বাংলালাইভ রেটিং -

এই লেখার শিরোনাম এমন কেন, সেটা একটু পরে বলছি। আগে একটু ফ্ল্যাশ ব্যাক হয়ে যাক। মোটামুটি বছর চৌদ্দ আগের কথা। সাল ২০০৩। বাংলা ছবিতে বিশ্ব-সুন্দরী ঐশ্বর্য রাইকে কাস্ট করে হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। রবি ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে তৈরি করছেন ম্যাগনাম ওপাস ‘চোখের বালি’।

ফাইনাল এডিট শেষ হওয়ার পর দ্যাখা গেল, সেই মহা-সিনেমার ডিউরেশান মানে দৈর্ঘ্যটিও দাঁড়িয়েছে বেশ সুবৃহৎ। বাংলা ছবির নিরিখে ১৬৭ মিনিট নেহাত কম কথা নয়। তখন তো আর এভাবে মাল্টিপ্লেক্স যুগ শুরু হয়ে যায় নি, যে সেই সাত-সকাল থেকে শুরু করে সারাদিন জুড়ে হরেক রকম শো-টাইম। ছবি রিলিজ করাতে তখন তো বাংলা ছবির সাবেক সেই রিলিজ চেনগুলোই ভরসা। এত লম্বা ছবি আদিযুগের সেই শো টাইমে ফিট-ইন করাটা কি মুখের কথা?

তাহলে কি জবরদস্তি এডিট করে ‘চোখের বালি’ ছেঁটে দিতে হবে নাকি? এত খরচ করে যত্ন নিয়ে শুট করা প্রায় এপিক-নির্মাণের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়াবে এটা?

ভেবে-চিন্তে তখন একটা সলিউশন বের করা গেল এর। ঠিক হল, দুটো ভার্সন তৈরি হবে ছবিটার। একটা হবে কেটে-কুটে ছোট করে দিয়ে গড়পড়তা বাংলা ছবির মাপ অনুযায়ী তৈরি। বেশিরভাগ সিনেমা-হল’এ রিলিজ করবে এটাই। আরেকটা ভার্সন হবে পরিচালকের ‘ভিশন’ মেনে তৈরি আন-কাট সেই লেংথ। এই ভার্সনটা দেখার সুযোগ থাকবে বিশেষ একটা-দুটো হল-এ।

মনে আছে, কলকাতায় গ্লোব সিনেমায় রিলিজ করলো ২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের সেই স্পেশ্যাল ‘ডিরেক্টর্‌স কাট’ ভার্সন। বিশেষ উৎসাহীদের জন্য। আর বাকি হলগুলোতে কেটে ছোট করে দেওয়া ২ ঘণ্টা ২৩ মিনিটের ভার্সনটাই রইলো। দর্শকদের কাছে সুযোগ রইলো দৈর্ঘ্য মেপে ইচ্ছেমত ভার্সন চয়েস করে নেওয়ার। যে ভাই, তোমার যেটা খুশি সেইটা গিয়ে দ্যাখো।

‘রেঙ্গুন’ নিয়ে লিখতে বসে হঠাৎ সেই চৌদ্দ বছর আগের কথা লিখতে বসলাম কেন জানেন? চৌদ্দ বছর আগের সেই কারনামা যে চুপচাপ এবার ফের একবার ঘটে গেল ভিশাল ভরদ্বাজের এই ‘রেঙ্গুন’ ছবিতেই।

পুরো ছবি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর দ্যাখা গেল ছবির দৈর্ঘ্য গিয়ে দাঁড়িয়েছে পাক্কা সেই ‘চোখের বালি’র মাপে। মানে ১৬৭ মিনিট। মজাটা হল, তখন এতে কারুর তেমন কিছু মনে হল না, আর ১৬৭ মিনিটের সেই ছবি জমাও পড়ে গেল ‘সিবিএফসি’ দপ্তরে সেন্সর সার্টিফিকেশনের জন্যে।

