বাংলালাইভ রেটিং -

নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না প্রায়। দক্ষিণ কলকাতার ‘প্রিয়া’ সিনেমা হল, সকাল এগারোটার শো, ‘সহজ পাঠের গপ্পো’। রিলিজের পর ফোর্থ উইকে সেখানে গিজগিজ করছে ভিড়! কাল যখন ‘বুক মাই শো’ থেকে ‘পি ভি আর’ বুক করতে গেছি, দেখি পুরো অডিটোরিয়ামে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেরে কেটে তিনটে কি চারটে সিট ফাঁকা। সেগুলোও সব একটা-একটা ফাঁকা সিট, কোথাও পাশাপাশি দুটো সিট ফাঁকা নেই, মানে ওই সিটগুলো একটা সিট বলেই তখনও ফাঁকা রয়ে গেছে!

Banglalive

যে কথাটা লিখে এই লেখাটা শুরু করেছি। নিজের চোখে দেখে তো এসব বিশ্বাস করতে পারি না ভাই। বাংলা সিনেমা এরকম আবার হয় নাকি? তার ওপর নতুন ডিরেক্টর, কোন স্টার নেই সিনেমায়। লাচা-গানা-ফুলটু মস্তি কিছুই তো নেই বলেই জানি এটায়।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলা বাজারে অভিজিৎ সাহা নামে এই প্রোডিউসারের নাম তো বোধহয় কেউ শোনে নি কখনও আগে। ঘাঘু শাঁসালো প্রোডিউসার হলে কী হয়, সব জায়গায় মেন মেন লোকের সঙ্গে সেটিং করা থাকে। মিডিয়া ম্যানেজ করা থাকে এমনভাবে যে সিনেমা যে রকমই হোক না কেন, লাগাতার সেটা নিয়ে ভালো ভালো কথা ছাপতে থাকবে কাগজে। সিনেমা হল-এর সঙ্গে সেটিং থাকে এমন যে ভালো ভালো শো টাইম সেই ছবির জন্যে বাঁধা। কিন্তু এ ছবির এ লোক তো নতুন প্রোডিউসার, এর তো লাইনে এখনও তেমন সেটিং হয় নি বলেই জানি।

পয়সা দিয়ে মিডিয়া কিনে সাজানো প্রচার নেই। ভালো ভালো রিলিজ চেনে জুতসই শো টাইমে ছবির স্লট বেঁধে রাখা নেই। পেটোয়া টিভি চ্যানেলে একটানা নিজের ঢাক নিজে পেটানো নেই। তবু একটা সিনেমা এরকম লাগাতারভাবে চলতে পারে নাকি?

ছবিটা এর মধ্যে আমার মোট দু’বার দ্যাখা। দ্বিতীয়বার দেখছি যখন, টের পাচ্ছি কেমন একটা নেশার মত লাগছে। ছবির ফ্রেমগুলো তো তখন সব চেনা, কীসের পরে কী হবে সব জানি। কোথাও আর কোন চমক লুকিয়ে নেই তখন। কিন্তু তারপরেও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে অদ্ভুত একটা আবেশ লাগছে চোখে। সেই আবেশটা আসছিল ঠিক কেন?

পুরো জীবনখানা কালি-ঝুলি মাখা শহরে বসেই কাটিয়ে দিলাম, আর তাই স্ক্রিনে এরকম টাটকা সবুজ গ্রাম দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি, এটা কি এর একটা ব্যাখ্যা হতে পারে?

ছবি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, ছবিটার কতটা সত্যি আর কতটা মিথ্যে মিথ্যে শুট? ছবির শেষে এন্ড ক্রেডিটে রেন মেশিনের ক্রেডিট দেখতে পেয়েছি। আচ্ছা, ছবির ওই চরম সব বৃষ্টি সিকোয়েন্সগুলো কি তার মানে রেন মেশিনে ক্রিয়েট করা নকল বৃষ্টি নাকি? এর উত্তর আমার কাছে নেই। শুধু জানি যখন বৃষ্টির ওই সিনগুলো হচ্ছিল, তখন একটুও মনে হয় নি নকল সিন বলে, মনে হচ্ছিল আমি নিজে গিয়ে ওই গ্রামে বৃষ্টির মধ্যে বসে রয়েছি যেন।

