বাংলালাইভ রেটিং -

চার সপ্তাহ টপকে গিয়েও ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ যখন হৈ-হৈ করে হাউস ফুল হচ্ছে, তখন মোটে দু’হপ্তার মাথায় ছুটির দিন সন্ধেবেলা ‘প্রজাপতি বিস্কুট’ দেখতে গিয়ে তো আমি এক্কেবারে হাঁ! হল-এ তখন লোক ছিল ক’টা, জানেন?

Banglalive

পরে বলছি দাঁড়ান। তার আগে একটু ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাই চলুন।

ছবি রিলিজ হল যেদিন, ঠিক তার পরদিন খবরের কাগজে ইন্টারভিউ বেরিয়েছে ছবির ডিরেক্টর অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের। দেখলাম, রিপোর্টার সেখানে জানতে চাইছেন, ‘আপনি গায়ক – এই ছবিতেও শান্তনু মৈত্রের সুরে গান গেয়েছেন। পাশাপাশি লেখালেখি বা পত্রিকা সম্পাদকের কাজ করছেন। আবার সিনেমাও পরিচালনা করছেন। কোন পরিচয়টা আপনার প্রিয়? গায়ক অনিন্দ্য, সম্পাদক অনিন্দ্য না পরিচালক অনিন্দ্য?’ এর উত্তর এলো এরকম ভাবে যে, ‘…এই সবকটা পরিচয়েই পরিচিত হতে ভাল লাগে। এগুলো তো জীবনেরই নানা খণ্ড খণ্ড অংশ। দিনে লেখালেখি, দুপুরে সিনেমা আর সন্ধ্যায় গান – এইভাবেই বেঁধে নিয়েছি জীবনটাকে।’ [‘বিনোদন’ ক্রোড়পত্র, আজকাল, ২৩ সেপ্টেম্বর]।

তখনও ‘প্রজাপতি বিস্কুট’ দ্যাখার সুযোগ হয় নি, কিন্তু বিশ্বাস করুন ইন্টারভিউয়ের এই অংশটা পড়ে মাথা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো আমার। একটা লোক একই দিনে লেখালেখি আর পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করছে, তার কিছুক্ষণ পর আবার ঢুকে পড়ছে সিনেমা তৈরির কাজে? আর দিন শেষ হলে সন্ধেবেলা আবার সিনেমার কাজ শেষ করে ফেলে মেতে উঠছে গান-বাজনায় সব্বাইকে জমিয়ে দেবে বলে?

যতদূর মনে পড়ছে, সকালবেলায় ফেলুদা লিখে, তারপর দুপুরবেলা ফিল্ম বানাবেন আর দুপুরে ফিল্ম বানিয়ে তারপর সাঁঝের বেলা গীতবাদ্য নিয়ে বসবেন, এতটা ট্যালেন্ট আদিযুগের সেই মানিক রায়েরও তো ছিল না!

ছবির প্রথম টিজার ছিল কার্তিক ঠাকুরের ছবি দিয়ে। চমক হিসেবে দারুণ, কিন্তু শুধু চমক দিয়ে কি সিনেমা হিট হয়!

ওঁর লেখা চিঠিপত্র কিংবা স্মৃতিকথায় যেটুকু পড়েছি, ভদ্রলোক যখন সিনেমা বানাতেন, তখন ওটা ছাড়া আর কিছুতে দেওয়ার মতো সময় হতো না তাঁর। সিনেমার প্রি-প্রোডাকশন, শুটিং আর পোস্ট-প্রোডাকশন শুষে নিত দিনের পঁচিশ ঘণ্টার পুরো সময়টাই যেন। লেখালেখি, সম্পাদনা, ইলাসট্রেশন বা সুরসৃষ্টির কাজ যেগুলো থাকতো, সেগুলো করতেন অন্য সময়ে, দুটো ছবি তৈরির ফাঁকে।

অনিন্দ্য’র ইন্টারভিউ পড়তে গিয়ে ব্যোমকে গেছি কি সাধে? ইন্টারভিউয়ের টোনটা তো একদম ইয়ার্কির নয়, কিন্তু ওই কথাগুলো কি আসলে ইয়ার্কি করে বলা? নাকি একই দিনে সত্যি সত্যি উনি এর সবকটা কাজ করেন?

