বাংলালাইভ রেটিং -
Raees film review in Bengali

এখনও যেন চোখের সামনে সিনটা দেখতে পাচ্ছি পরিষ্কার। জাস্ট মাস কয়েক আগের কথা, সৃজিত মুখুজ্জের ‘জুলফিকার’দেখে উঠে নিজেদের মধ্যে চলছে তখন তুমুল খিল্লি।

ছবি ভালো না মন্দ সেটা নিয়ে তখনও অবশ্য কথাবার্তা শুরুই হয় নি। খিল্লির বিষয় মূলত একটাই। এটা কি একটা অ্যাকশন সিনেমা হয়েছে ভাই? ২০১৬ সালে দাঁড়িয়ে সিনেমার ওই অ্যাকশন সিনগুলো কি আদৌ অ্যাকশন নাকি আর কিছু? ক্লিশেমার্কা ওই সিন-টিন তো দেখানো হতো কবে সেই কোন আশির দশকে বোধহয়। সৃজিত আবার কোন আক্কেলে ওগুলোকে সব কবর খুঁড়ে তুলে বের করে আনতে গেলেন।

তখন আর বুঝবো কী করে যে,ঠিক এর মাস কয়েকের মধ্যে খোদ বলিউড থেকেই এমন একটা সিনেমা বেরবে যেটা দেখতে গিয়ে নতুন করে সৃজিতের ওই খিচুড়ি সৃষ্টির কথা মনে পড়ে যাবে ফের। এমন একটা সিনেমা যেটা দেখতে দেখতে মনে হবে এতো আর নিছক শুধু অ্যাকশন সিকোয়েন্সের ব্যাপার হয়েই রইলো না। এখানে আস্ত ছবিটাই তো সেই সত্তর-আশির দশকের ধাঁচায় ফেলে তৈরি। আর এটা এলো কার কারখানা থেকে? যে লোকটাকে পুরো হিন্দুস্থান কিনা ‘কিং খান’ বলে ডাকে?

এখন তাঁর নতুন ছবির স্ট্যান্ডার্ড-ই যদি এমন হয় তো বাংলার লোকাল ট্যালেন্টদের দোষ ধরে-টরে আর হবেটা কী, বলুন তো?

‘রঈস’ দেখতে বসে একেকবার মনে হচ্ছিল শোকে-দুঃখে শাহরুখ খানের মাথা খারাপ হয়ে গেল কিনা কে জানে? নাহলে এরকম আনতাবড়ি সব সিনেমাগুলো সাইন করছে একটার পর একটা কি এমনি এমনি নাকি? শেষ পাঁচ বছরে কেরিয়ার থেকে মোটে একটার বেশি হিট ঢোকে নি ঘরে।কোনটার কথা বলছি, আপনিও জানেন, সবেধন নীলমণি সেই ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ (২০১৩) ছবিটা।কিন্তু চার বছর আগে খাওয়া সেই তামিল বিরিয়ানির ঢেঁকুর তুলে তুলে ভদ্রলোক আর থাকবেনই বা কতদিন।বিশেষ করে যখন গুছিয়ে স্কিম করে হাটে-বাজারে একটার পর একটা গোল মেরেই চলেছে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দুই খান।

দুজন তো বেশ দুরকম ব্র্যান্ডে নিজেদের সেট করে নিয়েছে দিব্যি। একজনের বেশ একটা সুপারহিরো ইমেজ। তা সে করাপ্ট পুলিশ সাজুক কিংবা ভোলেভালা কাজ না জোটা বেকার যুবক, যেটাই হোক না কেন। আর অন্যজনের তো যেন সমাজসেবী ব্র্যান্ড। সিনেমা কিংবা টিভি, যেখানে পারছে দুনিয়ার লোকের চোখে আঙুল দিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে যাচ্ছে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল।

ব্র্যান্ডের রাজ্যটা দুজন এমন হাফ-হাফ করে ভাগ করে নেওয়ার পর বেচারা এই খানের জন্যে তাহলে আর কী পড়ে রইলো, বলুন? সেই কোন কালে একটার পর একটা ছবিতে ভিলেন-হিরোর রোলেপার্ট করতো ছেলেটা। বক্স অফিস কাঁপিয়ে দিত সেগুলো। আজ এতগুলো বছর পরে গতিক সুবিধের নয় বলে কি শেষটা নিজের ঘাড়ে সেই ব্র্যান্ডিং-এর রিপিট টেলিকাস্ট চাপাতে হবে?

