বাংলালাইভ রেটিং -

হেডলাইনটা পড়ে কেউ আমায় ভুল বুঝবেন না প্লিজ। না বলে চুপিসাড়ে স্টোরি ঝেঁপে দেওয়ার কেস কিন্তু এটা নয়। এটা হল গিয়ে তেইশ বছর আগে লেখা একটা উপন্যাস আর তিন বছর আগে তৈরি একটা সিনেমা থেকে ‘ইন্সপিরেশন’ নিয়ে নতুন একটা ছবি বানানোর গল্প। 

উপন্যাসের নির্যাসটা একটু এদিক-ওদিক ক’রে তার ওপর সাজানো হয়েছে নতুন একটা গল্পের কাঠামো। সেটা আবার অনেকটাই যেন লেখা হয়েছে হিট একটা বাংলা সিনেমার স্ক্রিপ্ট সাজানোর প্যাটার্ন ফলো ক’রে ক’রে। আর এর পুরোটা হয়তো কনসাসলি নয়, কিছুটা আনকনসাসলিও করা।

মোটের ওপর এক কথায় বলতে গেলে এভাবেই বোধহয় তৈরি হয়েছে অনীক দত্তের নতুন ছবি ‘মেঘনাদবধ রহস্য’!

চলুন এবার ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাই।

মেঘনাদবধ রহস্য কি আসলে সুনীলের এই উপন্যাসের আদলে তৈরি!

বাংলায় ১৪০১ সাল, ইংরেজিতে ১৯৯৪। ‘দেশ’ পত্রিকার পুজোসংখ্যায় ছাপা হল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘বুকের পাথর’। গল্পটা কী, জানেন তো? অল্প কথায় সেটা হল, প্রাক্তন এক নকশাল যুবকের আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকার গল্প। কম বয়সে নকশাল মুভমেন্ট করতে গিয়ে রিটায়ার্ড গরিব স্কুল মাস্টারকে খুন করে ফ্যালে রজত। আর সেই খুনের বীভৎসতাটাই বলতে গেলে পালটে দ্যায় ওকে। নকশাল জীবন ছেড়ে গার্লফ্রেন্ডের ক্ষমতাশালী বাবা আর দিদির পঞ্জাবি বরের হেল্প নিয়ে লন্ডন পালিয়ে যায় ও। পাঁচ বছর পর কলকাতায় ফিরে সব পাস্ট ধুয়ে মুছে ফেলে শুরু করে দ্যায় নতুন জীবন। জাঁকিয়ে বসে নামজাদা কোম্পানির দামি চাকরিতে, বিয়ে হয়ে যায়, ছেলে-মেয়ে হয় দুটো। আর এর বেশ কিছু পর গল্পে আসে সেই চরম টুইস্ট!

হঠাৎ ক’রে ঘটনাচক্রে ওর জীবনে এসে পড়ে ওর হাতে খুন হয়ে যাওয়া সেই রিটায়ার্ড স্কুল মাস্টারের ছোট কন্যাটি। বয়সে সে এক পূর্ণ যুবতী এখন। আর সেই মেয়েটির সূত্র ধরে ফের একবার রজতের জীবনে উপচে আসে সত্তর সালের সেই ভয়ংকর অতীতটা আর তছনছ হতে থাকে ওর সাজানো জীবন, গোছানো গেরস্থালি।

খোঁজ নিয়ে দেখলাম, পরিচালক অনীক দত্তের জন্ম ২২ মে, ১৯৬০। অর্থাৎ ১৯৯৪ সনে লেখাটা যখন ছেপে বেরচ্ছে, অনীকের বয়স তখন পাক্কা চৌত্রিশ বছর। তখনও সিনেমা করতে শুরু করেন নি অনীক, কিন্তু সব হবু ফিল্ম মেকারেরই যেমন হয়ে থাকে, পুজোসংখ্যায় গল্পটা পড়ে ওঠার পর তাঁরও কি উথাল-পাথাল ক’রে ওঠে নি বুক, মনে হয় নি যে, ইস এর থেকে আমিও যদি ছবি বানাতে পারতাম একটা!