ধন্য প্রতিভা আপনার ভাই। মনে মনে সেদিন বলেছি লেখাটা পড়ার পর। আর বললাম এদিন, ছবিটা দ্যাখার পর।

একটা কথা বলুন তো আমায় অনিন্দ্য, তৈরির পর এখন নিজে দেখে কী মনে হচ্ছে, এটা কি আদৌ সিনেমা হয়েছে বলে? আমার তো মনে হচ্ছে, আপনার বানানো আর পাঁচটা বিজ্ঞাপনের ছবির মতোই এটাও নিছক একটা বিজ্ঞাপনের ছবি! বাস্তবের দুনিয়া থেকে যেটা প্রায় হাজার মাইল দূরে। সবকটা ফ্রেম এমন নিখুঁতভাবে সাজানো-গুছানো যে, একঝলক দ্যাখার পর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে, বাঃ। ক্রাইসিসের সিনগুলোতেও এমনভাবে সুগার কোটিং চড়ানো যে মনে হচ্ছে, উঃ কী মিষ্টি ব্যাপার, মাইরি!

কিন্তু, এই ‘উঃ কী মিষ্টি’ আর ‘দেখতে ভাল’ সিকোয়েন্সগুলো একটানা কতক্ষণ অবধি হজম করা যায়, সেটা আপনি বলুন নিজে? দু’মিনিটের অ্যাড হলে ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে দু’ঘণ্টার ছবি?

তাও এমন একটা ‘ছবি’, যেখানে গল্প বলতে আদৌ কিছু নেই!

ছবির সেকেন্ড হাফে বারবার তো ঘড়ি দেখছিলাম আমি। মনে হচ্ছিল, এই অত্যাচার আর কতক্ষণ চলতে থাকবে প্রভু? তারপর টের পেলাম, হল-এর এসি বন্ধ করে দেওয়া হল হঠাৎ। যেটা জেনারেলি ওরা সিনেমা শেষ হওয়ার একটু আগেই করে। বিশ্বাস করুন, ছবি শেষ হতে চলার সংকেত পেয়ে আনন্দে তখন যেন লাফিয়ে উঠলো মন!

বুঝুন, ছবি দ্যাখাতে বসিয়ে আসলে আমায় কী যন্ত্রণাই দিলেন!

অবশ্য সেদিক থেকে ভাবতে গেলে আপনারই বা এতে আর দোষটা কোথায় বলুন? ফস করে ছবির ফ্রেমে একটানা দুটো ঘণ্টার জমাট গল্প বলতে বসা কি চাট্টিখানি নাকি?

একটা কথা বলুন আমায়। নিজের ছবির গল্প-স্ক্রিপ্ট যে নিজের হাতেই লিখতে হবে, মাথার দিব্যি কে দিয়েছিল সেটা? বাংলায় তো অগুন্তি ভাল গল্প আছে? সে সব নিয়ে কি যেত না কাজ করা? 

সিনের পরে সিন সাজিয়ে গল্প বলার বেসিকটাতেই তো হোঁচটের পর হোঁচট খাওয়ার ধুম! আর সেই হোঁচট খাওয়ার ব্যথা লুকোতে অমনি চাট্টি গ্যাগ সিন ঠুসে দিচ্ছেন স্ক্রিনে!

আরও পড়ুন:  সোনার পাহাড় : এ কেমন ভয়ংকর ছবি আপনি বানালেন পরমব্রত!?

আরে ভাই, এটা তো উইকলি ম্যাগাজিনের কুইকলি লেখা সম্পাদকীয় নয়! যে ওয়ার্ড কাউন্ট মাথায় রেখে চালাক-চালাক বাক্যি লিখে তারপর একটা চুটকি শোনালেই ডিস্টিংশনে পাশ। এখানে যে পুরো অন্য হিসেব গুরু!

পাড়ার বন্ধুরা বাড়ির সামনে কার্তিক রেখে যাওয়ার পর তার পুজো হয় সেনবাটিতে। তবে বাড়ির মালকিনের আপত্তি সত্ত্বেও তা কী ভাবে হল সেটা কাহিনীর কোথাও স্পষ্ট নয়

বলতে বসেছেন অন্তর (অভিনয়ে আদিত্য সেনগুপ্ত) আর শাওন (অভিনয়ে ঈশা সাহা) নামে দুটো ছেলে-মেয়ের গল্প। ওরা জয়েন্ট ফ্যামিলিতে থাকে, বিয়ের আড়াই বছর পরেও কোন বাচ্চা-কাচ্চা না হওয়াতে এদিক ওদিক ওদের নিয়ে গুজগুজানির চরম। বেশ তো, এমন গোছের একটি নারী, একটি পুরুষ নিয়েও তো জমাট স্টোরি হয়। প্লাস ওরা ছাড়াও গপ্পো জমাতে আপনার হাতে ওদের বাড়ির বাকি লোকগুলোও ছিল!

