বাংলালাইভ রেটিং -

সিনেমা নিয়ে লিখছি পরে, আগে একটু নিজের কথা লিখি।

বহু বছর আগের কথা, তখন আমি বয়সে নেহাত ছোট। হঠাৎ করে কী মনে হল, ঠিক করলাম, কলকাতার স্কুল-টুল সব ছেড়ে, শান্তিনিকেতনে ভর্তি হব গিয়ে। সবে তখন রবীন্দ্রনাথকে চিনতে শিখছি, কে জানে সেটা তারই এফেক্ট কিনা। এছাড়া সে সময় খবর কাগজে যা লেখা হত, পড়ে ভাবতাম, ওখানকার স্কুল-হোস্টেল থাকার জন্য, পড়ার জন্য, অতুলনীয় স্থান।

এখনও মনে আছে বেশ, আশ্রম চত্বরেই ফুটবল মাঠের মত বিশাল সেই ঘর। সেখানে বোধহয় হাজার খানেক ছেলে-মেয়ে অ্যাডমিশন টেস্ট দিল। মাটিতে ঢালাও চাদর পাতা, তার ওপর বাবু হয়ে সব বসা। রেজাল্ট বেরলে দ্যাখা গেল, চান্স পেয়ে গেছি আমি।

সন্ধেবেলায় মা-বাবা আমাকে নিয়ে গেল ওখানকারই এক টিচারের কাছে। কমপাউন্ডের মধ্যেই তিনি থাকেন। আর এই যাওয়ার কারণটাও খুব সহজ, আমি যে সাবজেক্টে উইক, সন্ধেবেলায় আলাদা করে আমায় একটু দেখিয়ে দ্যান যদি।

মনে আছে, তাঁর মুখটা কেমন পাথরের মতো হয়ে গেছিল আমাদের কথা পুরোটা শোনার পর। খুব অবাক হয়ে আমাকে দেখিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, এ কি আপনাদের একমাত্র ছেলে? সেই ছেলেকে এখানে এভাবে ছেড়ে যাচ্ছেন কেন? কলকাতায় কি পড়ানোর মত একটা স্কুলও নেই?

কলকাতা ছেড়ে এখানে কেউ আসে?

তার পর মিনিট ত্রিশেক সময় যেন ঝড়ের মতো গেল। নিজে যে স্কুলে পড়ান, সেই স্কুলের স্বরূপ তিনি ফাঁস করলেন দ্রুত। ‘এখানে কারা ছেলেমেয়েদের পড়তে পাঠায় বলবো? যাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা জোটে না কোন। কিংবা যারা আরও দূরে জেলায়-টেলায় থাকে। এখানে এলে ফিউচারের যে বারোটা বেজে গেল, এতে কিন্তু সন্দেহ নেই কোন। খবরের কাগজে এই কথাগুলো কোনদিন বের হবে না হয়তো। আমি ভেতরে থাকি বলেই জানি। শুকনো বলুন, ভেজা বলুন, সবরকমের নেশার এখানে রাজত্ব চলে, জানেন? একটু সন্ধে নামলে কোন ক্রাইম তো বাকি থাকে না আর! দেখুন, এরপরেও যদি এই ছেলেকে রেখে যেতে চান!’

ওঁর মুখে সেদিন আরও যেসব কথা শুনেছি, সেগুলো এখানে না লেখাটাই ভাল। শুধু এটুকু লিখি, সো-কল্‌ড ওই নামী স্কুলে চান্স পেয়েও মত পালটে দ্রুত কলকাতায় ফেরত আসি আমি।

এরপর কয়েক দশক পার। মাঝে মাঝে মিডিয়ায় এখন উপচে আসে ওই প্রতিষ্ঠানের কেচ্ছা কেলেঙ্কারি। ওটা যে ভেতরে ভেতরে ঝাঁঝরা এখন, সেটা জানতে কারুরই বোধহয় খুব একটা বাকি নেই।

এখান থেকে চলুন সোজা পৌঁছে যাই ‘পোস্ত’ ছবির কাছে! সেখানে শুরুতেই যে সেই আমার চেনা পুরনো স্কুলের সিন! একের পর এক তখন সবে নাম দ্যাখানো হচ্ছে। তার সঙ্গে চলছে বিশেষ একটা ঘরে বসে প্রার্থনা-সংগীত গাইতে থাকার সিন। আরে, ওই ঘরে তো সেবার গিয়ে বসেছিলাম আমিও?

