হিন্দু ও মুসলিম দুই সমাজেই তিনি সমান শ্রদ্ধেয় | সন্ত‚ ফকির‚ সৎগুরু‚ সব পরিচয় একাত্ম হয়ে গেছে তাঁর আধারে | তিনি শিরডির  সাঁই বাবা | 

Banglalive

# তাঁর জন্মদিন ও জন্মস্থান নিয়ে প্রামাণ্য কোনও তথ্য নেই | জানা যায় না আসল নামও | মহারাষ্ট্রের শিরডিতে এসে তাঁর নাম হয়েছিল সাঁই বাবা | সাঁই কথার অর্থ আধ্যাত্মিক পুরুষ বা ঈশ্বর | বাবা শব্দটি ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের ভাষায় পবিত্র পুরুষকে বোঝায় | যিনি বৃদ্ধ অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ |

# সাঁইবাবার ব্রতকথায় কথিত ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু ব্রাহ্মণ ঘরে জন্ম ‚ বড় করেছিলেন এক মুসলিম সন্ত | কিশোর বয়সে সন্তের আদেশেই ঘর ছেড়েছিলেন তিনি | মানুষের কল্যাণসাধনে |

# সাঁই সৎচরিত্র বই অনুযায়ী তিনি ষোল বছর বয়সে এসেছিলেন মহারাষ্ট্রের শিরডিতে | ব্রহ্মচারী কিশোর নিম গাছের নিচে বসে ধ্যান করতেন | দিনের যেকোনও সময়ে যেকোনও আবহাওয়ায় তাঁর তপস্যাভঙ্গ হতো না |

#  গ্রামবাসীরা তাঁকে দেখে কৌতূহলী হয়ে পড়ল | কিন্তু অনেকেই তাঁকে পাগল ভেবে বসল | ঢিল‚ পাথর ছুড়ে মারতে লাগল | বাধ্য হয়ে শিরডি ছেড়ে চলে গেলেন তিনি |

# এরপর এক বছর ফের কুয়াশায় ঢাকা | শোনা যায়‚ তিনি আরও অনেক ফকির ও সন্ত সান্নিধ্য করেন | আবার কেউ কেউ বলেন‚ সিপাই বিদ্রোহে তিনি লড়েছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের বাহিনীতে |

# ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে আবার শিরডিতে ফিরে আসেন তিনি | তখন তাঁর পরনে মুসলিম ফকিরের পোশাক | হাঁটু অবধি এক কাপড়ের কাফনি এবং মাথায় কাপড়ের টুপি | 

# খাণ্ডোবা মন্দিরের পুরোহিত প্রথম তাঁকে সাঁই বলে অভিহিত করেন |

# প্রথম কয়েক বছর শিরডির বনে বনে ঘুরে বেড়াতেন তিনি | থাকতেন খোলা আকাশের নিচে | তারপর আশ্রয় নেন এক পরিত্যক্ত মসজিদে | খাবার বলতে ভিক্ষান্ন |

# মসজিদে ধুনি জ্বালিয়ে রাখতেন তিনি | কেউ তাঁর কাছে এলে ফিরে যাওয়ার সময় তাঁর হাতে ধুনির ভস্ম দিতেন | মসজিদের নাম দিয়েছিলেন দ্বারকামাঈ |

# স্থানীয় মানুষদের চিকিৎসাও করতেন | তাঁকে হাকিম বলত সবাই | হিন্দু ও মুসলিম ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতেন | বলতেন একেশ্বর বাদ তত্ত্ব | তাঁর প্রচারিত মতের ভিত্তি হল অদ্বৈতবাদ |

# নিজের হাতে একটি বাগান করেছিলেন সাঁই বাবা | নাম দিয়েছিলেন লেন্ডি বাগ | সেখানে ছিল এক গভীর ইঁদারাও | বহুকাল আগে ওখান দিয়ে বয়ে যেত লেন্ডি নদী | তার নামেই বাগানের নাম দিয়েছিলেন সাঁই |

# ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল সাঁই বাবার মহিমা | নিম গাছের নিচে গর্ত করে ধুনি জ্বালিয়ে রাখতেন | তার ভস্ম বা বিভূতিকে ভক্তরা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করত | আজও শিরডির আশ্রমে ধুনি ও বিভূতির মহিমা জাজ্বল্যমান |

# একদিকে অদ্বৈত বেদান্ত‚ ভক্তি যোগ-জ্ঞান যোগ-কর্ম যোগ | অন্যদিকে পবিত্র কোরান | সবই পাঠ করতেন তিনি | ভক্তদের কাছে ব্যাখ্যা করতেন সহজ সরল ভাষায় |

# সৎ পথে থেকে সদ্বগুরুর আরাধনা করতে বলতেন তিনি | পছন্দ করতেন না ধর্মীয় গোঁড়ামি বা রীতিনীতি | একইসঙ্গে নস্যাৎ করেছিলেন নাস্তিকতাবাদকেও | তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় বেশ কিছু অত্যাশ্চর্য ঘটনাও |

#  ১৯১৮ সালের ১৫ অক্টোবর শিরডিতেই দেহত্যাগ করেন এই মহান সাধক | আজ দেশের অন্যতম পুণ্যভূমির মধ্যে একটি শিরডি |

# রোজ গড়ে ২৫ হাজার পুণ্যার্থী আসেন | বিশেষ অনুষ্ঠান থাকলে সমবেত হন এক লাখের বেশি ভক্ত |

# হিন্দু-মুসলিম তো বটেই | সাঁই বাবা অত্যন্ত জনপ্রিয় পার্সি বা জোরাথ্রুস্টিয়ান ভক্তদের মধ্যেও | সব সম্প্রদায়ের ভক্তকে তিনি সমান দৃষ্টিতে দেখতেন | 

# পশুপাখিকে না খাইয়ে নিজে কোনওদিন খেতেন না | ভক্তদেরও সেই বাণী দিয়ে গেছেন | বলেছেন নিরন্নকে খাবার‚ বস্ত্রহীনকে বস্ত্র‚ আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়ার কথা | অর্থপ্রার্থীকে পয়সা দিতে ইচ্ছে না হলে দিয়ো না | কিন্তু তাঁর উপর কর্কশ ভাষায় চেঁচিয়ো না |

# শিরডির সাঁইবাবা কাউকে তথাকথিত দীক্ষা দিতেন না | নিজের উত্তরাধিকারীকেও চিহ্নিত করে যাননি | বিশ্ব জুড়ে তাঁর বাণী ও কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অগণিত ভক্ত |
 

আরও পড়ুন:  রোজ ৩৪০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্রে যান মুখ্যমন্ত্রীর দাদা তথা রাজ্যের আর এক মন্ত্রী

NO COMMENTS