কিন্তু আপনার কাণ্ড দেখুন, সব্বাইকে ছেড়ে ওদের প্রাইভেট এই ম্যাটারটাতে আপনি কিনা নিয়ে এলেন অন্তর-এর অফিসের বস নিয়োগীদা’কে (রজতাভ দত্ত) টেনে!

নিয়োগীদা’কে নিয়ে যে কটা সিকোয়েন্স লিখেছেন, তার সবকটাকেই মনে হচ্ছিল জোর করে জাস্ট কমিক রিলিফ দেওয়ার জন্যে লেখা। মানে, কী লিখবেন, কূল খুঁজে না পেয়ে অগত্যা ফ্যানা কাটার জন্য যেন ভদ্রলোককে আনা!

সত্যি করে বলবেন প্লিজ, এসব লিখতে গিয়ে একবারও কি মনে হয় নি যে, যা লিখছি, সত্যি সেটা শেষ অবধি মজার হবে তো আদৌ?

এই ‘নিয়োগী’ নামে ভদ্রলোকের কাজ তো দেখছি দুটো! এক, তাঁর আন্ডারে থাকা বছর পঁয়তাল্লিশের এক ভদ্রলোকের সেক্স লাইফের ডিটেল নেওয়ার ডিউটি। আর দুই, অন্তর-এর সঙ্গে বসে (সম্ভবত ওর পয়সাতেই) গাণ্ডেপিণ্ডে খেতে খেতে ওর এখনও বাচ্চা হচ্ছে না কেন, সেটা নিয়ে জোর গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকা।

কি জানেন, একটা পয়েন্টে এসে কিন্তু বিরক্ত লাগছিল খুব। নিয়োগী নামের ওই বস-স্থানীয় ভদ্রলোকের মুখে ‘আপনি করবেন লটর পটর, আর বৌ কী খাবে, হরি মটর?’ গোছের খাস্তা লেভেলের ডায়ালগ দিয়ে আপনার কত পুলক হয়েছে জানি না, কিন্তু এগুলো শুনে মুখে কিছুতে হাসি আসছিল না যে? আর এরপর তো ডায়ালগে আপনার ট্রাম্প কার্ডটা ছেড়েই দিলেন আপনি, দেখলাম নিয়োগীদা বলছেন, ‘যত দোষ, অণ্ড কোষ’। আর এটা শুনে আমার তখন কী বলতে ইচ্ছে করছিল, জানেন? সাবাশ অনিন্দ্য সাবাশ। ডায়ালগের নামে এগুলো লিখে কী এক্সপেক্ট করছেন এবার, হাউসফুল হওয়া ‘হল’ জুড়ে হাততালিতে পায়রা উড়বে, নাকি?

হায় আপনার আশা!

আর নিয়োগীদার খাবার টেবিলে অনুগত ভৃত্য হয়ে সবসময় অন্তরকেই বা হাজির থাকতে হয় কেন, সেটা বলবেন প্লিজ? শুধু তো খাবার টেবিলেই নয়, মদের টেবিলেও বটে! অন্তর-এর মতো নিরীহ টাইপ ভাল ছেলে, খামোখা বসের মালের টেবিলে থাকতে যাবেটা কেন? গল্পে তো এর উত্তর কোন জায়গায় নেই, স্ক্রিপ্ট লেখার সময় এর ব্যাখ্যাগুলো কি আপনার নিজের মাথাতেও ছিল?

‘নিয়োগীদা’ ক্যারেক্টারটা যেমন সিনের ফাঁকে ফাঁকে জাস্ট চুটকি স্টাইলে গোঁজা, সে রকম স্যাম্পেল সিনেমায় আরও গণ্ডা গণ্ডা আছে। ক’টা বলবো, বলুন?