স্রেফ হাওয়ার ওপর ভর ক’রে এতটা লিখে ফেললাম বলে ভাববেন না যেন। ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ প্রোমোট করতে গিয়ে এর পুরোটাই অনীক কিন্তু নিজের মুখে স্বীকারও করেছেন প্রায়। হ্যাঁ, মূল কাহিনীর নামটা একবারও বলেন নি ঠিকই, কিন্তু সিনেমার গল্প নিয়ে বলতে গিয়ে সোজাসাপটা এতটা অবধি বলেই দিয়েছেন যে, ‘(গল্পটা)…মাথায় ঘুরছিল আগে থেকেই। যখন আমার বছর তিরিশেক বয়স, ছবি করার কথা ভাবছি। বিজ্ঞাপনে কাজ করি তখন। সেই সময় একটা ছবি মাথায় এসেছিল। সেটার সঙ্গে আজ আর এটার কোনও সম্পর্ক নেই কিন্তু সেই ধাঁচে খানিকটা। ওই পরিপ্রেক্ষিতে রেখে, তার মধ্যে হুডানইট এলিমেন্ট এনে করেছি।’ (পপকর্ন, সংবাদ প্রতিদিন, ২১ জুলাই)।

তবে আগেই যেটা বলতে চেয়েছি যে, ‘বুকের পাথর’ থেকে কাট-পেস্ট করে এনে কিন্তু নিজের ছবিতে গল্প বসিয়ে দ্যান নি অনীক। আরে বাবা, সেই ’৯৪ সালের পরেও তো বলতে গেলে সিকি সেঞ্চুরি কাটতে চলল প্রায়। সুতরাং যুগের দাবি মেনে-টেনে অনীক বিস্তর পালটে দিয়েছেন গল্প। চুয়াল্লিশ বছরের মাঝবয়সী রজত এখানে হয়ে গেছেন প্রৌঢ় অসীমাভ (সব্যসাচী চক্রবর্তী)। এক স্ত্রীর বদলে এখানে ভদ্রলোকের স্ত্রীর সংখ্যা দুই। প্রথমা স্ত্রী বয়সে আবার ওঁর থেকে পাঁচ বছরের বড়, তিনি এখন অসুখে ভুগে অক্ষম এবং সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর স্বামী পরিত্যক্তা দশা। এই ভূমিকায় আছেন সোহাগ সেন। পরের স্ত্রী ইন্দ্রানী (অভিনয়ে গার্গী) বয়সে অসীমাভ’র থেকে কুড়ি বছরের ছোট, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় নায়িকা।

মূল লেখাটায় রজতের দুই ছেলে-মেয়ে। মজা হল, এই ছবিতেও অসীমাভের ছেলে-মেয়ের সংখ্যা সেই দুই! তবে সেখানেও একটু মডার্ন টাইপ পাঞ্চ আছে আর কি! ছেলে ঋক (অভিনয়ে গাড়ি দুর্ঘটনা খ্যাত বিক্রম চট্টোপাধ্যায়) অসীমাভের প্রথমা স্ত্রীর পুত্র। সে এখনও তার নিজের অসুস্থ মায়ের সঙ্গেই থাকে, আর ব্যান্ডে গান গেয়ে বাজনা বাজিয়ে, সঙ্গে চুটিয়ে গাঁজা টেনে নেশা ক’রে সময় কাটে তার। যেটুকু বোঝা গেল, তার মাকে এভাবে ছেড়ে দিয়ে কচি একজনকে এনে ঘরে তুলেছে বলে বাবার ওপর তার হেব্বি ক্ষার – তবে এর ডিটেল্‌ড ব্যাক স্টোরিটা সিনেমায় বলা হয় নি কোথাও।

আরও পড়ুন:  অনুষ্কা শেট্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে কী বললেন প্রভাস?

আর আছে অসীমাভের মেয়ে দামিনী, যার ডাকনাম হল গুলি (অভিনয়ে নবাগতা সৌরসেনী মৈত্র)। সম্পর্কে অসীমাভের মেয়ে হলেও আসলে সে ইন্দ্রাণীর মেয়ে, অসীমাভের নয়। অর্থাৎ এখানে ক্লিয়ার একটা হিন্ট রইলো যে ইন্দ্রানীরও অসীমাভের মতোই একটা আগের পক্ষ গোছের ব্যাপার রয়েছে জীবনে। তবে এর কোন ব্যাক স্টোরিও এই ছবিতে নেই।

