-‘তুমি আমায় ভালবাস?
-‘খুব…খ-উ-ব|’
-‘তাহলে তোমার হাতের ওই আংটি কেন?’

 

মুহূর্তে চাঁপাকলির মতো আঙুল থেকে আংটি খুলে বিসর্জিত আরব সাগরের জলে | সমুদ্র নাকি সব ফিরিয়ে দেয়, কিচ্ছুটি নেই না | সেদিন কেন, কে জানে সাগরের নোনা ঢেউয়ে দুলতে দুলতে আংটি ঠাঁই নিয়েছিল জলের আড়ালে | ফিরতি ঢেউ আর সেই উপহার ফিরিয়ে দেয়নি মেয়েটিকে |

শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন ‘দেবদাস’ লিখেছিলেন পাঠক(পড়ুন মহিলা পাঠক) গোগ্রাসে গিলে নাকি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলেছিল, এমন কেন সত্যি হয় না! আহা! অলক্ষ্যে বসে বিধাতা পুরুষ সেদিন বোধহয় মুচকি হেসেছিলেন | কারণ? তিনি জানতেন, এর কয়েক দশক (নাকি শতক) পরেই ‘জ্যান্ত দেবদাস’ আসছেন ধরাধামে!

রাজেশ খান্না | বিধাতা পুরুষের বহু যত্নে গড়া জ্যান্ত ‘দেবদাস’ | সপ্রেম চাহনি | ঠোঁটের কোণে চিলতে মোহন হাসি | খাটো নাক | ঈষৎ ঘাড় বেঁকিয়ে কটাক্ষ | মদনদেবের যাবতীয় প্রেমশর গুরু পাঞ্জাবির পকেটে পুরে বড় পর্দায় যখন আসতেন রাজেশ, প্রেমে পড়ার জন্য ছটফট করতেন মেয়েরা |

তার নমুনা লেখার শুরুতে বলা সংলাপ | ৩৩ বছরের রাজেশের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলেন ১৬-র ডিম্পল কাপাডিয়া | সেই প্রেমের নীরব সাক্ষী ওই কথোপকথন | সেই গল্প পরে |

আবার একটু ফিরে যাওয়া যাক দেবদাস-এ | এমন কী ছিল দেবদাসের মধ্যে? কন্দর্পকান্তি চেহারা? একেবারেই না | ব্যারিটোন ? উঁহু | তাহলে? দেবদাস ভালবাসতে জানত | বিরহের হাহাকার জানত | প্রেমের তাপে জ্বলতে জ্বলতে, গলতে গলতে, সুরার তরলে ঝাঁপ দিয়ে জুড়োতে চাইত | নেশায় চুর হয়েও কিন্তু কোনদিন প্রেয়সীর নাম দেবদাসের ঠোঁট-মন থেকে মোছেনি – এইগুলো ভীষণভাবে ছিল রাজেশ খান্নার মধ্যে |

চাপা নাক, ঈষৎ পুরু ঠোঁট, চোখ-মুখ বেয়ে চুঁইয়ে পড়া সেই রোমান্টিসিজমের দৌলতেই ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত বলিউডের ‘মুকুটহীন সম্রাট’ তিনি | মেয়েদের বালিশের নীচে রাজেশের ফটো | ১৯৭৬-এ যখন রাজেশ-ডিম্পল গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন প্রায় শতাধিক মেয়ে নাকি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন! রাজেশের ফটকে সামনে রেখে সে সময়ের বহু মেয়ে নাকি সিঁথিতে সিঁদুর পরতেন !

আরও পড়ুন:  বয়সে ২০ বছরের বড় স্বামীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হওয়াই আশীর্বাদ হয়ে এল অষ্টাদশীর কাছে

রাজেশকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই মিথ রাজেশ নিজেই আরো উস্কে দিয়েছিলেন রোজের যাপিত জীবনে | ডিম্পলের আগে রাজেশের জীবনে এসেছিলেন অঞ্জু মহেন্দ্র |সাত বছর রাজেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে ভালোবেসেছিলেন | এক সময় সেই প্রেম ফুরিয়েছিল | রাজেশের মদমত্ততা, ইয়ার-দোস্তের হুল্লোড়ের ভিড়ে একটু একটু করে মুছতে শুরু করেছিলেন অঞ্জু | অনেকবার অনেকভাবে রাজেশকে প্রেমপাশে নতুন করে বাঁধতে চেয়েছিলেন | সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আর আসেনি | অঞ্জু রাজেশের জীবনে কি ‘চন্দ্রমুখী’ ছিলেন?