বেশ কয়েকটা সিকোয়েন্স তো আবার শুরু হচ্ছে ভালই, কিন্তু একটু পরেই দেখছি ধেড়িয়ে গিয়ে ধরণীতলে ধ্যাড়াস!

যেমন ধরুন ওই সিকোয়েন্সটা, যেখানে বুক স্টল থেকে ‘কামসূত্র’ কিনে অন্তর বাড়ি ফিরেছে সবে, আর নিজের ঘরে ঢোকার আগেই তাকে খপ করে চেপে ধরছে মা আর বৌদি এই দু’জন মহিলা মিলে। অন্তর-এর হাতের প্যাকেটে কী আছে, ওটা শাওনের জন্যে গোপন কোন গিফট নাকি অন্য কিছু লুকনো, সেটা জানতে দু’জনের কি ছুঁকছুঁকুনি, বাপ্‌স! মানছি, ওকে নিয়ে রগড়াতে শুরু করার এই মোমেন্টটা বেশ ভাল। কেস তো জমে ক্ষীর হয়ে যায়, যখন অন্তর এটা বলে বসে যে, ওই প্যাকেটটা আর কিছু না, সদ্য কেনা বইয়ের প্যাকেট মোটে। ব্যাস! মা-বৌদি দুজনেই তো সেই বই দ্যাখার জন্যে তখন একটি পায়ে খাড়া! আর আমি তো ভাবছি, ছেলেটার ব্যাগে ‘কামসূত্র’ দ্যাখার পর এই সাধ্বীকুলের রিয়্যাকশনটা হবে কী।

সেই মজা দেখবো বলে বসে আছি, ওমা, কাণ্ড দেখুন, সিনটা ওই অবধি টেনে নিয়ে যাওয়ার দেখি ধক-ই আপনার নেই! ফট করে সিন কেটে চলে গেলেন নেক্সট সিনে সোজা। বেড রুমে বৌয়ের কাছে ‘কামসূত্র’ হাতে পৌঁছে গেছে ও। মানে? যেখানে আগের সিনে দ্যাখাচ্ছেন, মা-বৌদির সামনে বইয়ের প্যাকেট থেকে বই বের করতে বাধ্য হচ্ছে অন্তর, সেখানে সত্যি আদৌ ‘কামসূত্র’টা বের করে দ্যাখাতে ও বাধ্য হল কিনা, এরকম ভাইটাল একটা মোমেন্ট না দেখিয়ে এভাবে কিনা পালিয়ে যাবেন আপনি?

আরও পড়ুন:  চোখ রাখুন সলমনের পানভেলের বিলাসবহুল ফার্মহাউজের অন্দরে

এরকম আধা-খ্যাঁচড়া সিন এ ছবিতে একটা নয়, আরও অনেক আছে। শাওনের বাচ্চা হয় না কেন, সেটার চিকিৎসা করাতে গিয়ে ও শুনল ওর নাকি ‘পলিসিস্টিক ওভারি’। বেশ কথা, ভাবছিলাম এরপর কী হবে, এই ইনফরমেশন নিয়ে কোন লাটক হবে নাকি? নাহ, তার কিস্যু হল না। উলটে আপনি এর কয়েকটা সিন পরে একটা সিনে দেখিয়ে দিলেন, স্ট্রেচারে শুইয়ে শাওনকে ঢোকান হচ্ছে অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে! আর পাশে পাশে ওর বর যাচ্ছে, ‘কিচ্ছু হবে না, তুমি ঠিক ভাল হয়ে যাবে’ মার্কা কথা বলতে বলতে।

গানগুলো আলাদা করে শুনতে মন্দ না। কিন্তু ছবির মধ্যে গানের প্রয়োগ একেকসময় ক্লান্তিজনক লাগে!

এবং এমন একটা সিনেরও এখানে ফলো-আপ নেই কোন! অপারেশনটা কেন হচ্ছে, কীসের জন্য, এক ভগবানই শুধু জানে! পলিসিস্টিক ওভারিতে কি সব সময় কাটা-ছেঁড়া লাগে নাকি? ইন্টারনেটে সার্চ মেরে দেখি, উত্তর হল – না। তাহলে এটা কীসের অপারেশন, কেন হল? সবচেয়ে বড় কথা, অপারেশনের পর কেমন থাকলো শাওন? গোটা ছবিতে এসব নিয়ে কোথাও একটা শব্দ অবধি নেই!