মূল উপন্যাসে জায়গায় জায়গায় রজতের সেক্স লাইফ নিয়ে বর্ণনা ছিল তুমুল। সুন্দরী যুবতী বৌয়ের খোলা বুকে মুখ ঘষতে থাকার দৃশ্য থেকে শুরু করে একলা হস্তমৈথুন করার মোমেন্ট – সুনীল বাদ রাখেন নি প্রায় কিছুই। সিনেমায় এই ব্যাপারটা অনেকটা পালটে গেছে, অসীমাভের বয়সটা ওই রজতের তুলনায় অনেকটা বেশি হয়ে যাওয়ার কারণে। বইয়ে যেখানে সোজাসাপটা এরকম লেখা যে, ‘প্যান্টের ফাস্‌নার খুলে রজত চেপে ধরল নিজের কঠিন পুরুষাঙ্গ’ (অধ্যায় ৭), সিনেমায় সেখানে অনীক উলটে জুড়ে দিচ্ছেন বয়স্ক অসীমাভ’র পেনিস কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেটা নিয়ে সরস সব কমেন্টস। খবরের কাগজে পড়েছেন নিশ্চয় যে, সুনীলের টেক্সট-এর মতো অনীকও ছবির সংলাপে ‘পেনিস’ শব্দটা পর্যন্ত রেখে দিয়েছিলেন দিব্যি। সিবিএফসি কেটে বাদ দেওয়ার পরে এখন আর সেটা নেই বটে, কিন্তু তাও বাকি ডায়ালগটা শুনে বুঝতে কোন অসুবিধে হবে না আপনার যে এটা অসীমাভের শরীরের কোন অংশ সম্পর্কে বলা হল।

রহস্য সন্ধানে চেষ্টা করতে দ্যাখা গেছে কলকাতার পুলিশ গোয়েন্দাদেরও। তবে এই পুলিশ গোয়েন্দা একেবারেই বাংলা ছবির আরেক পুলিশ গোয়েন্দা শবর-এর মতো নন।

রজতের সেক্স লাইফের মতো অসীমাভের কোন অ্যাকটিভ সেক্স লাইফ অনীক দ্যাখান নি বটে, কিন্তু একটা ডায়ালগে আন্ডারলাইন করে দেখিয়ে দিয়েছেন, ওই ব্যাপারে ভদ্রলোকের ব্যুৎপত্তি কী চরম। ওই সিনটা মনে পড়ছে, যেখানে মেয়েদের বিষয়ে ওঁর ‘রেঞ্জ’ নিয়ে ডিসকাস করতে গিয়ে প্রায় হতবাক হয়ে যাচ্ছেন ইন্সপেক্টর সোম (ভাস্কর ব্যানার্জি)? স্থম্ভিত হয়ে পুলিস ইন্সপেক্টর এটা রিয়্যালাইজ করছেন যে বয়সে পাঁচ বছরের বড় মহিলা থেকে শুরু করে কুড়ি বছরের ছোট প্রায় মেয়ের বয়সী অভিনেত্রী – বিয়ের ব্যাপারে অসীমাভের ‘রেঞ্জ’ মোটামুটি এটা। আর বিয়ের বাইরে তো বাকি হিসেব রাখাই হল মুশকিলের, যেমন ধরুন বয়সে আরও ছোট এলিনা রায় মজুমদারকে (সায়নী ঘোষ) দিয়ে তো অসীমাভ শুধু নিজের ‘দ্য বিগ বং থিওরি’ অনুবাদ করান না, একটা সময় মেয়েটিকে তো নিজের বাড়িতে এসে থাকার অফার অবধি দিয়ে বসেন!

আরও মজার কাণ্ড শুনুন, মূল উপন্যাসটায় দেখছি রজতের মনে নাড়া দিয়ে গেছিল ওর বন্ধু অপুর মৃত্যু। সেটা ছিল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে পালানোর সিন। এরকম একটা লাইন সেখানে লিখছেন সুনীল যে, ‘তিনটে রাইফেলের গুলি লেগেছিল অপুর পিঠে, খুব ভাল সাঁতার জানত অপু, তবু আদি গঙ্গা পেরুতে পারল না’ (অধ্যায় ৯)। এই লেখার সেই ‘অপু’র মৃত্যু-দৃশ্যের সঙ্গে পারলে এ ছবির ইন্দ্রজিৎ চৌধুরীর মৃত্যু-দৃশ্যটা কেউ একটু মিলিয়ে দেখবেন প্লিজ। এখানেও পুলিশ বোধহয় জনা তিনেকই ছিল, এখানেও পিঠে গুলি খেয়েছিল ইন্দ্র, আর ফারাক বলতে দেহটা আদি গঙ্গায় না গিয়ে পড়েছিল গিয়ে বীরভূমের কালিকাপুরের ভাঙা রাজবাড়ির দিঘিতে।

