এ সময়ের অন্যতম চর্চিত পরিচালক রাজ চক্রবর্তী | কেউ বলেন তিনি রিমেক কিং | তবে ইদানীং পরিচালনা ছাড়াও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আলোচনার বস্তু | রাজ-এর সঙ্গে কথা বললেন তন্ময় দত্ত গুপ্ত |

আপনাকে প্রথমে যে প্রশ্নটা করতে চাই সেটা হলো

রাজ চক্রবর্তী : দাঁড়ান দাঁড়ান,তার আগে একটা কথা বলে নেই। কোনওরকম ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেব না।

আচ্ছা বেশ।আপনি আমায় আগের ইন্টারভিউতে বলেছিলেন,রিমেক ছবি করা কোনও ক্রাইম নয়।

রাজ চক্রবর্তী : তা তো নয়ই।

হ্যাঁ।সেটা নয়।কিন্তু যে রাজ চক্রবর্তী প্রলয় ও কাঠমন্ডুর মতো ছবি বানায়;সেই রাজ চক্রবর্তীর তামিল ছবির রিমেক করার প্রয়োজন কেন পড়ে?

রাজ চক্রবর্তী :কেন রিমেক করা কি কোনও অন্যায়?

না, অন্যায় কেন হবে।আপনি মৌলিক ছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন।তাহলে কেন রিমেক?

রাজ চক্রবর্তী : দেখুন আমি ছবি উপহার দেই।সেটা মৌলিক হতে পারে,আবার রিমেক হতে পারে।আমি রাজ চক্রবর্তী হয়েছি “চিরদিনই তুমি যে আমার” রিমেক ছবি থেকে। আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছবিই হলো রিমেক।আমি একজন ফিল্মমেকার।আমি টেলিভিশন করতে পারি।রিয়ালিটি শো করতে পারি।আমি সব পারি।আমার যেটা ভালো লাগবে সেটা করব।আর আপনারা যেভাবে প্রশ্ন করেন তাতে মনে হয় আমি কোনও অপরাধী।আমি কোনও অপরাধ করছি না।আমার কাছে রিমেক করা কোনও অপরাধ নয়।আমি রিমেকও খুব অনেস্টলি করি।এবং এই কাজ থেকে পারিশ্রমিক পাই।

রিমেকের জন্য কি বাণিজ্যিক সফলতা বেশি পাওয়া যায়?

রাজ চক্রবর্তী : আমি রিমেক করলে আপনার প্রবলেমটা কোথায়?আপনি রিমেক নিয়ে কথা বলতে চান না সিনেমা নিয়ে কথা বলতে চান?

আমি আপনার সামগ্রিক সিনেমা নিয়ে কথা বলতে চাই।

রাজ চক্রবর্তী : যে কোনও ভালো সিনেমাই বাণিজ্যি করে।সেটা রিমেকও হতে পারে।অরিজিনালও হতে পারে।

সেখানেই তো প্রশ্নটা।ভালো ছবি যদি বাণিজ্য করে,আর সেটা যদি অরিজিনাল হয় তাহলে রিমেক কেন?

রাজ চক্রবর্তী : আমি “লে ছক্কার” মতো ছবি করেছি।এখন “চ্যাম্পের” মতো ছবি করছি।আবার রিমেকও ভবিষ্যতে করতে পারি।আমার মাথাটা খুব পরিষ্কার।আমি কি করছি, কেন করছি সে ব্যাপারে আমি একশো ভাগ আত্মবিশ্বাসী।আর আমি মন থেকে কাজগুলো করছি।আমি পারিশ্রমিক নিয়ে ছবি বানাই।তাই অরিজিনাল ছবির প্রতি যতোটা পরিশ্রম, মেধা থাকে, ততটাই রিমেক ছবির প্রতিও থাকে।আপনি বিশ্বাস করুন,আমি রিমেক ছবি নিয়ে যথেষ্ট প্রাউড ফিল করি।আমি অনেক রকম ছবি বানিয়েছি।এটা একটা জার্নি।কাজ করে যেতে হবে।কোথায় গিয়ে শেষ হবে,সেটা কেউ জানে না।জীবন কাকে কোথায় নিয়ে যাবে,সেটা কেউ বলতে পারে না।

আরও পড়ুন:  সুজানের সঙ্গে সম্পর্কের জেরেই কি ভাঙতে চলেছে অর্জুন রামপাল-মেহের জেসিয়ার বিয়ে?

আপনি নতুন নায়ক নায়িকাদের সঙ্গে কাজ করেছেন।তাহলে আবার জিতের মতো স্টারের কাছে ফিরে আসার কারণ কী?

