বাংলালাইভ রেটিং -

রিলিজ হয়েছিল ঠিক দু’ হপ্তা আগে। লাস্ট উইকে ছুটির দিনে সাউথ কলকাতার একটা মাল্টিপ্লেক্সে দেখতে গেছি ছবিটা। একে ছোট ‘হল’, ছুটির দিনে তার অর্ধেকটাও ভরে নি দেখলাম। হাতে হাত ধরাধরি করে যারা ‘হল’-এর মধ্যে ঢুকল, তাদের ক’জন ঠিক এই ছবিটা দেখবে বলে এসেছে আর ক’জন বাইরে চরম গরমের মধ্যে অন্ধকার ঘরে নিরিবিলি একটু এসি-র মধ্যে বসে একে অন্যকে এনজয় করতে চায়, সেটা বুঝতে পারছিলাম না ঠিক।

তারপর আরও এক হপ্তা কেটে গেছে, হিসেব মতো রিলিজের থার্ড উইক চলছে এখন। বাকি ভারতে আর কোথায় কী অবস্থা হয়েছে জানি না, পুরো কলকাতা থেকে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে বিন্দু আর অভি-র প্রেমের গল্প ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’।

অথচ মজাটা কী জানেন? এ ছবির বেশিটা জুড়েই তো শুধু এই কলকাতা আর কলকাতা! ফার্স্ট সিনের সেই দুর্গা মূর্তি নিয়ে আসার সিন থেকে লাস্ট সিনের সেই তুমুল বৃষ্টিতে গোটা শহর গোটা পাড়া আর গোটা শরীর-মন ধুয়ে যাওয়ার গল্প। পুরোটা জুড়ে ম’-ম’ করছে তো চেনা-অচেনা এই শহরখানাই। তবু যে শহরে এটা নিয়ে তেমন কোন ‘বাজ’ তৈরি হল না আদৌ, তার কারণ তাহলে কী হতে পারে?

ছবির নাচে-গানেও কলকাতার অনুষঙ্গ… বানানো হয়েছে জাদু-বাস্তবে মোড়া ট্রাম ডিপোর সেট

ছবির প্রমোশনে টাকা ঢালা কম হয়ে গেছে, সেটা আরও বাড়িয়ে দিলে মিডিয়াগুলো ছবিটাকে ‘কভার’ করতো ঢেলে? নাকি ছবির গল্প বলার স্টাইলটা পাতি পাবলিকের জন্যে খুব ‘টাফ’ হয়ে গেছে, আম-গেরস্থের পেটের জন্যে সেটা আরেকটু সাধাসিধে হলে হতো?

ছবির কাহিনী আর চিত্রনাট্য পাঠভবনের পুরনো ছাত্র সুপ্রতিম সেনগুপ্তের লেখা

পরতে পরতে কলকাতাকে মিশিয়ে দিয়ে এমন একটা হিন্দি ছবির গল্প লিখেছেন যিনি, বুঝতেই পারছেন যে, তিনি নিজেও বাঙালি। তাঁর নাম সুপ্রতিম সেনগুপ্ত। প্রথমে অবশ্য তাঁর লেখা এই গল্পটার নাম ছিল ‘সাইড বি’। আর সেটা লেখা হয়েছিল এই পরিচালকের জন্যে নয়। অন্য একজনের জন্যে। বছর কয়েক আগে মাধুরী আর জুহিকে নিয়ে সেই ‘গুলাব গ্যাং’ (২০১৪) নামে একটা সিনেমা বানিয়ে নাম করেছিলেন যিনি, সেই বাঙালি ডিরেক্টর সৌমিক সেনের জন্যে। অবশ্য তখন তো পুরো প্রোজেক্টটাই ছিল অন্যরকম, ছবিটা প্রোডিউস করার কথাও ছিল বলিউডের আরেক বাঙালির। ‘কাহানি’ এবং ‘অহল্যা’ খ্যাত বাবু সুজয় ঘোষের।

যাই হোক, তারপর জল গড়াতে গড়াতে শেষ অবধি এসে পৌঁছল যশরাজ স্টুডিও’র ফ্লোরে। ছবির নামটা ততক্ষণে পালটে হয়ে গেছে ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’। পুরনো দিনের হিন্দি গান, পুরনো ক্যাসেট, আর থাক-থাক করে সাজিয়ে রাখা নস্টালজিয়াগুলো নিয়ে যশরাজ ফিল্মসের ‘দম লাগা কে হেইসা’ (২০১৫) তো ততদিনে আবার অবিশ্বাস্য হিট! এরপর প্রায় সেই ধাঁচেরই আরেকটা ছবি তৈরির সুযোগ ‘যশরাজ ফিল্মস’ই বা ছাড়বে কেন?

