ঈশ্বরচন্দ্রের জহুরি-চোখ চিনতে ভুল করেনি | বালকের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের রত্নকে | ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন এই ছেলে নিজের নামের মর্যাদা রাখবে | সত্য হয়েছিল বিদ্যাসাগরের অমোঘ বাণী | শিক্ষাজগতে দেবাদিদেব মহাদেব হয়ে উঠেছিলেন মুখুজ্যে ডাক্তারের ছেলে আশুতোষ | আশুতোষ যে শিবেরই আর এক নাম | তিনি নিজেও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বিদ্যাসাগরকেই | সদ্য চলে গেল স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ১৫৩ তম জন্মবার্ষিকী |

# সাবেক বহুবাজারে জন্ম | ১৮৬৪ সালের ২৯ জুন | বাবা ছিলেন নামী ডাক্তার এবং শিক্ষাবিদ‚গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়  | প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাউথ সুবার্বান স্কুল | মা জগত্তারিণী দেবী | 

# আশৈশব বাড়িতে সাহিত্য ও গণিত চর্চা দেখে এসেছেন তিনি | তাঁর গৃহশিক্ষক ছিলেন স্বনামধন্য মধুসূদন দাস | তিনি ছিলেন ওড়িশার প্রথম স্নাতক ও আইনজীবী |

# চক্রবেড়িয়ার শিশু বিদ্যালয় ছিল তাঁর প্রথম স্কুল | সেখানেই বালক আশুতোষের গণিতপ্রজ্ঞা মুগ্ধ করেছিল শিক্ষকদের | ১৮৭৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন | প্রথম শ্রেণীর জলপানি বরাদ্দ হয় তাঁর জন্য |

# ১৮৮০ সালে ভর্তি প্রেসিডেন্সি কলেজে | তখন সেখানে ছাত্র ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও নরেন্দ্র নাথ দত্ত ( স্বামী বিবেকানন্দ ) | 

# ১৮৮৩ সালে বিএ পরীক্ষায় প্রথম হন | গণিতে স্নাতকোত্তরের জন্য পান প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি | ১৮৮৫ সালে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি | পরের বছর একই ডিগ্রি ফিজিক্সে | তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন |

# গবেষণা ও শিক্ষাবিদ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন বলে ছেড়ে দেন লোভনীয় সরকারি কাজের সুযোগ | মাত্র ২৪ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো | ১৯০৬-১৯১৪ এবং ১৯২১-২৩ ভাইস চ্যান্সেলর | সারা জীবনই উৎসর্গ করেছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের কল্যাণসাধনে | তাঁর লক্ষ্য ছিল গোটা উপমহাদেশে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথম সারিতে রাখার |

# স্নাতক ও স্নাতোকত্তর দুই স্তরেই বহু নতুন বিভাগ তিনি শুরু করেছিলেন | একদিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন ঐতিহ্যকে | অন্যদিকে প্রাধান্য পেয়েছিল যুগোপযোগী আধুনিক বিষয় | দেশে তো বটেই | সারা বিশ্বের সেরা বিদগ্ধ পণ্ডিতদের খুঁজে এনেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষাদানের জন্য |

# সারা জীবনই মগ্ন ছিলেন বিদ্যা চর্চায় | ছিলেন স্যাডলার কমিশনের সদস্য | এশিয়াটিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট | ইম্পেরিয়াল বা ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রেসিডেন্ট | পরে নিজের সংগ্রহের ৮০ হাজার বই তিনি এখানে দান করে দিয়েছিলেন | ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসেরও প্রথম প্রেসিডেন্ট তিনি | শিখেছিলেন পালি‚ রাশিয়ান ও ফরাসি ভাষা | বাংলার পণ্ডিতরা তাঁকে সরস্বতী ও শাস্ত্রবাচস্পতি উপাধি দেন |

# বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট‚ বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজ‚ ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ ল’‚ ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি‚ আশুতোষ কলেজ‚ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে অনুঘটক তিনি |

# শিক্ষার বিস্তৃতি এবং মাতৃভাষার কল্যাণসাধন | এটাই ছিল এই শিক্ষানুরাগীর ব্রত | তাঁর ঋজু অনমনীয় সাহসী ব্যক্তিত্বের জন্য আগেই পরিচিত হয়েছিলেন বাংলার বাঘ হিসেবে | ১৯১১ সালে লাভ করলেন নাইট উপাধি |

# ১৯২৪ সালের ২৫ মে প্রয়াত হন পাটনায় | রেখে যান শিক্ষার আলোকবর্তিকা | আগামী বাংলার জন্য |

আরও পড়ুন:  'বন্দে মাতরম' বলে মুখে ঢেলে দেন পটাশিয়াম সায়ানাইড...বিস্মৃতির পলিতে ঢাকা পড়েছেন এই বিপ্লবী

NO COMMENTS