এই শীতে আবার একটা নয়, একেবারে দু-দুটো, মানে ‘ডবল ফেলুদা’ | তবে ফেলুদা ডবল হলেও তোপসে কিন্তু একজনই – সাহেব ভট্টাচার্য | বাবা সুব্রত ভট্টাচার্য ফুটবলে রক্ষণ সামলাতেন আর ছেলে সাহেব অপরাধী ধরতে ফেলুদার জুড়িদার হয়ে অল আউট অ্যাটাকে | সেই তোপসে সাহেবের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তন্ময় দত্তগুপ্ত |

 

সামনে ডাবল ফেলুদা রিলিজ করছে আপনার এক্সপেকটেশন কেমন?

সাহেব : দুর্দান্ত এক্সপেকটেশন এবং এক্সপিরিয়েন্স ।শীতকাল মানেই নতুন গুড় আর ফেলুদার ছবি ।এই দুটোই মাস্ট ।বাঙালির এই এক্সপেকটেশন প্রত্যেক শীতে থাকে । এ বছর ফেলুদা প্রকাশনার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হলো । তাই এক্সপেকটেশন আরো বেশি । এই ছবির টাইটেল আর এন্ড স্ক্রোল বা অন্তিম পরিচয়লিপিতে অনেক আকর্ষণ রয়েছে ।

অন্যান্য ছবির তুলনায় ফেলুদা নিয়ে আপনার মধ্যে কি কোনও বাড়তি এক্সপেকটেশন থাকে?

সাহেব : আমার মনে ফেলুদার একটা আলাদা জায়গা আছে । আমার কেরিয়ারে ফেলুদা আমাকে বিশাল পরিচিতি দিয়েছে । ফেলুদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া মানে সত্যজিৎ রায়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া । বাণিজ্যিক দিক থেকে যদি দেখা যায় তাহলে বলব এই ছবির বাজেট অনেক বেশি । সত্যজিৎ রায়ের যে লিগ্যাসি সেটা স্ক্রিনে দাঁড় করানো আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ।

এই ছবির শ্যুটিং কোথায় কোথায় হয়েছে?

সাহেব : বোলপুরে কিছুটা শুটিং হয়েছে । কলকাতায় কিছুটা শ্যুটিং হয়েছে । বাকি শ্যুটিং হয়েছে বালির গঙ্গার ধারে ।

এই শ্যুটিংয়ের কোনও স্মরণীয় ঘটনা মনে পড়ে?

সাহেব : এই বছর বৃষ্টির জন্য শ্যুটিং বহুবার বন্ধ হয়েছে । এছাড়া শ্যুটিং চলাকালীন বহু বাধা এসেছে । তাই প্রায় পাঁচ মাস ধরে শ্যুটিং চলেছে । এরকম বাধা-বিঘ্ন ফেলুদার অন্যান্য ছবির ক্ষেত্রে আগে ঘটেনি । বাজে এক্সপিরিয়েন্সের পাশাপাশি মেমোরেবল এক্সপিরিয়েন্সও হয়েছে । বোলপুরে শ্যুটিংয়ের ফাঁকে একই  মেকআপ বাসের ভেতর আমি, বেনুদা(সব্যসাচী), অপুদা(শাশ্বত), ব্রাত্যদা প্রায় পাঁচ-ছয়জনের আড্ডাটা আমার কাছে বাড়তি পাওনা । ওদের কাছ থেকে নাটকের গল্প, যাত্রার গল্প, আমাদের ইণ্ডাস্ট্রীর গল্প শুনেছি । অনেক কিছু শিখেছি । আমার  মনে হয়েছে ওই মেকআপ রুমের আড্ডাটা ছিল একধরনের এনসাইক্লোপিডিয়া অফ বেঙ্গলি সিনেমা অ্যাণ্ড আর্টের মতো ।

আরও পড়ুন:  সাংবাদিকের পা মাড়িয়ে দিলো তাঁর গাড়ি‚ চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করলেন শাহরুখ

তোপসে চরিত্র করার আগে আপনি কি ফেলুদার গল্পগুলো আবার পড়েছিলেন?

সাহেব : না, আমি নতুন করে ওই গল্পগুলো পড়িনি । স্ক্রিপ্টটা খুব ভালো ভাবে পড়েছিলাম ।

তোপসেকে নিজের মধ্যে কীভাবে প্রিপেয়ার করলেন?