ছবির ডিরেক্টর হিসেবে এবার অন-বোর্ড হলেন যিনি, সেই অক্ষয় রায়ের নামটা শুনতে যতই বাঙালি বাঙালি হোক না কেন, ভদ্রলোক আসলে কিন্তু একেবারেই বাঙালি নন। এর আগে বেশ কিছু ছবিতে সহকারী পরিচালকের কাজ করেছেন, শর্ট ফিল্ম বানিয়ে জাতীয় পুরস্কারও জিতে নিয়েছেন একবার। যতই অবাঙালি হোন না কেন। এই ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ফুল লেংথ ফিচার ফিল্মে কলকাতার কোন রস কী ভাবে মেশালে অদ্ভুত ঝিমঝিমে নেশা ধরার একটা সিচুয়েশন তৈরি হয়ে যাবে, সেই রেসিপিগুলো ভদ্রলোকের খুব ভালোই জানা!

ছবির শুরুতেই যেমন এই শহরের আকাশ চিরে হেলিকপ্টারে করে মা দুর্গা আসার সিন। কে ভেবেছিলেন এই কম্পোজিশনটা, ডিরেক্টর না স্ক্রিপ্ট রাইটার, জানি না। কিন্তু ওই যে একবার দেখেছি, তারপর থেকে ভিস্যুয়ালটা মাথায় গেঁথে বসে গেছে যেন। ভাবুন না আপনি? শহরের মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ছে, আর সেটার সঙ্গে বেঁধে রাখা আছে সালঙ্কারা দেবী মূর্তিটা। এতটা ইউনিক, এতটা অ-সম্ভাব্য ভিস্যুয়াল আগে দেখেছেন কখনও আর?

আরও পড়ুন:  আজীবন ভালবাসার কাঙাল হয়ে এক দরজা থেকে অন্য দরজায় ঘুরেছেন অসামান্য প্রতিভার এই আকর

শুরুতেই এই যে ফ্রেম জুড়ে দ্যাখানো প্রায় স্যুর-রিয়্যালিস্ট ছবি, এরপর জাদু-বাস্তবের তুমুল খেলা যেন ছবির সিনের পর সিনে। মনটাকে যেন কেউ অলরেডি তখন বাক্স বন্দী করে ফেলেছে এই বলে যে, যা দেখছ তা সত্যি হয়েও সত্যি নয় মোটে। এই তো ছিল শহরটা! এক্ষুনি ঘরের জানলা খুলে যাওয়ার পরে অভিমন্যু রায়ের (আয়ুষ্মান খুরানা) লেখা পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো উড়তে উড়তে সমুদ্রের তীরে এসে পড়লো কী করে না হলে? আর সেগুলো কুড়োতে গিয়ে অভিমন্যু নিজেই বা সাগরবেলায় নেমে চলে এলো কী করে?

এটা হল সিনেমার শুরুর সেই মোড়, যেখানে পৌঁছে হয় সিনেমাটা আপনার কাছে আস্ত একটা ধাঁধার মতো লাগবে। কিংবা মনে হবে এই সিনেমার সমস্ত কিছুই চেনা! অভিমন্যুর এই জীবনখানা আসলে যেন আপনার নিজেরই ভুলতে বসা পুরনো সেই জীবন! মনে হবে শোভাবাজারের ওই বাড়িটায় এই আমিই থাকতাম না সেই আগে? আর পাশের বাড়ির মেয়েটাকে দেখে আমারই না খুব মুচড়ে উঠত মন?

