স্বপ্নময় চক্রবর্তী
জন্ম ১৯৫২ সালে‚ কলকাতায় | বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ | কর্মজীবন শুরু দেশলাই-এর সেলসম্যান হিসেবে | দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন আকাশবাণীর সঙ্গে | 'হলদে গোলাপ' উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ১৪২১ সালের আনন্দ পুরস্কার |
স্কুলছাত্রদের তৈরি স্মৃতিফলক

গত ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম যাবার সুযোগ এসে গেল। ঢাকার বিখ্যাত একুশের বইমেলা শুরু হয় পয়লা ফেব্রুয়ারি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। সে অনন্য অভিজ্ঞতার কথা এখন থাক। বাংলাদেশে যাচ্ছি শুনে চট্টগ্রামের বিখ্যাত পুস্তক বিপণী বাতিঘরের কর্ণধার দীপঙ্কর দাস আমাকে বললেন, আমাদের সংস্থাটা দেখে যান।

বাতিঘর

জাহাজের মতো দেখতে বিরাট বইএর দোকান, অনেক চেয়ার টেবিল রাখা, যত ইচ্ছে বই পড়তে পারে কেউ। চা কফির ব্যবস্থাও আছে। কিনতে হয়। মাঝে মাঝে সেমিনারের বা কাব্য পাঠের ব্যবস্থাও করেন, লেখক-পাঠক বসে কখনও।  আমিও বসেছিলাম। প্রায় দেড়শো জন মানুষ। সে-ও আর এক অভিজ্ঞতা, এখন থাক।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ট্রেনে গিয়েছিলাম। পথে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণ বাড়িয়া, ফেনি এইসব স্টেশন। এইসব শব্দগুলি শৈশব থেকে কতবার শুনেছি আমার দাদু-ঠাকুরমা-জ্যাঠা মশাই, বাবা-পিসিদের কাছে। এইসব একেকটা শহর যেন এক একটা অবন্তীনগর। যেন এক যে ছিল দেশ। এ ও অন্যরকম শিহরণ। এখন থাক।

চট্টগ্রাম যাওয়ার সুযোগ যখন এল, তখন আমার কক্‌সবাজার মনে হয়নি, মার্চিন দ্বীপের কথাও মনে আসেনি। সীতা কুন্ডও নয়। আমার চোখের সামনে ভাসছিল জালালবাদের পাহাড়। টেগরা বল, লোকনাথ বল, মাস্টারদা সূর্য্য সেন…………।

পনেরই আগস্ট আমাদের শ্যামবাজারের সিনেমা হলগুলিতে ‘মর্ণিং শো’ হ’ত। সেদিন প্রমোদকর লাগতো না। মানে দশ আনার টিকিট আট আনা, পাঁচ সিকের টিকিট এক টাকা। দেখানো হতো, ‘ভুলি নাই’, ‘বিয়াল্লিশ’, ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন’ .. .. .. আমার কাকা নিয়ে যেত। ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন’ দু’বার দেখেছি। ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ, সৈন্যদের ঘিরে ধরা, প্রীতিলতা ওয়েদেদার পটাসিয়াম সায়নাইড মুখে দিয়ে বন্দেমাতরম বলে ঢলে পড়লেন, সেই দৃশ্য আমার আজও মনে আছে। চোখে ভাসে জালালবাদ পাহাড়ের সেই দৃশ্য ’ .. ..  । গুলি শেষ হয়ে আসছে। চুল ছিঁড়ছে অনন্ত সিংহ । একটি বাচ্চা ছেলে টেগরা বল – পাথর কুড়িয়ে আসছে, বৃটিশের সঙ্গে অসম প্রতিরোধ .. ..  

আরও পড়ুন:  "আচ্ছা মা, তোমার মনে হয় না দশ হাত থাকাটা আনডিউ অ্যাডভান্টেজ ?

এরকম কতবার হয়েছে, আমার বালক বয়সে, বেলগাছিয়ার পরেশনাথের মন্দিরের ভিতরে যে একটা খেলনা পাহাড় আছে, কুড়ি তিরিশ ফুট উঁচু, সিঁড়িও আছে, ঘোরানো। ভাবতাম, আমিই টেগরা বল। জালালবাদের পাহাড়ে উঠছি।

সূর্য্য সেন, গনেশ ঘোষ, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিংহরা মিলে ১৯২৯ সালে তৈরি করেছিলেন ইন্ডিয়ান রিপাবলিক আর্মি। ওরা ঠিক করেছিলেন, কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে কতগুলো কাজ করবেন। একদল রেল লাইন উপড়ে ফেলবেন, অন্য একটা দল ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমন করবেন, কারণ ওখানেই বৃটিশ রাজন্যবর্গ, সেনা কর্তা, পুলিশ কর্তারা আমোদ আহ্লাদ করে। আর পুলিশের যে অস্ত্রাগার আছে, সেটা লুণ্ঠন করে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার বাড়িয়ে নেবেন। সেই দিনটা ছিল ১৮ই এপ্রিল, ১৯৩০ সাল।