গল্প একটু এগোতেই শুনতে পেলাম, সাত বছরের ছোট্ট ‘পোস্ত’কে (অভিনয়ে অর্ঘ্য বসু রায়) মানুষের মত মানুষ বানাতে, আর স্কুল খুঁজে না পেয়ে এখানেই কিনা পুরে দিয়েছেন পোস্ত’র ঠাকুরদা (অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) লোকটি, পোস্ত যাকে ‘গুরুজি’ বলে ডাকে!

ঘটনা দেখে আমি তো ভাই থতমতো খেয়ে হাঁ! দেখে-শুনে তো মনে হচ্ছে, শান্তিনিকেতনের অ্যাড ক্যাম্পেন হচ্ছে যেন এটা! এই স্কুল, এই ইউনিভার্সিটি যেন স্বপ্নের মতো, স্বর্গের মতো ভালো! তেত্রিশ বছর ধরে এখানেই শিক্ষকতায় ওই ‘গুরুজি’ মানে দীনেন লাহিড়ী যুক্ত ছিলেন নাকি। তারপরে এখন এই বাহাত্তর বছর বয়সে পৌঁছে তাঁর কিনা এটা মনে হল যে, নাতিকে মানুষ করার জন্যে ওই বিশেষ স্কুলের চেয়ে ভালো কোন জায়গা আর কোথাও – এমনকি কলকাতাতেও নেই!

সত্যি বলতে কী, এটা দেখে কিছুতে আমার ঘোর কাটছিল না আর যেন! একেক সময় মনে হচ্ছিল ‘পোস্ত’ ছবির পুরো টিম ওই বিশেষ প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বোধহয়! আর না হলে, এই ছবিটা বোধহয় ওই জায়গাটার পেড প্রোমোশন কোন! হ্যাঁ, আসলে এটা বোধহয় সিনেমা নয়, ঝকঝকে আড়াই ঘণ্টার বিজ্ঞাপনী ফিল্ম! না হলে আপনি বলুন, কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ করে একটা ছবিতে বিশেষ কোন প্রতিষ্ঠানকে এরকম লাগামছাড়া প্রমোট করা হয়?

আরও পড়ুন:  ঐশ্বর্যকেও কাছে পেতে চেয়েছিলেন হার্ভি ওয়েনস্টেইন!

রগড় দেখুন আরও। এই ‘গুরুজী’ মানে দীনেন লাহিড়ী এত ভীষণ শুদ্ধাচারী যে নাতির মুখে ‘শিট’ শুনে শোকে-দুঃখে বলতে গেলে মর্মাহত হন! আর প্রায় মাঝবয়সী ছেলের ঘরে মদের বোতল দেখতে পেলে শিউড়ে ওঠেন দ্রুত। জানা নেই, ওই স্কুলের রিয়্যালিটিতে এতগুলো বছর তিনি টিচার হয়ে সারভাইভ করলেন কী করে ভাই! একেকসময় এটা জানারও সাধ হচ্ছিল যে, পুরো জীবনটা ভদ্রলোক স্রেফ অলীক কিছু ভাবের ঘোরেই কাটিয়ে গেলেন কিনা।

অবশ্য শুধু এই দিকটাই নয়। ‘পোস্ত’ ছবির অন্য অন্য দিকেও কিন্তু রিয়্যালিটির খুব একটা বালাই-পাট নেই! ডায়ালগে দেওয়া তথ্যগুলো ভিস্যুয়াল দিয়ে মেলাতে গেলে হোঁচট খাচ্ছি জোরে।

উদাহরণ দিই, আসুন। ছবির ফার্স্ট হাফে আছে একটা ক্রিকেট খেলার সিন। সেই দিনটার বর্ণনা দিতে গিয়ে ছবিতে বলা হয়, শীতের এক মিষ্টি রোদের দিন। এটা শোনার পরেই মনে একটু খটকা আসে যে, শীতের মিষ্টি রোদ মানে এই সময়টা ঠিক কখন?

এর বেশ কিছুটা পরে একটা সিনে দেখবেন, নিশুত রাতে সাইকেল চেপে বাড়ি ফিরছে বাবা এবং ছেলে। অবাক হবেন দেখে যে এই সিনে কারুর গায়ে একটা কোন শীতের পোশাক নেই! জাস্ট একটা করে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা!

খুঁটিয়ে ছবি দেখতে গেলে এটা তখন মনে হবে না যে, যাহ্‌ বাবা, এ কী রকম শীতের দিন রে ভাই! এত রাতেও গায়ে কিচ্ছু দিতেই হয় না মোটে!

