(ভাবলিখন :  তন্ময় দত্তগুপ্ত)

কবিতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বহুদিনের । ক্লাস নাইন থেকে আমি কবিতা লিখতে শুরু করি । যদিও আমার পরিবারে কবিতার সঙ্গে কোনও যোগ ছিল না । আমার বাড়ির পাশে ছিল একটা দীঘি । সেই দীঘির ভেতর ডুব দিয়ে স্নান সেরে উঠতেন আমার মা । মার পরনে থাকত সাদা থান । কারণ ছোটবেলায় বাবা মারা গিয়েছিলেন । ভেজা থানে মা এগিয়ে যেতেন তুলসীতলার দিকে । তারপর ঢেলে দিতেন জল । মার মুখ থেকে বেরিয়ে আসত গীতার একেকটা অধ্যায় । আমার শৈশবের অনুভূতির সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ ছিল এটাই ।

আমার মনে হয় ভ্রমণের অনেক বৃহত্তর মানে আছে । ভ্রমণ শুধুমাত্র আমাজনের জঙ্গল বা রাজস্থানের মরুভূমি দর্শন নয় । আমরা প্রত্যহ শারীরিক এবং মানসিক ভ্রমণ করি । আমার শৈশবের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা একরকম । পরবর্তী জীবনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অন্যরকম । কলেজে আমার এক বন্ধু ছিল । সে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র । আমি ছিলাম ইংরাজির ছাত্র । আমরা সামান্য পয়সা জমিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে চাঁদিপুর গিয়েছিলাম । সে এক শিহরন জাগানো অভিজ্ঞতা । এটা পচাত্তর সালের ঘটনা । চাঁদিপুরে গিয়ে দু’রাত্তির একটা বাড়িতে ছিলাম । সেই বাড়ির দারোয়ানকে আমরা কুড়ি টাকা দিয়েছিলাম । সে আমাদের দু’দিন ধরে মাছ,ভাত,রুটি খাইয়েছিল । একটা সুন্দর ঘরে থাকতেও দিয়েছিল । এরপরেও চাঁদিপুরে অনেকবার গিয়েছি । কিন্তু প্রথমবার চাঁদিপুর যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা । একটা এ্যাডভেঞ্চারের নেশায় মেতে ছিলাম আমরা ।

আমাদের কলকাতায় কয়েক লক্ষ গাছের বসবাস । বহু গাছের উপস্থিতি বদলে দেয় পরিবেশ । খুব ভালো লাগে সেই সমস্ত গাছ তলায় গিয়ে বসতে । পয়সা খরচ করে বৃক্ষ দর্শন করতে হয়ত কেউ যায় না । আমাদের জীবনের তালিকায় এও কিন্তু ভ্রমণ ।

বিবাহের আগে মল্লিকার সঙ্গে বহুবার ঘুরতে গিয়েছি । আমার কৃষ্ণনগরে জন্ম । আমি আর মল্লিকা কৃষ্ণনগর থেকে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতাম । কল্যাণী  বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাস পালিয়ে আমি আর মল্লিকা অনেকদূর চলে গিয়েছিলাম । সেখানে ছিল বিশাল একটা বিল । উড়ে আসত সাইবেরিয়ার পাখি । গ্রামটার নাম বিরহী । বিরহীতে আমরা দুজন বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম । চারপাশে ছিল না কোনও মানুষ । শুধু গাছের ডালে উড়ে আসছিল পাখি । রংবেরঙের পাখি । দূর আকাশে সূর্যাস্তের হলুদ কমলা আলোর বৃত্তে ক্রমাগত আটকে পড়ছিলাম আমরা । সুন্দরের অপূর্ব আয়োজনে আমরা বিহ্বল । সন্ধ্যা নেমে এলো । তারপর রাত । ফেরার পথ আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না । একটা নির্জনতার আবহে জড়িয়ে ছিলাম আমরা । ঠিক করলাম ওইখানেই থেকে যাব । আমার হাতে ছিল শেক্সপিয়ার । মল্লিকার ব্যাগে সোসিওলজির বই । ওই সমস্ত বই মাথায় দিয়ে ঘাসের ওপরে আকাশের মুখোমুখি আমরা রাত কাটিয়েছিলাম । সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা । আমার কবিতায় এই বিরহী গ্রামের কথা বার বার এসেছে । এসেছে নির্জনতার প্রসঙ্গ । আমি বোঝার চেষ্টা করেছি নির্জনতার মানে । আমি বিরহী থেকে বাড়ি ফিরেও পেয়েছি নির্জনতার গন্ধ । আমার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত খুল্লেই দেখতে পাচ্ছিলাম নির্জনতা ।

পৃথিবীর অনেক জায়গায় গিয়েছি । কিন্তু বিরহীর মতো নির্জনতা কোথাও খুঁজে পাইনি । প্রকৃতি আমার কাছে কখনও নারী কখনও পুরুষ । উত্তরবঙ্গের তিস্তা নদীকে দেখেছি বহুবার । এক জায়গায় তিস্তা শান্ত তির তির করে বয়ে চলেছে । তিস্তা তখন আমার কাছে শান্ত কিশোরী । আবার তিস্তা যখন করনেশন ব্রিজের কাছে তখন দেখেছি তার ডাকাতিয়া রূপ । তিস্তার দাপট,ঝাপট,তোলপাড় করা আচরণ তিস্তাকে নারী থেকে পুরুষে রূপান্তরিত করে । একই নদীর দুই রূপ । আমাদের ভারতীয় দর্শনে রয়েছে প্রকৃতিকে নারী রূপে কল্পনা করার প্রবণতা । আমার কাছে প্রকৃতি সব সময় নারী নয় । পুরুষও । প্রকৃতির দান যেমন সমুদ্র তেমনই পাহাড় । পাহাড় পুরুষের মতো টান টান শিরদাঁড়ায় ঊর্ধ্বমুখী । উত্তরবঙ্গের দার্জিলিংয়ের পাহাড়ের কাছে গেলে আমার মাথা নত হয়ে আসে । আমার মনে হয় পাহাড়ের উচ্চতার কাছে মানুষ হিসেবে আমি কত ছোট ।