খানকয়েক গালিগালাজ ছেঁটে দেওয়ার নিদান দিয়ে ছবির সেই ভার্সনটাকে ইউ/এ সার্টিফিকেট দিয়েও দিলেন সেন্সর বোর্ডের বাবুরা। রগড় যা জমার সেটা জমল এরপরে। হঠাৎ করে প্রোডাকশন হাউসের কর্তাব্যাক্তিদের টনক নড়ল যে, এহে, ছবির ডিউরেশন যে বড্ড বেশি হয়ে গেছে ভাই? আজকের ইয়ং জেনারেশন আবার এত লম্বা ছবি দ্যাখে নাকি? তাহলে উপায়? কাটো কাটো, ওই ভিশালবাবুর ছবি কেটে ছোট করে দাও!

চৌদ্দ বছর আগে ডিরেক্টরের তাও বোধহয় কিছু সম্মান-টম্মান অবশিষ্ট ছিল। একটা-দুটো সিনেমাতে হলেও ‘চোখের বালি’র ফুল লেংথ ভার্সনটা তখন অ্যাট লিস্ট রিলিজ তো করেছিল! চৌদ্দ বছর পর এখন হচ্ছে ‘বাজার’ আর ‘রেভিনিউ’ – এই দুটো ব্যাপারের যুগ। ওসব ডিরেক্টরের ভিশন-ফিশনকে এখন বোধহয় খুব একটা আর পাত্তা দ্যায় না কেউ। হৈ-হৈ করে তাই কাটা পড়ে গেল ‘রেঙ্গুন’। একটা-দুটো মিনিট নয়, পাক্কা সতের মিনিট পুরো। সিনেমা-হলে বসে ঘড়ি ধরে মিলিয়ে দেখলাম, কাঁচির ক্যারিশমায় ১৬৭ মিনিটের ছবি হুশ করে নেমে এসেছে ১৫০ মিনিটে মোটে!

প্রোডাকশন হাউস থেকে এরপর দায়সারা একটা বিজ্ঞপ্তি বেরল যে, ছবি কেটে ছোট করে দেওয়ার এই ব্যাপারটায় প্রোডাকশন টিমের সবাই নাকি একমত। এতবড় ছবি আজকাল আর কেউ দ্যাখে না বলে ভেবে-চিন্তে দেখে তবেই নাকি এই ডিসিশন। আর হ্যাঁ, আলাদা করে এখানে কোথাও ডিরেক্টর হিসেবে ভিশালের কোন মত-টত রইল না।

মোটে মাস দুয়েক আগে ২ ঘণ্টা ৪৯ মিনিটের ‘দঙ্গল’ যদি সবাই দেখে চুটিয়ে সেটাকে প্রায় সর্বকালের সেরা হিট বানিয়ে ছাড়তে পারে, তাহলে এখন ২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের ‘রেঙ্গুন’ ইয়ং জেনারেশন-এর কেউ বসে দেখতে চাইবে না কেন, তার কোন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টাও রইলো না কোথাও।

