সুমন সরকার
পড়াশুনা প্রেসিডেন্সী কলেজে স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে । বর্তমানে আইএসআই , কলকাতায় ডক্টরেট করছেন । ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালিখি শুরু । যেভাবে গীটার বাজিয়ে গান গাইতে ভালো লাগে , সেভাবে লিখতে ভালো লাগে , তাই লেখেন । লিখেছেন রম্যগদ্যের দুটো বই- 'লাকি থারটিন' , 'ফাউ' ।

গত তেরো বছর ধরে , মফস্‌সলের একটা নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে , সরকারি ইলেকট্রিক ট্রেন এসে আমায় তুলে নিয়ে যায় , আর যেখানে আমার নামবার প্রয়োজন সেখানে , দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংসের টুকরোর মতন ছুঁড়ে ফেলে দেয় । এই স্টেশন চত্বরটাও অনেক বদলে গেছে । বইয়ের দোকানটা উঠে গেছে । বিক্রি নেই , বিড়ি টেনে ক্লান্ত দোকানের মালিকের হার্টটা একদিন দুম করে বন্ধ হয়ে যায় বিনা নোটিসে । দুটো নতুন ঘুগনির দোকান হয়েছে, হেবি সেল । তবে পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্টেশন মাতিয়ে রেখেছে একটা ঝালমুড়ির দোকান । সেই হিন্দিভাষী ঝালমুড়ি বিক্রেতা স্টেশনে ঢোকার মুখে যেন ভারতীয় রেলের ম্যাসকটের মতন দাঁড়িয়ে ! ওঁকে আমি কোনদিন বসতে দেখিনি , অনুগত অশ্বের মতন দাঁড়িয়ে অনন্তকাল । এই ঝালমুড়ি বিক্রেতা একটুও বদলাননি , ওঁর চুলে পাক ধরেছে । কিন্তু, মুড়ি মাখার সময় স্টিলের পাত্রের ভেতর ছোট্ট হাতা দিয়ে মুড়ির মিশ্রণ নাড়ার মায়াবী শব্দ , আলুকাবলি বানাবার আগে ‘লঙ্কা দেবো , লঙ্কা’ এই তিনটি শব্দের পরস্পর অমোঘভাবে বসে যাওয়া , প্রত্যেক বার ঝালমুড়ি বানাবার আগে অদ্ভুত একটা কাশির শব্দ , স্টেশনে ঢোকার মুখের ওঁর ঝালমুড়ি ডালা থেকে ভেসে আসা তেঁতুলমাখা আর ভাজা মশলার অদ্ভুত গন্ধ , এগুলো কিছুই বদলায়নি । স্টেশনের দুপাশটা বদলে গেছে অনেকটাই ।