কেউ ভয় পাবেন না প্লিজ, পুরো গল্পটা বলে থ্রিলার দ্যাখার মজা মাটি করে দেব না আমি আদৌ। কিন্তু এটুকু যদি বলি যে ‘বুকের পাথর’ উপন্যাসে রজত ধরা পড়েছিল বীরভূমের ঘাঁটি থেকে, আর এই সিনেমাতেও গোপন ঘাঁটি রেড করে নকশালদের ধরপাকড় করা হয় সেই বীরভূমের বুকেই, তাহলে তো আর ক্ষতি নেই কিছু?

অসীমাভকে যখন বলতে শুনি, ‘এই এতগুলো বছর এই অপরাধবোধ আমায় কুরে কুরে খেয়েছে’, তখন আমার তো অন্তত মনে হচ্ছিল, কথাগুলো আসলে অসীমাভ নয়, সেই রজতের মুখ দিয়ে বেরচ্ছে।

এতটা পড়ার পর নিশ্চয় এরকম কিছু ভাবছেন যে, সুনীলের উপন্যাস থেকে কী ভাবে গল্পে এটা-ওটা নেওয়া হয়েছে সেটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু এর সঙ্গে সৃজিতের সিনেমার রিলেশনটা ঠিক কোথায়?

সৃজিতের এই ছবির স্ক্রিপ্ট লেখার প্যাটার্নের সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে এই ছবির।

আসুন এবার আপনাকে মনে করিয়ে দিই, বছর তিনেক আগে তৈরি সৃজিতের ‘চতুষ্কোণ’ নামে ছবিটা। মন দিয়ে শুরু থেকে শেষ অবধি ‘মেঘনাদবধ’ দেখুন, দেখতে পাবেন, এর গল্প বলার প্যাটার্নের সঙ্গে সৃজিতের ওই ছবির প্যাটার্নের কী রকম আশ্চর্য কিছু মিল!

‘চতুষ্কোণ’ যেমন, শুরুটা দেখে বোঝাই যাবে না কোন দিকে এগোতে চলেছে ছবিটা। তারপর আস্তে আস্তে পরত খুলতে থাকবে একের পর এক। একটা সময় অবধি যেটা মনে হচ্ছিল ছবি করার জন্য মরিয়া এক ফিল্ম ডিরেক্টরের গল্প। শেষে গিয়ে সেটাই হঠাৎ করে হয়ে দাঁড়াবে তুমুল এক প্রতিশোধের কিস্যা! এবার বলুন তো, এই ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ও কি অনেকটা প্রায় তাই না?

আরও পড়ুন:  মাঝ-রাস্তায় হাতাহাতিতে জড়ালেন সুশান্ত সিং রাজপুত

আরও দেখুন। মনে আছে তো যে, ‘চতুষ্কোণ’ ছবি জুড়ে একটার পর একটা সিনে কী ভাবে ছবির ক্যারেক্টারদের টুকরো টুকরো ডায়ালগ দেখিয়ে দর্শকদের মনটাকে উলটো পথে চালিয়ে দিচ্ছিলেন সৃজিত। কখনও মনে হচ্ছিল যে, মলয় সেন (বরুণ চন্দ) বোধহয় লোক লাগিয়ে খুন করতে চাইছে স্ত্রী তৃণাকে (অপর্ণা)। কখনও মনে হচ্ছিল, হাইওয়ের ওপর ওই যে হঠাৎ করে আর একটু হলেই একটা ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে যাচ্ছিল দীপ্ত (চিরঞ্জিত), এটার পেছনেও কারুর বোধহয় কনস্পিরেসি রয়েছে কোন।

সেখানে লাস্ট সিনের আগে তো কিছু বোঝাই যাবে না যে আসল ষড়যন্ত্রটি রচেছে ঠিক কে! এবার এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন এই ‘মেঘনাদবধ রহস্য’র প্যাটার্ন। ছবিতে মাঝে মাঝে ফিল্ম ডিরেক্টর কুণাল সেনের (আবীর চট্টোপাধ্যায়) এমন সব ডায়ালগ শুনতে পেলেন না, যাতে মনে হচ্ছিল, আসল কালপ্রিট বোধহয় ও-ই? ছবির দ্বিতীয়ার্ধে পৌঁছে যতক্ষণ না কুণালের ওই সংলাপগুলোকে ঠিকমতো কনটেক্সটের সঙ্গে জুড়ে আপনাকে শোনানো হবে, ততক্ষণ তো কুণালের আসল ক্যারেক্টার নিয়ে ধাঁধাটা আপনার কাটবেই না, তাই না?