কিন্তু ভয়টা কোথায়, জানেন? সেই কবে কোন যুগে ‘বাজিগর’ (১৯৯৩), ‘ডর’ (১৯৯৩), ‘অনজাম’ (১৯৯৪) আর‘রামজানে’ (১৯৯৫) মার্কা ছবিগুলোতে যে ফর্মুলাটা সাপটে খেয়েছিল লোকে, আজ এতদিন পরে সেই বাসি বাটি-চচ্চড়িটা ফের তাদের একই রকম ভালো লাগবে তো আদৌ? 

মাল্টিপ্লেক্সে ‘রঈস’ শুরুর ঠিক আগে দ্যাখানো হল ‘এক্সাইড’ ব্যাটারির একটা অ্যাড। আলাদা করে এটার কথা বলছি কেন, জানেন? এই ব্যাটারির অ্যাডে দেখলাম মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘রঈস’ ছবির ফুটেজ। সে ঠিক আছে, মার্কেটিংয়ের পরিভাষায় একে বলে ‘ইনটিগ্রেটেড প্রোমোশন’। কিন্তু হাঁ হয়ে গেলাম এইটে দেখে যে, ছবির খুব মেজর একটা ডায়ালগের ইমপ্যাক্ট একেবারে বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে অ্যাডটা।

এবং সোকল্‌ড ওই ‘কিং খান’-এর হালত বোধহয় এতই খারাপ, যে তাতেও কোন গাঁই-গুই করে উঠতে পারে নি লোকটা। উলটে কিনা সেই অ্যাডে আবার ভয়েস ওভার দিতে হয়েছে দস্তুর মতো আলাদা করে! চাইলে অ্যাডটা আপনি দেখে নিতে পারেন ইউটিউব থেকেই।

‘ব্যাটারি নেহি বোলনেকা’ বলে যে সংলাপের টুকরোটা ছড়িয়ে রয়েছে ছবির আগাপাস্তলা, শাহরুখের মুখে যে ডায়ালগটাকে ছবিতে ইউজ করাই হয়েছে মূলত মাফিয়া ডন ‘রঈস’-এর অ্যাটিটিউড বোঝানোর জন্যে, মূলত সেইটে নিয়েই এই অ্যাডটা তৈরি। অবশ্য ডায়ালগের ওটুকু শুনিয়েই শেষ হচ্ছে না অ্যাডটা, তারপর ওটা আরও কী বলছে জানেন? ‘ব্যাটারি নেহি বোলনেকা… সির্ফ এক্সাইড বোলনেকা। যো চলে জাদা, ঔর দমদার জাদা’।শাহরুখের ভয়েসে এই ডায়ালগবাজি শুনতে শুনতে আপনি অ্যাডে যে সিনগুলো দেখতে পাবেন, সেগুলো সেই ‘রঈস’ ছবিরই সিন!

আরও পড়ুন:  বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল সোনাক্ষীর!?

সিনেমা শুরুর আগেই এইটে দেখে তো আমার পেটে তখন গুবগুবোচ্ছে হাসি। বাদশা খানের তাহলে এই হাল হয়েছে এখন? ছবি শুরুর আগে এমন একটা অ্যাড দেখে ফেলার ফল হল এইটা যে, এরপর যতবার সিনেমার মধ্যে ওই ‘ব্যাটারি নেহি বোলনেকা’ বলে ডায়ালগটা আসছে, ততবার শুনে-টুনে মনে হচ্ছে ধুস এটা আবার একটা লোকের সিরিয়াস কোন অ্যাটিটিউড নাকি, এটা তো একটা সুপার-ফচকেমির পার্ট। এটাও মনে হচ্ছে যে ছবির অন্য ক্যারেক্টারগুলো ওই ‘রঈস’ লোকটাকে ‘ব্যাটারি’ না ডেকে ‘এক্সাইড’ বলেই বা ডাকছে না কেন? ওটা তো অ্যাট লিস্ট ওই‘কিং খান’-এর অ্যাপ্রুভ করে দেওয়া ডাক, এতে তো রগড় জমে উঠতো আরও!

এই লাস্ট লাইনটা আমিও যে ইয়ার্কি করেই লিখলাম, মানছি। কিন্তু এটা বুঝতে পারছেন তো সিনেমা শুরুর আগেই আমার ইমোশনের কেমন ছানা কেটে গেছিল পুরো!