বাচ্চা হতে অসুবিধে কেন, সেটা জানতে সিমেন টেস্ট করতে যাচ্ছে শাওনের বর অন্তর, এমন একটা সিনও রয়েছে ছবিতে। কিন্তু এই সিকোয়েন্স দ্যাখালে পরে পাবলিকের যে সেই টেস্টের রেজাল্টখানাও জানার ইচ্ছে হয়, আপনার বোধহয় সেটা নিয়ে আইডিয়া নেই কোন! ফলে আপনি শুধু ল্যাবের একটা স্টাফকে দিয়ে শব্দ-মজায় ঠাসা চাট্টি ডায়ালগ শোনাতে পেরেই হ্যাপি! লোকে সিনেমা দেখতে এসেছে কেন? আপনার লেখা ডায়ালগ শুনবে বলে? নাকি স্ক্রিনে একটা নিটোল টাইপ গল্প দেখবে বলে? এই রিসার্চটা আগে একটু করে নিলেন না ভাই?

আরেকটা সিন বলছি এখানে শুনুন। সেই সাইকিয়াট্রিস্ট পাকড়াশি’র (অভিনয়ে শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়) কাছে শাওনের প্রথমবার সিটিং নেওয়ার সিন। নামী সাইকিয়াট্রিস্টকে দিয়ে আপনি তখন ওটা কী করালেন স্যর?  নায়িকার হাতের চেটোয় সুড়সুড়ি দিইয়ে গেলেন শুধু? কারণ ওটাই নাকি ভদ্রলোকের সেক্সুয়াল প্লেজার পাওয়ার স্টাইল! আর শাওনের হালকা একটা ধমক খেয়েই অমনি বয়স্ক সেই সাইকিয়াট্রিস্ট ঠাণ্ডা? রোগীর কাছেই সারেন্ডার করে সাইকিয়াট্রিস্ট বলছে তখন যে, এমন করছি, কারণ আমি নিজেই সকাল থেকে স্ট্রেসড, এটা ‘কী যে স্ট্রেসফুল প্রফেশন’! মনে হচ্ছিল, তখন ডেকে বলি আপনাকে যে, এটা স্ক্রিপ্ট হয়েছে, নাকি বোধহীন সব খিল্লি?

শুধু গল্প দাঁড় করাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া নয়। এখান ওখান থেকে এলিমেন্টস ঝেড়ে চুপচাপ নিজের ছবিতে ফিটিং করে দেওয়া! কেমন সেটা, বলি?

মোল্লা নাসিরুদ্দিনের সেই আদ্দিকালের চুটকি অবধি হাতিয়ে নিয়েছেন নির্লজ্জের মতো! মিষ্টির দোকানে গিয়ে মোল্লা একের পর এক মিষ্টি খাচ্ছে, আর দোকানিকে বলছে, এখানে বড় একটা গণ্ডগোল লাগবে এক্ষুনি, তার আগে খাওয়া সেরে নিই – আরও মিষ্টি দাও। মোল্লার বলা ওই ‘গণ্ডগোল’টা আসলে যে ঠিক কী, সেটাই ছিল সেই নকশা-র ক্লাইম্যাক্স। ভেবে দেখুন, ওই চুটকিটা কিনা এই ছবিতে প্রায় কাট-পেস্ট করে সাঁটা! আপনার ভাবনাচিন্তার ভাঁড়ারের কি সত্যি এখন এমন হাঁড়ির হাল?

‘প্রাক্তন’ ছবিতে অপরাজিতা অসাধারণ হিট – সেই ফর্মুলা কপি-পেস্ট করতে গিয়েই বোধহয় এই ছবিতেও আটপৌরে বাঙালি বৌয়ের ভূমিকাতে তিনি!

মোল্লা নাসিরুদ্দিনের থেকে যেমন চুটকি হাতিয়েছেন, সেরকম দেখলাম হাতিয়ে নিয়েছেন ‘গানের ওপারে’ সিরিয়াল থেকে রবি ঠাকুরের প্রেমে অবশেস্‌ড থাকা আস্ত একটা বাঙালি ফ্যামিলি পুরো! তাঁদের নিয়ে খিল্লি করাই তো আপনার এই সিনেমার বিষয়? আর বুঝুন কাণ্ড, আপনার সেই ফ্যামিলি মানে ‘সেনবাটি’তে ইউজ করা রবি ঠাকুরের ছবিটা অবধি সেই ‘গানের ওপারে’ স্টাইলে রয়েছে ঝোলান! মাথা খাটিয়ে এই স্টাইলটুকু পালটে দেওয়া যেত না আদৌ, দাদা?