ইনি শুধু লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক নন। ছবিতে দ্যাখান হয়%2c ইনি সক্রিয় ভাবে মাওবাদী নাশকতার সঙ্গে যুক্ত।

কিংবা ধরুন লিটল ম্যাগাজিনের এডিটর ওই বাদল বিশ্বাসের (কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়) চরিত্র। ছবির গোড়া থেকেই যে রকম সন্দেহজনক ভাবে দ্যাখান হতে থাকে ভদ্রলোকের গতিবিধি, তাতে একটা সময় অবধি এটা মনে হতে থাকে না যে, অসীমাভের জীবন তছনছ করে দেওয়ার জন্যে আসলে ইনিই বোধহয় দায়ী!

খুঁটিয়ে দেখলে শুধু গল্প বলার এই প্যাটার্ন নয়, আরও মিল পাবেন ‘চতুষ্কোণ’-এর সঙ্গে। হাইওয়ের ওপর ওই যে অসীমাভ বোসের ট্রাক দুর্ঘটনা হতে হতে বেঁচে ফেরার সিন, সেটা কি প্রায় ‘চতুষ্কোণ’-এর একটু আগে লেখা দীপ্ত’র সেই হাইওয়ে অ্যাক্সিডেন্ট সিনটার মতো না? বা অসীমাভ বোসের বুক রিলিজ অনুষ্ঠানে না এসে বাড়িতে বসে বান্ধবীকে নিয়ে যে নেশা করছিল ওর প্রথম পক্ষের ছেলে ঋক, সেটাও কি প্রায় সেই ‘চতুষ্কোণ’-এর দীপ্ত’র ছেলের সিকোয়েন্সগুলোর মতো না? সেখানেও তো দীপ্ত’র সঙ্গে ওর ছেলের গণ্ডগোল বেঁধেছিল দীপ্ত নিজের থেকে অনেক কমবয়সী একটা মেয়েকে এনে ঘরে তোলার জন্যে!

তবে সুনীলের গল্পটা থেকে জেনে-বুঝে এলিমেন্টস নিয়ে থাকলেও সৃজিতের ছবি থেকে জেনে-বুঝে এসব কপি করে নিয়েছেন অনীক, এরকমটা হয়তো ঘটে নি। কেন জানি মনে হচ্ছে যে, ‘চতুষ্কোণ’ ছবিটা দ্যাখার প্রভাব অনীকের কাছে এমন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছিল যে স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে অজান্তেই হয়তো এসব সিন-টিন সব চলে এসেছিল গল্পে!

আর শুধু তো সেই ‘চতুষ্কোণ’ কিংবা সেই ‘বুকের পাথর’ নয়! নিজের প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর চরম হ্যাং ওভারও যে এ ছবির পরতে পরতে! একটু খেয়াল করে দেখুন, সেই ছবিতেও সব্যসাচী চক্রবর্তীকে মোটামুটি সেন্ট্রাল ফিগার বানিয়ে তাঁকে দিয়ে বিপ্লব দাশগুপ্ত নামে সত্তর দশকের নকশাল যুবকের পার্ট করান অনীক। এবার এটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন এই ছবিটা, আর সব্যসাচীর অভিনয় করা ওই অসীমাভ বোসের ক্যারেক্টার! কী দেখছেন, বলুন?

