বেশ রঙিন ঝলমলে শহর মুসৌরি

হরিদ্বারকে টা-টা-বাই-বাই করে রওনা দেওয়া হল। এ যাত্রায় আমাদের শেষ গন্তব্য মুসৌরি-র উদ্দেশ্যে। মাত্র আড়াই-তিন ঘণ্টার পথ – দেরাদুনের কাছাকাছি এসে গরম থেকে কিঞ্চিৎ স্বস্তি পাওয়া গেল। গাড়ি থামিয়ে রাস্তার ধারে একটা ধাবায় বসে নাস্তা সেরে নিলাম চানা আর গরম গরম পরোটা দিয়ে। ততক্ষণে বেশ মালুম হয়ে গিয়েছে আমাদের সঙ্গে আরও কত লোক মিছিল করে চলেছে মুসৌরির উদ্দেশ্যে। চিন্তার কথা কারণ ওখানে কোনও হোটেল বুক করা নেই, আমাদের পেয়ে নিশ্চয়ই গলা কাটবে বলে বসে আছে সবাই। দেরাদুন শহরটার গা ঘেঁষে খাড়া পাহাড় উঠে গিয়েছে যার মাথায় মুসৌরি শহরটা। গাড়ি একের পর এক বাঁক নিতে নিতে সোঁ করে উঠে গেল। নিচে ক্রমশ ছোট হয়ে আসা দুন উপত্যকাটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন আমি একটা ক্যাপসুল লিফট-এর মধ্যে বসে আছি।

ম্যাল রোড

শহরে ঢোকার আগেই গাড়ির স্ট্যান্ড – একটা পাঁচিলের ওপর সার দিয়ে যত কুলি আর হোটেলের দালালরা বসে পা দোলাচ্ছিল – আমাদের দেখে কয়েকজন বোঁ করে চলে এল। রোগা পাতলা চেহারার একজনকে বেছে নিয়ে বলা হল মাঝারি দামের কোনও হোটেলে নিয়ে যেতে। দু চার পিস মালপত্র ঘাড়ে তুলে লোকটা আমাদের সটান পৌঁছে দিল এখানকার সব থেকে জমজমাট জায়গা গান্ধিচকের খুব কাছে পাহাড়ের কোলে বেশ ছিমছাম একটা হোটেলে। সিজন-এর তুলনায় ঘর ভাড়াও বেশ সস্তা মনে হল।

লাইব্রেরি পয়েন্ট

জানলা দিয়ে উত্তরে দেখা যায় পাহাড়ের সারি আর নিচের দিকে ঘন পাইনের জঙ্গল। প্রায় ছ’হাজার ফিট উঁচু মুসৌরিতে গরম কালেও বেশ আরাম – শীতে নাকি এখানে বরফ টরফ-ও পড়ে – টুরিস্ট অফিস বা ক্যামেরার দোকানের দেওয়ালে সাদা হয়ে যাওয়া শহরটার প্রচুর ছবি টাঙানো দেখলাম।

ভানু চন্দ্র

একটা ক্যামেরার দোকানে আলাপ হল ভানু চন্দ্র’র সঙ্গে। বেশ বয়স্ক মানুষ কিন্তু এখনও স্মার্ট রেখেছেন নিজেকে – মুম্বাই-এর জে-জে স্কুল অফ আর্ট-এর ছাত্র তবে বহুদিন হল আঁকা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি ছবি তোলায় মন দিয়েছেন। ভদ্রলোকের চেহারা আর কথাবলার ভঙ্গি আমায় ভীষণভাবে সিনেমার নায়ক দেব আনন্দের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। মুসৌরি বেশ রঙিন ঝলমলে শহর – মূল সড়ক বলতে ম্যাল রোড, গান্ধিচক থেকে শুরু হয়ে চলে গেছে একেবারে “ল্যান্ডাও” অবধি। দোকানপাট আর রেস্টোরেন্টের ছড়াছড়ি – টুরিস্ট থিক থিক করছে।