আসুন এরও কয়েকটা সিন পর। হঠাৎ একদিন সকালবেলায় নাতিকে স্কুলে পৌঁছে দিতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হবে দীনেনবাবুর, আর পরে জানা যাবে ওই দিনটা নাকি নভেম্বরের ফোর্থ!

বোঝো কাণ্ড! নভেম্বরের শুরু কিংবা তারও আগের সময় কোন লজিকে শীতকাল হয় শুনি? সেটাকে তো লোকে বোধহয় হেমন্ত কাল বলে। এবং যতদূর জানি, তখন ঠাণ্ডা পড়া দূরের কথা, সময় সময় ভাল মতন ভ্যাপসা গরম থাকে!

বুঝতে পারছেন তো কেন এটাকে সিনেমা না বলে অ্যাড ফিল্ম বলে দাগিয়ে দিয়েছি আগে? যদি সিনেমা হত, এই ডিটেলগুলোর নিখুঁত হিসেব যে স্ক্রিনে এসে ঠিকরে পড়তো ভাই! লজিক মেনে গল্প বলার মিনিমাম সেই দায়টা তো ভাল সিনেমার থাকে। তার পাশে অ্যাড ফিল্মগুলো দেখুন, দেখবেন লজিক-ফজিক হাওয়া করে দিয়ে সেখানে শুধু দেখন-সুখ সিন দ্যাখানোর হিড়িক। এবার মিলিয়ে দেখুন, ‘পোস্ত’ও এক্কেবারে তাই!

ঠাকুমার কাছে গল্প শুনে পোস্ত বড় হয়

অক্টোবর শেষ আর নভেম্বরের শুরু দিয়ে এই সিনেমার শুরু। কিন্তু কারুর মুখে একটা কোথাও পুজোর কোন কথা শুনতে পেলেন? ধরে নিলাম, এটা এমন একটা বছর যে কালী পুজো বা ভাই ফোঁটা সব অক্টোবরের থার্ড উইকেই শেষ। যদি সেটাও ধরি, লোকজনের ডায়ালগে সেই রেফারেন্স তো আসতে হবে ভাই! এমন একটা ক্যারেকটার নিয়ে গল্প, যার বয়স মোটে সাত, মা-বাবাকে ছেড়ে ঠাকুরদা আর ঠাকুমার কাছে থাকে। তাকে কোয়ালিটি টাইম দিতে পারে না বলে সেই বাবা এবং মা তো প্রায় শোকে মূহ্যমান! তা এসব সিকোয়েন্স যখন হচ্ছে, তখন আমার মতো একটা মামুলি পাবলিকের মনে এই জিজ্ঞেসাটা আসতে পারে না যে, সবে যে ঢাউস একটা পুজোর ছুটি গেল, সেটায় হলটা কী? কী করলো পোস্তবাবু তখন? ওর মা-বাবা কি সেই পুজোতেও কাজ থেকে কোন ছুটি পেল না কো নাকি?

সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখতে গেলে দিন-তারিখ আর ঘটনাক্রমের তালমিলটা কোন লেভেলে দরকার হয়, স্পষ্ট হল তো? এই ছবির নির্মাণে সেই মুন্সিয়ানা কোথায়!

এখানেই শেষ নয়, আরও মজা আছে। অক্টোবরের লাস্ট উইক, ‘পোস্ত’র সঙ্গে দ্যাখা করতে ওর মা-বাবা মানে অর্ণব (যীশু সেনগুপ্ত) আর সুস্মিতা (মিমি চক্রবর্তী) এসেছে বোলপুরে ওর ঠাকুরদা-ঠাকুমার বাড়ি। রাতে অর্ণব আর সুস্মিতার বেডরুমে পাখা চলছে না, এসি-র কোন চিহ্ন নেই, জানলা অবধি বন্ধ! এবং তারই মধ্যে ঢুক ঢুক করে দিব্যি মদ খেয়ে যাচ্ছে অর্ণব। এবং কারুর মধ্যে অস্বস্তির চিহ্ন নেই জাস্ট! বাস্তবে এটা পসিবল কী করে, কেউ একটু বুঝিয়ে দেবেন প্লিজ?

আরও পড়ুন:  শাহরুখের ছবিতে একসঙ্গে কাজল‚ রানি‚ শ্রীদেবী‚ করিশ্মা‚ আলিয়া!?