থ্রি-ডি তো এখন ডেটেড হয়ে গেছে, হালে এসেছে সেভেন-ডি’তে সিনেমা দ্যাখার যুগ। গলা-কাটা টিকিটের দাম খসিয়ে হল-এ ঢোকার পর যেখানে নাকি বৃষ্টির সিনে সত্যি সত্যি আপনার গায়ে জলের ছিটে লাগবে এসে। এখানে কিন্তু স্প্রিঙ্কলার দিয়ে জল ছেটানোর তেমন কোন আলট্রা মডার্ন কেতার বালাই নেই। কিন্তু তবু এরকম অদ্ভুত জীবন্ত একটা ফিলিং আসছে কেন? সেটা কি ওই বৃষ্টির তীব্র শব্দওয়ালা সাউন্ড ট্র্যাকের জন্যে?

সাউন্ড ট্র্যাকের কথা উঠলো যখন, বলি। শুধু তো বৃষ্টি পড়ার শব্দটুকুই নয়। একটা গ্রামের মধ্যে যত রকম আওয়াজ হতে পারে। ঝিঁঝিঁর আওয়াজ, পাখিদের বিচিত্র সব শব্দ আর সঙ্গে হরেক পতঙ্গদের কলরোলেরও ধ্বনি। এমনকি গাছের পাতার মধ্যে দিয়ে হাওয়া গেলে সর-সব ক’রে যে শব্দটা হয়, সেটাও। কী মমতা দিয়ে এগুলো সব এ ছবির শরীর জুড়ে সাজানো! শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, আচ্ছা, এই শব্দগুলোও কি সত্যি শব্দ নাকি? সত্যি কি গ্রামের কোন নিঝুম কোণের থেকে এগুলো সব রেকর্ড করে আনা? নাকি আর পাঁচটা ছবিতে যেমন হয়, শহরের সাউন্ড স্টুডিওতে এগুলো সব মিথ্যে মিথ্যে মেশিন দিয়ে তৈরি?

আরও পড়ুন:  সইফের চিন্তা যে কোনও দিন ইনায়ার চুল টেনে ছিঁড়ে দেবে তৈমুর

এবার চলুন ছবির ওই সিনটায়, ছোট্ট গোপাল (জীবনের প্রথম অভিনয়ে সামিউল আলম) যেখানে চরম একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছে রাতে। স্বপ্নটা কী, সেটা লিখছি না, সেটা না হয় নিজের চোখেই দেখবেন। শুধু এটুকু বলি যে, সেই স্বপ্নের মধ্যে রেল-ট্র্যাকের কাছে যখন ক্যামেরা পৌঁছে যাবে, ফুল স্পিডে ট্রেন যাওয়ার শব্দে হল-এর মধ্যে বসেও থরথরিয়ে যেন তখন কাঁপতে থাকবেন আপনি। এরপর হঠাৎ সেই স্বপ্ন ভাঙার মোমেন্টটাও আবার বোঝানো হবে সেই অডিও ট্র্যাকেরই খেলায়।

হ্যাঁ, পোকার ডাক বা ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো রেলগাড়ির শব্দটাও যেন ধাক্কা দিয়ে যায়! ছবি শুরুর সময় যদি খেয়াল করেন তো দেখতে পাবেন, সাউন্ড ডিজাইনে যে নামগুলো আছে, তার মধ্যে প্রথম নামটাই খোদ ডিরেক্টরের নাম। এখান থেকে আঁচ করতে পারবেন হয়তো, পুরো ছবি জুড়ে যত্ন করে শব্দ-মায়া সাজিয়ে দেওয়ার মূল কারিগর কে।

ডিরেক্টরের ইন্টারভিউতে শুনলাম, প্রায় অজ-পাড়া গাঁ থেকে দুই খুদে’কে খুঁজে বের করেছেন তিনি। আর তারপর ফিলিমে অ্যাক্টো করানোর আগে, সাত-আট মাস ওদের দুটোকে নিজের বাড়িতে রেখে একটু একটু করে নাকি ছবির জন্য ‘তৈরি’ করেন তিনি। যে দুই বাচ্চার রোলে অভিনয় করবে ওরা, গল্পের সেই দু’জন আসলে কেমন, বাস্তবের দু’জনকে সেটাই নাকি একটু একটু করে চিনিয়ে দিতেন উনি!