ওই আগেই বলেছি না? এই ছবির গল্প খুব স্টাইল করে বলা। এই দেখছেন প্রেজেন্ট টাইমে আছে, হঠাৎ ফ্ল্যাশ কাট করে সেই কবে তিরাশি সালে চলে গেল গল্প। ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ড কাপ জিতছে, আর অভিমন্যুর বাড়ির পাশে সবুজ অ্যাম্বাসেডর চেপে এসে নামছে ফুটফুটে বাচ্চা একটা মেয়ে। ঠিক ওদের পাশের বাড়িটায় থাকবে বলে। দুজনের মুখোমুখি প্রথম দ্যাখা হচ্ছে নিঝুম এক দুপুরবেলার চিলেকুঠুরির ঘরে। অভিমন্যু মানে বুবলার হাত দিয়ে নতুন আসা প্রতিবেশী ওই বাচ্চা মেয়েটার জন্যে শিঙাড়া পাঠিয়েছে বুবলার মা। শিঙাড়ার সঙ্গে সবুজ একটা চাটনিও আছে আবার। সিনটায় এরকম মায়া মেশানো থাকে যে, এটা আর ভেবে দেখতেই ইচ্ছে হয় না যে সেই তিরাশি সালে বাঙালি বাড়িতে শিঙাড়া লোকে মুড়ি দিয়ে খেত নাকি পুদিনা আর ধনে পাতার চাটনি দিয়ে টাকনা দিতে দিতে।

অভিমন্যুর মা-বাবার ভূমিকায় অপরাজিতা আর রজতাভের দুর্দান্ত অভিনয় সমৃদ্ধ করেছে ছবিকে

এই যে সেই এইটুকুনি বয়সে প্রথম দ্যাখা, আর প্রথম দ্যাখাতেই মন জুড়ে ওকে শুধু কাছে পাওয়ার ঝড়। সেটাই তো এরপর গিলে খাবে বাকি জীবনটাকে। যত মেয়েকে দেখবো, তার মধ্যে শুধু মনে হবে ওই একটা মেয়ের কথা। এর মধ্যে যতই মা (অপরাজিতা আঢ্য) পরবাস থেকে মিথ্যে মিথ্যে কথা বলে ডেকে অভিমন্যুকে ফিরিয়ে আনুক ঘরে। বুবি মাসি (অভিনয়ে কমলিকা ব্যানার্জি) যতই বুকের খাঁজ না চাইতেই দেখিয়ে দিক না কেন। কিংবা হট হট সব মেয়ের সঙ্গে যতই বিয়ের সম্বন্ধ হোক না কেন। সব ভুলে গিয়ে শেষটা তো ওই বুবলার মনে শুধু সেই অভিশপ্ত বাল্য প্রেমই থাকে!

পাশের বাড়িতে থাকতে আসা সেই বাচ্চা মেয়েটা এর মধ্যে বড় হয়ে গেছে দিব্যি। ও হ্যাঁ, মেয়েটা কিন্তু বাঙালি নয়, তামিল। ওর ডাক নাম হল বিন্দু। আর পুরো নাম বিন্দু শঙ্কর নারায়ণন (অভিনয়ে পরিণীতি চোপড়া)। কে বলবে চৌখস এই মেয়েটাকে পুঁচকে বয়সে ভয় দ্যাখাতে বাথরুমে আটকে রাখতো ওর বিচ্ছিরি আর্মি মেজর বাবা। কে বলবে সেই বয়স থেকেই পাশের বাড়ির বুবলার মনে পাকাপাকি আসন গেড়েছে ও। একটা গাছ বেয়ে উঠে উপরতলায় ওর ঘরে গিয়ে সোজা ঢুকে পড়ে সেই বুবলা। কেন? বাহ, উপরতলায় বন্দী রাজকুমারীর কাছে কি রাজপুত্তুর সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে যাবে?