মদের ব্যবসা নিয়ে ছবি, কোথায় ভেবেছিলাম ছবি দেখতে দেখতে সেই নেশাটাই নির্ঘাতসপ্তমে চড়ে বসবে, আর মাল্টিপ্লেক্স থেকে বেরতে গিয়ে সবকিছু ঝাপসা দেখতে হবে! ও হরি, কোথায় কী! চোলাই মদ তৈরির যে সিকোয়েন্সটা দিয়ে ছবির শুরু, সেটা দেখে আমার মনে হল, ধুস– এ আর নতুন কী, এরকম একটা সিন তো দিনকয়েক আগে আমাদের ঘরের পাশের বাংলা সিনেমাতেই দেখে উঠলাম, ভায়া!

মনে আছে তো? অরুণ রায়ের তৈরি ‘চোলাই’ (২০১৬) নামে সেই ছবিটারও বিষয় ছিল চোলাই মদের ব্যবসা। রীতিমতো ফেস্টিভ্যাল ঘুরে পুরস্কার পাওয়া ছবি, তার ওপর আবার একই ছবিতে পাঁচ-পাঁচটা আলাদা রোলে শাশ্বত চাটুজ্জের চমকে দেওয়া অভিনয়। টানটান ডকু-ড্রামার স্টাইলে সেই ‘চোলাই’ ছবিটা তুলে ধরেছিল চোলাই খেয়ে এই বাংলায় একই দিনে একের পর এক ১৪৩ জনের মৃত্যু হওয়ার গল্প। আর শুনে চমকে যাবেন না প্লিজ, যে, ‘রঈস’ ছবির ফার্স্ট সিনেইশুনিয়ে দেওয়া হল গুজরাটে বছরে ২৫ হাজার কোটি টাকার মদ-ব্যবসার হিসেবআর ঠিক তারপরেই যেটা বলা হল সেটা সেই দেশি মদ খাওয়ার জন্যে হঠাৎ করে কোন একবার ১৪০ জন লোকের প্রাণ চলে যাওয়ার গল্প!

দেখছি আর ভাবছি, নতুন কী আর দ্যাখাচ্ছ গুরু? বেশি বাজেট পেয়েছ, তাই এত কেতা মারছো, বড় জোর যেটা এক্সট্রা দ্যাখাচ্ছ, সেটা হল এই সিচুয়েশনে এনে ফিট করে দিচ্ছ শাহরুখ লেভেলের স্টার। ‘চোলাই’ ছবিতে চোলাই কেলেঙ্কারির পর প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালাতে হয় চোলাই বেওসায়িটিকে। ‘রঈস’ তো সেখানে শুধু এটুকু আলাদা যে ওই সিচুয়েশনটাকে টুক করে হালকা ছুঁয়ে গিয়ে ডিরেক্টর উলটে দেখিয়ে দিল ওই ঘটনা থেকেই লোক-শিক্ষে হয়ে যাচ্ছে শিশু ‘রঈস’য়ের। জীবনের সেরা আপ্তবাক্যটাও শিখে যাচ্ছে ও যে পুলিশ নাকি শুধু ‘দেশি’ দারু-বেচনেওয়ালাদেরই ধরে, ‘ইংলিশ’ বেচনেওয়ালে কো নেহি।

মানে একভাবে বলতে গেলে সেম ইস্যু নিয়ে খেলতে নেমে ‘চোলাই’ যেখানে শেষ করেছিল, এই ‘রঈস’ সেখান থেকেই শুরু!

হ্যাঁ, এরপর স্কুলব্যাগে মদের বোতল পুরে পুলিশের চোখে ধুলো দেবার সেই সিন। হল-এ দেখি এই সিনটা হওয়ার সময় চটাপট করে হাততালি পড়ছে বেশ। আমি তো ফের একবার থতমতো খেয়ে চুপ। এই লোকগুলোই ছবি শুরুর আগে জাতীয় সংগীত শুরু হতে না হতে দম দেওয়া কাঠের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল না? বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমার ঠিক পাশের লোকটা তো রীতিমতো হেঁড়ে গলায় জাতীয় সংগীত গাইতে অবধি শুরু করে দিয়েছিল। এবার স্কুলের বাচ্চারা পুলিশকে লাট্টু বানিয়ে মদ চালান করছে দেখে আবার ফুর্তিতে হাততালি দিচ্ছে কিনা এরাই?

