১৯১৫ সালের মে মাস। রবীন্দ্রনাথ সদলবলে শান্তি-নিকেতনের চরম দহন থেকে রেহাই পেতে চলে গিয়েছেন কুমায়ুন পাহাড়ের রামগড়ে। ‘হৈমন্তী বাড়িতে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। আগের বছর কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে বিরাট এই বাগানবাড়ি কিনেছেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ। তিনশো বিঘার বিশাল বাড়ি জুড়ে পিচ, আখরোট, স্ট্রবেরির বাগান। পাকদণ্ডী পথের শেষে ধনু বাঁকের সেই বাড়ি থেকে দেখা যায় পাহাড়ের আশ্চর্য ছবি, মেঘেদের আজব রাজ্যপাট।

রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে গেছেন শিল্পী মুকুল দে আর অতুলপ্রসাদ সেন। বাগানের এক কোণে একটা পাহাড়ি গুহা। পিছনে বনে ঢাকা খাড়া পাহাড়। ওক গাছে বাহারি অর্কিডের ফুল। এখানেই রোজ সকালে গান-কবিতার আড্ডা বসান রবীন্দ্রনাথ।

তখন সবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ‘ডক্টরেট’ দিয়েছে কবিকে। রামগড়ের ঠিকানায় যাওয়া সব চিঠিতে লেখা থাকে, ‘ডক্টর রবীন্দ্রনাথ টেগোর’। দেখেশুনে রামগড়ের পোস্টমাস্টার রাষ্ট্র করে দিলেন, কলকাতা থেকে ‘বিখ্যাত ডাক্তার’ এসেছেন রামগড় পাহাড়ে। পাহাড়িয়াদের মধ্যে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত।

ক’দিন আগেই ‘হৈমন্তী’তে ঘটেছে এক আশ্চর্য ঘটনা। বাড়ির কাঠের ছাত মেরামত করছিল এক পাহাড়ি ছুতোর। কাজ করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত এক কাঁপুনি দেখা দেয় মিস্ত্রি ছেলেটার। দেখে রথীন্দ্রনাথ একদিন কবিকে দেখান সেই কম্পন– নৃত্য। মেটেরিয়া মেডিকা গুলে খাওয়া ‘চিকিৎসাবায়ুগ্রস্থ’ রবীন্দ্রনাথ দেখেই বললেন, ‘এ এক জটিল স্নায়বিক রোগ। Saint Vitus Dance বলে একে।

রথীন্দ্রনাথকে শখের হোমিওপ্যাথ রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘এক ব্যামোর ভালো ওষুধ আছে হোমিওপ্যাথিতে’। কবি ওষুধ দিলেন ছুতোর মিস্ত্রিকে। ‘দিন কয়েক বাদে মিস্ত্রি যখন কাজ করতে এল, তার ওই ব্যামো সম্পূর্ণ সেরে গেছে’।

এই খবর ছড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের এপার থেকে ওপারে। এর পাশাপাশি পোস্টমাস্টারের সেই ‘ব্রেকিং নিউজ’। আর যায় কোথায়! দলে দলে পাহাড়ি মানুষ তাদের রোগ সারাতে আসতে শুরু করেছে রবি ঠাকুরের কাছে। রোগীর ভিড় সামলাতে রীতিমত ডিসপেনসারি খুলে বসতে হচ্ছে কবিকে। রোজ সকালে বেশ কয়েক ঘন্টা রোগী দেখে কাঠের হোমিওপ্যাথির বাক্স খুলে ওষুধ দিচ্ছেন ‘ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ’। ‘বাবা হোমিওপ্যাথি করতে ভালবাসতেন। রামগড়ে এসে তাঁর সেই শখ চূড়ান্তভাবে মিটেছিল’, স্মৃতিকথায় লিখেছেন কবি-পুত্র রথীন্দ্রনাথ।

বাগবাজারের তরুন ডাক্তার পশুপতি ভট্টাচার্যকে কবির সঙ্গে প্রথম আলাপ করিয়ে দেন ‘সবুজপত্র’-র সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী। ‘বীরবল’ প্রমথ কবির আদরের ভাইঝি ইন্দিরা দেবীর স্বামী। প্রথম দর্শনেই পশুপতিকে পছন্দ হয়ে গেল কবির। তাঁর গলায় নিজের লেখা গান শুনে আনন্দ পেলেন রবীন্দ্রনাথ।