আমার জীবনে সমুদ্রও এসেছে । ভারত সরকার থেকে আমাকে একবার পাঠানো হয়েছিল আমেরিকায় । সেই আমার প্রথম প্লেনে চড়া । প্রথমবার প্লেনেই আমেরিকা ভ্রমণ । আমাকে ওনারা নিয়ে গেলেন নিউইয়র্ক শহরে । দেখলাম আটলান্টিক সাগর । আটলান্টিকে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস । আমার মাথা থেকে কান পর্যন্ত মাফলার জড়ানো । বাতাসের তীব্রতায় পরাজিত আমার শীতপোশাক । আমার বার বার মনে হচ্ছিল,বাতাস বুঝি ছিনিয়ে নেবে আমার কান । তাই ভালো করে উপভোগ করতে পারছিলাম না আটলান্টিকের সৌন্দর্য । হালকা শীতল জলীয় বাষ্প মিশে যাচ্ছিল আমার সারা শরীরে । আমি বেশ বুঝেছিলাম,আটলান্টিকের সঙ্গেই আমি আছি বা আটলান্টিক আমার সঙ্গে আছে । আমি আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখেছি । ওখানে আটলান্টিক অতোটা বিপজ্জনক নয় । একটা শান্ত সৌম্য অবস্থান । আমি খুব দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছি । তখন প্লেন দেখতাম আকেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ।

জীবনে প্রথম প্লেনে চড়ে আমেরিকা ভ্রমণ অতীতের কষ্টে মলম মাখিয়েছিল । স্তব্ধ হয়েছিল দুঃখের বহমান নদী । সৃজনশীলতার ভেতর শুরু হয়েছিল আমার ভ্রমণ । আমার মানে আমারই । একান্তই ব্যক্তিগত । আটলান্টিকের মতো ভারত মহাসাগরের মুগ্ধতা আমাকে ভাবিয়েছে । ভারত মহাসাগরের ইস্টকোর্স বিশেষ করে উড়িষ্যার উপকূল, দক্ষিণ ভারত কিংবা আরো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত । হাতের কাছে পুরীর সমুদ্র আমার বেশ লাগে । একবার আমি পর পর তিন চারটে দেশে গিয়েছিলাম । চেক রিপাবলিকের কথা বলব । অপূর্ব সে দেশ । আবার ভূমধ্য সাগরের ওপর দিয়ে প্যারোস বলে একটা দ্বীপে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । সেখানে বহু দেশের কবিরা এসেছিলেন । প্যারোস দ্বীপটা পুরোটাই পাহাড় । প্যারোস পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বাইজেনটাইন সভ্যতার যে পথ সেই পথ দিয়ে আমি গিয়েছিলাম । ওখানে আমরা সাতদিন ছিলাম । ওই দ্বীপের কথা আজও আমি ভুলতে পারি না । প্যারোসে একই সঙ্গে সমুদ্র এবং পাহাড়ের সহবাস । আর আছে জনবসতি । প্যারোসের পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আমি একটা কবিতার লাইন বলেছিলাম —“তুমি যত ওপরে উঠবে/তত তুমি একা” ।

ছোটবেলা থেকে পাহাড় আমাকে খুব টেনেছে । এম এ পাশ করে আমি  পি এইচ ডিতে ঢুকেছি । সেই সময় আমার একটা চাকরির অফার এলো । আমি চাকরিটা নিয়ে নিলাম । চাকরিটা ছিল ডুয়ার্সের একটা কলেজে । আমি ভাবলাম এবার আমি ডুয়ার্স বেড়াতে পারব । আমি এগারো মাস ডুয়ার্সে ছিলাম । ডুয়ার্স আমার কাছে একটা সম্পদ । সত্যি কথা বলতে কী ডুয়ার্স সুইজারল্যাণ্ডের থেকেও সুন্দর । যে কোনও বাঁকের মুখে দাঁড়ালে মনে হয় ডুয়ার্স অপরূপ । ডুয়ার্সের জঙ্গলে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছি । জঙ্গলের একটা নিজস্ব ভাষা আছে । সে ভাষা আমি অনুভব করতে পেরেছি ।

আমার মৃত্যুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে বহুবার । প্রথম পরিচয় শৈশবে । অল্প বয়েসে আমার বাবা চলে গেলেন । কৃষ্ণনগরের ডিস্ট্রিক্ট হসপিটালে আমি সকাল সাড়ে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে পৌছলাম । দেখলাম বাবা শুয়ে আছেন । বমি করলেন বাবা । নার্স ছুটে এলেন । এলেন ডাক্তার । বাবাকে দেখলেন । তারপর একটা সাদা কাপড় টেনে দিলেন বাবার মাথা পর্যন্ত । হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমি ছুটতে লাগলাম । আমার পেছন পেছন ছুটল একটা কুকুর । এই দৃশ্যটার কথা আমি আমার কবিতায় লিখেছি । আমার মনে হয়েছে মহাভারতের কুকুর আমার পিছনে কেন আসছে?ওই কুকুরটার কারণে আমার মনে হলো আমি মহাভারতের পৃষ্ঠার ভেতর ভ্রমণ করছি ।

NO COMMENTS