সন্ধেবেলার আকাশ জুড়ে একের পর এক ফানুশ উড়তে দ্যাখানোটা কি ‘রাজকাহিনী’ (২০১৫) থেকে ঝাঁপা? আর বকবক করতে থাকা মায়ের ভূমিকায় অপরাজিতা আড্ডিকে কাস্ট করার প্ল্যানটা বোধহয় ‘প্রাক্তন’ (২০১৬) হিট হয়ে যাওয়ার এফেক্ট?

দুটো প্রেমিক-প্রেমিকা কিস করতে গেলেই তখন ভূমিকম্পের শুরু, সেটা তো আবার হিন্দি সিনেমা ‘হাম তুম’ (২০০৪) থেকে তোলা? আর শাওনের পায়ের তলায় রক্ত দেখিয়ে ঋতুস্রাব বুঝিয়ে দেওয়ার সিনটা কি সেই ‘চোখের বালি’র (২০০৩) থেকে?

সত্যি, বাকি পরিচালকদের সিনেমা আপনি দ্যাখেন বটে, ভাই! শুধু দ্যাখেন না, সিনের পরে সিন মিলিয়ে কেমন মনেও রাখেন দিব্যি! না হলে একই গেলাসে ঋতুপর্ণ, মোল্লা নাসিরুদ্দিন, সৃজিত মুখুজ্জে আর বলিউড মিশিয়ে এরকম এক্সট্রা মালাই লস্যি বানানো কি মুখের কথা নাকি!

আরও পড়ুন:  কার সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়ালেন নার্গিস ফকরি!?

তবে একটা কথা না বলে পারছি না আমি স্যর। ‘হাম তুম’ নামে সিনেমাটাতে হিরো-হিরোইনের প্রথম দ্যাখা প্লেনের মধ্যে হয়। আর দু’জনে দু’জনকে টাচ করতেই থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে সেই প্লেন। সেখান থেকে চোখ বুঁজে সেই সিন টুকে নিচ্ছেন, বেশ করেছেন, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে মিনিমাম বুদ্ধি খাটানো বারণ ছিল নাকি? আপনি দেখছি, হুবহু প্লেনের সেই কেঁপে ওঠার প্যাটার্নটাকেই নিজের ছবিতে কাট-পেস্ট করে ‘ভূমিকম্প’ বলে চালিয়ে দিলেন বেশ!

আমার তখন মনে হচ্ছিল, এটা ভূমিকম্প হচ্ছে, নাকি তৃতীয় গ্রেডের রগড় হচ্ছে কোন! আপনার ক্যামেরাম্যান তো ওই সিনগুলোয় ক্যামেরাটা ধরে থরথরিয়ে জাস্ট কাঁপিয়ে দিলেন, না?

হাতসাফাই করতে গেলেও যে চালাকিটুকু লাগে, সেটারও কি এই সিনটায় অভাব পড়ে গেল?

‘আহারে মন’ বলে যে গানটা রয়েছে, সেটার লাস্ট সিনে দেখলাম একটা রেল লাইনের দু’পারে মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছেন আপনার লায়ক-লায়িকাকে। ঠিক যেন মনে হচ্ছিল, ওরা ওয়েট করছে কোন রেফারি এসে বাঁশি বাজাবে বলে, তারপর বোধহয় ফুটবল শুরু হবে। আর হ্যাঁ, এই গানটার মধ্যেই দেখলাম, ‘স্বাধীন’ ভাবে বাঁচবে বলে লম্বা চুল কেটে ছোট করে ফেললো শাওন। তারপরে ঠিক যা ভেবেছি, তাই। আপনি ওকে দেখিয়ে দিলেন সিগারেট আর মদের গেলাস হাতে। সত্যি, হিসেব-নিকেশ পুরোটা এখন কী মিষ্টি ছকের মতো! নারী প্রগতি মানেই তো হল ছোট চুল, মদের গেলাস, সিগারেট, আর জিন্‌স পরে মধ্যরাতে ফেরা।