সাহেব : সন্দীপ স্যার প্রথমেই আমাকে বলেছিলেন পুরানো ফেলুদার ছবিগুলো না দেখতে । আর বলেছিলেন তোপসের ইন্সপিরেশন অন্য কোনওখান থেকে না নিতে । আমরা পাঠক হিসেবে যখনই ফেলুদার গল্প পড়েছি তখন আমরা নিজেকেই তোপসে হিসেবে ভেবেছি । তাই আমার আলাদা করে তোপসেকে তৈরি করতে হয়নি ।

তোপসে ফেলুদার গল্পগুলো বলে ওর চোখ দিয়েই আমরা ফেলুদাকে দেখি তাই তোপসেকে কি আপনার একই সঙ্গে ফেলুদার সহকারী এবং লেখক বলে মনে হয়?

সাহেব : তাতো বটেই । শুধু সহকারী এবং লেখক নয় । তোপসে একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক । যা যা ঘটনা ঘটছে তোপসে কিন্তু কোথাও সেগুলো লিখে রাখছে না । বরং তোপসে স্মৃ্তি থেকে বলছে । তোপসে সেই কারণে ছবিতে কম কথা বলে । অবজার্ভ করে বেশি ।

তোপসের ভূমিকায় প্রথমে সিদ্ধার্থবাবু, তারপর শাশ্বতবাবু, তারপর পরমব্রত এবং এখন আপনি অভিনয় করছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তোপসে চরিত্রের ইন্টারপ্রিটেশন কি বদলাচ্ছে?

সাহেব : খুব একটা নয় । তোপসের বেসিক কাঠামো একই রয়েছে । কেউ হয়ত এর মধ্যে ইন্টালিজেন্সের পরিমাণ বেশি দেখানোর চেষ্ট করছে । কেউ হয়ত কনফিডেন্সটা বেশি দেখানোর চেষ্টা করছে । আমি তোপসেকে ফেলুদার ওপর নির্ভরশীল রূপেই দেখিয়েছি । কারণ আমার মনে হয়েছে তোপসে কখনই ফেলুদাকে টপকে যায় না । তাই তোপসে চরিত্রের সাইকোলজিক্যাল পরিবর্তন অভিনেতা অনুযায়ী কিছুটা হয়েছে ।

এখনকার সময়ের মতো করে তোপসেকে কি প্রাসঙ্গিক করে তোলা হয়েছে?

সাহেব : হয়েছে । কিন্তু খুব একটা মূল গল্পের থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি । তোপসে মোবাইল ব্যবহার করে না । তোপসে গুগুল সার্চ করে ইনফরমেশন নেয় না । আমরা প্রত্যেকেই ফেলুদা গল্পের অরিজিন্যাল ফ্লেভার রাখার চেষ্টা করেছি । আপনি ব্যোমকেশ বা শবর দেখুন, দেখবেন সেখানে ডিরেক্টরস ইন্টারপ্রিটেশন বেশি চলে এসেছে । সেক্ষেত্রে অরিজিন্যাল গল্পের ফ্লেভারটা চলে যায় । কিন্তু ফেলুদার গল্পের অরিজিন্যাল ফ্লেভারটা সন্দীপ স্যারের ছবিতে আপনি পাবেন ।

আরও পড়ুন:  জানেন কার সঙ্গে প্রেম করছেন এয়ারটেল 4G গার্ল?

কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ছবির তুলনায় সন্দীপবাবুর ছবিতে অনেক বেশি শার্প কাট, জাম্প কাট আছে যার ফলে ছবির গতি অনেক বেড়েছে সেটা লক্ষ্য করেছেন?

সাহেব : হ্যাঁ, সেটা করতেই হবে । কারণ সত্যজিৎবাবুর সময় ছবির ডিউরেশন আড়াই থেকে তিন ঘন্টা হতো । সেটা মানুষ বসে দেখতেন ।এখন মানুষ অতো সময় ধরে বসে ছবি দেখবেন না । তাই  ডিডেক্টিভ সিনেমার গতিকে বাড়াতে হয় । ডাবল ফেলুদার ক্ষেত্রেও তাই হবে । সন্দীপ স্যারের ছবির মেকিংয়ের মধ্যে ওনার সিগনেচার-তো থাকবেই ।

এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি প্রত্যেকেই জানেন আপনি ফুটবল খেলোয়াড় সুব্রত ভট্টাচার্যের ছেলে বাবার খেলার জগতে গেলে প্রতিষ্ঠা পেতে অনেক সুবিধা হতো সেখানে না গিয়ে ফিল্ম জগতে আসার কারণ কী?

সাহেব : এর পেছনে একটা সাইকোলজিক্যাল কারণ আছে । ছোটবেলায় আমার মাঠে গিয়ে খেলা দেখা বারণ ছিল । মাঠে গিয়ে খেলা দেখার উত্তেজনা থেকেই একজনের ভেতর খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন জাগে । ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়েছি । তাই ক্রিকেট খেলার প্রতি ঝোঁক অনেক বেশি ছিল । তাই ফুটবলের প্রতি ঝোঁক তৈরিই হয়নি ।

আপনার নিজের কাছে রিমার্কেবল চরিত্র কোনগুলো?