আরও পড়ুন:  ভিলেন থেকে হিরো - অজানা বিনোদ খান্না

শাবাশ ইন্ডিয়া!এমনটাই তো চাই! কোর্টের ঠিক করে দেওয়া নিয়ম মতো দেশপ্রেমের কোটা বুঝি পূরণ করা শেষ?ব্যাস, চলো এবার বেড়াতে যাই আইন-ভাঙার দেশ। যে স্ক্রিনে একটু আগে ভারতের জাতীয় পতাকা উড়ছিল, সেই স্ক্রিনে এবার তাই ক্রমে ক্রমে রূপোপজীবিনীর বুকের খাঁজ, নাভির অতল উদযাপনের শুরু। নামী পর্ন-স্টারের মাখনের মতো ত্বক, সিংহিনীর মতো কটি। সঙ্গে কী আদুরে টোনে গানের সুরে বলতে থাকা ‘লায়লা ম্যায় লায়লা’! ব্যাপারটার মধ্যে একটা চরম ইয়ে তো আছেই আছে। মনে হল আর কি, এবার তার শরীরজুড়ে আদর করুক এ ছবির ক্যামেরাম্যানের চোখ। আর সেটুকু চেটে উপোসি ওই পাবলিকের জীবন ধন্য হোক।

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা কখন লাগছিল এসে জানেন? যখন দেখছিলাম, মাফিয়া গুণ্ডাকে ‘হিরো’ বানাবে বলে পুলিশ-টুলিশদের একেবারে ‘জিরো’ বানিয়ে ছেড়ে দিল ছবিটা!

স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছে এমন করে, ঘটনা-টটনা সাজানো হয়েছে এমন স্টাইলে যে, যেসব সিনগুলোয় পুলিশ, মানে এসিপি জয়দীপ আম্বালাল মজমুদার-কে (অভিনয়ে নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি) ঘোল খাইয়ে ছাড়ছে খুনে মাফিয়া ‘রঈস’ (শাহরুখ খান), সেই সিনগুলোতেই বেছে বেছে ফটাফট সিটি আর হাসির তুমুল ছররা। সিনেমা দেখতে এসে সিনেমা দেখবে কী, দলে দলে আম-পাবলিকগুলো জেনেশুনে নিঃসাড়ে যেন জয়েন করছে ওই মাফিয়া ডনের গ্যাংয়ে!আর তারপর গুরুর জয়ে হাততালি আর উল্লাসের ঝড়!সেখানে পুলিশ-টুলিশকে দেখে কেমন লাগছে বলুন তো?ঠিক যেন সার্কাস থেকে পালিয়ে আসা জোকার-দলবল!

এটাই সেই মোমেন্ট, যখন তলিয়ে একটু ভাবতে গেলে ছবি দেখতে বসে আপনার আতংকে দম আটকে আসবে পুরো।

কেন, শুনুন। মাফিয়া ডনের গল্প কিংবা দুষ্টু লোকের কাহানি তো সেই কোন যুগ থেকে শুনিয়ে আসছে সিনেমা। সে আর নতুন কি! সেদিনের ‘ডন’ থেকে শুরু করে এদিনের সেই ‘রামন রাঘব ২.০’ – লিস্টিটা তো বিশাল বিশাল লম্বা। কিন্তু এ ছবির মত এমন কাণ্ড সচরাচর কি হয়েছে কখনো আগে?

মোটের ওপর সব ছবিতেই একলা একলা একটা লোকের গোটা দুনিয়ার ওপর হঠাৎ অ্যাংগ্রি হওয়ার,নষ্ট হওয়ার যুক্তিগ্রাহ্য কারণ থাকে কিছু। সে ছোট্টবেলার নির্যাতন হোক, বা বাপের খুনের বদলা। কিন্তু এবারে এই ছবিতে যে কোথাও কোন কারণ-টারণ একটা ফোঁটাও নেই। খারাপ হলে বেজায় মজা, বেজায় টাকা, তাই যেন ইচ্ছে করেই খারাপ কাজে হাত পাকাতে থাকা! আর সেটাকে ভ্যালিডেট করবে বলে ক্ষণে ক্ষণে ‘ধান্ধা’ মানে ‘বেওসা’ নিয়ে ‘মা জননী’ কী বলে গেছেন, সেই মাতৃ-বাক্য কোট!