এই দিনটা বেছে নেওয়ার কারণ ছিল। সেদিন গুড ফ্রাইডে। ইউরোপিয়ান ক্লাবে অনেক লোক সমাগম হওয়ার কথা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছিল। কিন্তু নিজেদের একটা ভুলে ইউরোপিয়ান ক্লাবের গোপন আক্রমন ভেস্তে যায়। পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে বন্দুক লুঠ হয়, কিন্তু গুলি পাওয়া যায় নি। পুলিশ বিপ্লবীদের খুঁজতে থাকে, ওরা জালালবাদ পাহাড়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকে। ৭০ জনের মতো বিপ্লবী ছিলেন। বৃটিশ বাহিনী পাহাড় ঘিরে ফেলে। ১৩ জন বৃটিশ বুলেটে মারা যান। কয়েকজন গ্রেফতার হন। কয়েকজন আত্মগোপন করতে পেরেছিলেন, যেমন সুর্য্য সেন স্বয়ং। কিন্তু কিছুদিন পরে ধরা পড়েন। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারী সুর্য্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি হয়।

১২ই জানুয়ারী স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটি ঢেকে দিয়েছে। আর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরে সুর্য্য সেনের কোনও মূর্তিই নেই। দুঃখের হলেও এটা সত্যি কথা।

ছবি তুলে এনেছি। এখানেই শ্রদ্ধা জানান। 

 

বাতিঘরের অনুষ্ঠানটা শেষ হলে আমি দীপঙ্করকে বলেছিলাম, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলি দেখতে চাই। দেখাবার ব্যবস্থা করার অনুরোধ রেখেছিলেন দীপঙ্কর। ও বলল, ভালই হ’ল, আমারও দেখা হয়নি। আমি বললাম, সে কী? বললো, হ্যাঁ। এই শহরে ওটা ভুলে যাওয়া গল্প কথা।

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ১৪)
জালালাবাদ পাহাড়ের রাস্তা

আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল একটা টিলার উপর বাংলাদেশ গ্যাস লিমিটেডের অতিথিশালায়। একটা টিলার উপরে। আশে পাশে আরও কিছু টিলা ও পাহাড়। কিন্তু সাজানো। কিছু অতিথিশালা আছে, ব্যক্তি মালিকানার বাড়িও আছে।

দীপঙ্কর গাড়ি নিয়ে এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় কোথায় যেতে চান?

আমি বলি, প্রথমে জালালবাদ পাহাড়।

দীপঙ্কর বলেন, আপনি ওই পাহাড়েই আছেন। এটাই তো সেটা।

জালালাবাদ পাহাড়ে গেস্ট হাউস

আমি অবাক। চারিদিকে তাকাই। কেয়ারি করা ফুল গাছ। মাধবীলতা কুঞ্জ। বাহারী ঝাউ। রাস্তায় উড়ছে ক্যাডবেরির রাংতা, প্রাণ পটেটো চিপসের প্যাকেট। এই সেই পাহাড়?

জিজ্ঞাসা করি, কোনও স্মারক বা স্মৃতিচিহ্ন?

দীপঙ্কর বলেন, কই, জানি না তো .. .. ..

বলি, সুর্য্য সেনের মূর্ত্তি আছে এই শহরে?

বললেন, না নেই। তবে প্রীতিলতার আছে।

বলি, চলুন সেখানে।

ইউরোপীয়ান ক্লাব এখন পি ডব্লুডির কারিগরী অফিস। বাড়িটা একই আছে। সামনে কোনও স্মৃতিস্তম্ভ নেই, তবে পাশের দেওয়ালে স্থানীয় স্কুলের ছাত্ররা লিখে রেখেছে প্রীতিলতার কথা, আর এই বাড়িটার ইতিহাস। কিছুটা দূরে, একটা রাস্তার মোড়ে একটা মূর্ত্তি স্থাপনা করেছে একটি সংস্থা, বছর দুই আগে।

ইউরোপিয়ান ক্লাব

এবার অস্ত্রাগার।

দীপঙ্কর ওটা ঠিক চেনেন না।  পরিচিত পুলিশের বড় কর্তাকে ফোন করে জানলেন, ওটা পুলিশ লাইনের ভিতরে। সেখানে পুলিশের ট্রেনিং হয়, কুচকাওয়াজ হয়, পুলিশ বাহিনীর বড় অংশ ওখানেই থাকে। ওখানে ঢুকতে গেলে অনুমতি লাগে। দীপঙ্কর অনুমতিও জোগাড় করে ফেললেন, সঙ্গে একজন গাইড। সে দু বছর হল পুলিশে ঢুকেছে। বড় পদে।

ভিতরে ঢুকলাম। সু-সজ্জিত। কুচকাওয়াজের মাঠ, ট্রেনিং সেন্টার, ক্যান্টিন। অস্ত্রাগারও বাইরে থেকে দেখলাম। সেখানে অস্ত্র মজুত আছে। ওটা আধুনিক ভবন। চকচক করছে।

ভাঙা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার

তরুণ পুলিশ অফিসার খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলেন। কেউ হদিশ দিতে পারলেন না। একজন বয়স্ক মানুষ অবশেষে জানালেন, হ্যা, ওই পুরোন ‘আরমারি’র একটুখানি এখনও আছে। লাল ঘর। ওইটা পাহারদারের ঘর ছিল।

আরও পড়ুন:  ‘সমালোচক’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি স্ববিরোধী? (জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ রচনা)

‘বাকি লাল বাড়ি বাঙ্গা হই গেছে গো। কুন কামের আছিল না যে। ওই দ্যাহেন, রাবিশ। নিউ বিল্ডিং হইব যে .. .. ..’

1 COMMENT

এমন আরো নিবন্ধ