অবশ্য বিজ্ঞাপনের ছবিতে গরম কিংবা ঘামের মতো আনইম্প্রেসিভ ব্যাপারগুলো থাকবেই বা কেন? দুপুরে রোদ্দুরে তুমুল হুটোপাটি করার পর পোস্ত-র গায়ে কী ঘাম দেখতে পান আপনি? দেখেছেন একবারও ওকে কিংবা অন্য কাউকে কখনও বাড়িতে এসে পাখা কিংবা এসি চালাতে?

ছবির সেকেন্ড হাফের বেশিটাই কোর্টরুমের নাটক। খুদে ‘পোস্ত’র কাস্টডি নিয়ে ওর বাবা আর ঠাকুর্দাতে তুমুল লড়াই শুরু। দু’তরফই চায় ‘পোস্ত’কে নিজের কাছে রাখতে। সেখানে সওয়াল-জবাব করতে গিয়ে যে সব কথা উঠছে, একটু তলিয়ে ভাবুন, তার মধ্যেও শুনতে পাবেন খাপছাড়া সব কথা।

ওই সিনটা ধরুন, যেখানে উকিল অলোকরঞ্জন চ্যাটার্জি (পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) অর্ণবকে ক্রশ করতে গিয়ে ফাঁস করে দিলেন দোসরা নভেম্বর রাতে ওর সেই বন্ধু হিমাদ্রি মানে বনি’র (অভিনয়ে বাবুল সুপ্রিয়) মায়ের বাৎসরিকে গিয়ে নিভৃতে একটু ইলিশ ভাজা সেবন আর মদ্যপানের কথা। বেশ কাণ্ড এটা, ভাই! অলোক দেখছি এমন সুরে এই ঘটনাটা বলতে থাকেন, যে, ওখানে যেন স্বয়ং নিজেই হাজির ছিলেন তিনি। কিন্তু এখানেই তো আসল প্যাঁচ লুকনো! ওই ঘটনা তো এক বন্ধু সেই হিমাদ্রি ছাড়া আর অন্য কারুর জানারই কথা নয়! আর সেই হিমাদ্রিও তো বেশ কিছুদিন আগেই দূর বিদেশে ধাঁ। এবার বলুন, উকিল অলোক ওসব কথা তাহলে জানলো কী করে তবে?

কোর্ট রুম ড্রামা জমাতে পারলে জমে যায় বেশ ভাল! কিন্তু লজিকগুলো আরও একটু ভেবে-চিন্তে লিখতে হবে তো, নাকি?

এ সমস্ত তাও না হয় হল। এরপর কোর্টরুমে কি নিয়ে যুদ্ধ শুরু জানেন? ডায়রিতে লিখে রাখা গীতবিতানের গানের ব্যাখ্যা নিয়ে! আমি ভাবছিলাম, হচ্ছেটা কী ভাই? কোর্টের উকিল, কোর্টের জাজ, এরাও কি সব তাহলে এখন রবি ঠাকুরের ভাবের ঘোরে আছে?

কে বলবে ঠাকুরদা আর বাবার মধ্যে কেস চলছে কোর্টে

সিনের পরে সিন সাজানো, সেখানেও নড়বড়ে সব কেস! কোর্টের লড়াই তুঙ্গে উঠেছে, কী হয় কী হয় ভাব। তখন ঝুপ করে কোন আক্কেলে ঠাকুরদা আর ঠাম্মা ‘পোস্ত’কে কলকাতায় বাবার কাছে যেতে দিল, বলুন? পাসপোর্টের ছবি তোলাতে হবে, এটা কি কারণ হল কোন? পোস্ত যাতে ওঁদের ছেড়ে বিদেশ না চলে যায়, সেটা রুখতেই না এই সুবৃহৎ মামলা-পর্ব শুরু? তবে? ঠাকুরদা ভদ্রলোকটি সেই রিয়্যালিটি হঠাৎ করে ভুলেই গেলেন নাকি?

‘পোস্ত’ দেখছি আর মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে, একের পর এক ধাঁধা। আচ্ছা, এইটা বলুন, সেই যে ইউ. কে.-তে রেস্টুরেন্ট চেন খোলার জন্য আগাম কয়েক লাখ টাকা আগেভাগেই ‘পোস্ত’র বাবাকে পাঠিয়ে দিল বনি, সেই টাকাটার তারপরে কী হল? ‘পোস্ত’র আবদার শুনে বিদেশে না গিয়ে প্লেন মিস করে ‘পোস্ত’কে নিয়ে সোজা বোলপুরে ফেরত এলো ওর বাবা এবং মা। টাকা নষ্ট, টিকিট নষ্ট এসব নিয়ে তাদের কি কারুর কোন চিন্তা-ভাবনা নেই? নাকি টাকাপয়সা এই ছবিতে তুচ্ছ ব্যাপার, খোলামকুচির মতো? এই ছবিতে সে সব কিছু তাই দ্যাখানো মানা!

