pareshnath-temple-travelogue
পাহাড়ের মাথায় পরেশনাথের মন্দির

পরেশনাথ গিয়েছিলাম স্রেফ পাহাড়ে চড়ার ইচ্ছে নিয়ে | তবে জৈনদের তীর্থস্থান হিসেবে ঝাড়খন্ডের এই অঞ্চলটি খুবই জনপ্রিয় বলে ছবি আঁকারও প্রচুর রসদ পাওয়া গেল | লোকজন, দোকানপাট, ধর্মশালা আর মন্দির গিজগিজ করছে সর্বত্র | বসে বসে খালি স্কেচ খাতা ভরিয়ে তোলার অপেক্ষা |

এমনিতে কলকাতা থেকে উত্তরভারতগামী প্রায় সব বড় ট্রেনই  পরেশনাথ স্টেশনে থামে কিন্তু ছুটির মরসুম বলে কোথাও টিকিট না পেয়ে আমাকে শেষে ধানবাদ হয়ে যেতে হলো | তবে গেলাম বেশ রাজার হালে – ছোটবেলার বন্ধু অজয় তখন ধানবাদেই পোস্টেড – কমিশনার অফ ইনকাম ট্যাক্স | স্টেশন থেকেই মাথায় লালবাতিওলা গাড়ি আমায় তুলে নিল – প্রথমে ওর বাড়ি তারপর অফিস | অজয়  ব্যবস্থা করেই রেখেছিল – দুজন গাইড কাম হেলপার সমেত একটা ঢাউস ‘স্করপিও’ আমায় নিয়ে চলল  পরেশনাথের উদ্দেশ্যে | ন্যাশানাল হাইওয়ে ধরে সওয়া ঘন্টা যাবার পর ডানদিকে একটা রাস্তা বাঁক নিয়েছে ‘ইসরি’মোড়ের দিকে – ওখান থেকে পরেশনাথ মিনিট পয়তাল্লিশ | দু’ধারে চমত্কার সব দৃশ্য দেখতে দেখতে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ পৌঁছে গেলাম ‘মধুবন’ – হ্যাঁ, পাহাড়ের কোলে ধর্মস্থানটার আসলে এটাই নাম – পাহাড়টাই কেবল পরেশনাথ |

পাহাড় অবধি চলে যাওয়া একটা রাস্তার দু’ধারে গজিয়ে ওঠা জনপদ এই মধুবন – যথারীতি ঘিঞ্জি আর নোংরা | এখানে চলনসই হোটেল বলতে একটাই – ‘সপনা’ | পিঠে ব্যাগ, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, সানগ্লাস, সঙ্গে দুজন মুশকো লোক পৌঁছতে এসেছে – রিসেপশনে যিনি ছিলেন (পরে বেশ জমে গিয়েছিল এই সঞ্জয় গুপ্তার সঙ্গে )আমাকে ঘর দিলেন বটে তবে ভুরু দুটো ওঁর সারাক্ষণ কুঁচকেই রইল – ভাগ্যে ভোটার কার্ডের কপি এনেছিলাম – সেটা খুঁটিয়ে দেখে সটান ভরে ফেললেন ড্রয়ারে |

দোকানপাটের মধ্যে দিয়ে রাস্তা গিয়েছে পাহাড় অবধি
দোকানপাটের মধ্যে দিয়ে রাস্তা গিয়েছে পাহাড় অবধি

গুছিয়ে বসতে না বসতেই হেমন্তের বেলা পড়ে এল, দিনটা কোজাগরী পূর্ণিমা – গোটা সন্ধেটা চাঁদের আলো উপভোগ করব বলে হোটেলের খোলা ছাদে উঠে দেখলাম সে গুড়ে বালি – আকাশ মেঘে ভর্তি |

