কপিলমুনির মন্দির

প্রায় বছর বারো আগে প্রথমবার সাগরদ্বীপে গিয়েছিলাম স্রেফ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্যেই | জুলাই মাস ঘোর বর্ষাকাল, এসপ্লানেড থেকে নামখানার বসে চেপে বসতে না বসতেই ঝেঁপে বৃষ্টি – স্ত্রী-পুত্র ছাড়াও সঙ্গে চলেছে সদ্য স্কুল মাস্টার হওয়া ঋতুপর্ণ | রোদে-জলে ওর সঙ্গে ছাতা থাকবেই – এবারও নড়চড় হয়নি | সকাল সাতটার বাস – হারউড পয়েন্টে পৌঁছতে লাগল ঘন্টা আড়াই – নামলাম যখন বৃষ্টি হালকা হয়েছে – ভ্যানরিক্সায় উঠে চারজন মিলে এক ছাতার তলায় গুঁতোগুঁতি করে বসলাম – যাব লঞ্চঘাট অবধি সেখান থেকে জল পেরিয়ে ওপাশে সাগরদ্বীপ |

কচুবেড়িয়াতে মাছ ধরা চলছে
কচুবেড়িয়াতে মাছ ধরা চলছে

যেখানে নামলাম জায়গাটার নাম কচুবেড়িয়া – জেলেনৌকো নিয়ে সবাই মাছ ধরতে ব্যস্ত | আমরা যাব সমুদ্রের দিকটা অর্থাৎ একেবারে অন্য প্রান্তে যেখানে কপিলমুনির মন্দির – আসল মেলাটা বসে | সরকারি লোকজন বা ভিআইপি হলে গাড়ি পাওয়া যায় – আমরা নেহাতই আম আদমি – লোকাল বাস-ই ভরসা – ঘন্টাখানেকের পথ – ভিড়-ভাট্টা প্রচুর, তবে গাঁ-গঞ্জের মানুষকে দেখেছি শহুরে লোকেদের থেকে একটা সম্ভ্রম মেশানো দূরত্ব বজায় রাখে | মাঝে মাঝে ছোট বড় লোকালয় পড়লেও গোটা রাস্তা সবুজ গাছপালা আর ক্ষেতখামার দেখতে দেখতে যাওয়া – আর দেদার পানের বরজ | এদিককার মিষ্টি পান-পাতা প্রসিদ্ধ |

বাস পৌঁছে দিল সমুদ্রের কাছেই – চারদিকে ছোটখাটো হোটেল আর ধর্মশালা – একটু ঘিঞ্জি ভাব, তবে কিছুটা গেলেই মন্দির তারপর ধূ-ধূ খোলা প্রান্তর ছড়িয়ে আছে বালিয়াড়ি ডিঙিয়ে সমুদ্র অবধি | মেলাটা বসে এখানেই | এর একপাশ থেকে শুরু হয়েছে মাছচাষের জন্য জলাজমি আর খাঁড়ি – সব মিলিয়ে বেশ মনোরম দৃশ্য | খাঁড়ির গা ঘেঁষে রয়েছে বড় বড় সুদৃশ্য একটা হোটেল – ‘লারিকা’ যেখানে আমরা থাকব |

এই খাঁড়ির ধারেই ছিল ‘লারিকা’ হোটেল
এই খাঁড়ির ধারেই ছিল ‘লারিকা’ হোটেল

তখনও সাগরদ্বীপে ইলেকট্রিসিটি ছিল না (এসেছে ২০১২ নাগাদ) তবে ঘরের জানলা-দরজা খুলে রাখলে সমুদ্রের হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যায় | এখানে চুরিচামারি বিশেষ হয় না তাই সেই ব্যবস্থায় হলো – তবে মানুষ না হোক প্রথম রাতে এক বেড়াল চোর আমার আর ঋতুপর্ণর ঘরে ঢুকে বেশ কিছু বিস্কুট নিয়ে পালিয়েছিল |

আরও পড়ুন:  মনের হাট পুকুরে : উষসী চক্রবর্তী

3[1]
বৃষ্টির মধ্যেই খদ্দেরের আশায়
জানুয়ারি মাসের সেই উত্তাল জনস্রোত না হলেও সাগরদ্বীপে সারা বছরই পূন্যার্থীদের আনাগোনা লেগেই থাকে | খোলা আকাশের নিচে গোল হয়ে বসে পুজোআচ্চা-ভোগ বিতরণ-হরির লুঠ-জলে ভাসানো – সব চুকিয়ে-বুকিয়ে দিনে দিনেই ফিরে যায় সবাই |মন্দিরের আশেপাশে দোকানপাটের ছড়াছড়ি – চন্দন,সিঁদুর,জবাফুল,শিবলিঙ্গ,তামার ঘটি-থালা, ছোটখাট ঝুড়িতে সাজানো | সমুদ্রের জল ভক্তিভরে নিয়ে যায় অনেকে – তার জন্যে জেরি-ক্যান মজুত |

4
ব্রজেন খ্যাপা

আশেপাশে সাধুদের ছোট ছোট ঝুপড়ি, ভেতরে তেড়ে গাঁজায় দম দেওয়া চলছে | অনেকেই বোমভোলা হয়ে ঘুরে বেড়ায় যত্রতত্র – এরকম দু-একজনকে পাকড়াও করে এঁকে ফেললাম | ব্রজেন খ্যাপা বলে একজন ‘পোজ’ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনর্গল নিজের কথা বলে গেল – অত কান দিলাম না | সমুদ্রের ধারে বালির ওপর প্রচুর লাল কাঁকড়া – বাচ্চারা সুতো নিয়ে একটা দিক কাঁকড়ার পায়ে অন্যটা বালিতে একটা কাঠি পুঁতে সেটাতে বেঁধে ছেড়ে দেয় – কাঁকড়াগুলো তখন ওই কাঠির চারদিকে গোল হয়ে ঘুরতে থাকে – ওটা একটা মজার খেলা | কাছাকাছির মধ্যে বেশ কিছু ছেলেছোকরারাও দু’হাত দিয়ে কেবল বালি সরিয়েই চলেছে – সকাল থেকেই এটা চোখে পড়ছিল – আবার কোনও খেলা নাকি? জিজ্ঞেস করে জানলাম হরির লুঠের যে সমস্ত পয়সা ছড়ানো হয় সেগুলো খুঁজে বের করার এ এক প্রাণান্ত কসরৎ |

সমুদ্রের ধারে দোকান সাজানো
সমুদ্রের ধারে দোকান সাজানো

দিনভর ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকা মন্দ হলো না – ঋতুপর্ণও কিছু কিছু আঁকছিল তবে ওর বেশি নজর আমি কী করছি, কীভাবে করছি সেদিকে – এ ব্যাপারে চিরকাল ও একজন ঘোরতর উত্সাহী ছাত্র |

আড্ডায় মশগুল দুই পাণ্ডা
আড্ডায় মশগুল দুই পাণ্ডা

কপিলমুনির মন্দির বেশ রঙবাহারি – জম্পেশ দেখতে | এঁকে নিয়ে ভেতরে গেলাম পাথরের মূর্তিগুলোকে প্রণাম করতে | পুজো দেব না জেনেও পাণ্ডারা ঘুরে ঘুরে দেখালো – বলে এলাম আমার ছবির মধ্যেই যাবতীয় ভক্তিভাব উজাড় করা আছে – চিন্তা নেই |

Sponsored
loading...

NO COMMENTS