ডেনজারাস এই প্যাটার্নটা না, বলুন?গ্যাংস্টারকে ‘জ্ঞান-স্টার’ বানিয়ে দিলেই কি সাত খুন তার মাফ?

গুজরাটের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত মদ পাচার করে বেড়াচ্ছেন আর মাঝে মাঝে পাড়া-বেপাড়ায় গুচ্ছের এক্সট্রা সঙ্গে নিয়ে গানের তালে তালে নাচ দ্যাখাচ্ছেন, মাইরি বলছি শাহরুখ, এটা ২০১৭ সালের সিনেমা নাকি ১৯১৭ সালের? খুনে মাফিয়ার গল্প শোনাতে গেলে বলিউড তো এখন আর রামগোপাল ভার্মাকেও ডাকে না, অনুরাগ কাশ্যপ ২.০ এসে গেছেন বলে।আর তখন আপনি কিনা এখনও সেই প্রি-হিস্টোরিক যুগে পড়ে? সেই মনমোহন দেশাই আর ঘাই সুভাষের সঙ্গে!

প্রোডিউসারের লিস্টে ফারহান আখতার আর রীতেশ সিধওয়ানির সঙ্গে আপনার স্ত্রীর নামটাও রয়েছে বলে নজরে এলো।জানি একটা হিটের খোঁজে আপনি এখন কোন লেভেলে মরিয়া, কিংবা এই সিনেমার পেছনে আপনার কী বিপুল রকম স্টেক। প্রশ্নগুলো সরাসরি তাই আপনাকেই আজ করা।

সোজাসুজি এইটে বলুন না যে, পাকিস্তান থেকে মাহিরা খানকে উড়িয়ে এনে ছবির নায়িকা সাজিয়ে লাভটা হল কী? টাকা বাঁচল প্রচুর? বোম্বের কেউ রোলটা করলে বিশগুণ টাকা নিত? নাকি বোম্বের কেউ অমন একটা অকিঞ্চিৎকর পুঁচকে রোলে রাজিই হয় নি মোটে? জেনারেলি অন্য দেশের কাউকে ছবিতে পার্ট করার সুযোগ দেওয়ার মানে তো সে দেশে ছবির বিজনেস বাড়িয়ে তোলার ফিকির। কিন্তু পাকিস্তানে এমনিতে তো আপনি নিজেই স্বয়ং জবরদস্ত ক্রেজ। মাহিরা খানকে নায়িকা করলে গরিব সে দেশের বক্সে আর কত এক্সট্রা পয়সা হবে?

আরও পড়ুন:  ধন্যি অধ্যবসায়‚ ১৮ কোটি টাকার ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্টের অফারও ফিরিয়ে দিলেন 'বাহুবলী' প্রভাস

কিংবা এই যে ছবির প্রমোশনে হঠাৎ করে ঠিক করলেন ট্রেনে চড়ে মুম্বই থেকে দিল্লি যাবেন সোজা। আর সে সময় পাবলিকের স্টার দ্যাখার হ্যাংলামোতে মারাই গেল একজন। এতেও কি ছবির প্রচারে লাভ হল স্যর কিছু?

মাফিয়া ডনের বিজনেস সেন্স নিয়ে ছবি। আর খোদ প্রোডিউসারের বিজনেস সেন্স-ই এমন জিরো?

অবিশ্যি শুধু বিজনেস সেন্স নয়, গল্পের সেন্সও যে আপনার খুব একটা সুবিধের সেটা মনে হয় না কিন্তু। না হলে শেষটা ওরকম একটা তাবড় টাইপের ডনকে অমন একটা ‘নিষ্পাপ আসামী’ মার্কা বানিয়ে দিলেন কেন? স্মাগলিং–চোরাচালান–খুন কিচ্ছু করতে যার এতটুক হাত কাঁপে না, আর ডি এক্স পাচার করার কথা শুনে সে কিনা একেবারে বিবেক দংশনে শেষ? শুনে মনে হচ্ছিল, ওরেব্বাস, কী এথিক্সের সেন্স মাইরি লোকটার!