নিজের খুঁজে বের করা দুই শিশু অভিনেতার সঙ্গে ছবির পরিচালক

মানে আট মাস ধরে অ্যাক্টিং ওয়ার্কশপের ক্লাস? বিশ্বাস করুন, এটা শুনে আঁতকে উঠেছি আমি। বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে একটা ছবি বানাতে গিয়ে এতটা যত্ন, এতটা ফোকাস আজকের দিনে সত্যি কারুর আছে নাকি রে ভাই?

নাকি এটা পরিচালকের প্রথম ছবি বলেই এখানে যত্ন এত বেশি?

শুধু তো প্রথম ছবিই নয়, তার ওপর এটা আবার বিভূতিভূষণের গল্প! গ্রাম বাংলার পটভূমিতে দুই পুঁচকের বাল্যলীলা কথা! বাংলা ছবির কোন মহলে সাহস করে হাত ছোঁয়ানোর চেষ্টা হল এই ছবিতে, সেটা তো এটার থেকেই স্পষ্ট! এবার আপনি বলুন, এরপরে অপুর চোখ আর এ ছবির ছোটুর চোখে তুলনা না হয়ে পারে?

আপনি যদি বাঙালি হন, এ ছবি দেখতে গিয়ে, অনিবার্য মনে পড়বে ’৫৫ সালে রায়মশাইয়ের বানিয়ে যাওয়া সেই ছবিটার কথা। সেই বৃষ্টিতে ভাই-বোনের হাকুচ ভেজার সিন, বা দিদিকে ভিজে জ্বর বাঁধিয়ে মরতে দ্যাখার সিন। মেঘলা দিনে বাইরে গেলে সঙ্গে ছাতা রাখার মতো চরম সব শিক্ষে পাওয়ার সিন। হ্যাঁ, এ ছবিতেও বৃষ্টি ভিজে প্রবল জ্বরে বেহুঁশ হয় দাদা। দেখে-শুনে ছাতা মাথায় পথে নামে ভাই। আদিগন্ত মাঠের মধ্যে রেলগাড়ি কী তীব্র শকের মতো আসে, সেটার একটু আভাস তো এ লেখায় আগেই দিয়েছি আমি। আর স্ক্রিন উপচানো কাশ ফুলের মেলা থেকে শুরু করে বড় আশা নিয়ে বড়লোকের বাড়ির দালান অবধি গিয়ে ভেতরে ঢোকার ডাক না পাওয়ার জ্বালা – রায়বাবুর ওই ছবির থেকে সব সিগনেচারই তো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এখানে দেখছি হাজির!    

বৃষ্টি ভিজে দিদিকে অসুখে পড়তে দেখে এভাবেই অপু ছাতার ব্যবহার শেখে।

ছবিটা দেখবো বলে বহু যুগ পরে নতুন করে বিভূতিভূষণের ‘তালনবমী’ উলটে দেখতে গেছি। বিশ্বাস করুন, পড়তে গিয়ে দেখতে পেলাম হোঁচট খাচ্ছি খুব। কেন জানেন? মনে হচ্ছিল, এই যে গ্রামের ছোট্ট দুটো ছেলে, যাদের নিয়ে এই গল্পটা লেখা, এই জন্মে এদের মতো কাউকে আমি দেখেছি কখনও নাকি?

চিনেছি কখনও এদের? এরা কারা, কোথায় থাকে, অন্য গ্রহের কোথাও?

চার পাতার চেয়েও ছোট সেই ‘তালনবমী’ গল্পটা স্ক্রিনের জন্য প্রায় নতুন করে লিখে আস্ত একটা সিনেমা বানালেন কী করে ডিরেক্টর মানস মুকুল পাল, সেটাই ভাবছিলাম তাই বসে। এই যে সিনের পর সিন নতুন করে লেখা, এতে তাঁর রেফারেন্স পয়েন্ট কী ছিল, শুধু ‘পথের পাঁচালী’ ছবি? নাকি নিজের ছোটবেলাটাও?

নাকি গ্রাম বাংলার চেনা-অচেনা আরও একশো হাজার জীবন?

গরিব ভ্যানওয়ালা বাবা ট্রাকের ধাক্কায় প্রায় মুমূর্ষু হয়ে শুয়ে, আর তাই খাবার জুটছে না গোপাল-ছোটু নামে ছোট্ট দুই ভাইয়ের, গল্পের এ মোচড় তো বিভূতিভূষণের লেখার কোন লাইনে নেই? এতো পুরোপুরি মানসে মুকুলে তৈরি!