আরও পড়ুন:  স্বামীকে বাঁচাতে গোয়েন্দাগিরি শুরু করলেন অপরাজিতা

এমন কি সেই ‘চোখের বালি’র মতো এখানে ‘ডিরেক্টর্‌স কাট’ মানে ফুল লেংথ ছবিটা দ্যাখার সুযোগ অবধি রইলো না কোথাও। কারণ পুরো দৈর্ঘ্যের ছবিটা তো আর রিলিজই হল না আদৌ। ছবি রিলিজের ঠিক আগে, ভিশালের মাপের একজন ডিরেক্টরের ছবি আগাপাস্তলা মুড়িয়ে ছেঁটে দেওয়ার এই ডিসিশনটা যে কীরকম আনাড়ি আনতাবড়ি ভাবে নেওয়া, তার অকাট্য প্রমাণ আপনিও পাবেন যদি ছবির গোড়ায় ‘সিবিএফসি’ মানে সেন্সর বোর্ডের সার্টিফিকেটটা একটু খুঁটিয়ে নজর করে দ্যাখেন। দেখবেন, সেখানে ছবির দৈর্ঘ্য কিন্তু লেখা আছে ১৬৭ মিনিট ২৫ সেকেন্ড বলেই। অর্থাৎ কিনা, তাড়াহুড়োর ঠ্যালায় ছবি তো কেটে সাফ করে দিলাম ভাই, কিন্তু স্যরি, ওটা পালটানোর আর সময় ছিল না!

ভারতের অন্যতম সেরা ডিরেক্টর। সেই তাঁর ছবি নিয়ে সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা বা ভায়াকম ১৮ মোশন পিকচার্সের মতো প্রোডিউসারের দায়সারা ভাব কতটা ছিল, সেটা কিছুটা বোধহয় এটার থেকেই স্পষ্ট। সত্যিই একটা ছবির লেংথ অকারণে বেড়ে যাচ্ছে কিনা, সেটা বোঝার একশো একখানা উপায় থাকে সেই স্ক্রিপ্ট লেখার সময় থেকেই। নামী দামি প্রযোজনা সংস্থার কারুর সেসব জানাই নেই, ছবি সেন্সর হয়ে আসার আগে অবধি লেংথ নিয়ে জ্ঞানচক্ষু খোলার সময়ই হল না কারুর, মুম্বই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রফেশনালিজম কি এখন এই লেভেলের নাকি?

আরেকটা বড় আপত্তির ব্যাপার এই যে, বেওসা কেমন হবে না হবে, সেটা আগের থেকে আঁচ করে নিয়ে ভিশালের মতো লোকের ছবি কেটে বারোটা বাজিয়ে দেওয়াটা সত্যি আসলে লজিক্যাল কিনা আদৌ। সোজা কথাটা সোজা করেই লিখি। ভিশাল তো কোনদিন রোহিত শেঠি নন, কিংবা সুরজ বরজাতিয়া কিংবা করন জোহরও নন যে সিনেমা বানিয়ে চলেছেন জনতা জনার্দনের মন পাওয়ার জন্যে। ওঁর ছবি মানে তো এটাই জানি যে মাস্টারমশাইয়ের ক্রিয়েট করে যাওয়া নিখুঁত একটা আর্ট ওয়ার্ক হবে যেন। সেই ‘মাকড়ি’ (২০০২) থেকেই দেখুন। সেখান থেকে শুরু করে একে একে ‘মকবুল’ (২০০৩), ‘দ্য ব্লু আমব্রেলা’ (২০০৫), ‘ওমকারা’ (২০০৬), ‘কামিনে’ (২০০৯), ‘সাত খুন মাফ’ (২০১১), ‘মাটরু কি বিজলি কা মানডোলা’ (২০১৩) আর ‘হায়দার’ (২০১৪)। পরপর মোট আটটা রত্নের মতো ফিল্ম। কিন্তু এর মধ্যে কি এমন একটা ছবিও আছে যেটা বক্স অফিস কাঁপিয়ে দিয়ে একেবারে ঝড়ের মতো ব্লকবাস্টার হিট? নেই! যে লোকটা আজ অবধি ছবি বানিয়ে এল স্রেফ মুষ্টিমেয় রসিক লোককে মাতিয়ে দেবে বলে আর ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে সময়-সময় শোর মাচাবে বলে, আজ স্রেফ ইয়ং জেনারেশন দেখবে না বলে তাঁর ছবির ওপর এভাবে ঘ্যাঁচ করে কাঁচি চালানো যায়?