পরেশনাথ সম্পর্কে দুটো তথ্য আমি জেনে এসেছিলাম – এক, পাহাড়ের ওপর যদি যেতে হয় তাহলে ভোর হবার আগেই বেরিয়ে পড়া ভাল – দুই, পাহাড় ও আশেপাশের জায়গাগুলো বিশেষ নিরাপদ নয় কারণ ওখানে নাকি মাওবাদীর চাষ হয় | ভোরে ওঠার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না – কিন্তু হোটেলের বেয়ারা রামু রাত তিনটের সময় দরজা ধাক্কা দিয়ে জাগালো – অগত্যা তৈরি হয়ে সোয়া চারটে নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম – চারদিকে তখন ঘুটঘুট করছে অন্ধকার | পাহাড়ের একটাই পথ এঁকেবেঁকে উঠেছে – স্রেফ আন্দাজে পা ফেলে এগিয়ে চলা | এর আগে বহু ‘ট্রেক’ করেছি কিন্তু এরকম অন্ধকারের মধ্যে এই প্রথম, তার ওপর জায়গাটার যা সুনাম – সব মিলিয়ে ভয় মেশানো একটা রোমাঞ্চ হচ্ছিল | অবশ্য মাঝে মাঝে টর্চের আলো আর লাঠির ঠকঠক আওয়াজে আশ্বস্ত হচ্ছিলাম – আমার আগে, পরে, আরও অনেকে রয়েছে | ন’কিলোমিটার রাস্তা পাহাড়ি হলেও প্রায় গোটাটাই বাঁধানো – মাঝে মাঝে আবার সিঁড়িও করা আছে | অর্ধেক পথ যেতেই আলো ফুটে গেল, চারদিক দেখে বুঝতে পারলাম একটা নয়, বেশ অনেকগুলো পাহাড় গা জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে | ফাঁকে ফাঁকে মেঘ আর কুয়াশা খেলে বেড়াচ্ছে – রোদ নেই, ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া – সব মিলিয়ে মনটা বেশ চনমনে হয়ে উঠল | তীর্থস্থান, তাই কিছুটা অন্তর চায়ের দোকান খুলে বসেছে – সঙ্গে বিস্কুট, শসা, তেলেভাজা, চিপস! একেবারে কচিকাঁচা থেকে থুত্থুড়ে বুড়ি পর্যন্ত সবাই চলেছে – পাহাড়ের একটা বাঁকে দেখলাম এক ঠাকুমা ভক্তিভরে বসে বসে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন আর পাশে বসে তাঁর বছর পনেরোর নাতনি সেটা মন দিয়ে শুনছে – দৃশ্যটা ভারি সুন্দর লাগল |

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর
মধুবনের শ্বেতাম্বর মন্দির
মধুবনের শ্বেতাম্বর মন্দির

পাহাড়ে ওঠার জন্য ডুলির ব্যবস্থা আছে – অনেকেই এভাবে ওঠেন – তবে যাতে পুণ্যার্জনে কোন ব্যাঘাত না ঘটে তাই মাঝে মাঝে নেমে পায়ে হেঁটে ব্যাপারটাকে ব্যালেন্স করে নেন | ডুলির রেট এখানে ওজনের হিসেব অনুযায়ী ঠিক করা আছে – স্থানীয় আদিবাসীদের অধিকাংশ এই জীবিকাকে নির্ভর করে বেঁচে রয়েছে | বেশ অসুস্থ এক বুড়িকে দুজনে ওপরে তুলে এনেছে – বাহ্যজ্ঞানশূন্য মানুষটি ডুলিতে বসে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মন্দিরের দিকে | দেখলাম বাহকের একজন নিজে থেকে বুড়ির দু’হাত ধরে তার কপালে ঠেকিয়ে প্রণামটা সারিয়ে দিচ্ছে সুন্দরভাবে, বাচ্চাদের সঙ্গে যেমন করে – সম্পূর্ণ অচেনা এই বুড়ির প্রতি হতদরিদ্র এই ডুলিওয়ালার এত মমতা আসে কোথা থেকে কে জানে!