হিসেব মতো অক্টোবরে বাবার নাকি চাকরি গেছে, লাস্ট ছয় মাস স্যালারি হয় নি কোন। মা একা চাকরি করে খরচ-খরচা চালায়। এমন একটা পরিবারের থাকার ফ্ল্যাট দেখলে আপনার তাক লেগে যাবে, বস! কী তার কেতা, কী তার স্টাইল! দেওয়ালের ছবি থেকে সকালবেলার ব্রেকফাস্টে খাওয়ার জন্যে চুবড়ি ভর্তি ফল! দারুণ সব আসবাব আর চোখ জুড়নো মনোরম এক কিচেন। সেই কিচেনে আবার কোথাও একফোঁটা কালিঝুলিও নেই! মজা হল, তেলকালি ‘পাস’ করার জন্যে চিমনিটাও লাগান নেই কোথাও! এই চমৎকার ফ্ল্যাটে বেকার বাবা আর স্ট্রেসড মায়ের সঙ্গে আলো লাগানো ডানা লাগিয়ে, আলো লাগানো চশমা পরে, আলো লাগানো গিটার হাতে নিয়ে খুব ফুর্তিতে ‘হোম শান্তি হোম’ গান গেয়ে নাচানাচি করে পোস্ত।

মন দিয়ে এই গানটা দেখুন। যদি কোন সংশয় থেকে থাকে, এবার সেটাও কেটে যাবে, বুঝতে পারবেন এই ছবিটাকে সিনেমা না বলে কেন মনে হল প্রায় অনুভূতি-হীন লুক-সর্বস্ব দীর্ঘ একটি বিজ্ঞাপনের মতো।

আরও পড়ুন:  বিবেক ওবেরয়ের কেরিয়ার মুখ থুবড়ে পড়ার পেছনে সত্যিই কি সলমনের হাত আছে!?

এবার ওই সিনটায় আসুন। কোর্ট চত্বরে দাঁড়িয়ে রয়েছে অর্ণব আর দূরে কোন একটা হাইওয়ের ওপর অফিসের কাজে ব্যস্ত রয়েছে সুস্মিতা। ফোনে কথা হচ্ছে দু’জনের মধ্যে। অবাক হয়ে দেখতে পাবেন, কোর্ট চত্বরে রীতিমত রোদ আছে। অথচ সুস্মিতা যে হাইওয়েতে, সেখানে সূর্য পাটে বসে গেছে প্রায়! আচ্ছা, অর্ণবের থেকে সুস্মিতা কি তখন হাজার কিমি দূরে? নইলে দু’জায়গায় সূর্যের আলো আর পজিশনে এতটা ফারাক হয়?

শুটিং করতে গিয়ে না হয় খেয়াল ছিল না কোন। শটগুলো এডিট করে পরপর লাগাতে গিয়েও কি এত বড় ভুল কারুর চোখে ধরাই পড়লো না?    

নিজেকে একটা সময় এটাই বোঝাচ্ছিলাম যে এটাই হল নন্দিতা আর শিবপ্রসাদের স্টাইল। কোন একটা সোশ্যাল ইস্যু বেছে নিয়ে ছবি করবেন ওঁরা ঠিকই, কিন্তু সেটা প্রেজেন্ট করতে গিয়ে এন্ড প্রোডাক্ট যা হয়ে দাঁড়াবে, সেটার মধ্যে হাজার ফাঁক আর হাজার রকম ফাঁকি!

ঠাকুমা গৌরী দেবীর হাঁটুর অস্টিও আরথ্রাইটিসের ব্যথা সারিয়ে দেওয়ার জন্য এখানে হুল্লোড়ে এক নাতির দৌড়ঝাঁপই কাফি, ডাক্তার বা ওষুধ লাগবে না কোন। ঠাকুরদার গুরুতর হার্টের ব্যামো অবধি হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে যাবে, বোলপুর আসার সময় গাড়িতে ছেলের সঙ্গে তুমুল বিতণ্ডা বলুন বা কোর্টের চরম আকছা আকছি-র সময়েই বলুন, সেই ক্রিটিক্যাল ব্যামো সত্তরোর্ধ্ব শরীরটায় আর ফিরবে না কোন দিন। 

