও যদি বাদ পড়ে যায় সে জন্য শেষে যোগ করেছেন —
ওঁ যে চাস্মাকং কুলে জাতা অপুত্রাগোত্রিণো মৃতাঃ |
তে তৃপ্যন্তু ময়া দত্তং বস্ত্রনিপীড়নোদকম |
অর্থাৎ যাঁরা আমাদের বংশে ( বংশ বলতে জন্ম-জন্মান্তরের বংশকে বুঝতে হবে) জন্মে পুত্রহীন ও বংশহীন হয়ে মারা গেছেন, তাঁরা আমার দেওয়া বস্ত্রনিপীড়ন জলে তৃপ্ত হোন |

(সমাপ্ত)

NO COMMENTS