একটু একটু করে বড় হতে হতে দুজনে কী ভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে ক্যাসেটের হিন্দি গানের কলি দিয়ে নিজেদের জীবনদুটোও একই সঙ্গে গাঁথতে থাকে, বিন্দুর বদরাগী আর্মি-ম্যান বাবা সেটা টেরও পায় না আদৌ। লতা, কিশোর, আশা, রফি, বাপ্পিদা’রা গিলে খেয়ে নেয় ওদের।

মুখে সে ভাবে কখনও বলতে পারে নি হয়তো। কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হচ্ছে যে মেয়েটাকে নিয়ে, হঠাৎ করে তাকে ছাড়া বাকি লাইফটা কাটানো যায় নাকি? কিন্তু মেয়েটাও তো চরম মডার্ন। ইচ্ছে হলে এক ঝটকায় উঠে বসে ধ্রুব বলে হ্যান্ডসাম অন্য কারুর গাড়িতে। আর অভি-কে যখন-তখন গালি দিয়ে দ্যায় ‘শালা আনফিট বেঙ্গলি’ বলে! এরপর কারুর মাথা ঠিক থাকে, বস? সেই মাথা ঠাণ্ডা করতে একেক সময় নিশুত রাতে ভিক্টোরিয়া যাওয়া!

আরও পড়ুন:  'শিবগামী' রামিয়া কৃষ্ণনের হট ফটোশ্যুট

সেখানে গিয়ে আদর করে একে অন্যকে পিঠে তুলে নেওয়ার পালা। এই রাগ এই হাসি এই মারপিটের দোস্তিটা তো আজ নয়, সেই বহুযুগ আগে শুরু। বুধবার রাত আটটায় ‘চিত্রহার’ হওয়ার সময় টর্চ জ্বেলে জ্বেলে বারান্দা থেকে পাশের বাড়ির অভি-কে চুপি চুপি ইশারা করতো কে? কে তখন নিজেকে দুলিয়ে নেচে উঠত টিভি-র গানের তালে? হ্যাঁ, এই গল্পটা চেটে-পুটে খেতে হলে ছোটবেলাটা কাটিয়ে আসতে হবে সেই আশির দশকে গিয়ে।

আজকের জেন-এক্স ছেলেপুলে, যারা হোয়াটস অ্যাপে ঝড় তুলে বেঁচে থাকে, সত্যি তো, তারা এই মেদুর রোমান্স বুঝবে কী করে ভাই? ল্যান্ড লাইনে দু’বার রিং করে ছেড়ে দেওয়া মানে যে আসলে এমারজেন্সি কল, সেটা ডিকোড করার সাধ্য তো এই ডিজিট্যাল এজের নেই!

এমন ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরেও কোন মেয়ে ছেড়ে চলে যেতে পারে!

এরপর গল্পে হঠাৎ ঝড়ের মতো স্পিড। মদ খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল আর্মি ম্যান বাবা। তুমুল অ্যাকসিডেন্ট হল গাড়িতে। ড্রাইভারের পাশের সিটটায় বসেছিল মা। বাবা বেঁচে গেল, কিন্তু চিরতরে চলে গেল মা। বিন্দুর চোখে টলটল করে জল। তারপর গ্র্যাজুয়েশনটাও কমপ্লিট না করে বাড়ি থেকে পালিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় মাসির কাছে চলে গেল বিন্দু। হঠাৎ এই বিচ্ছেদে তখন কষ্ট হবে না অভি-র মনে?

ছিটকে তখন নিজেকে সরিয়ে নিতে ইচ্ছে করবে না এই কলকাতা থেকে?

নতুন শতক সবে শুরু হল তখন। অভি চলে গেল ব্যাঙ্গালোর। তারপর মুম্বই। ব্যাঙ্কার হবে বলে।

ব্যাঙ্কার হল না ছাই! সবচেয়ে কাছের মানুষকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট থেকেই বোধহয় ওর বিচিত্র এক মনোবিকলন শুরু। অভিমন্যু শুরু করলো পর্নোগ্রাফি লেখা। মারমার কাট কাট সেল শুরু হল ওর লেখা ‘চুড়েইল কি চোলি’র। আর ওরকম একটা লিখেই পেন গুটিয়ে রাখা গেল না কিন্তু ভাই। পাবলিশারের দাবি মেনে, সেক্স আর হরর পাঞ্চ করে অভি লিখতে লাগলো একের পর এক। দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, অভির ক্যারেকটারের এই অদ্ভুত ডার্ক রিয়্যালিটিটা কি সেই বছর কয়েক আগের ‘মস্তরাম’ (২০১৩) ছবিটা থেকে ধার করে নিয়ে আসা? কনটেক্সট সেখানে আলাদা ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ছবিও তো এরকমই অসহায় এক লেখকের একের পর এক সুপারহিট পর্নোগ্রাফি লিখে বেড়ানোর গল্প!