আরও পড়ুন:  ক্যালিফোর্নিয়াতে ঋতাভরী... ‘বিশেষ সঙ্গী’ কে?

বিভূতিবাবু তো শুধু এটুকু লেখেন যে, ‘ক্ষুদিরাম ভটচাজের বাড়ি দু’দিন হাঁড়ি চড়ে নি।… জমিজমার সামান্য কিছু আয় এবং দু-চারঘর শিষ্য-যজমানের বাড়ি ঘুরে-ঘুরে কায়ক্লেশে সংসার চলে। এই ভীষণ বর্ষায় গ্রামের কত গৃহস্থের বাড়িতেই পুত্র-কন্যা অনাহারে আছে, – ক্ষুদিরাম তো সামান্য গৃহস্থ মাত্র।’

তারপর আরও একটা লাইন লেখা যে, ‘ক’দিন থেকে পেট ভরে না-খেতে পেয়ে ওরা দুই ভায়েই সংসারের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠেছে।’ আর মানস মুকুল এই একটা লাইন ছবির ভাষায় ট্রান্সলেট করছেন এভাবে যে, ভাত জোটে নি বলে মা দুপুরবেলায় মুড়ি এনে দিলে লাথি মেরে সেই মুড়ির থালা উলটে ফেলে দিচ্ছে ছোট্ট গোপাল! আর তারপর রাগ আর খিদেয় কাঁপতে কাঁপতে পুকুরতলায় একলা বসে কাঁদছে।

‘পথের পাঁচালী’ছবির দৃশ্য-বিষয়-ফ্রেম থেকেই যেন জন্ম হয়েছে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’

ভাই ছোটু (জীবনের প্রথম অভিনয়ে নুর ইসলাম) তখন পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরছে গলা, হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে গাছ থেকে পাড়া পেয়ারা দু’টো এনে। আর মিথ্যে মিথ্যে কথা বলে স্তোকও দিচ্ছে ওকে!

খাবার জুটোতে না পেরে ছোট্ট দু’ভাইকে তাদের মা-ই বলছে, ‘অনেক বড় হয়েছ, এবার কাজে ঢোক।… মহাদেবের দোকানে বিক্রিবাটা ভাল, একটা ছেলে লাগবে বলছেল… মাসে ৩০০ টাকা দেবে।’ আর উলটো দিকে বসে ছেলে তখন আকুল হয়ে জানতে চাইছে, ‘ইস্কুলে যাব না আর?’ জানতে চাইবে না কেন, স্কুলে গেলে যে জম্পেশ মিড-ডে মিল দ্যায়! বা ধরুন ওই সিনটা, স্রেফ দুপুর বেলায় খাবার জোটার চান্স আছে বলে, গ্রামের শ্যামা কাকীমার বাড়ির পেছল কুয়োতলা সাফ করতে গেছে গোপাল, আর খাওয়া জুটলে তার ভাগ একটু ভাইকে দেবে বলে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে তাকেও! এগুলো সব বিভূতিভূষণের না-বলা-কথা বলে ধরতে পারেন আপনি। আর দেখবেন সেই না-বলা-কথাই এই ছবিতে ডিটেল শুদ্ধু রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ সবটা নিয়ে হাজির!

কোথাও কোথাও সেই ডিটেল তো আবার চরম রকম শকিং। যেমন ধরুন, সেই পেছল কুয়োতলা সাফ করতে গিয়ে শ্যামার আর ওর বরের ইউজ করা কনডোম কুড়িয়ে পাচ্ছে ছোটু আর তারপর ওটাকে বেলুন ভেবে জল ভ’রে ফুলিয়ে মাতছে নতুন একটা খেলায়! কী বলবেন এটা, ইনোসেন্সের ওপর জটিল সেক্স-দুনিয়ার পাঞ্চ!

‘সহজ পাঠের গপ্পো’র ছোটু ঠিক যেন আজকের অপু!