মাইসোর থেকে আসা চিরন্থ
মাইসোর থেকে আসা চিরন্থ

প্রায় চারঘন্টা লেগে গেল পাহাড়ের মাথায় পৌঁছতে, যার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে আছে সব মিলিয়ে প্রায় চব্বিশটা মন্দির, বিভিন্ন তীর্থঙ্কররা সেখানে বসে ধ্যান করেছিলেন – ঘুরে দেখতে গেলে আবার ন’কিলোমিটার চড়াই-উতরাই ভাঙতে হবে | ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে তীর্থ করতে আসা বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো | আঠারো বছরের ‘চিরন্থ’ এসেছে মাইসোর থেকে, সঙ্গে বন্ধু – আমাকে একটা উঁচু জায়গায় বসে আঁকতে দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠে এল তারপর ওর যত রাজ্যের প্রশ্নের ঠেলায় আমার তো যায় যায় অবস্থা | শেষকালে বললাম দাঁড়াও তোমার একটা স্কেচ করি – ওর তো বিশ্বাসই  হয় না |

মূল মন্দিরের যখন বেশ কাছে চলে এসেছি
মূল মন্দিরের যখন বেশ কাছে চলে এসেছি

পাহাড়ের একেবারে চুড়োয় রয়েছে মূল পরেশনাথের মন্দিরটা – যথারীতি এখানে দোকানপাট আর লোকের ভিড়ও সবথেকে বেশি – মন্দিরের ভেতর দেখলাম জোরকদমে পুজো-আচ্চা চলছে – অনেকে আবার মেঝেতে বসে ছোট ছোট টুলের ওপর বই খুলে নিচু গলায় মন্ত্র পড়ছে – এদের মধ্যে অল্পবয়সীদের সংখ্যা নেহাত কম নয় |

পাহাড়ের ওপর ছোট ছোট মন্দিরগুলোর একটি
পাহাড়ের ওপর ছোট ছোট মন্দিরগুলোর একটি

নামার সময় পেট চুঁই চুঁই শুরু করল – ভোর থেকে স্রেফ বিস্কুটের ওপর আছি – পথে একটা ছোট ক্যান্টিন পড়ল, এখানে সবাইকে ‘ফ্রি’তে টাটকা বোঁদে আর ঝুরিভাজা সহযোগে গরম গরম চা খাওয়ানো হচ্ছে – অবশ্য একেবারে ফ্রি বলা যাবে না, পাশেই দানপাত্র রয়েছে – যে যা খুশি দিতে পারো – সবাই দিচ্ছেও |

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর

আমার হোটেলের ঘরটা ছিল একেবারে রাস্তার ওপরেই – সাত সকালে জানলা খুলতেই চোখে পড়ল এক অভিনব দৃশ্য – দুজন সাধুবাবা সম্পুর্ন উলঙ্গ অবস্থায় হেঁটে আসছেন – আর ভিড়ের মধ্যে থেকে অনেকেই এগিয়ে গিয়ে তাঁদের ভক্তিভরে প্রণাম জানাচ্ছে – এমনকী মহিলারাও বাদ যাচ্ছেন না | বাবাজিরাও বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ময়ূরের পালক লাগানো এক ধরণের লাঠি তাদের মাথায় ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করছেন | মনে পড়ে গেল জৈনদের মধ্যে দুটো শাখার কথা – শেতাম্বর আর দিগম্বর – এঁরা হলেন সেই দিগম্বর | জীবনধারণের সমস্ত বাহ্যিক প্রয়োজনগুলোকে ত্যাগ করে বেঁচে থাকা অদ্ভুত একটা জগতের মানুষ | কোনওরকম সংকোচ ছাড়াই এদের প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে কিংবা ভক্তদের সঙ্গে মেলামেশা করতে দেখলাম | এঁরা অবশ্য শুধু সকালে একবার আহার করেন আর বাকি দিনটা ঘরে বসে জপ-তপ নিয়ে কাটান | ভীষণ ইচ্ছে করছিল এই দিগম্বর সাধুদের সামনে থেকে ছবি আঁকার |