আরে বাবা, যখন ভিশালের ছবি প্রোডিউস করতে যাচ্ছি, তখন ভিশালকে নিয়ে মিনিমাম হোমওয়ার্কটুকু থাকবে না আমার? তখন থেকেই তো এইটে আমার জানা থাকার কথা যে, ভিশালের ছবি মানে আর যাই হোক, সেটা নাদিয়াদওয়ালা-মার্কা সেই ‘হাউসফুল’ সিরিজ কিংবা ‘হিরোপন্তি’ নয়। উলটে তার থেকে আলাদা পুরো অন্য রকম কিছু। বাজারে ঠিক খাবে কিনা ভেবে রিলিজের ঠিক আগের ক্ষণে এভাবে সেটা ঘেঁটে দিতে পারি আমি?

আর এবার বলুন, ‘খুন’ ছাড়া, এটাকে আর কী বলা যায়! এতে মানুষ মরে নি ঠিকই। কিন্তু একটা আর্ট ওয়ার্কের বারোটা তো বেজে গেছে!

লিখতে বসে তো মনে হচ্ছিল, এই প্রথম এমন একটা ছবির রিভিউ লিখছি, যে ছবিটা অক্ষত ভাবে পুরো দ্যাখার সুযোগই হল না মোটে! ফাইনাল এডিট হয়ে যাওয়ার পর সতের মিনিট কেটে দেওয়া তো আর চাট্টিখানি না। খামচে খামচে কোন কোন জায়গা থেকে মাংস তুলে নিয়েছে, কে জানে।

দ্যাখার সময় তো বেশ বুঝতে পারছিলাম, যে কূল পাচ্ছি না ঘটনাগুলোর মধ্যে আদৌ। কিছুটা বুঝছি, কিছুটা যেন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে থাকছে! বিশেষ করে গল্প যেখানটায় পড়ছে গিয়ে সেই ভারত-বর্মা বর্ডারে! খরস্রোতা নদী, ঘন জঙ্গল, পাথুরে পাহাড়, গভীর খাদ। যেন অচেনা মোহময়ী রাক্ষসীর মতো প্রকৃতি। তার মধ্যে দুটো-তিনটে আলাদা জোনে প্যারালালি এগিয়ে যাচ্ছে স্টোরি। মুশকিল হল, মাঝখান থেকে সিন-কে-সিন ছেঁটে উড়িয়ে দেওয়ার ফলে, এই ঘটনাপ্রবাহে কোথাও কোথাও চোখে জার্ক লাগতে পারে চরম।

আরও পড়ুন:  ফের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা‚ কী করলেন সলমন-ঐশ্বর্য ?

যেমন জুলিয়া-র (কঙ্গনা রানাওয়াৎ) যে সর্বক্ষণের সহায়ক সেই জুলফি (সহর্ষ কুমার শুক্লা) নামে লোকটির কথাই ধরুন। দল বেঁধে নদী পার হতে গিয়ে জাপানি বোমারু বিমান হানায় বোধহয় মরেই গেলেন তিনি। পরের দিকে সেরকম কী যেন একটা বলাও হল কোথাও, যে জুলিয়ার কস্টিউমের বাক্স সামলাতে গিয়ে বিমান হানার চোটে মাঝ নদীতে ভেসে গিয়েছে জুলফি, আর জুলিয়া তো সেটা শুনে কেঁদে-কেটে হল শেষ। ওমা, তারপর দেখি সেই লোকটাই দিব্যি পৌঁছে গেল সেই কাংলাটোম্বি ক্যাম্পে সোজা গোপন বিদ্রোহীদের কাছে! নদীর অতলে তলিয়ে না গিয়ে হিংস্র প্রকৃতির সঙ্গে যুঝতে যুঝতে দৃশ্যত দুর্বল নারীসুলভ জুলফি এন্তার সব লটবহর সঙ্গে নিয়ে ওই এতদূর অবধি এসে পৌঁছলেন কী করে, শুধু তার কোন ব্যাখ্যা, কোন ক্লু রইলো না কোথাও।