স্টেশনের দুপাশে দেখি বড় বড় বিজ্ঞাপনের ক্যানভাস । বিগত কয়েক বছরে এই স্টেশনটাকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের মতন মুড়ে ফেলেছে এইসব বিজ্ঞাপনগুলি ।  মূলত ফ্ল্যাট , বেসরকারি কলেজ , জ্যোতিষী এরাই রাজ করছে এইসব বিজ্ঞাপনের পর্দায় । মাত্র পাঁচ লাখে ফ্ল্যাট আপনার দরকার , বিজ্ঞাপন ছাড়া কিভাবেই বা জানবেন । যদিও হাতির শরীরে পিঁপড়ের মতন , সেই বিজ্ঞাপনের শরীরেও একটা তারা চিহ্ন দিয়ে লেখা ‘শর্তাবলি প্রযোজ্য’ । ফলে পাঁচ লাখের ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে দেখলেন পনেরো লাখ , প্লাস আরও ফ্যাকড়া ! বেসরকারি কলেজে , নানান কোর্স , নামগুলি গালভরা নয় ‘মালভরা’ । কোর্স আছে , কোর্স ফি আছে , কোর্স করার সময় প্রেম হলে ইন্টারকোর্স আছে , কিন্তু কোর্স শেষে নিশ্চিত চাকরী নেই । আমাদের দেশে চাকর আছে , চাকরী নেই । তবে উষ্ণগোবর মস্তিষ্কের সন্তানযুক্ত উষ্ণপকেট পিতাদের , পকেটের মেদ কিঞ্চিত ঝরানো ছাড়া এই কলেজগুলি অন্য কি করছে সেটা অনুধাবন করা কষ্টকর ! আগে পাঠশালায় গরুর পাল যেতো , এখন বেসরকারি কলেজে গাধার পাল যায় । ঠিকই আছে , সভ্যতা এগোচ্ছে । তবে গরু দিনকে দিন যেভাবে নাম করছে , গরুর ছবি হয়তো নোটে স্থান পাবে । ষাঁড় তো ওয়াল স্ট্রিটে গুঁতোতে আসছে । গরু মহান ভারতের কনট্রিবিউশন হোক ! এরপর আছে বিজ্ঞাপনে জ্যোতিষী । জ্যোতিষীদের সঙ্গে ডাক্তারদের একটা ব্যাপারে বেশ মিল , সেটা হল ডিগ্রি । ডাক্তারদের নামের পাশে যেমন লেখা থাকে , এমবিবিএস , এমডি , এফআরসিএস (লন্ডন) , জ্যোতিষীদের নামের পাশেও নানান ডিগ্রি লেখা থাকে । এরা কেউই সিলভার মেডেল পান না , সকলেই গোল্ড । যদিও অনেকে শুধু জ্যোতিষী নয় , তান্ত্রিক ও বটে । বিলেত ফেরত ডাক্তার , শ্মশান ফেরত তান্ত্রিক । আমার সেই স্মৃতিঘেরা স্টেশনের পাশে এখন বিরাট বড় একটা বিজ্ঞাপনে ছ’টা ভুতের ছবি । বড় বড় দাঁত , দাঁতে রক্ত লেগে , চোখে রক্ত লেগে , জিভ বার করা বাহুবলি গ্রাফিক্স ! ডাক্তারের চেম্বারে যেমন হার্ট , কিডনির ছবি থাকে , তান্ত্রিকের চেম্বারে বা বিজ্ঞাপনে কোন ধরনের জটিল ভুত ওরা তাড়ান তার ঝলক তো থাকবেই । এই অবধি তাও ঠিক ছিল । কিন্তু, নার্সিং হোমগুলি , ডাক্তাররাও হাজির বিজ্ঞাপনে !

আরও পড়ুন:  প্রেসক্রিপশন

ছোটবেলায় তিনটে রোগের নাম জানতাম , জ্বর-সর্দি-কাশি । আর একজন ডাক্তারের নাম , গোপাল ডাক্তার , হোমিওপ্যাথ । প্রথম জীবনে কম্পাউনডার , তারপর স্বঘোষিত ডাক্তার , এখন একটি হোমিও হলের ফাউনডার ! যতই বয়স বাড়তে লাগল , নতুন নতুন রোগের , এবং ডাক্তারের নাম জানতে লাগলাম । চারপাশে গাদা-গাদা টেস্ট সেন্টার গজিয়ে উঠল । সেখানে সকাল থেকেই লম্বা লাইন । মানুষ  কি লাস্ট কয়েক বছরে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল ! ঘরে ঘরে কালার টিভি এলো , মোবাইল এলো এবং কেমোর বিক্রি বাড়াতে ক্যান্সার এলো ।  তারপর জানতে শুরু করলাম নানান নার্সিং হোমের নাম । এই অবধি ঠিক ছিল । শরীর থাকলেই রোগ হবেই , তাই ডাক্তার , হাসপাতাল , নার্সিং হোম , সবশেষে যম । কিন্তু, বিজ্ঞাপনে শাহরুখ খান , অমিতাভ বচ্চন , নবাব কিনলে আরাম ফ্রি , হনুমান কিনলে রাম ফ্রি এসব ছাপিয়ে এতো ডাক্তার-নার্সিং হোম কোথা থেকে গজিয়ে উঠল ভাই ! আগে  কুণ্ডু প্যাকেজ ট্যুর করতো , এখন চিকিৎসা হয় প্যাকেজে । সাহেবদের উচিত ইংরেজি ভাষায় একটা  পরিবর্তন আনার । এ রাজ্যের বেসরকারি নার্সিং হোমে ‘BILL’ শব্দটা আর ব্যাবহার করা যাবে না ,  তার জায়গায় ব্যবহার করতে হবে ‘KILL’ ! আসলে যে সভ্যতার বোঝা আমরা কাঁধে নিয়ে চলতে চলতে নিজেদের আমরা সভ্য ভাবছি , শিক্ষা-স্বাস্থ্য সেই সভ্যতার কোনো প্যারামিটার নয় , শিক্ষা-স্বাস্থ্য আসলে ব্যবসার প্যারামিটার ।  