রাজ চক্রবর্তী : আপনার প্রশ্নগুলো বড্ড প্যাঁচালো।আমার সাবজেক্ট যদি ডিম্যাণ্ড করে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে; তাহলে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কাজ করব।যদি মনে হয় জিতকে নিয়ে হবে তাহলে জিতকে নিয়ে করব।আমি কোনও স্টারের কাছে ফিরে আসি না।আমি যদি স্টারের কাছে ফিরেই আসতাম তাহলে বনি,সোহম,রাহুলের সাথে কাজ করতাম না।আমার কাছে স্টারডম সব নয়।আমি প্রাধান্য দিই কনটেন্টের ওপর।আর একটা বিষয় মাথায় রাখবেন,আমি বাণিজ্যিক ছবি বানাই।কোনও ফেস্টিভ্যাল মুভি বানাই না।আমি সব সময় এন্টারটেইনিং ছবি বানাই।

অনেকে বলেন আপনি চাপে থাকার সময় খুব ভালো কাজ করেন।তাই কি?

রাজ চক্রবর্তী : আমি সব সময় প্রচণ্ড  চাপে থাকি।।এবং প্রত্যেকটা সময় স্ট্রাগল করি।এবং আমি হাণ্ড্রেড পারসেন্ট দিয়ে কাজ করি।আমি কাজ পাগল মানুষ।আমি সারাক্ষণ কাজ নিয়ে থাকি।আমি যখন ঘুমাই তখনও কাজের স্বপ্ন দেখি ।

গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন, অশোক বিশ্বনাথন কখনও রাজ চক্রবর্তীর ছবি নিয়ে আলোচনা করেন না।এই বিষয়টা কি আপনাকে ভাবায়?

রাজ চক্রবর্তী : না, ভাবায় না।আসলে আমি ওনাদের যোগ্যই নই।ওনারা বড় মাপের পরিচালক।ওনাদের মুখে আমার নাম শুনলে আমি অবাকই হব।আমার নাম নেওয়ার ওনারা প্রয়োজন বোধ করেন না।আমার দর্শক আমার নাম নিলেই হোল।আমি অডিয়েন্সের এ্যাকসেপটেন্সে এবং রিজেকশনে বিশ্বাসী।আর কে কী ভাবল, না ভাবল—তাতে আমার কিছু এসে যায় না।এসব নিয়ে আমি ভাবিও না।

আপনার নিজস্ব প্রোডাকশান কোম্পানি আছে।সেই কোম্পানি থেকে জি অরিজিনালে অনেক নতুন নতুন পরিচালক নতুন সিনেমা পরিচালনা করেন।এই নতুন পরিচালকদের সুযোগ দেওয়ার পেছনে কী কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে?

রাজ চক্রবর্তী : ওটা আমার সাব বিজনেস।আমি পরিচালক হিসেবে যেমন কাজ করি তেমনই আমার একটা হাউস আছে।যেখানে আমি প্রোডিউস করি।জি অরিজিনালে আমার সহ পরিচালকেরা ছবি পরিচালনা করেন।পরিচালনা যেমন আমার সত্ত্বা তেমনই প্রযোজনাও আমার একটা  সত্ত্বা।

আরও পড়ুন:  তৈমুরের নাম পাল্টে ফেলতে চেয়েছিলেন সইফ‚ আটকালেন কে?

আপনার প্রোডাকশান কোম্পানিতে আপনি নতুন পরিচালকদের কী ভাবে নির্বাচন করেন?

রাজ চক্রবর্তী : আমি প্রথমে দেখি পরিচালকদের স্টোরি সেন্স।মানে পরিচালকেরা কী ভাবে গল্প বলছে।তার সঙ্গে তারা গল্পটাকে কী ভাবে ভিস্যুয়ালাইজ করছে —সেটাও দেখি।

নতুন পরিচালকদের কি ফিল্মের ব্যাকগ্রাউণ্ড থাকা প্রয়োজন?

রাজ চক্রবর্তী : না, না, যে কোনও ব্যাকগ্রাউণ্ড থেকে তারা আসতে পারেন।আমি এন্টারটেইনিং মুভিতে বিশ্বাস করি।আমি দেখি তাদের বলা গল্পটা আমাকে মজা দিচ্ছে কিনা।

আপনি থিয়েটারে অভিনয় দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেনআপনার পরিচালিত ছবিতে নিজেকে কাস্ট করতে কখনও ইচ্ছে হয়েছে?