বিশেষ করে যখন সবে এটা দেখে উঠেছি যে এই পথটুকু পাড়ি দিতে গিয়েই দম ফেটে শেষ অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছবির হিরো-হিরোইন জুলিয়া আর নবাব মালিক (শাহিদ কাপুর) – এই দুজন লোকের।

ছবির কোনখান থেকে মেদ মজ্জা খুলে খুলে নেওয়া হয়েছে জানি না। শুধু টের পাচ্ছিলাম কয়েকটা ব্যাপার ঠিক ধরতে পারছি না যেন। আকবরি আফিমের সঙ্গে এপিডেমিক ছড়ানোর কোন সম্পর্ক আছে কিনা, সেটা যেমন তার মধ্যে একটা। বা জুলিয়া যখন তার পিঠ-কোমর সব খুলে দ্যাখায়, সেই সিনগুলোয় তার পেছন দিকে কোমরের ঈষৎ ওপরে সেই প্রায় চাবুক খাওয়ার দাগের মতো স্থায়ী হয়ে থাকা দাগটা, সেটার কোন আলাদা মানে আছে কিনা। শুধু মনে হচ্ছিল, এগুলোর আড়ালে আড়ালে অনেক গল্প যেন শেষ অবধি লুকিয়ে রয়ে গেল, ছবির এই কাট-ভার্সন দেখে যার কোন কিচ্ছু জানার উপায় নেই।

বা যখন জুলিয়া ঘন বনে চক্কর কাটছে নবাব মালিকের সঙ্গে। জুলিয়া হারিয়ে গেছে, মরেই গেছে হয়তো বা, এটা শোনার পর কী হল তার বাঁধা-বাবু রুসি বিলিমোরিয়ার (সইফ আলি খান) হাল? হাল বলা তো দূরের কথা, ছবিতে এইসময় একটানা বেশ অনেকক্ষণ রুসির কোন ফুটেজ অবধি নেই!

আরও একটা মুশকিল কী হচ্ছে শুনুন। উনিশশো তেতাল্লিশের সেই অতি দুর্গম ইন্দো-বার্মা বর্ডার এলাকা এরিয়া হিসেবে যত ভয়ানকই হোক না কেন, একেকটা সময় তো প্রায় মনে হচ্ছিল ছবির লোকজনের কাছে জায়গাটা বোধহয় চেনা সেই এপাড়া-ওপাড়া টাইপ! এই ধরা পড়ছি শত্রুপক্ষের হাতে, আবার এই ওদের থেকে ছাড়া পেয়ে নিজের দলে ফেরত যাচ্ছি দিব্যি। এই আছি ব্রিটিশ বাহিনির সঙ্গে, তো এই সাঁকো পেরলেই পৌঁছে যেতে পারবো আজাদ হিন্দ ফৌজের কাছে। সবটা যেন আগে থেকে গুগল ম্যাপ দেখে ছকে রাখার মতো ব্যাপার! অসুবিধে হলে যেন সেলে একবার কল করে নিও ভাই! এখন এই ব্যাপারটা ডিরেক্টর ভিশাল ইচ্ছে করেই ছবির মধ্যে পুরে দিয়েছেন নাকি বেখাপ্পা কাটতে যাওয়ার ফলে ছবির মেজাজ শেষটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা হলফ করে বলতে পারা মুশকিলের।