ট্রেনে-টয়লেটে-বাসে ডি কে লোধের লিঙ্গ ক্ষুদ্র-বাঁকা , শীঘ্রপতনের চিকিৎসা , শিব ঠাকুরের দেওয়া অর্শের মাদুলি , জাপানি ( জাপানিরা আগে বোম ফেলত , এখন ঘুমন্ত সাপের উপর তেল ফেলে ) লিঙ্গবর্ধক যন্ত্র এসবের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে । এই অবধি তাও ঠিক ছিল । কিন্তু ,স্টেশনে , বড় রাস্তায় , দৈত্যাকার সব বিজ্ঞাপন –  ‘সাত হাজার টাকায় নতুন অণ্ডকোষ , ডাক্তার সেন বসছেন মঙ্গলবার’ , ‘৯৯,৯৯৯ টাকায় বাইপাস’ , ‘তাস খেলতে খেলতে কিডনি স্টোন অপারেশন’ , ‘ভেলোর যাবেন কেন , এখানেই মরুন’ । ডাক্তারদের দেখতে ভালো হয় জানি , লন্ডন ফেরত বলে কথা । কিন্তু, বিজ্ঞাপনে রোগীকেও এতো সুন্দর লাগছে ! ফ্যাবইনডিয়ার হসপিটাল গাউন পরে রোগী যেন এখুনি আইটেম সঙ-এ নাচবেন ! আসলে কি রোগীদের এরকম দেখতে লাগে ! চলুন না , একটু কলেজ স্ট্রিটে মেডিকেল কলেজে যাই । দেখবেন , অপেক্ষমান তেল চটচটে , মুখে দুর্গন্ধ , বাসি ঘুগনির টক ঢেঁকুর তোলা , শূন্য দৃষ্টির রোগীর আত্মীয়দের ? ওদের একটা ছবি দিন না বিজ্ঞাপনে ! রোগীর ছবিটা তো আর দিতে পারবেন না । সারা শহর জুড়ে ভেসে উঠছে – ‘তোমার হল ছুটি , আমার ক্লিয়ার পটি ।’ মানেটা জানেন ? মানেটা হল , রোগীর হল ছুটি , নাহ , নার্সিং হোম থেকে নয় , দুনিয়া থেকে । সবসময় রোগীরই পেছন মারা যাবে ।

আরও পড়ুন:  মিউজিক্যাল চেয়ার

মানছি বেঁচে থাকাটা কষ্টকর , তবু রাস্তার ধারে একটা সবুজ গাছ দেখলে , গাছে ছোট্ট একটা পাখি দেখলে মনটা ভাল হয়ে যায় । দৃশ্যপটে যদি বারবার ভেসে ওঠে ‘অত্যাধুনিক লেসার সার্জারি মাত্র ১০০০০ টাকায়’ , ‘ডাক্তার মুত্তুস্বামী চেন্নাই থেকে প্রতি মাসে আসছেন’ , ‘ডাক্তার পোদ্দার একমাত্র বসছেন প্রিয়া পাইলস ক্লিনিকে , রক্তজবা পোঁ… নিয়ে এখুনি আসুন’ , বাঁচতে একটু কষ্ট হয় । চোখের ভেতর বারবার ধুলোর জায়গায় শরীরে নানান রোগ আর ডাক্তারের বিজ্ঞাপন এসে পড়লে চোখ জ্বালা করে , মনটায় বিষণ্ণতার ঘুণপোকা বাসা বাঁধে । এরকম গরীব দেশে রোগী হওয়া যন্ত্রণার , সেই যন্ত্রণাকে বাংলা সিরিয়ালের মডেলদের দিয়ে ঝাঁ চকচকে বিজ্ঞাপন করার খুব দরকার বোধহয় নেই ।  বিজ্ঞাপন কখনো সত্যি বলে না । তাই, চিকিৎসার আসল সত্যিটা সে কখনোই দেখাবে না । এখানে রোগীর চিকিৎসা হয় , রোগের নয় । তাই বলতে হয়, রোগীর ছুটি , রোগের নয় ।                

7 COMMENTS

  1. অসাধারণ! অপূর্ব! আছোলা বাঁশ!!!

  2. অনেক অনেক ভালবাসা নেবেন। লিখে যান।

  3. দারুন লিখেছেন। আপনার ইয়েতি রিভিউ টাও পড়েছি। পেটে খিল ধরে গেছে।😂😂

  4. Jani na , Ettyo bhalo lekha y ki mantyabya kortey hoi, sab shobddo gulo khub choto lagche…… tomar kolomer mukhe phul chandan

এমন আরো নিবন্ধ