রাজ চক্রবর্তী :আমার মনে হয় অভিনয় করাটা খুব কঠিন।আর ক্যামেরার সামনে অ্যাক্টিং করা আরো কঠিন।আমি যখন থিয়েটার করতাম তখনও অভিনয়ের থেকে ব্যাকস্টেজে কাজ করতে বেশি পছন্দ করতাম।

আপনি একটু আগে বলছিলেন আপনি সব সময় চাপে থাকেন।তবুও আপনার মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকেএই হাসিটাকে আপনি কী ভাবে ধরে রাখেন?

রাজ চক্রবর্তী : কাজ করতে আমি খুব এনজয় করি।কাজ করলে চাপ থাকবেই।আর কাজ মন দিয়ে করলে আপনি সেই কাজকে এনজয় করবেনই।এনজয় করলে আপনার মুখে হাসি থাকবেই।

আশি থেকে দুহাজার সালের বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমাকে বুদ্ধিজীবীরা সব থেকে খারাপ বলে চিহ্নিত করেন।এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন?

রাজ চক্রবর্তী : যে সময়টার কথা আপনি বললেন,সেই সময়ে বাংলা সংস্কৃতির একটা আদল ছিল।কারোর কাছে সেই সময়টা খারাপ ছিল।কারোর কাছে আবার ভালো ছিল।

কারোর কাছে নয়,আমি নাম দিয়ে সেই সমস্ত মানুষের কথা বলতে পারি যারা এই কথা বলেন।যেমন অঞ্জন দত্ত,অশোক বিশ্বনাথনের মতো মানুষেরা বলছেন,আশি থেকে দুহাজার সালের বাণিজ্যিক বাংলা ছবি নিম্ন রুচির ছবি,এই ধরনের ছবি বোম্বের হিন্দি ছবির অনুকরণ।

রাজ চক্রবর্তী : আশি থেকে দু’ হাজার;এই কুড়ি বছর ইণ্ডাস্ট্রী কিন্তু বেঁচে ছিল।আর যাদের কথা বললেন তারা তো সেই সময়েও কাজ করেছেন।তাহলে তারা কি নিজেদেরকেই গালি দিচ্ছেন নাকি ইন্ডাস্ট্রীকে গালি দিচ্ছেন?

আরও পড়ুন:  ঐশ্বর্যর বাবার প্রয়াণে শোকাহত অমিতাভ

তারা তো ওই ধারার ছবি করেনই না।তারা অঞ্জন চৌধুরী,স্বপন সাহা, হরনাথ চক্রবর্তীর ধারার ছবির কথা বলছেন।

রাজ চক্রবর্তী : আমি অঞ্জন চৌধুরী,স্বপন সাহা,হরনাথ চক্রবর্তীর মতো পরিচালককে কখনও ফেলে দিতে পারব না।আমি সবাইকে রেসপেক্ট করি।ফিল্মমেকার হওয়া অতো সহজ নয়।সকলের সমালোচনা করা খুব সহজ।নিজের সমালোচনা করা কঠিন।আমি কাউকে ডিসরেসপেক্ট করতে পারি না।অঞ্জন চৌধুরী,হরনাথ চক্রবর্তী,স্বপন সাহা যদি এতোই খারাপ ছবি বানাতেন,তাহলে ওনারা এগসিস্ট করতেন না।সত্যি কথাটা কি জানেন; পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গিয়ে আজও কেউ যদি অঞ্জন চৌধুরীর কথা বলে তাহলে সবাই অঞ্জন চৌধুরীকে চিনবে।অঞ্জন দত্ত,অশোক বিশ্বনাথনকে কেউ চিনবে না।

আপনি সাক্ষাৎকারের শুরুতে বলেছিলেন;কোনওরকম ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন না।আমি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছি না।কিন্তু আপনার এই সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে যখন ইন্টারনেট সার্চ করছিলাম তখন দেখলাম একটাই নিউজ।মিমি চক্রবর্তীর সঙ্গে ব্রেকআপের পরে রাজ চক্রবর্তী শুভশ্রীর সঙ্গে প্রেম করছে।কী বলবেন?

রাজ চক্রবর্তী : মানুষের যেমন ভালো দিক থাকে তেমন খারাপ দিকও থাকে।একজন মানুষের প্রশংসা ও নিন্দা দুই হয়।সবটা নিয়েই চলতে হবে।কেউ কেউ আমার কাজের থেকে আমার ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণ করতে বেশি পছন্দ করেন।আমি কাজে বিশ্বাস করি।আমার ব্যক্তিগত ইন্টারভিউতে দেখবেন আমি কাজ নিয়েই বেশি কথা বলেছি।ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গ কম এসেছে।

NO COMMENTS