‘তিরাশিতে ওয়ান ডে ক্রিকেটে বিশ্বজয়ের পর থেকে বাঙালির ফুটবল প্রীতি কমতে শুরু করে দিয়েছিল। কমতে কমতে এখন একেবারে তলানিতে ঠেকে গেছে। আজকালকার কোন বাবা-মা চান বলুন তো, তাদের ছেলে কাদা মেখে ফুটবল খেলে বেড়াক? যাই বলুন, ফুটবল নিয়ে বাঙালির আবেগ মোটেই আগের জায়গায় নেই।’
আবার একটা নতুন ডার্বির সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে গেল কলকাতার এক বড় ক্লাবের শীর্ষস্থানীয় কর্তার কাছ থেকে বছর দুয়েক আগে শোনা কথাগুলো। কেবল ওই কর্তাই নন, ময়দানে কান পাতলে শোনা যাবে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস, বড় ম্যাচ নিয়ে আগের মাতামাতি নাকি আর নেই! সত্যজিতের ‘জন অরণ্য’-তে ময়দানে হেঁটে চলা যুবক ‘দাদা, আপনি পাস না অনার্স?’ প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল ‘মোহনবাগান’। বাঙালির সেই চরিত্র বদলে গেছে। তারা টিভিতে রাত জেগে ইপিএল দেখতে পারে। কিন্তু ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ ইলিশি-চিংড়ির দ্বৈরথ নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই।
এই মতের ঠিক উল্টোদিকের ছবি তুলে ধরছে ফেসবুক। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান নিয়ে পেজ আর গ্রুপের ছড়াছড়ি সেখানে। মুর্হুর্মুহু আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের যে ‘ভার্চুয়াল’ ঝড় লক্ষ করা যায় ফেসবুকে তা দেখে মোটেই মনে হবে না, বাঙালির ফুটবল-পাগলামি কমছে। থেকে থেকে অন্য শিবিরকে ট্রল করে চলেছে নবীন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। শুধু তো আওয়াজ দেওয়া নয়, সঙ্গে অশ্লীল গালাগালির বন্যা বয়ে চলেছে। অ্যাডমিনরা একেবারে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছে সেসব নিয়ন্ত্রণ করতে। ম্যাচ যত এগিয়ে আসবে তত তীব্র হবে কথার লড়াই। আসবে নতুন নতুন মেমে আর জোকস। সেসব ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপে ঘুরে বেড়াতে থাকবে ক্রমাগত।
প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ঠিক কোনটা আসল ছবি? নতুন একটা ডার্বি ম্যাচের সামনে দাঁড়িয়ে সেটা নিয়ে দু-দণ্ড ভাবা যেতে পারে। প্রথম মতের পক্ষে যাঁরা, তাঁরা বলছেন, এতই যদি পাগলামি তবে প্রিয় দলের হোম ম্যাচেও মাঠ ভরছে না কেন? এর উত্তরে উল্টো দল বলছে, অনেকেই যেতে চায়, কিন্তু ব্যস্ততার জন্য গিয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু সুযোগ পেলেই টিভির সামনে বসে পড়ে। তাও সম্ভব না হলে নাগাড়ে ম্যাচের আপডেটের দিকে চোখ রেখে চলে ইন্টারনেটে। অথবা ‘খ্যাপা খুঁজে ফেরে’ লাইভ স্ট্রিমিংয়ের লিঙ্ক। তাছাড়া মাঠে যদি লোকজন যাওয়া কমিয়েই দিতে থাকে, তাহলে এবারের ডার্বি, যা কিনা মোহনবাগানের হোম ম্যাচ, সেটা শিলিগুড়িতে হচ্ছে শোনার পর থেকে ঘটিদের মুখভার কেন। শিলিগুড়িতে বাঙাল ফ্যান বেসের রমরমা আছে বলেই না!
তারপর এই যে আইএসএলের চেয়ারম্যান নীতা আম্বানি চাইছেন টুর্নামেন্টের আকর্ষণ বাড়াতে সবুজ-মেরুন, লাল-হলুদকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে তা কি এমনি এমনি! প্রবল প্রচারের ঢক্কানিনাদের পরেও আইএসএলের প্রয়োজন পড়ছে সেই আদ্যিকালের দুই ফুটবল ক্লাবের সমর্থনই। সেই সমর্থন যদি শুধুই আকাশকুসুম মিথ মাত্র হত, তাহলে কি তা নীতা আম্বানিদের ভাবনায় আসত?