এটা হল সেই দুনিয়া, যখন স্ক্রিন জুড়ে গ্রাফিক্সে করা জোনাকিগুলো এই মোটা মোটা হলদেটে আলো ছড়িয়ে উড়তে থাকবে, দাদা! আরে না, গ্রাফিক্সের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে কোন সমালোচনা করতে চাই না, শুধু এটুকু লিখতে চাই, আমার দ্যাখা জোনাকিরা ছোট্ট বিন্দুর মতো মৃদু নীলাভ আলো ছড়িয়ে উড়ত। হতে পারে, এ ছবির এই এঁরা হলেন জেন-এক্স জোনাকি, যাঁদের আলো বিন্দুর মতো নীলচে নয়, ইয়া বড় আর হলদেটে হয়ে গেছে। 

এত অবধি হজম হচ্ছিল তাও, এরপর কানে আরও কী এলো জানেন? ‘পোস্ত’ ছবির গল্প নাকি চুপিসাড়ে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘মোহনবিল’ ছোটগল্পটা থেকে নেওয়া! সত্যি নাকি নন্দিতাদি, সত্যি নাকি শিবপ্রসাদ? চুপ করে থাকবেন না প্লিজ, এই অভিযোগ নিয়ে কী বলতে চান, দোহাই একটু জানিয়ে দেবেন, স্যর!

একের পর এক অসতর্ক চাল, আর তার জন্য এরকমের চরম সব কেস। আচ্ছা, মোদ্দা ব্যাপার তাহলে কী দাঁড়াল, ‘পোস্ত’ কি ভুলভাল খারাপ একটা ছবি?

মাফ করবেন। তা কিন্তু না আদৌ। মাঝে মাঝে বোরিং লাগছিল, ১৪৬ মিনিট ডিউরেশনটা এই সাবজেক্টের জন্যে বাড়াবাড়ি রকম বেশি মনে হল, ঠিকই। তবে ছবিটা কিন্তু এক ধারসে দেখে যেতে মন্দ লাগবে না আপনার।

চটকদার সংলাপে ‘মুখরোচক’ ব্র্যান্ডিং

হ্যাঁ, প্লাস পয়েন্টগুলোও বলি। অনুপম রায়ের গাওয়া ‘আপন মনে থাকে পোস্ত’ গানের দৃশ্যগুলো তো দুর্দান্ত লাগে দেখতে। সেই যে গ্রাফিক্সের কাঠবেড়ালিটা যখন এই গানের মধ্যে মিষ্টি টোনে ডেকে উঠবে ‘অ্যাই পোস্ত’ বলে, সেটা কি এই জীবনে ভুলতে পারবেন, বলুন? গান তো আছেই তার সঙ্গে আছে একটু পরপরই মুখরোচক ডায়ালগের মশলা। জায়গামতো ছড়িয়ে দেওয়া মারকাটারি কমিক রিলিফগুলো। ও হ্যাঁ জানেন তো, ‘মুখরোচক’ নামে চানাচুরের ব্র্যান্ড দিয়ে ছবির ডায়ালগগুলোকে ব্র্যান্ডিংও করিয়ে ছেড়েছেন নির্মাতারা! আর শুধু তো একটা দুটো নয়, এই ছবিতে এত ব্র্যান্ড একসঙ্গে এসে জড়ো হয়েছে, যে সেই অ্যাঙ্গেল থেকে ভাবতে গেলেও এই ছবির জন্য ওই ‘অ্যাড ফিল্ম’ অভিধাটা বেশ খাপে খাপ বলে মনে হবে আপনার।

নাম দ্যাখানোর শুরুতে একের পর এক ব্র্যান্ডের লোগো দেখতে দেখতে বুঝতে পারবেন, ছবির মার্কেটিংটা কত মন দিয়ে করে ওঁদের টিম। ইস, যদি গল্প আর স্ক্রিপ্ট লেখাতেও গুরুত্বটা একই রকম দিতেন!

এই রিভিউ-য়ের বেশিটা জুড়ে ছবির ভুলগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দ্যাখালাম কেন, জানেন? এই আশা নিয়ে যে, সেগুলো পড়ার পর নিজেদের শুধরে নেবেন ওঁরা। নেক্সট ছবিটা বানাতে গিয়ে সাবধান হবেন আরও বেশি।

তাতে কিন্তু আখেরে এই বাংলা ছবিরই লাভ!

NO COMMENTS