এর পরই ডিম্পল অধ্যায় | ‘ববি গার্ল’ প্রথম ছবিতেই তুবড়ির মতো জ্বলেছিলেন | সেই আলোয় ধাঁধিয়েছিলেন রাজেশ | আর রাজেশের প্রতি ডিম্পলের অনুরাগ? সে তো কিশোরীবেলা থেকে! তাই রাজেশ যখন নিঃশর্ত প্রেমের পরীক্ষা নিয়েছিলেন, আঙুল থেকে ঋষি কপূরের দেওয়া আংটি খুলতে সময় লাগেনি ডিম্পলের |

১৯৭৩ – ’৮৪ দেবদাস-পার্বতীর প্রেমের কাল | এখানেই ছোট্ট ভুল দুজনের | উপন্যাসের দেবদাস ঔপন্যাসিকের দূরদর্শিতায় কখনো ছুঁতে পায়নি পারকে | রাজেশ ভালবাসার আশ্লেষে ভোগের আরতি সাজিয়েছিলেন ডিম্পলকে ঘিরে | তাই ভোগ যখন শেষ হলো, ভাটার টান প্রেমের জোয়ারে | ১৯৮৪-তে দুই মেয়ে রিঙ্কি আর টুইংকল খান্নাকে নিয়ে যখন ‘আশীর্বাদ’ ছেড়েছিলেন ডিম্পল, ব্যথা ভুলতে মদ-এ ডুব দিয়েছিলেন রাজেশ |

ডিম্পলহীন ‘আশীর্বাদ’-এ তখন এবেলা-অবেলা সুরা আর সাকির নিত্য আনাগোণা | সকালে মুমতাজ এলে সন্ধেয় শর্মিলা ঠাকুর | দুজনের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে ‘রং রলিয়া’ মানাতেন রাজেশ | একজন আরেকজনের উপস্থিতি কদাচিৎ টের পেলেই বাংলোয় ধুন্ধুমার কাণ্ড! এরই মাঝে টিনা মুনিম | বেশ কিছু বছর লিভ ইন | দুজনে নাকি একে অপরের ব্রাশ ব্যবহার করতেন | পরনের পোশাকও! সেই প্রেমও টিকলো না | কেন? ডিম্পলের স্মৃতি যে সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরত রাজেশকে!

অনেকেই রাজেশের এই আচরণকে বলতেন স্বভাবের দোষ | প্রেমীমন বুঝত, রাজেশ যা করতেন সবটাই ‘অভাবে’ | আসলে রোমান্স থাকলে বিরহ থাকবে | হাহাকার থাকবে বুক জুড়ে | আর ধিকিধিকি জ্বলবে মৃত্যু আকাঙ্খা | দেবদাস তিলে তিলে নিজেকে ঠেলে দিয়েছিলেন মৃত্যুর দিকে | রাজেশ খান্না ঘুরেফিরে মৃত্যু দৃশ্যে অভিনয় করেছেন ‘আনন্দ’, ‘আরাধনা’, ‘সফর’, ‘আন্দাজ’, ‘নমকহারাম’ ছবিতে |

আরও পড়ুন:  খোলা মঞ্চে পোশাক বিভ্রাটের হাত থেকে দিশা পাটানিকে রক্ষা করলেন বয়ফ্রেন্ড টাইগার শ্রফ!?