আরও পড়ুন:  মনের হাট পুকুরে : উষসী চক্রবর্তী

শহরের বেশীরভাগ বাড়ি ঘর দেখলেই বোঝা যায় এককালে এখানে ইংরেজদের বসবাস ছিল। এরা বেশ যত্ন করে এগুলো সব রেখেছে। ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা এই হিল স্টেশন-এ উত্তর ভারতের লোকজনই ভিড় করে বেশি – দিল্লির বহু পয়সাওলা লোকের নিজস্ব বাংলো রয়েছে শহরের একটু বাইরের দিকে। গান্ধিচক থেকে কিছুটা এগিয়ে ম্যাল রোড থেকে একটা রাস্তা বাঁক নিয়ে প্রশস্ত ‘গান হিল’-এর পুরো উত্তর দিকটাকে জড়িয়ে বহু দূর অবধি গিয়ে আবার মিশেছে ম্যাল রোডে। রাস্তাটার নাম ‘ক্যামেলস্‌ ব্যাক রোড’। শহরের হট্টগোল থেকে দুরে সরে থাকা এই পায়ে চলা পথটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাঁদিকে দিগন্ত বিস্তৃত হিমালয়ের দৃশ্য উপভোগ করছিলাম আর মনে পড়ে যাচ্ছিল দার্জিলিং-এর জলাপাহাড় রোড-এর কথা। চোদ্দ বছর পর রাস্তাটা আগের মতই মনোরম আছে কি না কে জানে। গরমকালে এমনিতেই সন্ধে হয় দেরীতে – ফলে ছবি আঁকার সময় পাওয়া যায় অনেক বেশী। কিন্তু ঝামেলা হল অন্যখানে।

নির্জন ক্যামেল ব্যাক রোড

ক্যামেলস্‌ ব্যাকের একদিকে নেমে যাওয়া ঢালু পাহাড়ের গায়ে ছোট একটা চায়ের দোকানে সন্ধে ছ’টা নাগাদ আমরা গিয়ে বসলাম সানসেট দেখব বলে। কাপের পর কাপ চেয়ে শেষ করে চলেছি – সানসেট আর হয় না। শেষকালে দোকানের মালিককে বলেই ফেললাম – এরপর কিন্তু এমনিই বসে থাকব। পাহাড়ের আরও নিচে লোকটার বাড়ি। নাম মুনসি সিং – একসময় ফৌজ-এ ছিল – স্থানীয় লোক। দেখলাম বড় ভালোবাসে নিজের শহরটাকে। অবশেষে আমাদের একরকম ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে প্রায় পৌনে আটটা নাগাদ সূয্যিমামা অস্ত গেলেন। আলোটা থেকে গেল আরও অনেকক্ষণ।

পাঠান স্যুট ভাড়া দেওয়া হচ্ছে পরে ছবি তোলার জন্যে

এবার শেষ করি একটা মজার কথা বলে। সেটা ছিল ট্রাভেলর্স চেক-এর যুগ – শেষের দিকে এসে টাকা তোলার দরকার। কাজেই স্টেট ব্যাঙ্কে গিয়ে দু’হাজার টাকা ভাঙানো হল। চারখানা কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট হাতে পেয়ে সন্ধেবেলা প্রথমেই গেলাম আমার একটা সোয়েটার কিনতে। পছন্দসই জিনিস প্যাকট্যাক করে একটা নোট দেওয়া হল, (দামটা পাঁচশোর কমই ছিল) দোকানি সেটা উল্টে পাল্টে দেখে সটান ফেরৎ দিল – নোটটা নাকি অচল। অন্য আরেকটা দিলাম। এবার পাশ। কিন্তু এই নোটের কী গতি হবে? কাল রবিবার, তাছাড়া ভোরেই আমরা নেমে গিয়ে দুন এক্সপ্রেস ধরব। শেষে মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলল। আমাদের ছেলে বুবুল তখন বেশ ছোট। একটু আগে কাছেই একটা দোকানে ‘নডি’-র (কমিক্স চরিত্র) বই দেখে এসেছিল। ওর হাতে ওই অচল নোটটা ধরিয়ে বললাম যা কিনে নিয়ে আয়। বাচ্চা ছেলে দিচ্ছে ভেবে হয়ত দোকানদার অত খুঁটিয়ে দেখবে না। হলও ঠিক তাই। বাকি খুচরো পকেটে আর নডিকে বগলে নিয়ে বীরদর্পে বুবুলকুমার আমাদের সঙ্গে হোটেলে ফিরল। মুসৌরির অচল নোট মুসৌরিতেই থেকে গেল।

আরও পড়ুন:  দিলওয়ারা দেখতে মাউন্ট আবু

দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/haridwar-travelogue-in-bengali/

প্রথম পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/kumaon-to-garwal-himalayas-the-picturesque-travel/

Sponsored
loading...

NO COMMENTS