ডাক্তারদের প্রতি অদ্ভুত দুর্বলতা ‘ডাক্তারি প্রবণতা’ থাকা কবির। নিজেই লিখেছেন, ‘আমি চেষ্টা করলে খুব ভালো ডাক্তার হতে পারতুম’। শুধু হোমিওপ্যাথি নয়, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও গভীর পড়াশোনা কবির। গভীরভাবে জানতেন বায়োকেমিক শাস্ত্রও।

সে বছর গ্রীষ্মে পশুপতি ডাক্তার গিয়েছেন বোলপুরে। স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আশ্রমের বাসিন্দাদের ভিতর থেকে অনেকেই আসতো তাঁর কাছে ওষুধ নিতে … দেখতাম যে তাঁরা খুব বিশ্বাস করে ওষুধ নিয়ে যায় ….’।

পশুপতি ডাক্তারের স্মৃতিকথায় রয়েছে ইরিসিপেলাম বা বিসর্প রোগে আক্রান্ত এক ছাত্রকে কবির ওষুধ দিয়ে ভালো করে তোলার কাহিনি। ‘রবীন্দ্রজীবনী’ রচয়িতা প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের ভাই আক্রান্ত হয়েছে রোগটাতে। রোগটা জীবাণু ঘটিত জটিল এক চর্মব্যাধি। অত্যন্ত ছোঁয়াচে। এই রোগে বেশিরভাগ রোগীই মারা যেত তখন।

আরও পড়ুন:  স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় ! তবু কে দিল 'ল্যাংড়া' নাম ?

‘তার মুখের একপাশ ফুলে উঠেছে, সিঁদুরবর্ণ … সঙ্গে জ্বর। পশুপতি নিজে ডাক্তার। বুঝলেন, শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে বাঁচানো যাবে না ছেলেটিকে। কবিকে বললেন, ‘একে এখনই হাই ডোজের সিরাম ইঞ্জেকশন দেওয়া দরকার। তারই ব্যবস্থা করুন’।

সামান্য হাসলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘এখন তো আমারই ওষুধ চলুক, দু’দিন দেখাই যাক না কী হয়, তারপর না হয় তোমারই ব্যবস্থা করা যাবে’। এমন এক জটিল রোগে ডাক্তার রবীন্দ্রনাথের ওষুধে কাজ হল ম্যাজিকের মত। দু’দিন বাদে দেখা গেল, রোগটা অনেকটাই গেছে কমে। ‘আরও দু-তিনদিনের মধ্যে ছেলেটি একেবারে সুস্থ হয়ে গেল।‘

মুগ্ধ হলেন পশুপতি ডাক্তার। কবিকে বললেনও সেকথা। কবি হাসছেন। মজা করে বলছেন, ‘তবু তোমরা আমাকে ডাক্তার বলে মানবে না! আমি ফি নিই না, তাই ডাক্তার নই। যদি মোটা ফি নিতাম তাহলে সবাই বলত এ একজন মস্ত বড় ডাক্তার’!

‘প্রবাসী’ সম্পাদক রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘প্রবাসী’তে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাবিদ্যা অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করিয়াছিলেন এবং শেষদিকে বায়োকেমিক ঔষধ ব্যবহার করিতেন এ কথা বেশি লোক জানে না। … তাহার স্কুলের এক শিক্ষককে রবীন্দ্রনাথ যে কয়েক খণ্ডে বৃহদাকার সম্পূর্ণ হোমিওপ্যাথি এনসাইক্লোপেডিয়া উপহার দিয়াছিলেন তা আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি।

শুধু তাই নয়, আশ্রম বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ওই বইগুলো দেবার আগে বহু তত্ত্ব আর তথ্য পেন্সিল দিয়ে আন্ডারলাইন করে দেন কবি। শুধু তাই নয়, ওষুধ ব্যবহার সম্পর্কে ‘অসংখ্য পৃষ্ঠার পার্শ্বে স্বহস্তে নোট দিয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথ’।

কিশোরবেলা থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে রবির ছিল গভীর অনুসন্ধিৎসা। যৌবনে তা বদলে যায় গভীর আগ্রহে। শান্তিনিকেতনে আশ্রম তৈরির সময় থেকে কবির চিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞান প্রকাশ পেতে শুরু করে নানাভাবে। ডাক্তারি বইপত্র পড়েন নি শুধু, আত্মস্থ করেছেন গভীর অভিনিবেশে। এর মূলে ছিল ডাক্তারি নিয়ে কবির গভীর আগ্রহ।

