রুডিয়ার্ড কিপলিং যখন প্রয়াত হন তখন তিনি দু বছরের শিশু | দুজনের মধ্যে বহু মিল | দুজনেই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত | দুজনেরই জন্ম ব্রিটিশ ভারতবর্ষে | দুজনেই সাহিত্যিক | কিন্তু দুজনের লেখায় ভারতবর্ষ এসেছে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে | কিপলিঙের লেখায় যখন ভেসে আসে বর্ণবিদ্বেষের গন্ধ‚ তখন তাঁর লেখা ভরপুর বুনো ফুলের মাদকতায় | তিনি রাস্কিন বন্ড | ভারতকে‚ এর অরণ্যকে বোধহয় ভালবাসেন যেকোনও ভারতীয় বংশোদ্ভূতর চেয়েও অনেক বেশি |

রাস্কিনের বাবা এডিথ ক্লার্ক ছিলেন ব্রিটিশ রয়াল এয়ারফোর্সের কর্মী | কর্মরত পরাধীন ভারতে | কসৌলিতে জন্ম হয় রাস্কিনের‚ ১৯৩৪-এর ১৯ মে | তাঁর মা ছিলেন ওব্রে বন্ড | তিনি স্বামীকে ডিভোর্স করেছিলেন ১৯৪২-এ | তিন সন্তানকে নিয়ে ওব্রে ঘর বেঁধেছিলেন এক পাঞ্জাবি তরুণের সঙ্গে | ২০১৪ সালে প্রয়াত হন ওব্রে | আমৃত্যু ছিলেন লুধিয়ানায় |

রাস্কিনের যখন দশ বছর বয়স‚ মৃত্যু হয় তাঁর বাবা এডিথের | তাঁকে বড় করেন মা ও সৎ বাবা | তবে রাস্কিন গ্রহণ করেছিলেন মায়ের অবিবাহিত জীবনের পদবী | ভারতের বিভিন্ন শহর‚ জামনগর-শিমলা-দেরাদুনে ঘুরে ঘুরে বড় হয়েছেন তিনি | পড়াশোনা শিমলার বিশপ কটন স্কুলে | স্কুলজীবনেই ধরা পড়ে তাঁর সাহিত্যপ্রতিভা | মৌলিক রচনায় একাধিক পুরস্কার পেতে থাকেন | মাত্র ১৬ বছর বয়সে লিখেছিলেন প্রথম ছোটগল্প‚ আনটাচেবল |

স্কুলপাঠ শেষ করে রাস্কিন পাড়ি দিয়েছিলেন লন্ডন | থাকলেন | কিন্তু মন টিকল না | শেষে লিখে অর্থ উপার্জন করে যোগাড় করলেন প্যাসেজমানি | আবার ফিরে এলেন ভারতে | সেটা পাঁচের দশকের শুরু | তার আগে লন্ডনে বসেই লিখে ফেলেছেন প্রথম উপন্যাস‚ ‘ The Room on The Roof ‘ |

ততদিনে বুঝে গেছেন লেখালেখি ছাড়া তাঁর আর গতি নেই | দেরাদুন আর দিল্লিতে শুরু করলেন ফ্রিল্যান্সিং | সংবাদপত্র আর পত্রিকায় গল্প লিখতেন | যে কয়েকশো টাকা পেতেন‚ তাঁর চলে যেত |

একার বাউন্ডুলে জীবন কাটাতে গিয়ে থিতু হলেন মুসৌরিতে | জায়গাটার প্রেমে পড়ে গেলেন | তাছাড়া দিল্লিও বেশ কাছে | প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেও সুবিধে | ১৯৮০ সালে ভারতে এল সংস্থা পেঙ্গুইন | প্রকাশিত হল রাস্কিনের আর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ Vagrants in the Valley ‘ |

১৯৬৩ সাল থেকে রাস্কিন থাকেন ল্যান্ডরে | মুসৌরির পাশেই আছে পাহাড়ের কোলে সাজানো এই ছোট্ট জনপদ | সেই যে হিমালয় আর তার অরণ্যের প্রেমে মজেছিলেন রাস্কিন‚ তাকেই সঁপে দিয়েছেন মনপ্রাণ | তিনি অকৃতদার | থাকেন এক পরিবারের সঙ্গে | তাঁরা রক্তের সম্পর্কের কেউ নন | সেই পাহাড়ি মুখগুলোই এখন রাস্কিনের পরম আত্মীয় | বলেন‚ তিনি থাকেন অ্যাডপ্টিভ ফ্যামিলির সঙ্গে |

হিমালয়‚ তার শরীর বেয়ে অসংখ্য পাকদণ্ডী‚ সরলবর্গীয় আর পর্ণমোচী অরণ্য‚ তার ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ি গ্রাম আর তার সরল মানুষজন‚ সবাই রাস্কিনের লেখার এক একটি চরিত্র | ৫০ বছরের লেখক-জীবনে বড়গল্প‚ ছোটগল্প‚ উপন্যাস‚ ছোট উপন্যাস‚ প্রবন্ধসবরকম লিখেছেন তিনি | কখনও পাহাড়ি আঁধারে ভৌতিক পরিবেশ‚ কখনও পাকদণ্ডী চুঁইয়ে পড়া প্রেম‚ উঠে এসেছে তাঁর লেখায় | তিনি সেই মুষ্টিমেয় সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম যাঁর লেখা শিশু-কিশোরপাঠ্য সমান উপভোগ্য প্রাপ্তবয়স্কদের কাছেও |

৫০০-র বেশি ছোটগল্প লিখেছেন | ছোটদের জন্য আছে তাঁর ৫০ টি বই | কে ভুলতে পারে স্কুলজীবনে পড়া The Cherry Tree, Ranji’s Wonderful Bat বা The Blue Umbrella ! ভৌতিক সিরিজের মধ্যে অন্যতম Ghost Stories from the Raj, A Season of Ghosts এবং A Face in the Dark and other Hauntings | তাঁর লেখা একাধিকবার উঠে এসেছে বড় পর্দাতেও | ১৯৭৮ সালে তাঁর A Flight of Pigeons থেকে হয়েছে শ্যাম বেনেগালের জুনুন | ২০০৫ সালে বিশাল ভরদ্বাজ করেছিলেন ছোটদের ছবি দ্য ব্লু আমব্রেলা | ২০১১ সালে তাঁরSusanna’s Seven Husbands থেকেই হয়েছিল সাত খুন মাফ | The Rusty storiesথেকে দূরদর্শনে রূপায়িত হয়েছিল এক থা রাস্টি | Our Trees Still Grow in Dehra-র জন্য ১৯৯২ সালে সম্মানিত হন সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কারে | ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে ভূষিত হন পদ্মভূষণে |

হিমালয়কে ভালবেসে চিরতরুণ আছেন অশীতিপর রাস্কিন বন্ড | সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে তাঁর আবেদন জেমস বন্ডের থেকেও বেশি | বলা হয়‚ যদি ঘরে বসেই হিমালয়কে পেতে চাও তবে রাস্কিন বন্ড পড়ো | ৮৩ বছর পূর্তির জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য |

আরও পড়ুন:  কাচ চুরমার করে গাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল ঘোড়া‚ আটকে রইল দশ মিনিট !
- Might Interest You

NO COMMENTS