মোদ্দা কথা হল, দু-পক্ষেরই অনেক যুক্তি আছে। আর সেই যুক্তির মারপ্যাঁচের মধ্যে দিয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল। আসলে বাঙালি সব কিছুতেই একটা দ্বৈরথ খুঁজে বেড়ায়। মান্না-হেমন্ত, সুনীল-শীর্ষেন্দু, তৃণমূল-সিপিএম তো আছেই। এমনকী পাহাড় না সমুদ্র এই নিয়েও চূড়ান্ত খটাখটি লেগে যায়। কাজেই ইস্ট-মোহন লড়াইয়ের পাশাপাশি ফুটবল পাগলামির একাল ও সেকাল নিয়েও একটা তর্ক ঘনিয়ে উঠবে এতে আর আশ্চর্য কী! আর অন্য সব তর্কের মতো এ তর্কেরও কোনও মীমাংসা হওয়া মুশকিল। বলতে গেলে অসম্ভবই। অবশ্য বাঙালি কি আদৌ তর্কের মীমাংসা চায়?
এই তর্ক-বিতর্কের ভিতরেই আবার একটা ডার্বি এসে দাঁড়িয়েছে একদম সামনে। শুরু হয়ে গেছে কাউন্ট ডাউন। এই সময়ে আরও বেশি বেশি করে ‘বাঙাল-ঘটি’ বোধ জেগে উঠতে থাকে। বাঙালরা সেই পঁচাত্তরে দেওয়া পাঁচ গোলের রিপিটেশনের আওয়াজ দিয়ে পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলে, মনে আছে তো, সুভাষ ভৌমিক কেমন ‘ডেকে ডেকে’ সুরজিৎ সেনগুপ্তকে দিয়ে গোল করিয়েছিলেন! সেইরকম আবার দেব। উত্তরে ঘটিরাও মনে করিয়ে দেয়, তারা কেমন সতেরো সেকেন্ডে গোল দিয়েছিল। বাঙালদের উত্তর, ধুর! ওই সময় সুধীর কর্মকার নিজের বুটের লেস ঠিক করছিলেন বলেই হাবিবের থ্রু পাস থেকে উলগানাথনের ক্রস ধরে আকবর গোলটা দিতে পেরেছিল। এভাবে চলতে থাকে। কিছু পরিসংখ্যান। অনেকটাই ময়দানের আজগুবি সব কিংবদন্তি। ব্যাপারটা অবশ্য কেবল অত দূরেই থেমে থাকে না। আস্তে আস্তে ’৯৭-এর ডায়মন্ড সিস্টেম পেরিয়ে গত কলকাতা লিগে মোহনবাগানের মাঠে না নামা নিয়ে আওয়াজ। মাঝে আবার ৫-০-এর উত্তরে ৫-৩ নিয়ে জগঝম্প বাক্‌যুদ্ধ। এর সঙ্গে তো চলছেই অনর্গল খোঁচা, যার সঙ্গে ফুটবলের কোনও সম্পর্ক নেই। জাত ধরে টানাটানি, সেই সঙ্গে অবিরাম দু অক্ষর-চার অক্ষর… পৃথিবীতে তখন দুটোই পক্ষ। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান।
এবারের ডার্বি দু-দলের কাছেই মরণ-বাঁচন ম্যাচ। লিগের প্রথম বড় ম্যাচ ড্র হয়েছিল। এবার সেটা হলে আইজলের সুবিধে। তারাই লিগ জয়ের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। সুতরাং জেতা ছাড়া রাস্তা নেই দুই প্রধানেরই। মোহনবাগান আই লিগের শেষ খেলায় বেঙ্গালুরুকে উড়িয়ে দিয়েছে। এবার এএফসিতেও ঢাকার আবাহনীকে হারাল। উল্টোদিকে ইস্টবেঙ্গল চার সপ্তাহের উপরে প্র্যাকটিসে নেই। তার ওপর শেষ দুই ম্যাচে চার্চিল আর চেন্নাইয়ের কাছে হেরে সত্যি সত্যি বেকায়দায়। সেই হিসেবে মোহনবাগানকেই ফেভারিট ধরা যায়। কিন্তু ঘটনা হল, বড় ম্যাচের দিন ওসব দিয়ে কোনও হিসেব করা যায় না। সেদিন যে ভালো খেলবে জিতবে সেই। অতীতে বহুবার আন্ডারডগ টিমের বাজিমাতের ঘটনা ঘটেছে। কাজেই মাঠে আসার সময় কিংবা টিভি-ইন্টারনেটের পর্দায় ম্যাচের হাল হকিকত নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোনও সমর্থকই ওসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না।
আবার একটা বড় ম্যাচ। আবার একবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হাতে বয়ে চলা ঐতিহ্যের ব্যাটন। কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে। দশ… নয়…আট…

আরও পড়ুন:  ঝুলনের বিশ্বরেকর্ড : মফস্‌সলের মেয়ের স্বপ্নপূরণের কাহিনি
- Might Interest You

1 COMMENT

  1. নস্টালজিয়িয়ায় আবদ্ধ হলাম। ম্যাচের আগে জেগে ওঠা গেল।