আরও মজার কাণ্ড জানেন? ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর ফিল্ম ডিরেক্টর সেই অয়ন সেনগুপ্তকে (পরমব্রত) মনে আছে তো? সে ছবির শেষ হচ্ছে বিপ্লবের বলে যাওয়া গল্প নিয়ে সেই অয়নের নতুন ছবি তৈরির মোমেন্ট দিয়ে। এবার কাণ্ড দেখুন এটায়। অসীমাভের লিখে যাওয়া সুবৃহৎ আত্মকথা ‘স্বীকারোক্তি’ নিয়ে তো কল্পনায় যেন প্রায় ছবি করতেই শুরু করে দিল এ ছবির ফিল্ম ডিরেক্টর কুণাল সেন! কুণাল যখন নিজের সেই কল্পনার ছবির সিনগুলো শোনাতে শুরু করলো ইন্দ্রাণীকে, আমার একেকবার মনে হচ্ছিল, যাহ বাবা, পুরো ছবিটায় ‘চতুষ্কোণ’ আর ‘বুকের পাথর’-এর স্ট্যাম্প মারতে মারতে লাস্ট সিনে এসে ছবিটা এভাবে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মার্কা হয়ে গেল?

নিজের আগের দুটো ছবিতে মুহুর্মুহু মুচমুচে সব উইটি ডায়ালগ পুরে যে ভাবে এই বাংলা বাজারে নিজের একটা আলাদা স্টাইল সেট করেছিলেন অনীক, এই ছবিতেও সে রকম ডায়ালগ এদিকে-ওদিকে ঠাসা! একেকবার তো মনে হচ্ছিল যে, এভাবে সংলাপের খোঁচা না মেরে বোধহয় থাকতে পারেন না ভদ্রলোক! যেমন ধরুন, ঋক যে ব্যান্ডে গায়, তার নাম ‘মাটি’ শুনে অসীমাভ সঙ্গে সঙ্গে যেটা বলে বসেন তা’ হল, ‘মাটি করেছে’। তারপরেই বলেন, ‘মাটি যখন আছে, অনুপ্রাসে আগে-পরে দুটো শব্দ জুড়ে দাও, সরকারি মোচ্ছবে বরাত বাঁধা’! কথা পড়তে না পড়তে পুরো নন্দন জুড়ে হাসি আর হাততালির ঝড়!

আরও পড়ুন:  করণ জোহারের উপর বেজায় চটেছেন রণবীর
ছবির শুটিংয়ে পরিচালক অনীক দত্ত

আবার অসীমাভ যখন বোলপুর যাচ্ছে, তখন পাড়ার প্রমোটারের (সুমিত সমাদ্দার) ছোট্ট ডায়ালগ, ‘কেষ্টদাকে বলে মালটাকে পুরো গুম করে দিই?’ মানে একবার লোকেশন হিসেবে বীরভূম এসেছে মানেই কোন একটা বিতর্কিত রাজনৈতিক নাম জুড়ে দিয়ে ডায়ালগের খোঁচা মারতে বোধহয় সুড়সুড় করছিল অনীক দত্তের পেন! বা ধরুন অসীমাভের জন্মদিনের ফাংশনের ওই সিনটা। ওর বন্ধু নিখিলেশ (অভিনয়ে কল্যাণ রায়) তো বলেই ফেলছে, এবার অসীমাভকে ধরে-বেঁধে একটা বঙ্গ-বিভীষণ না দিয়ে দিলে চলছে না!

এভাবে সংলাপ দিয়ে একটানা ফক্কুড়ি করতে করতে যাচ্ছেন, অথচ জমিয়ে তুলছেন একটা রহস্য গল্প, এটা কিন্তু চাট্টিখানি কথা না। একেক সময় মনে হচ্ছিল, কী পরিমাণ সৃজন-ক্ষমতা থাকলে তবে এমন কিছু সম্ভব।

আবার এটাও মনে হচ্ছিল, এই যে তুমুল তির্যক সমালোচনার শ্লেষ। এসব দিয়ে কী বোঝাতে চাইছেন অনীক? যে, তিনি নিজে ওই বঙ্গ-বিভীষণদের গোত্রে পড়েন না, অনেক উচ্চ মার্গের লোক? কিন্তু সত্যি কী আপনি তাই অনীক? মনে সত্যি কিছু সংবেদনশীলতা থাকলে ছবির শুরু থেকে শেষ অবধি এফেমিনেট এক পুরুষকে (অসীমাভের বাড়ির সহায়ক শম্ভু – অভিনয়ে অমিত সাহা) স্রেফ কমিক রিলিফের জন্যে ইউজ করে যেতে পারতেন নাকি আপনি? 