শান্তিনিকেতনে স্কুল প্রতিষ্ঠার পর কালীমোহন ঘোষকে আশ্রমে আসার আমন্ত্রণ জানান কবি। চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমার এখানে চিকিৎসক বলিতে আমি ও ক্ষিতিমোহনবাবু’। একান্ত বাধ্য হয়ে বাড়তে থাকা আশ্রমবাসীদের চিকিৎসার ভার নিজের হাতে নেন রবীন্দ্রনাথ। কবিকে একাজে সাহায্য করতেন অমর্ত্য সেনের দাদামশায়, আয়ুর্বেদজ্ঞ ক্ষিতিমোহন সেন। আশ্রম দিনে দিনে বড় হচ্ছে, বাড়ছে আশ্রমিকদের আধিব্যাধি। অগত্যা রোগীদের চিকিৎসার প্রাথমিক দায়িত্ব হাতে তুলে নিতে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে।

ছেলেবেলা থেকে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ দক্ষতা ছিল শিশু রবির। ছিল বিজ্ঞান ও শরীরবিজ্ঞানে প্রবল আগ্রহ। এসবই পরবর্তী জীবনের রবীন্দ্রনাথকে করে তুলেছিল বিজ্ঞান চেতন। ‘বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ভূমিকায় কবি লিখেছেন, ‘প্রাণী-বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্রমাগত পড়তে পড়তে আমার মনের মধ্যে বৈজ্ঞানিক একটা মেজাজ তৈরি হয়ে গিয়েছিল কম বয়সেই। বন্ধু বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্রের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন বিজ্ঞান আর সাহিত্যের সম্পর্ক বিষয়ে।

‘বিজ্ঞান ও রস সাহিত্যের প্রকোষ্ঠ সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন মহলে, কিন্তু তাদের মধ্যে যাওয়া-আসার, দেনা-পাওনার পথ আছে।’ লিখেছেন সাহিত্যের কারবারি রবীন্দ্রনাথ। ‘জগদীশ ছিলেন সেই পথের পথিক। সেই জন্য বিজ্ঞানী ও কবির মিলনের উপকরণ দুই মহল থেকেই জুটত’।

আরও পড়ুন:  শূন্যে ভাসমান বিগ্রহের হীরকখণ্ডে এসে পড়ত প্রথম আলো...রহস্যাবৃত কোণার্কের সূর্যমন্দির

১৯১৮ সাল। ইনফ্লুয়েঞ্জা হানা দিল বোলপুরের আশ্রমে। আশ্রমের অনেক ছাত্রছাত্রী শয্যাশায়ী। রবীন্দ্রনাথ রোজ ঘুরে ঘুরে আক্রান্ত ছাত্রছাত্রীদের দেখতেন। শুধু দেখতেন না, ‘চিকিৎসাও করিতেন’। রামানন্দ-কন্যা শান্তাদেবী লিখেছেন তাঁর সেই সময়কার অভিজ্ঞতা। ‘সাধারণ উদ্ভিদ হইতে কি একটা প্রতিষেধক তৈরি করিলেন, … সেবন করিয়া অনেকেই জ্বরের হাত এড়াইল’।

খুব কড়া ডাক্তার ছিলেন কবি। প্রতিষেধক বলতে ‘পঞ্চতিক্ত পাঁচন’। নিম, গুলঞ্চ, তেউরি, নিসিন্দা আর থানকুনি বেটে তৈরি হত কবির রামতেতো সেই পাঁচন। ইনফ্লুয়েঞ্জা আটকাতে জ্বর হয়নি এমন প্রত্যেক আশ্রমবাসীকে ওই পাঁচন নিয়ম করে খেতে হয়েছে। ফাঁকি দেবার উপায় ছিল না, ছিল না পালানোর পথ।

নিজের ডাক্তারি নিয়ে নিজেই মজা করতেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে প্রশান্ত মহালনবিশের স্ত্রী রানিকে এক চিঠিতে লিখছেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় কোনও ভালো কবিরাজি টনিক ব্যবহার করলে তোমার ঘুসঘুসে জ্বরের ক্ষেত্রে কিরকম হয়। কবিরাজ বলতে আমাকে বুঝে নিও না, তাতে আমাকে খাটো করা হবে … আমি কবি-রাজ নই, কবিসম্রাট’।

ডাক্তার পশুপতি ভট্টাচার্যের ‘ভারতীয় ব্যাধি ও তার প্রতিকার’ বইয়ের ভূমিকা লেখেন রবীন্দ্রনাথ। লিখছেন, ‘আমার মতো সাহিত্য ডাক্তার, যাকে দায়ে পড়ে ভিষক্‌ ডাক্তার হতে হয়’ সাধারন মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে, সাধারন গরীব মানুষ রোগ সারাতে এলে দেখেশুনে দিতে হয় ওষুধ। ‘এদের সম্বন্ধে পণ করে বসতে পারি না যে পুরো চিকিৎসক নই বলে কোনও চেষ্টা করব না। আমাদের হতভাগ্য দেশে আধা-চিকিৎসকদেরও যমের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে হয়।