সেই তিরাশি সালের ছোটবেলা থেকে এই আজকের দিন অবধি মাঝে মাঝেই তো অভি-র দ্যাখা হয়ে গেছে বিন্দুর সঙ্গে এখানে ওখানে ঠিকই। কখনো গোয়ায়, কখনও মুম্বইতে, কখনও হয়তো অন্য কোথাও। এর মধ্যে একবারও কেন বিন্দু ওকে বিয়ে করতে রাজি হল না আদৌ? ‘অভিমন্যু বুবলা রায়, আমি তোমাকে ভালবাসি’ এই কথাটা নিজের মুখে তো বলেও ছিল ও। কিন্তু তারপরেও হঠাৎ উলটো ঘুরে কেন বলে দিল যে, অভি-র ওই টু বিএইচকে মাটুঙ্গাওয়ালা ফ্ল্যাটের প্ল্যানে নিজেকে ফিট করে দেওয়া অসাধ্য ওর পক্ষে?

বিন্দুর স্বপ্ন ছিল গায়িকা হওয়ার… কিন্তু শেষ অবধি ও হল ঘরের বৌ আর এক মেয়ের মা

২০৩খানা ই-মেল, ১১২টা এস. টি. ডি. কল আস্তে আস্তে ফুরিয়ে এল ক্রমে। বিন্দু ভেবেছিল নামী খুব গায়িকা হতে পারবে। কিন্তু সেটাও তো আর হওয়া হয়ে উঠলো না ওর? এমনি এমনি গানের অডিশন দিয়ে কিস্যু হয় না, মিউজিক ডিরেক্টর ফাঁকা একটা ফ্ল্যাটে একা এসে গান শিখে যেতে বলে! আর অনেক কষ্ট করে নিজে নিজে সিডি বের করতে গেলে কী হয়, সেও তো বিন্দু দেখেই নিল নিজে! দু’দিন যেতে না যেতেই নামী সিনেমার সিডি রাখবে বলে ওর সব সিডি ঝেড়ে-পুঁছে নামিয়ে দ্যায় দোকানের লোকে এসে!

আরও পড়ুন:  দুর্লভ স্যমন্তক মণির দৌলতে শ্রীকৃষ্ণ পেয়েছিলেন চার পত্নী‚ পৌরাণিক সেই রত্নই কি কোহিনূর হিরে ?

বার তিনেক এনগেজমেন্ট হওয়ার পরেও পালিয়ে গেছিল বিন্দু। এবার সত্যি সত্যি বিয়ে করে নিল কোথাকার কোন এক মিস্টার নায়ারকে! পারলো করতে এমন একটা বিয়ে? ঠিকই তো বলেছে বুবলা যে, সারা জীবন ধরে যুদ্ধ করে বুবলা সেঞ্চুরি মেরে উঠতে পারল ঠিকই, কিন্তু ম্যাচটা আসলে বেমালুম হেরে বসে গেল যে!

মানে বুবলার মায়ের কথাই ঠিক যে, একটা মেয়ের জন্যে পুরো লাইফটা ওর ওয়েস্ট হয়ে গেল!

এমন একটা ভালবাসার গল্প, যার শেষে একে অন্যকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট

ছবি যত শেষের দিকে যায়, তত যেন জেঁকে বসতে থাকে গভীর গভীরতর তুলনাহীন বিষাদ। একটার পর একটা হট সেক্সি পাল্প ফিকশন লিখতে পারলেও কেন যে এত বছর ধরে চেষ্টা করেও বুবলা একটা প্রেমের গল্প লিখে উঠতে পারে না, সেটাও এবার স্পষ্ট হয় ক্রমে।

ছবির লাস্ট সিকোয়েন্সটা ভাবুন। অনেক অনেক দিন আগের সেই যে চিলেকোঠায় দুজনের প্রথমবার দ্যাখা। এখন আবার সেই চিলেকোঠায় ফেরত এলো বুবলা। শহর জুড়ে সেদিন কী বৃষ্টি আর অডিও ট্র্যাক জুড়ে কী নিবিড় বৃষ্টিপতনের শব্দ। সেই চিলেকোঠায় ফের বুবলার দ্যাখা হচ্ছে ছোট্ট পরির মতো একটা মেয়ের সঙ্গে। আর তারপরেই ও একটা ধাক্কা খেয়ে জানতে পারছে, ছোট্ট মিষ্টি এই ‘কাঞ্চি’ নামের মেয়েটা আসলে ওর সেই ‘পেয়ারি বিন্দু’র মেয়ে।

