কলেজ ক্যান্টিনে রোগা‚ কালো‚ ক্ষয়াটে চেহারার তরুণটিকে বলল বন্ধু |
এমন গল্প দিতে পারবি যাতে বিচিত্রা পত্রিকায় ছাপা হয় ?
আলবত পারব | এসেছিল উত্তর |
এমন একজনের কাছ থেকে যিনি এর আগে কোনওদিন লেখেননি | বড় হয়েছেন মধ্যবিত্ত পরিবারে | চোদ্দজন সন্তানের একজন হিসেবে |

লিখে দিলেন গল্প খসখসিয়ে | কিন্তু কী মনে করে নিজের নাম দিলেন না | সই করলেন অন্য নামে | সাতপাঁচ না ভেবে দিয়েছিলেন নিজের ডাকনাম | মানিক |

সেটা ১৯২৮ | নামী সাহিত্যিকরা ভিড় করে আছেন বিচিত্রা পত্রিকায় | সাহিত্যের প্রথম সারির পত্রিকা | ছাপা হল এক নবাগত লেখকের গল্প অতসী মামী | পাঠক মহলে যেন ঝড় উঠল |

এই বলিষ্ঠ কলম কার ?

তখন কে আর চেনে চোখে ভারী কাচের চশমার আড়ালে থাকা প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে ? এখনও এই নামটা বইপোকাদের কাছে অচেনা | কারণ প্রবোধ তো অমর হয়ে আছেন তাঁর ডাকনামে | মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় |

জন্ম ১৯০৮ সালের ১৯ মে | আজ থেকে ঠিক ১০৯ বছর আগে  | অবিভক্ত বাংলার সাঁওতাল পরগনার দুমকায় | বাবা ছিলেন সরকারি কর্মী | বদলির চাকরি |

আশৈশব ঘামে রক্তে ভেজা মানুষের জীবন মিশে গিয়েছিল মানিকের রক্তে | ছোট থেকেই গণিতে অকল্পনীয় দখল | বিভিন্ন জেলার স্কুল থেকে শেষ হল স্কুলজীবন | তারপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে স্নাতক | আগাগোড়া তাঁর রেজাল্ট ছিল দুর্ধর্ষ |

কিন্তু অঙ্কপাগলের নিজের জীবনের হিসেব কে মেলায় ! মনের মধ্যে গিজগিজ করছে মার্ক্স ও ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব | অন্নসংস্থানের জন্য কত রকমের চাকরি করেছেন | শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ স্কুলের প্রধানশিক্ষক | নবারুণ‚ বঙ্গশ্রী পত্রিকার সম্পাদক‚ নিজের প্রিন্টিং হাউজ‚ সরকারি চাকরিকোনওটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি | আজীবন সঙ্গী ছিল দুঃসহ দারিদ্র |

সংসারে অনটন | দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা নেই | অথচ মানিকের কলম ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের জটিল মনস্তত্ত্বের আবর্তে | তিনি বাংলা সাহিত্যের তিন বাঁড়ুজ্যের একজন | কিন্তু আর এক বাঁড়ুজ্যে বিভূতিভূষণের সৃষ্টি থেকে তাঁর রচনা অবস্থান করে বিপরীত মেরুতে | বিভূতিভূষণ খুঁজে গেছেন গ্রামবাংলার প্রকৃতির নিসর্গ | মানিকের লেখার উপজীব্য ছিল গ্রামের মানুষের সংগ্রাম | সাহিত্যমোদীরা বলেন‚ যদি সঠিক ভাবে তাঁদের সৃষ্টি অনূদিত হতো‚ বাংলা সাহিত্যের তিন বাঁড়ুজ্যেই নোবেল পুরস্কার পেতেন | বিশ্বের দরবারে সেভাবে পৌঁছতে পারল কোথায় তাঁদের সাহিত্য ?

জীবনের স্বল্প পরিসরে ৩৬ টি উপন্যাস‚ ১৭৭ টি ছোটগল্প লিখে গেছেন মানিক | বলা হয়‚ যতদিন বিশ্ব সাহিত্য থাকবে‚ বাংলা ভাষা থাকবে‚ ততদিন থাকবে মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথা‚ পদ্মানদীর মাঝি‚ শহরতলি এবং চতুষ্কোণ | লিখেছিলেন নাটক‚ প্রবন্ধ ও কবিতাও | তাঁর সব সৃষ্টিই তো দিবারাত্রির কাব্য | বাংলার কোন পত্রিকা সমৃদ্ধ হয়নি তাঁর সাহিত্যের শাশ্বত স্পর্শে !

কিন্তু তাও এত অভাব কেন ! কারণ তাঁর জীবনদর্শন | ১৯৪৪ সালে সদস্য হয়েছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির | যা উপার্জন করতেন সবই প্রায় দিয়ে দিতেন পার্টিকে | বাড়িতে প্রমাদ গুনতেন গৃহিণী | উনুনে হাঁড়িই চড়ে না যে ! তার মধ্যে দেহে বাসা বেঁধেছিল মৃগী রোগ | মানসিক ঝড় থামাতে মানিক তখন সুরার আশ্রয় নিয়েছেন | আকণ্ঠ ডুবে থাকতেন মদে | খাবারই জোটে না ! চিকিৎসা তো দূর অস্ত !

১৯৫৬ সালে তখন তিনি থাকতেন বরানগরে ভাড়াবাড়িতে | ৩ ডিসেম্বর বাড়িতেই কোমাচ্ছন্ন | পরের দিন প্রয়াত হাসপাতালে | মাত্র ৪৮ বছর বয়সে থেমে গেল তাঁর ক্ষুরধার কলম | সরস্বতীর নাস্তিক বরপুত্র‚ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলম |

আরও পড়ুন:  'তিন তালাক হল বিশ্বাসের রীতি‚ পালিত হয়ে আসছে ১৪০০ বছর ধরে ',দাবি মুসলিম ল' বোর্ডের
- Might Interest You

1 COMMENT