দিগম্বর বাবাজি
দিগম্বর বাবাজি

আমার হোটেলের পাশেই যে মন্দিরটা ছিল তার পিছনের দিকটায় দেখলাম একদল দিগম্বর রয়েছেন – সমানে তাঁদের যাতায়াত চলছে – আমিও ওখানে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করতে লাগলাম, তারপর সুযোগ বুঝে একদল ভক্তের সঙ্গে ঢুকে গিয়ে সোজা হাজির হলাম গাছের ছায়া ঘেরা একটা খোলা চত্বরে | এখানে তিনজন ন্যাংটা-বাবা বসে মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন – একজন বড় চেয়ারে আর বাকি দুজন নিচু পিঁড়িতে – মনে হল এখানেও সিনিয়ার-জুনিয়ার ব্যাপার আছে | চেয়ারওয়ালা আমাদের জন্য একটা মাদুর পাতিয়ে দিল – ধর্ম-টর্ম বুঝি না, মন্ত্রও না, তবে কিনা সব মিলিয়ে বেশ মজা লাগছিল – একদম সময় নষ্ট না করে তিনজনকেই আলাদাভাবে নমস্কার জানিয়ে স্কেচখাতা আর পেন বের করলাম – পিঁড়ির একজনই আমার সাবজেক্ট | পাকানো রোগাটে কিন্তু শক্তপোক্ত চেহারার মানুষটি টানটান হয়ে বসে আছেন জোড়হাত করে – বয়েস মনে হল পঞ্চাশের আশেপাশে | আমার কাণ্ড দেখে বাকিদের মুখে বিরক্তিভাব জাগল কিনা বুঝলাম না তবে যাঁকে আঁকা হচ্ছিল তিনি কিন্তু মন্ত্রপাঠের মধ্যেই দিব্যি মুচকি মুচকি হাসছিলেন |

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর
sanjay gupta pareshnath
সঞ্জয় গুপ্তা

পুরো দুটো দিন কাটানোর পর এই তীর্থস্থানাটির মাহাত্ম্য যখন সবেমাত্র অনুভব করতে শুরু করেছি – হোটেলের সেই সঞ্জয় গুপ্তা মহাশয় এসে তার ওপর ঠান্ডা জল ঢেলে দিলেন বলা যায় | এমনিতে আমার ছবি আঁকার ব্যাপারটা লোকটিকে বেশ তাতিয়ে তুলেছিল – সময় পেলেই ঘরে ঢুকে কাজ দেখতেন আর সঙ্গে জায়গাটি সম্পর্কে নানা খবরাখবর দিয়ে যেতেন | শেষের দিন যখন দিগম্বর বাবাজিদের কথা উঠল তখন রীতিমত উত্তেজিত হয়ে উঠলেন – “সব কুছ বকওয়াস হ্যায়” – ধর্মের নামে ভিতরে ভিতরে স্রেফ ভ্রষ্টাচার চলছে | তাহলে তো সত্যিই চিন্তার কথা – সঞ্জয় আবার ঝাঁঝিয়ে উঠলেন – চিন্তার কী আছে – কোন ধর্মে এসব নেই আপনি বলুন তো? বলব আর কী, বুঝলাম দশ বছর ধরে এইরকম একটা জায়গায় হোটেল চালিয়ে গুপ্তাজির ভক্তির একেবারে দফারফা হয়ে গিয়েছে |

হোটেল ছেড়ে চলে আসার সময় সঞ্জয় বললেন – “পারলে একবার হোলিতে আসবেন – এখানকার সবচেয়ে বড় ‘তেওহার’, তবে হাজার টাকার নিচে কিন্তু কোনও ঘর পাবেন না |

NO COMMENTS