এমনিতে এই ছবিটা তো রিয়্যালিটির মাটিতে দাঁড়িয়ে একটা অন্য মিউজিক্যাল এক্সটেনশনের মতো। তাই যুদ্ধের পটভূমিকায় ছবি হলেও ছবি জুড়ে একটার পর একটা শুধু গান আর নাচের বাহার। ছোট-বড় মিলিয়ে এমনি গানের সংখ্যা প্রায় এক ডজনের মতো। তার সঙ্গে আবার বার তিনেক জন-গণ-মন গানের আজাদ হিন্দ ভার্সন ‘শুভ সুখ চয়ন’। ছবির ঘরানাটাই এমন বলে এগুলো নিয়ে আলাদা করে প্রশ্ন তোলার মানেই হয় না, উলটে গান-নাচের সিকোয়েন্স শুরু হলেই দেখছিলাম অটোম্যাটিক্যালি মনটাকে কে যেন ঠেলে ‘সাসপেনশন অফ ডিসবিলিফ’ মোডে পাঠিয়ে দিচ্ছিল সোজা। যে, চোখের সামনে যা দেখছি কিছুই যেন অবিশ্বাসের নয়। যেটুকু রিয়্যালিটি নয়, সেটুকু বা যেন সেই সাররিয়্যালিটির পার্ট।

আরও পড়ুন:  অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ছেড়েছিলেন ঘর ! প্রয়াত ইন্দর কুমারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ প্রাক্তন প্রথম স্ত্রীর

ছবির এই জায়গাগুলো এমন মুন্সিয়ানায় তৈরি যে মনেই হয় না দেশের সরকার যুদ্ধ চলার সময় সত্যি সত্যি হিন্দি সিনেমার নামী হিরোইনকে যুদ্ধক্ষেত্রে নাচতে পাঠায় কিনা। কিংবা মুহুর্মুহু বোমারু বিমান হানায় শয়ে শয়ে লোক মরছে যেখানে সেখানে রাতের বেলা সত্যি অমন বিশাল করে মঞ্চ সাজিয়ে হুল্লাট ওই নাচের আসর বসে কিনা। বা ভয়ংকর অচেনা জঙ্গলে ভাঙা বাড়িতে বৃষ্টিভেজা রাতে অতগুলো মোম জ্বালিয়ে রেখে সত্যি অমন প্রেমের উদযাপন কখনো কেউ করতে পারে কিনা।

আর জঙ্গলে কাদার মধ্যে শুয়ে যখন আবেশে মাখামাখি হয়ে যায় জুলিয়া আর নবাব মালিকের শরীর, তখন একবারও তো মনে হয় না, অচেনা এক রণক্ষেত্রে আদৌ কেউ পথ হারিয়ে ফেলেছে বলে।

ছবির ক্লাইম্যাক্সের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়ে তো পুরোপুরি মিউজিক্যালই হয়ে গেল ছবিটা। যেখানে গুলি-গোলা-অ্যাকশন সব নাচের আর গানের মধ্যে দিয়েই হবে। যেখানে সত্যি সত্যি কল্প-দুনিয়ার সুপার-নায়িকা হয়ে উঠে ব্রিটিশের ট্রেন একলা থামিয়ে সব্বাইকে ঘায়েল করে নবাব মালিককে উদ্ধার করবে মিস জুলিয়া একাই।

মনে মনে সেইসময় থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলাম ভাগ্যকে। এমনও তো হতেই পারতো যে এই ‘অ-বাস্তব’ সিনগুলোকে বুঝতে না পেরে ছবি স্লিম-ট্রিম বানাতে গিয়ে এগুলোকেও কেটেকুটে জাস্ট উড়িয়ে দিল মহাজ্ঞানী সেই প্রোডাকশনের লোক। কী ভাগ্যি যে, এখানে তেমন কিছু হয় নি! কী ভাগ্যি যে ছবির শেষে তুমুল সিনেম্যাটিক রেঙ্গুন ব্রিজের সিনটাও অক্ষত আছে পুরো। দুজন পুরুষের থাবার মধ্যে আটকে থাকা যৌবনবতী কন্যার মন উচাটন হয়ে ওঠার গল্প তো এর আগে অগুন্তিবার শুনিয়ে এসেছে সিনেমা। কিন্তু দুই পাহাড়ের মাঝখানে ঝুলতে থাকা নড়বড়ে রেঙ্গুন ব্রিজের ওপর ভরদ্বাজী মাখার গুণে সেই মশলাটাই যে এসে পুরো অচেনা টার্ন নিল।