সাহেব : তোপসে-তো নিশ্চয়ই । আমার প্রথম ছবি ছিল অপর্ণা সেনের পরিচালনায় ‘ইতি মৃণালিনী’ । সেখানে আমি এক নকশাল ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম । ওই চরিত্র আমার খুব কাছের ।

আপনি সত্তর দশক দেখেননি তাহলে সত্তর দশকের চরিত্র কী উপায়ে পোট্রে করলেন?

সাহেব : প্রথম ছবি হিসেবে ‘ইতি মৃণালিনী’ আমার কাছে খুব বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিল । কারণ ওই সময়টা আমি দেখিনি । অপর্ণা সেন ওই চরিত্র সম্পর্কে আমাকে সব কিছু বলে দিয়েছিলেন । রীনাদি-রা ওই সময়টা খুব ভালো ভাবে দেখেছেন । রীনাদি এবং সোহাগ সেন খুব ভালো ভাবে আমাদের টানা একমাস ওয়ার্কশপ করিয়েছিলেন ।

আপনি চিন্ময় রায়ের ‘ভালোয় ভালো’ দিয়ে আপনার কেরিয়ার শুরু করেছিলেন সেই সময়ের স্টুডিও পাড়ার পরিবেশে আপনি কাজ করেছেন আজকের স্টুডিও পাড়ার পরিবেশেও কাজ করছেন এই দুই পরিবেশ দেখে কী মনে হয়?

সাহেব : ওরে বাবা আপনি ‘ভালোয় ভালো’র কথা কোথা থেকে জানলেন!এতো রিসার্চ করলেন কোথা থেকে? চিন্ময় রায়ের ‘ভালোয় ভালোর’ সময় আমি খুব ছোট ছিলাম । তখন স্টুডিও পাড়ার পরিবেশ বোঝার মতো বয়স আমার হয়নি । তবে মানুষের আবেগ তখন খুব বেশি কাজ করত । ‘ভালোয় ভালো’র পর অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয় । উনি খুব ধৈর্য এবং স্নেহের মিশেলে আমার সঙ্গে কাজ করেছিলেন । প্রভাত রায়ের সঙ্গেও কাজ করার সময়ও আমি স্নেহ অনুভব করেছিলাম ।

আরও পড়ুন:  ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস-এর আবহেও এক মুহূর্ত দেবকে কাছছাড়া করলেন না রুক্মিণী

আপনার মধ্যে একটা চকোলেট লুক আছে।সেটার জন্য কি মহিলাদের কাছ থেকে বাড়তি এ্যটেনশন পান?

সাহেব : ওই লুক আমি বহুবার ভেঙ্গেছি ।‘ইতি মৃণালিনীতে’ নকশাল ছেলে, মহেশ মঞ্জরেকারের ছবিতে কলেজ বয়, সন্দীপ স্যারের ছবিতে তোপসে—প্রত্যেকটা চরিত্রই আলাদা । এ বছর ‘রোমান্টিক নয়’ করলাম । আবার কমলেশ্বর মুখার্জীর ‘মুখোমুখি’ করলাম । আমি চেষ্টা করি চরিত্রগুলোকে আলাদা করতে । আমি চাই চরিত্র নিয়ে এক্সপিরিমেন্ট করতে । এক্সপিরিমেন্টের ফলে সেই চরিত্র হিটও করতে পারে আবার ফ্লপও করতে পারে । কিন্তু এক্সপিরিমেন্ট করাটা প্রয়োজন । তা না হলে একটা স্ট্যাগন্যান্সি চলে আসে।

আপনার ভালোলাগা এবং মন্দলাগার দিকগুলো কোনটা?

সাহেব : আমার কাজের প্রশংসা যখন সবাই করেন তখন সত্যি ভালো লাগে । কোনও ছবি খুব এক্সপেক্টেশন নিয়ে শুরু করলাম কিন্তু কনসেপ্টটা যে কোনও কারণে হোক বাস্তবায়িত হলো না । তখন সত্যি খারাপ লাগে ।

আপনার জীবনের ফিলোসফি কী?

সাহেব : আমি হার্ড ওয়ার্কে বিশ্বাসী । ভগবানে বিশ্বাসী নই । আমি ধর্মে বিশ্বাসী নই । আমি কর্মে বিশ্বাসী । ভালো কাজ করলে তার ফল ভালো হবে । আর খারাপ কাজ করলে তার ফল খারাপ হবে । এটা আমার চিরকালের বিশ্বাস । এই বিশ্বাস নিয়ে আমি কাজ করে চলেছি । অনেস্টলি কাজ করে চলেছি ।

NO COMMENTS