বাংলা বাজারে হালে যে সব ঢপের স্ক্রিপ্ট থেকে ছবি তৈরি হয়, তার থেকে হাজারগুণ ভাল ঠাসবুনোট স্ক্রিপ্ট। তবে খটকা যে কোথাও নেই, তাও কিন্তু না। যেমন ধরুন, ওই যে নিজের জন্মদিনে হঠাৎ করে অজানা কারুর থেকে দুম করে একটা ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ উপহার পেলেন অসীমাভ, আর সেটা খুলে দেখতে পেলেন সেটার বিশেষ একটা লাইন ইয়েলো মার্কার দিয়ে মার্ক করা আছে, পরে এত ভাইটাল একটা ইনফো ছবি থেকে জাস্ট হারিয়ে গেল? ছবির সেকেন্ড হাফে অসীমাভ উধাও হওয়ার পর বইটা নিয়ে অত ছানবিন করলো গোয়েন্দারা, কিন্তু ইয়েলো মার্কিংটা খেয়াল করে দেখল না কেউ একবারও?

অসীমাভ থাকেন আসলে কোথায়, কলকাতায় নাকি লন্ডনে, সেটাও যেমন বোঝা যাচ্ছিল না ঠিক। এই তো শুনছি উনি বিদেশেই থাকেন বেশির ভাগ সময়, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। আর তাই নাকি কলকাতায় ওঁর বাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকে আর সেটার ওপর প্রমোটারের নজর এসে পড়ে। কিন্তু আবার দেখুন, সেটাই যদি হবে, তাহলে অসীমাভের স্ত্রী ইন্দ্রাণীর সঙ্গে নাগপুর এবং কলকাতার বাসিন্দা সেই জানকী (সায়ন্তনী সেনগুপ্ত) নামে মেয়েটির ওরকম দিন-প্রতিদিন ঘনিষ্ঠতা হলটাই বা কী করে? ইন্দ্রাণী থাকেন লন্ডনে, আর এন.জি.ও. চালান কলকাতায়? সেই এন.জি.ও.-র সূত্রে মেয়েটি ইন্দ্রাণীর কাছে এসেছে? কিন্তু সেই এন.জি.ও.-তে আর কেউ নেই, শুধু লন্ডন-বাসিনী ইন্দ্রাণী আর কলকাতা থেকে জানকী? যুক্তি হয়তো কোন মতে খাড়া করে দেওয়া যায়, কিন্তু ব্যাপারটা হজম হচ্ছিল না ঠিক।

কুখ্যাত পুলিশ অফিসার রুনু গুহনিয়োগীর আদলে ছবিতে একটা ক্যারেক্টার বানিয়েছেন অনীক, নাম রাখা হয়েছে সুনু (নিমু ভৌমিক)। বেশ তো, তাতে অসুবিধে নেই কিছু। খটকা শুধু অন্য জায়গায়। কুণাল সেনের সঙ্গে একান্ত আলাপে সুনু তো স্বীকার করেই নিলেন ইন্দ্রজিৎকে তিনি নিজে মারেন নি, সুনুর নির্দেশে ওকে মেরেছিল বীরভূমের লোকাল পুলিশেরা। কিন্তু এটা শোনার পরেও অন্য সব সিনে টানা কুণাল বলে যেতে লাগল যে সুনুর কাছে গুলি খেয়েই নাকি প্রাণ যায় ইন্দ্রজিতের। এমন টান-টান একটা ছবিতে এরকম আলগা ভুল মানতে পারি, বলুন?

‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ (২০১২) বলুন বা ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ (২০১৩)। অনীক দত্তের সিনেমা মানেই যেন হাসতে হাসতে সমাজটার হদ্দমুদ্দ ক’রে ছাড়া। এ ছবিতে সেই চেনা কমফোর্ট জোন থেকে অনেকটা দূর সরে এসেছেন অনীক। আর শেষটায় তো দুঃসাহস দেখিয়েছেন চরম। রহস্য গল্পে তো রহস্যের পুরো কিনারা না হলে পাবলিকের ভাতই হজম হয় না। আর অনীক কিনা তাঁর এই ছবিটার ইতি টেনে দিয়েছেন রহস্যের আসল ধাঁধাটা সল্‌ভ না করেই।

ছবির শেষটায় কী এক্সপেরিমেন্ট, বাপ রে বাপ! মনে হচ্ছিল, এতটা আবার বাঙালির নরম পেটে সইবে তো?

বাংলার বক্স অফিস কী বলছে, দ্যাখার অপেক্ষায় রইলাম।

Sponsored
loading...

NO COMMENTS