মানস মুকুল দ্যাখাচ্ছেন যে ছেলে দুটোর ধারণাই নেই যে ওদের হাতে ধরা অদ্ভুত দেখতে এই বেলুনটা আসলে ঠিক কী। কিন্তু ওদের হাতে এটা ঝুলতে দেখে বাড়ির মালকিন শ্যামা তো প্রায় বোমার মতো ফাটে! এই দৃশ্য দেখতে গিয়ে হাই চান্স যে আপনি নিজেও পৌঁছে যাবেন আপনার সেই ছোট্টবেলার এমন কোন দিনে, যে দিনটায় না বুঝে-শুনে বড়দের দুনিয়াটাতে পা রেখেছিলেন ফার্স্ট।

এই যে আপনাকে আর আমাকে এক ধাক্কায় যার যার নিজের ছোটবেলাটায় পৌঁছে দেওয়া সটান, সেটাই এই সিনেমার ক্যালি।

তবে হ্যাঁ, যতই যত্ন করে তুলির টানে নিজের প্রথম সিনেমাটাকে সাজিয়ে তুলুন মানস, একটু খুঁটিয়ে দেখতে গেলেই দেখবেন খটকা লাগছে বেশ কয়েকটা জায়গায়।

সংসারের হাল যখন এত খারাপ যে নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা, তখন রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরেও হ্যারিকেন জ্বলতে থাকবে কেন ভাই? রাতে শুয়ে শুয়ে বাড়ির পুঁচকে ছোঁড়া হ্যারিকেনের শিখা বাড়ানো-কমানোর খেলা খেলতে থাকবে বলে? ওই গরিব ফ্যামিলিতে কেরোসিন কি বিনে পয়সাতে আসে?

সকালবেলা যখন ওরা ঘুমের থেকে ওঠে, তখনও দেখছি হ্যারিকেনটা একই ভাবে জ্বলছে! পান থেকে চুন খসলে যে মা ওদের মেরে লাশ বানিয়ে দ্যায়, সেই মা’ও এসব দেখে কিছু বলে না কেন ওদের?

নাকি আমার জানাটা ভুল, গ্রামদেশে গরিব বাড়িতে সারা রাত হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাখতে হয়?

ছবিতে এর চেয়েও বড় খটকা আছে। এই যে ধরুন নানু’র কাছ থেকে জানতে পারলো ওরা যে পরের বুধবার জন্মাষ্টমীর দিন শেঠেদের বাড়িতে নাকি খাওয়া-দাওয়া হবে হেভি। লুচি, আলুর দম, মিষ্টি আর সঙ্গে ‘পোলোয়া’ মানে পোলাও নাকি হবে। তা’ এই সময় চেনা খাবারগুলো ছেড়ে ছোটু হঠাৎ যে খাবারটা আদৌ চেনে না, সম্ভবত নামও শোনে নি কখনও, সেই ‘পোলোয়া’ মানে পোলাওয়ের লোভে আটকে গেল কেন?

আরও পড়ুন:  সোনার পাহাড় : এ কেমন ভয়ংকর ছবি আপনি বানালেন পরমব্রত!?

খেয়াল করে দেখুন, ‘পোলুয়া’ কেমন খেতে, সেটা নিয়েই কোন ধারণা নেই ওর, তাই মায়ের কাছে জিজ্ঞেসও করতে থাকে সেটা। অথচ আর সব কিছু ছেড়ে সেটা খাবার জন্যেই ছটফটানি এত? মনে মনে নিজেকে বোঝাই, এটা শিশুর খেয়াল হয়তো।

কিন্তু পরের একটা সিনে যে গণ্ডগোল আরও।

‘পোলুয়া’ দেখতে কেমন, খেতে কেমন, সেটা নিয়ে কোন ধারণা না থাকলেও ডিরেক্টর দেখিয়ে দিলেন, স্বপ্নে সেই শেঠ’দের বাড়ি গিয়ে চুটিয়ে ‘পোলুয়া’ খাচ্ছে ছোটু আর ওর চোখ দিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, হলুদ রঙের ভাতের ওপর কাজু, কিশমিশ, চেরি আর আরও কী কী সব ছড়িয়ে দিয়ে রাজকীয় এক খাবারের রূপ নিয়েছে যেন ওটা!

যে খাবারটা খাওয়া দূরের কথা, দেখেই নি জীবনে, সেটাকে এমন নিখুঁত ডিটেলসহ স্বপ্নে দেখতে পাওয়ার ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত কিনা, এবার আপনি বলুন সেটা।

আরও একটা ব্যাপার কেমন যেন লাগলো। সেটা হল ওই দুই পুঁচকে’র সঙ্গে ওদের বাবার রিলেশন। ছবির শুরুর সিন বলুন কিংবা শেষের সিন, সব জায়গায় ওদের কথাবার্তার মেন বিষয় কিন্তু হচ্ছে ওদের বাবা।

কিন্তু সেই বাবার সঙ্গে পুরো ছবিতে ওদের কি একটা সিনও আছে?

