তাঁর দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক পাণ্ডিত্য, অসামান্য ব্যক্তিত্ব, বিরোধীদের গুরুত্ব না দেওয়ার সীমাহীন ক্ষমতা বা কোন সিদ্ধান্ত ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সেটা বলার সাহস নিয়ে বহু নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে | শেষ হয়েছে বহু কলমচির কলমের কালি | সেই সব বহুচর্চিত আলোচনা এখানে নয় |
আজ, প্রয়াত জ্যোতি বসুর ১০৩ তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পাতায় চোখ রাখার ছোট্ট প্রয়াস |

ওপার বাংলার বারদি গ্রাম পৈতৃক ভিটে হলেও জ্যোতি বসুর জন্ম খাস কলকাতায় | ৪৩/১,হ্যারিসন রোডে | নাম পাল্টে যে রাস্তা এখন মহাত্মা গান্ধী রোড | মধ্য কলকাতার এই ঠিকানাতেই ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই জন্ম হয় নিশিকান্ত এবং হেমলতা বসুর তৃতীয় সন্তানের | নবজাতকের ভাল নাম রাখা হয় জ্যোতিরিন্দ্র বসু | আর বাড়ির আদরের নাম ‘গনা’ | তাঁর জন্মের ছ বছরের মধ্যে বার দুয়েক ঠিকানা বদল করে ‘বসু পরিবার’ উঠে আসে ৫৫-এ হিন্দুস্থান রোডের বাড়িতে | সেখানেই যৌথ পরিবারে বড় হয়ে ওঠা তাঁর |

১৯২০,যে বছর হিন্দুস্থান রোডের বাড়িতে আসে বসু পরিবার,সেই বছরেই প্রথম স্কুলে পা রাখা ছোট্ট গনার | ধর্মতলার লোরেটো হাউজে | স্কুলে ভর্তির সঙ্গে আর একটাও পরিবর্তন হল ছোট্ট ছেলেটির জীবনে | স্কুলের খাতায় ছেলের নাম জ্যোতিরিন্দ্র থেকে ছোট করে ‘জ্যোতি’ করে দিলেন নিশিকান্ত বসু | মেয়েদের স্কুল লোরেটো হাউসেই পাঁচ বছর পড়লেন জ্যোতি | ১৯২৫-এ তাঁকে ভর্তি করা হল সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে |

সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে তৎকালীন হিন্দু কলেজ,আজকের প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন জ্যোতি বসু | সেখানকার পাঠ শেষ করে তিনি পাড়ি দেন সোজা ইংল্যান্ডে | আইন পড়তে |

১৯৪০ সালে বম্বে (এখন মুম্বই) হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন বসু | সবাই ভেবেছিল,বাবার যোগ্য উত্তরসুরি হবেন তিনি | কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে তরুণ তুর্কী জানালেন,আইন নয় | তিনি এগোবেন রাজনীতির পথে | বহু চেষ্টা করেও সঙ্কল্প থেকে সরানো যায়নি তাঁকে |

আরও পড়ুন:  চিকিৎসা করাতে ভারতে কুয়েতের সুলতান‚ সঙ্গে ৮ জন বেগম

রাজনীতির পথে এগোতে এগোতেই বিয়ে | ১৯৪০ সালে | জ্যোতি বসু বিয়ে করলেন বাসন্তী ঘোষকে | তবে দীর্ঘায়িত হয়নি এই দাম্পত্য | মাত্র আড়াই বছরের | ১৯৪২-এর মে মাসে প্রয়াত হন বাসন্তী দেবী | স্ত্রী বিয়োগের শোক কাটতে না কাটতেই ফের শোকের আঘাত | কয়েক মাসের মধ্যে চলে গেলেন জ্যোতি বসুর মা |

প্রথমা স্ত্রী বিয়োগের ছ বছর পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন তিনি | কমল বসুকে | ১৯৫১ সালে জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান | কিন্তু সেখানেও আঘাত | জন্মের কয়েকদিনের মধ্যে মারা যায় সেই সদ্যোজাত কন্যাসন্তান | ডায়রিয়া আর ডিহাইড্রেশনে আক্রান্ত হয়ে |
পরের বছর,১৯৫২ সালে জন্ম হয় তাঁদের পুত্রসন্তানের | আদরের খোকার | যাঁকে সবাই চেনে চন্দন বসু বলে |

সমালোচকদের তীক্ষ্ণ বক্রোক্তি থেকে বাঁচেনি বসুর পরিবার বা পারিবারিক জীবনও | কিন্তু একটা জিনিস আজ অবধি কোথাও দেখা যায়নি | কোনও সংবাদমাধ্যমে তাঁকে শুধু নাম ধরে উল্লেখ বা উদ্ধৃত করতে পারেনি | সবসময় তিনি ‘শ্রী বসু’, শুধু ‘বসু’ অথবা পুরোপুরি ‘জ্যোতি বসু’ |

অথচ রাজনৈতিক নেতাদের শুধু নাম ধরে উল্লেখ বা উদ্ধৃত করা,এটাই প্রচলিত রীতি সংবাদমাধ্যমে | তাহলে তাঁর ক্ষেত্রে এই পার্থক্য কেন? তাঁর ব্যক্তিত্বের কোন অমোঘ শক্তির জন্য?

উত্তরটা জানা নেই তাঁর অতি বড় সমালোচকেরও |

- Might Interest You

NO COMMENTS