অনেক রটনা, বহু ঘটনা রাজেশকে নিয়ে | রাজেশের নায়িকাদের নিয়ে | রাজেশ কিন্তু তাঁর রিল লাইফ ঘরনিদের রিয়েল লাইফে কখনো অসম্মান করেননি | বরং আন্তরিকতার উষ্ণতায়, বন্ধুত্বের চাদর দিয়ে যত্নে মুড়ে রেখেছিলেন তাঁদের | ‘রোটি’ ছবিতে মুমতাজকে কাঁধে তুলে বেশ কিছু দূর যাওয়ার দৃশ্য ছিল | রাজেশ চলে যাওয়ার পর মুমতাজ সেই স্মৃতি ভাগ করে জানিয়েছিলেন, “প্রায় ৮ বার কাঁধে চড়েছিলাম কাকাজির | রোজ শ্যুটের আগে মজা করে বলতেন, এ মোটি, চল আজা | সঙ্গে সঙ্গে এক লাফে ঘাড়ে চড়তাম | বরাবরই আমি গোলগাল | লম্বায় ৫ ফুট ৭ | এই চেহারাকে আটবার কাঁধে তলার পর কাকাজির কাঁধে লালচে দাগ হয়ে গিয়েছিল | আমি দেখে মজা করে বলেছিলাম, আপ কি কান্ধে মে ইয়ে দাগ ক্যায়সা? ইজ ইট লাভ বাইট? কাকাজি মিটিমিটি হাসতেন |”

এভাবেই হাসি-মজাক-রোমান্টিসিজম-এর দিন এক সময় ফুরিয়েছে | মাটির দুনিয়ার ‘দেবদাস’ ফুরিয়ে আসছেন ধীরে ধীরে | অমিতাভ বচ্চন যুগ শুরু হয়েছে | নরম পেলবতা সরিয়ে তখন হুজুগ ‘রাফ এন্ড টাফ’কে নিয়ে | ‘আশীর্বাদ’-এ বসে নিজের শেষদিন চেয়ে চেয়ে দেখেছেন কাকাজি | হয়তো উপভোগও করেছেন | কারণ, প্রেমিক মন তো শুধু মিলনে তৃপ্ত হয় না | যন্ত্রণায় রক্তাক্ত হতে হতে তার মধ্যেও জীবনের রসদ খোঁজে | অশক্ত শরীর | কাবু মন | তবু ‘শান’ যায়নি শেষ দিনেও |

১৮ জুলাই | রাজেশ খান্নার বাংলোর বাইরে, ভিতরে কালো কালো মাথার ভিড় | ভেজা চোখে সবাই দেখতে এসেছেন ‘দেবদাস’ রাজেশ খান্নার চলে যাওয়া | রাজেশকে শেষবারের মতো ছুঁতে এসেছিলেন ডিম্পল | উপন্যাসের ‘পারো’ যেটা পারেনি | শেষ দেখার ভেতর দিয়ে প্রথম দেখার অনুভূতি ফিরে পেয়েছিলেন ডিম্পল? ফিরে পেয়েছিলেন সেই দিনটিকে? যেদিন রাজেশকে গ্রহণ করতে গিয়ে হাতের আংটি খুলে মুছেছিলেন ঋষির স্মৃতি!

রাজেশ খান্নাকে বলিউডের অনেকেই ‘জীবন্ত দেবদাস’ বলে ডাকতেন | অনেকে মিল পেতেন ট্রাজেডি কিং গুরু দত্তের সঙ্গে | প্রেম-বিরহে এমন দুরন্ত সহবাস এক মানুষের জীবনে খুব কম দেখা গিয়েছে | এই সহবাস যেমন ঋদ্ধ করেছে, তেমনই দগ্ধ করেছে রাজেশকে | তিলে তিলে | মৃত্যুর কিছুদিন আগে আর বাল্কির একটি বিজ্ঞাপনে শেষবার ক্যামেরামুখী হয়েছিলেন কাকা | সেই বিজ্ঞাপনে সগর্বে বলেছিলেন, “মেরা ফ্যান মুঝসে কোই নহি ছিন সকতা” | দু’শো শতাংশ সত্যি সেই কথা | বলিউডের প্রথম ও শেষ সুপারস্টারের তকমার দখলদার একজনই – রাজেশ খান্না | যাঁর জীবনগাথা সাঙ্গ করে মনে হবে এ যেন ‘অধুরী কাহানি’ | কিংবা ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’ |  এবং ‘জীবন্ত দেবদাস’কে নিয়ে কেন কোন পরিচালক আরেকবার ‘দেবদাস’ বানানোর সাহস দেখালেন না!?

আরও পড়ুন:  নিজের পরবর্তী ফিল্ম 'ফ্যানি খান'-এ মাধবনকে নেওয়ায় খুব একটা খুশি নন ঐশ্বর্য!?

4 COMMENTS