ছবির শুরুর সিনটা বলি। গোপাল গাছের ডাল দিয়ে মেক-শিফট বঁড়শি বানিয়ে মাছ ধরছে পুকুরে, পাশে ওর ভাই ছোটু। ছোটু’র প্রথম ডায়ালগটাই হল এই ছবিতে, ‘এই দাদা – বাবা সত্যি সত্যি মই যাবে? ওই দাদা?’ ‘মরে’ শব্দটা স্থানীয় ডায়ালেক্টে এখানে ‘মই’ হয়ে গেছে। তা’ বাবা ‘মই’ গেলে কী হবে, সেটাও শোনা যায় আর অল্প সময়ের মধ্যেই, ‘বাবা মরি গেলি আমরা আর খেতি পাব না’।

ছবির একদম শেষ দৃশ্যেও কাশ বনের মধ্যে শুয়ে থাকা দুই ভাইয়ের কথায় জানতে পারবেন বাবাকে কত ভালবাসে ওরা। শুধু তাই নয়, গভীর ভাবে ওদের মধ্যে বেঁচে থাকে এই আশা, যে, ওদের বাবা আবার ভাল হয়ে যাবে ঠিকই।

কিন্তু ওই আগেই লিখেছি যেটা! বাবাকে ভালবাসা নিয়ে এত কথা থাকলেও একবারও কখনও দুই ভাইয়ের কাউকে দ্যাখা যায় না বাবার ধারে বা কাছে। খাটে বাবার পাশে উঠে শুতে হলেও যেন খুব সাবধানে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে শোয়।

কাশবনের মধ্যে অপু-দুর্গার দৃশ্য কিছুটা এই রকমই ছিল

ছবিতে দু’য়েকটা শট রয়েছে ওদের মা নিজের স্বামীর সেবা করছে বলে, কিন্তু সে জাতীয় একটা কোন শটও কি ওদের কারুর সঙ্গে আছে? ইন ফ্যাক্ট সত্যি সত্যি ওদের বাবার কী হয়েছে, ছবিতে সেটা বুঝে উঠতেই সময় লাগে ঢের! শেষে সেটা বুঝতে হয় ছবির মধ্যে অন্য একটা সিনের অন্য একটা ডায়ালগ শুনে, তবে।

যে মানুষটার দুর্ঘটনা থেকেই কার্যত গোপাল-ছোটু’র এই কষ্ট-যাপন শুরু, গল্প থেকে সেই লোকটাকেই প্রায় উধাও করে দিলেন কেন পরিচালক, সেটাও একটা প্রশ্ন কিন্তু, ভাই!

এটা কি ইচ্ছাকৃত স্টাইল?

‘পথের পাঁচালী’র সঙ্গে ছবির মিল তো শুধু দৃশ্য কিংবা বিষয়-ভাবনায় না! ছবির মিউজিক থেকে শুরু করে শুরুর নাম দ্যাখানোর স্টাইল পর্যন্ত সব কিছুতেই যেন সেই ‘পাঁচালী’ স্ট্যাম্প দেওয়া! তা’ ভাল, কিন্তু আপনি বলুন, এমন একটা ছবিতে বানান ভুল থাকতে দেখলে কেমন লাগতে পারে? ছবির শুরুতে ‘ভূমিকা’ বানানটা দেখলাম একাধিকবার ‘ভুমিকা’ হিসেবে লেখা। এই রকম কাঁচা ভুলগুলো এড়ানো যেত না কি?

তবে মানতে হবে, ভুলচুক যাই থাক না কেন, দু’বার দ্যাখার পর ফের এই ছবিটা দেখতে সিনেমা হল-এ যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার।

আসলে বাংলা ছবির মরা বাজারে একটা ভাল ছবির হদিশ পাওয়া তো কম কথা নয় মোটে!

তেমন একটা ছবি বানিয়ে ফেলার জন্য প্রযোজক অভিজিৎ সাহা আর পরিচালক মানস মুকুল পালকে ধন্যবাদ রইলো আমার তরফ থেকে।

3 COMMENTS