ও হ্যাঁ, এই প্রগতিশীল নারীই আবার শ্বশুরবাড়িতে সবার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে টিভি সিরিয়াল লেখে! আর ভাগ্যে এরপরে কী আছে জানতে জ্যোতিষীর কাছে যায়! জীবনে জলজ্যান্ত এমন কাউকে দেখে তাঁকে মডেল করে তবে এই শাওন ক্যারেক্টারটা ফেঁদেছেন কিনা জানি না। শুধু এটুকু বলি, হিট টিভি সিরিয়ালের প্লট কিংবা স্ক্রিপ্ট কিন্তু ফোনে ফোনে অমন দায়সারাভাবে আদৌ ফাঁদা যায় না কো ভাই!

বন্ধু পারিজাতের সূত্রে টিভি সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লিখত শাওন। পারিজাত বিদেশে যাওয়া মাত্র লেখা পুরো বন্ধ হয়ে গেল নাকি বাকিটা দ্যাখানোর কথা ভুলেই গেলেন পরিচালক!

আর আপনার নায়িকা এই শাওনকে যে সিরিয়াল লিখতে দেখিয়েছিলেন, তা সেই মেয়ের লেখালেখির শেষটা কী হল, সেটা দ্যাখানোর কথাও আপনার আর খেয়ালে থাকলো না, না? সিরিয়ালের টিম থেকে ওর সঙ্গে কনট্যাক্ট করতো যে মেয়েটি, পারিজাত (অভিনয়ে খেয়া চট্টোপাধ্যায়) নামে সেই মেয়েটি বরের সঙ্গে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি আপনার ওই শাওন সেনের সিরিয়াল লেখা শেষ?   

টিভি সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লেখাকে ঠুকতে গেছেন, ভাল। কিন্তু আপনার নিজের লেখা এই স্ক্রিপ্টের ছিরিটা দেখেছেন, ভাই?

শুধু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না কিছুতে। যে, এমন একটা ছবি শিবপ্রসাদ আর নন্দিতা রায় প্রোডিউস করতে রাজি হলেন কী করে আদৌ? স্ক্রিপ্ট পড়েই তো ওঁদের বোঝার কথা, ছবি সুপার ফ্লপ! তারপর ফের সেটা বানিয়ে তাহলে এরকম করে মুখ পুড়নো কেন!

নাকি ছবিটা ফ্লপ করবে ভেবে নিয়ে আগের থেকে স্কিম করেই ফিল্ম মেকিংটা হল?

হিসেব কষেই ছবির বাজেট রাখা হল অবিশ্বাস্য কম। যাতে পুজোর মধ্যে প্রথম চোটেই সেই বাজেটের ম্যাক্সিমামটা ফেরত আসে ঘরে?

লিড রোলে নতুন মুখের আমদানিও কি সেই কারণেই নাকি? যাতে ছবির কাস্টিংয়ে পেমেন্ট হয় নামমাত্র মোটে! আচ্ছা, এটাই কি তবে এক ঢিলে সেই দুটো পাখি বধ করবার কেস? নতুন প্রতিভাকে সুযোগ দেওয়ার মহান কাজ তো হলোই, আর তার সঙ্গে খরচ বাঁচিয়ে অল্প টাকায় ছবিও হল রেডি!

রিলিজের ঠিক দু’হপ্তার মাথায় কলকাতার ‘হল’টা কিন্তু সেদিন ছিল এক্কেবারে খালি! ছবি দেখে আমার তখন নাজেহাল দশা প্রায়, কটা লোক এসেছে, সেটা গোনার কথা তাই আর মাথায় আসে নি মোটে। তা’ পেছন থেকে এক মহিলা দেখলাম গুনে-গেঁথে সেই অঙ্কটা শুনিয়ে দিলেন জোরগলাতেই বেশ। ‘মোটে এগারজন লোক – এরকম বই এলে এই বাজারে সিনেমা হলগুলো টিঁকবে কী করে বলুন?’

বোধহয় ওটা ওঁর নিজের মনে বলা কথা। কারণ সেদিন শোয়ে হাজির আর কেউ তো এর জবাব দিল না কোন!

আপনার কাছে যদি এর উত্তরটা থাকে, জানিয়ে দেবেন অনিন্দ্য আমায় প্লিজ।

NO COMMENTS