ডাক্তারিতে কত গভীর জ্ঞান ছিল কবির? জাপান থেকে কবির সঙ্গে আশ্রমে পড়বে বলে চলে এসেছে এক বালিকা। নাম তার হারাসান। কলকাতায় এসে জ্বরে পড়ল হারাসান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে তাকে রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন বন্ধু ধন্বন্তরি নীলরতন সরকারকে দিয়ে। ১৯২৯-এ ৬ নভেম্বর রানি মহালনবিশকে চিঠি লিখছেন রবীন্দ্রনাথ, ‘হারাসানের রোগটা যে কোনস্থানে এবং কী আকারে এখনও তা ধরা পড়েনি। … এটা স্থির যে Enteric (Fever) নয়, typhoid নয়, তার চেয়ে গুরুতর কিছুও নয়’। এই কবি যে ব্যাধিজর্জর মানুষ দেখলেই, ছুটে যাবেন তার কাছে, তাকাবেন বিজ্ঞাননিষ্ঠ চিকিৎসকের মমতায়, এতে বিস্মিত হবার কারণ থাকে না আর।

কেমন ডাক্তার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ? ১৯০০ সালে এক চিঠিতে লিখছেন, ‘আমার ছোট ছেলে (শমীন্দ্রনাথ) কয়েকদিন জ্বর ও কাশিতে ভুগিতেছিল। আমি তাহাকে অ্যাবোনাইট-৩০ ও বেলাডোনা-৩০ পর্যায়ক্রমে দিয়া আরাম করিয়া তুলিয়াছি। লন্ডন থেকে ছোট মেয়ে মীরা দেবীকে লিখছেন, ‘তোর খোকার Eczema সেরে গেছে অথচ ওর শরীর খারাপ হয়েছে লিখেছিস। … তাড়াতাড়ি একজিমা সারানো ভাল নয়। সালফা ২৬০ আনিয়ে দুটো বড়ি খোকাকে খাইয়ে দিস … একজিমা যদি বসে গিয়ে থাকে সালফার সেই দোষ নিবারণ করবে।

‘আমি এই শাস্ত্রে(চিকিৎসা) প্রোগ্রেসের চেষ্টা করেছিলুম চিকিৎসার দৌরাত্ম্য প্রশমণের  ইচ্ছাতে … আমি শিক্ষকতায় প্রবৃত্ত হয়েছিলুম শিক্ষকতার নির্দয়তা থেকে মানব সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টায়। পেটের সমস্যা আর জ্বরে কষ্ট পাচ্ছেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের স্ত্রী রানি। ডাক্তার নীলরতন সরকার প্রশান্তচন্দ্রের মেজো মামা, ডাক্তার সত্যসখা মৈত্র রানির জ্যাঠতুতো দাদা। দুজনেই রানিকে পরীক্ষা করে জানালেন রোগের মূলে এক ধরনের কৃমি।

আরও পড়ুন:  ১ ঘণ্টায় ভাজা ১৫০০ পরোটা...রোজ রান্না ১.২ লাখ ডিম...শুনবেন রাক্ষুসে সব রান্নাঘরের কথা

খবর পেলেন রবীন্দ্রনাথ। রানিকে লিখলেন, ‘কৃমির উপদ্রব পুরো ধ্বংস হলে আরাম পাবে। কৃমি ধংসের ভালো ওষুধ কাঁচা পেঁপের আঠা, অল্প একটু দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বারবার খেলে উপকার পাবে বলে মনে করি।’

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ে নিয়মিত প্রচুর পড়াশোনা করতেন কবি। ১৯৩৯ সালে বিজয়া দশমীতে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে হাঁপানির টান এড়াতে কুকুর ও বিড়ালের সংস্রব এড়াতে বলেছেন। বোলপুর ও তার আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে বহু মানুষ ওষুধ নিতে আসছেন কবির কাছে। ওই গ্রামগুলোর মানুষের সাহায্যে গ্রামে গ্রামে রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ প্রসব থেকে প্রসূতির পরিচর্যায় তৈরি করছেন মহিলা শুশ্রূষাকারীদের দল। গ্রামগুলোতে ম্যালেরিয়া আটকাতে যুক্ত হচ্ছেন অ্যান্টি ম্যালেরিয়া সমবায় সমিতির সঙ্গে।

