অতনু ভট্টাচার্য
অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক | পাঠদানের মূল বিষয় সংস্কৃত ও বাংলা | পড়ানোর পাশাপাশি গভীর আগ্রহ ভারতীয় সংস্কৃতি এবং সনাতনী ধর্মের নানা শাখাপ্রশাখায়, ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ গড়ার ফাঁকে তাঁর অবসর যাপনের মূল উপজীব্য বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি |

হিন্দু সমাজে ভাই-বোনের সম্পর্ক সুদৃঢ় করার প্রয়াসেই সেই প্রাচীনকালে প্রচলিত হয়েছে রাখীবন্ধন বা রক্ষাবন্ধন উৎসব | এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারস্পরিক প্রীতি ভালবাসা ও দায়িত্ববোধ | শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায় বোন ভাইয়ের হাতে রাখী পরিয়ে দেয় | অনেক সময় সহোদর ছাড়াও অন্য পুরুষকে হাতে রাখী পরিয়ে ভ্রাতৃত্বে বরণ করার প্রথা প্রচলিত পৌরাণিক যুগ থেকে | তবে হিন্দু ছাড়াও জৈন ও শিখদের মধ্যে এই প্রথার চল আছে | প্রধানত ভারত, নেপাল ও মরিশাসে এই প্রথা প্রচলিত হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সব জায়গায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোক রয়েছে সেই সব দেশে রাখী বন্ধন সোহৎসাহে পালন করা হয় |

রাখীবন্ধন বিষয়ে অনেক পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনি প্রচলিত আছে | ভবিষ্যপুরাণ থেকে জানা যায় একবার দেবতা ও অসুরদের যুদ্ধকালে আকাশ, বৃষ্টি ও বজ্রের দেবতা ইন্দ্র অসুররাজ বলি কর্তৃক অপমানিত হন | তখন ইন্দ্রাণী শচী বিষ্ণুর কাছে পরামর্শের জন্য গেলে ভগবান বিষ্ণু, শচীদেবীকে একটি সুতীর পবিত্র বালা দেন এবং স্বামী ইন্দ্রর শুভ কামনায় শচী তা ইন্দ্রের হতে বেঁধে দেন | এরপর ইন্দ্র অসুরদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন | রক্ষাকবচ হিসেবে এই পবিত্র বালাই পরবর্তী কালে রক্ষাবন্ধনে উৎসাহিত করে |

পরে আর একবার দেবরাজ ইন্দ্র অসুররাজ বলির কাছ থেকে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল জয় করে নিলে বলি বিষ্ণুকে তাঁর প্রাসাদে অবস্থান করার প্রার্থনা করে| তখন বিষ্ণু ‘তথাস্তু’ বলেন | কিন্তু এই ঘটনা দেবী লক্ষ্মীর মনঃপুত হয় না | এ যেন বলি বিষ্ণুকে তাঁর প্রাসাদে বন্দি করে রেখেছেন বলে মনে হয় | তাই দেবী লক্ষ্মী বৈকুণ্ঠে ফিরে যান ও ভাবতে থাকেন কীভাবে বলিরাজের সঙ্গে বিষ্ণুর সখ্যতা বা তার প্রাসাদে থাকা বন্ধ করা যায় | শেষে লক্ষ্মী বলিরাজের হাতে রাখী পরিয়ে তাকে ভ্রাতৃত্বে বরণ করে নিলেন | বলিও তখন লক্ষ্মীর পছন্দমতো উপহার দিতে চাইলে লক্ষ্মী বলেন, তাঁর প্রাসাদ থেকে বিষ্ণুর মুক্তি | বলি তাতে সম্মত হয়ে লক্ষ্মীকে ভগিনীর মর্যাদায় ভূষিত করেন |

আরও পড়ুন:  'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেত্রী হতে পারেন‚ কিন্তু বাকিরা চাকর নন'‚ ইস্তফা দিয়ে বিস্ফোরক মুকুল

গণেশ পুরাণের এক জায়গায় আমরা দেখি, একবার রাখীপূর্ণিমার দিন গণেশের বোন গণেশকে রাখী পরালে গণেশের দুই ছেলে শুভ ও লাভের ইচ্ছে হয় রাখী পরার | কিন্তু তাদের কোনও বোন না থাকায় তারা বাবার কাছে বোনের জন্য আব্দার করে | কিন্তু গণেশ সে কথায় কর্ণপাত না করায় ছেলেরা নিরাশ হয়ে পড়ে | শেষ অবধি দেবর্ষি নারদের অনুরোধে রাজি হয়ে গণেশ তাঁর দুই স্ত্রী ঋদ্ধি ও সিদ্ধির ভিতর থেকে দৈব তেজ আকৃষ্ট করে, তা থেকে এক কন্যার জন্ম দেন | তিনিই ‘সন্তোষী মা’ যিনি পরবর্তীকালে শুভ ও লাভকে রক্ষাকবচ হিসেবে রাখী পরাতেন | এ তো গেল পৌরাণিক দিক | রাখীর ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তও কম উল্লেখযোগ্য নয় |

গ্রীকবীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ কালে তাঁর স্ত্রী রোশানক পুরুরাজের বীরত্বের কথা শুনে ভীত হয়ে পড়েন ও স্বামীর প্রাণরক্ষার বিষয়ে চিন্তিত হন | এ সময় তাঁর কানে আসে এ দেশে প্রচলিত রাখীবন্ধন প্রথার কথা | তিনি গোপনে পুরুরাজকে রাখী পাঠান | এর পরের ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রে | কিছুতেই পর্যুদস্ত করা যাচ্ছে না দেখে পুরু তাঁর অন্তিম তথা ভীষণতম তীরটি আলেকজান্ডারকে লক্ষ্য করে ধনুকে জুড়ে জ্যাতে টান দিতে গিয়ে হঠাৎ হাতের কব্জিতে চোখ পড়তেই চমকে ওঠেন, সেখানে তো বোন রোশানকের দেওয়া রাখী বাঁধা ! পুরু তৎক্ষণাৎ তীরটি ভূমিতে ফেলে দিয়ে রাখী তথা বোনের মর্যাদা রক্ষা করেন |

এটা ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দের ঘটনা | এর বহু যুগ পরে ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে গুজরাতের সুলতান বাহদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করতে আসছেন শুনে চিতোরের বিধবা রানী কর্ণাবতী ভীত হয়ে বিজাতীয় জেনেও মোগলসম্রাট হুমায়ুনের কাছে রাখী পাঠান | রাখী পেয়ে হুমায়ুন তৎকালীন ভারতীয় প্রথা অনুসারে রানী কর্ণাবতীকে বোন হিসেবে গ্রহণ করে সৈন্য সামন্ত নিয়ে চিতোরের উদ্দেশে রওনা দেন | কিন্তু তাঁর পৌঁছতে একটু দেরি হয় | এই সুযোগে বাহাদুর শাহ চিতোর দখল করে দুর্গের ভিতর যখন প্রবেশ করেন তখন রানি কর্ণাবতী অসম্মানের ভয়ে ১৩০০০ রাজপুত রমণীকে নিয়ে একসঙ্গে জওহর ব্রত পালন করে অগ্নিতে আত্মাহূতি দিয়েছেন |

আরও পড়ুন:  বেকসুর খালাস রাজেশ-নূপুর‚ তবে কি নো ওয়ান কিল্ড আরুষি-হেমরাজ ?

(পুনর্মুদ্রিত )

NO COMMENTS