লেখার শুরুতে একবার জুলফিকারের কথা লিখেছি না? এখানে এসে সেই জুলফিকারের কথা মনে পড়ছে ফের! নেহাত খুব কাছাকাছি সময়ে রিলিজ হয়েছে সিনেমা দুটো, নাহলে হয়তো এটাও ভাবতে হতো যে এ ছবির ডিরেক্টর রাহুল ঢোলাকিয়া ও ছবির ডিরেক্টর সৃজিত মুখুজ্জের থেকে ইন্সপিরেশন ধার নিলেন কিনা শেষে।

কারণ খ্যামটা নাচতে নেমে ঘোমটা টানার এই গল্পটা, মাফিয়াগিরি করতে এসে এথিক্সবাজি দ্যাখানোর এই ট্র্যাকটা তো এর আগে ওই জুলফিকারেই দেখে ফেলেছি আমরা। সিণ্ডিকেটের মধ্যে টেররিজম বেওসা ‘ইন’  করতে চায় নি বলেই তো সেই ছবিতে জুলফিকারের পতন! মন দিয়ে এবার মিলিয়ে দেখুন এই ছবির ‘রঈস’এর পতন কী ভাবে ওটার জুলফিকারের পতনের সঙ্গে কুলে-গোত্রে সাজিয়ে-গুছিয়ে দিব্যি যায় মিলে!

আর শুধু এটুকু তো নয়। জুলফিকারেও গল্পের মধ্যে মাফিয়া ডনের ক্রমে ক্রমে নিজের এরিয়ায় রবিন হুড হয়ে ওঠার ব্যাপার ছিল না একটা? মাইরি বলছি, সেটা অবধি এই ছবিতে আছে। সি গ্রেডেড কিছু ভোজপুরি ছবিতে রবিন হুড মার্কা এই ক্লিশে ধ্যাস্টামিগুলো এখনও ‘ইন থিং’ বলে শুনেছি। হতে পারে যে ‘রঈস’ চোখ বুঁজে কনটেন্ট ধার করেছে সেখান থেকেই।

অবশ্য চাইলে আপনি এতক্ষণ লেখা এসব নিন্দে-মন্দ ইগনোর করে পুরো অন্যভাবেও ইন্টারপ্রেট করতে পারেন ছবিটা। ভেবে নিন না যে সিনেমাটাকে আশির দশকের মেনস্ট্রিম ঢংয়ে বানানো হয়েছে আসলে এটা‘পিরিয়ড ছবি’বলে! ভেবে নিন না যে, সবচেয়ে ঘোড়েল শয়তানটার নাম ‘রঈস’ (যার মানে জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে অভিজাত ধনী) রেখে তির্যক ব্যঙ্গ ছবির মধ্যে দেওয়া হয়েছে ঠুসে। আর ভেবে নিন না যে, বাজার চলতি ফিল্ম বানানোর নামে আসলে ছিল এটা গুজরাটের মতো চরম একটা রাজ্যের গুন্ডা-পুলিশ-মাফিয়া-মন্ত্রী নেক্সাসগুলো খুলে-আম নাঙ্গা করার চাল, সেখানকার লিকার মাফিয়া আব্দুল লতিফের শয়তানিটাকে ডকুমেন্ট করে রাখা।

ওই যে বললাম, ছবিটাকে কী ভাবে দেখবেন, সেটা একেবারে যার যার নিজের নিজের চয়েস!

আর হ্যাঁ, গ্যাংস্টারের ‘জ্ঞান-স্টার’ হয়ে ওঠার ছবির আলোচনায় লাস্ট লাইনে একটু জ্ঞান না থাকলে চলে? এই জ্ঞানটা এইরকম : এখনও পর্যন্ত সবকটা বাংলা কাগজে দেখবেন এ ছবির নামের বানান লেখা হচ্ছে ‘রইস’। কিন্তু মজার কথা হল,চোখের সামনে ছবির পোস্টারে ওই শব্দটাতে দিব্যি লাগানো রয়েছে দু-দুখানাইংরেজি ‘ই’!দু-দুখানা ‘ই’ থাকলে সেটা হ্রস্ব ই হবে নাকি দীর্ঘ ঈ? এটা নিয়ে বাংলা প্রিন্ট দুনিয়ার কোথাও কারুর মনে কোন খটকা অবধি নেই, কষ্ট করে হিন্দি অভিধান খুলে মিলিয়ে দ্যাখা তো বহু পরের ব্যাপার ভাই।

ভেবেচিন্তে এই রচনায় নামের ঠিক বানানটাই রাখা হল। ‘রইস’ নয়, ‘রঈস’।

- Might Interest You

NO COMMENTS