সারা পৃথিবী বোধহয় তখন পুরো নির্বাক হয়ে ছিল। শুধু বৃষ্টির ওই শব্দটুকু ছাড়া।

যদিও তখন বুঝতে পারছি যে সিনেমার লাস্ট সিনে পৌঁছে গিয়েছি প্রায়। তবু মনে হচ্ছে, এখানে পৌঁছে কলকাতা মুছে গিয়ে, ‘মস্তরাম’-এর ছোঁয়া মুছে গিয়ে সিনেমাটা যেন হয়ে উঠছে সেই ছাব্বিশ বছর আগে বানানো যশ চোপড়ার ‘লমহে’র (১৯৯১) নতুন কোন ইন্টারপ্রিটেশনের মতো। অনেক চেয়েও কাউকে না পাওয়া আর সেই তীব্র সংরাগ তার মেয়ের ওপর উপচে আসার গল্প।

না, এখানে তেমন কিছু হয় নি। মানে, ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’র যদি কোন পার্ট টু হয়, সেখানে এরকম কিছু হবে কিনা জানি না, কিন্তু এখানে গল্পটা তো বুবলা’র সঙ্গে বাচ্চা সেই মেয়েটার দ্যাখা হয়ে যাওয়াতেই শেষ। বুবলার লেখা প্রেমের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি পড়ে, বিন্দু বলেছে, আমি লিখলে এটা অন্যরকম হতো। আর তারপর মেয়ের হাত ধরে ছাতা মাথায় তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ওর কলকাতার রাস্তায় নেমে আসার সিন।

ছবিটা এমনিতেই আগাপাস্তলা একশো গানে মোড়া, এর ওপর এই সিনটা দেখে আমার তখন মনে পড়ে যাচ্ছে সেই ‘লমহে’ ছবির গান। ‘ইয়ে লমহে, ইয়ে পল হাম, বর্ষো ইয়াদ করেঙ্গে’। না, হরিহরণের সেই তুমুল দুখ-জাগানিয়া গান এখানে নেই। কিন্তু পরিণীতি-র নিজের গলায় গাওয়া যে গানটা আছে, সেটাই বা কম কি? ‘মানা কে হাম ইয়ার নেহি’ শুনতে গিয়ে আর চোখের সামনে ভিস্যুয়ালগুলো দেখতে গিয়ে মনে হতে থাকে, সত্যি তো, জীবন নামে ব্যাপারখানা এত অসহ রকম দুর্বোধ্য আর জটিল হল কেন?

যশরাজ ফিল্মস মানেই যে পারশেপশন আসে, সেটা তো ধুম-ধাড়াক্কা বাজারি সিনেমা গোছের। তার মধ্যে দুম করে একটা ‘তিতলি’ (২০১৫) কিংবা ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’ (২০১৫) কিংবা এই ‘মেরে পেয়ারি বিন্দু’ মার্কা এক্সপেরিমেন্টগুলো এসে পড়লে পাবলিকেরও বোধহয় একটু তাল কেটে যায় যেন।

চোপড়া ক্যাম্পের লোকগুলো আসলে করতে চাইছেটা ঠিক কী? পপুলার বলিউডের ভাষাটাই বদলে দিতে চাইছে নাকি?

এটা সিনেমার থার্ড উইক চলছে। বক্স অফিস ভারডিক্ট বেরিয়ে গেছে, সব মার্কেটেই এই সিনেমা ডাহা ফ্লপ হয়েছে পুরো।

কিন্তু কী আসে যায় তাতে? আমি তো বুঝতে পেরেছি, আলাদা করে এর একটা ডিভিডি কিনে রেখে দিতে হবে আমায়।

আর বাকি জীবনটার নানা সময়ে চুপিসাড়ে ফিরে আসতে হবে এই ছবিটার কাছে।

Sponsored
loading...

NO COMMENTS