রিলিজের সেকেন্ড উইকে পৌঁছে গিয়ে ভিশাল-এর এই ছবিটাকে বলা হচ্ছে বক্স অফিসের মহা-ডিজাস্টার বলে। মুশকিল হচ্ছে জ্ঞানী-গুণী যে সব ক্রিটিক এখন এসব বাণী ছাড়ছেন, তাঁরা কেউ কিন্তু একটা লাইনও লিখছেন না যে, আগের পনের বছর ধরে যে ছবিগুলো বানিয়ে এলেন ভিশাল, তার মধ্যে পয়সার নিরিখে কোন ছবিটা সুপার সাকসেসফুল ছিল! নাকি এবারেরটা বানাতে খরচ হয়েছে অনেক বেশি, বলেই বক্স অফিসের ধসটা এত বেশি লাগছে চোখে?

বড় বাজেট নিয়ে পিরিয়ড পিস বানাতে গেলেই যে ছবি হিট হয়ে যাবে, এমন আশা করার মধ্যেই তো একটা গভীর গামবাটপনা আছে! ‘বোম্বে ভেলভেট’ (২০১৫) তো বেশিদিন আগের কথা নয়? রণবীর কাপুর আর অনুষ্কা শর্মার মতো স্টার, সঙ্গে ডিরেক্টর অনুরাগ কাশ্যপের পাঞ্চ। সেটার কপালে কী হয়েছিল, লোকে ভুলে-টুলে গেল নাকি? নাকি ১৯৪২ সালের সেই প্রেম কাহিনীটাকে দুর্দান্ত সব গান-টান দিয়ে আর ডি বর্মণ সেই কবে কোন কালে হিট বানিয়ে দিয়েছিলেন বলে সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা আর ভায়াকম ১৮ গ্রুপের দল-বল ভেবে নিয়েছিল যে কাট-পেস্ট সেই ফর্মুলাতে এই ’৪৩ সালের প্রেম-কাহিনীও উতরে যাবে ঠিকই!

একবারও তখন এটা মনে হল না যে, সেই আগের ছবিটা ছিল খুব সরল করে ভারত বনাম ব্রিটিশ যুদ্ধের গল্প! সেটার সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজে লুকিয়ে রসদ পৌঁছে দেওয়ার এই মার্জিনাল থিমটার তুলনা হয় কোন? এই গল্পটা ঠিকভাবে বুঝতে গেলে মিনিমাম যে হিস্ট্রি জ্ঞানটা থাকার দরকার, সেই জ্ঞানটাই বা এখন কটা পাবলিকের আছে?

নির্বোধ জনতাকে আমোদে ভুলিয়ে বেওসা করতে গেলে তো শেষে ধরে-বেঁধে সেই ‘সুলতান টু’ কিংবা ‘ডন থ্রি’ বানানোই ভাল। সেই বিজনেস, সেই ইমপ্যাক্ট এই ‘রেঙ্গুন’ দিয়ে হয় কি কখনো, পাগল?

‘রেঙ্গুন’ হল দীর্ঘ মেয়াদ পেরিয়ে টিকে যাওয়ার মতো ছবি। অনেকদিন পরেও খোঁজ পড়বে যে ছবিটার। সুভাষবাবুর প্যারালাল ফ্রিডম মুভমেন্ট নিয়ে মেনস্ট্রিম বলিউডের ‘টেক’ কী ছিল, সেটা জানতে গবেষকেরা নতুন করে দেখতে বসবেন যেটা।

ও হ্যাঁ, কেটে ফেলে দেওয়া সেই সতের মিনিট তখন না ফের নতুন করে খুঁজে বের করতে হয়, স্যর!

Sponsored
loading...

NO COMMENTS