একজন অসুস্থ মানুষকে একবার দেখেই গভীর নিরীক্ষণ আর ডাক্তারি প্রবণতার জোরে সমস্যা বুঝে নেবার আশ্চর্য দক্ষতা ছিল রবীন্দ্রনাথের। সবসময় হোমিওপ্যাথি করেন নি কবি, শেষ জীবনে সরে এসেছেন বায়োকেমিকে। ছোটখাটো সমস্যায় ওষুধ দিতেন নিজে, রোগটা জটিল হলে রোগীকে পাঠাতেন তাঁর অন্তরঙ্গ চিকিৎসকদের কাছে।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র ছিলেন কবির অন্তরঙ্গ বন্ধু। গভীর সখ্যতা ছিল ধন্বন্তরি নীলরতনের সঙ্গে। ইংল্যান্ডে রবীন্দ্রনাথের করা ‘গীতাঞ্জলী’-র ইংরেজি অনুবাদ কবির হাত থেকে গেল ইংরেজ কবি ইয়েটসের হাতে। দ্বিজেন্দ্রনাথকে ডিনারে ডেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ইয়েটস বুঝলেন কবিতাগুলোর ভাব। ইয়েটসের ভূমিকাসহ কবিতাগুলো ‘ম্যাকমিলান’ সংস্থা প্রকাশ করলেন ‘Songs Offerings’ নামে।

১৯১২ সালে ‘গীতাঞ্জলী’-র অনুবাদ প্রকাশিত না হলে ওই বই ইয়েটসের জোরালো প্রস্তাব ও সুপারিশসহ যেত না নোবেল কমিটির কাছে। দ্বিজেন্দ্রনাথ না থাকলে ওই কবিতাগুলোর মূলভাব এত সহজে পৌঁছে যেত না নোবেল পুরষ্কারের নির্বাচকদের কাছে। যদি বলি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯১৩তে নোবেল পুরষ্কার পাবার পিছনে এই ডাক্তারটির ভূমিকা ছিল অনেকটাই, ভুল হবে না সে বলায়।

ডাক্তার নীলরতন সরকার, ডাক্তার দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র বাদেও সত্যসখা মৈত্র, জ্যোতিপ্রকাশ সরকার, রাম অধিকারী, অমিয় সেনের মত অসংখ্য ডাক্তার ছিলেন কবির ঘনিষ্ঠ। ডাক্তারদের প্রতি দুর্বলতার কথা প্রকাশ্যে বলতেন ‘শখের ডাক্তার’ রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৩ সালে আশ্রমের ডাক্তার হিসেবে যোগ দেওয়া তরুন শচীন্দ্রচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে কবি ডাক্তারি পরীক্ষা পর্যন্ত নিয়েছেন!

এক আশ্রমবাসীকে হোমিও ওষুধ দিয়েছেন কবি। কবিকে লুকিয়ে রোগী খাচ্ছেন অ্যালোপ্যাথ শচীন্দ্রচন্দ্রের দেওয়া ওষুধ। রোগী দেখতে গিয়ে দুই ডাক্তার মুখোমুখি। গম্ভীর কবির নির্দেশে তরুন ডাক্তারকে তখনই যেতে হচ্ছে ‘উত্তরায়ন’-এ, কবির তখনকার বাসভবনে।

শেষ পর্যন্ত ‘রফা’ হল, শচীন ডাক্তারকে আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি, বায়োকেমিক, সব শাস্ত্রের বই পড়ে পরীক্ষা দিতে হবে কবির কাছে। পরিচারক বনমালীকে দিয়ে একঝুড়ি বই রবীন্দ্রনাথ পাঠিয়ে দিলেন ডাক্তারের বাড়ি। সাতদিন রাত জেগে সব বই আত্মস্থ করতে হল ডাক্তার ছাত্রকে। অষ্টমদিন ভোরে কবির চা চক্রে বসে পরীক্ষা দিলেন তরুন ডাক্তার।

ছাত্রের উত্তরে খুব খুশি রবীন্দ্রনাথ। ‘চরক সংহিতা’ গুলে খেয়েছে ডাক্তার রবীন্দ্রনাথের ছাত্র। কবি পাশ করিয়ে দিলেন ছাত্রকে! লেটার মার্কস দিয়ে। বললেন, ‘চমৎকার। ডাক্তার তোমার ইনটিউশন আছে। এবার থেকে তোমার ওষুধ আমি খাব’।

- Might Interest You

NO COMMENTS