দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |
কঙ্কালিতলার মন্দির

শান্তিনিকেতনে গিয়ে সাইকেলে চেপে ঘোরাটা বহুদিনের অভ্যেস । নিজেকে তখন ওখানকার একজন আশ্রমিক বলেই মনে হয় । প্রান্তিক স্টেশনটা টপকে ওপারে কিছুটা গেলেই ধু ধু প্রান্তর ছিল এক সময়ে । পিচের রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে গিয়েছে কঙ্কালিতলার দিকে । শীতের দিনে সাইকেল চালিয়ে কী যে ভালো লাগত । পালা পার্বণ ছাড়া মন্দিরে তেমন ভিড় হত না । বেশীরভাগ লোকই যেত সাইকেল রিক্সা ভাড়া করে । হুট হাট গাড়ি হাঁকানোর রেওয়াজটা গত পাঁচ সাত বছরে খুব বেড়েছে । মন্দির চত্বরের ছবি আঁকতে গিয়ে বারবার মনে পড়েছে কালীঘাটের কথা । আর্ট কলেজে থাকতে ওখানে গিয়েও কত কাজ করেছি । ফেরার পথে রাস্তার একটা বাঁকে থামলাম । জায়গাটার ভালো স্কেচ হয় । দু’চারটে চালা ঘর । একটা আধ ন্যাড়া খেজুর গাছ । এটা বুনডাঙা ।

বুনডাঙ্গার সেই দৃশ্য

সত্যজিৎ রায়ের লেখা পড়ে জানতে পারি বিনোদবিহারীর সেই মিউর‍্যালটার কথা – হিন্দি ভবনের তিনটে দেওয়াল জোড়া যে বিশাল কাজটিকে তিনি দরাজ হাতে সার্টিফিকেট দিয়ে গেছেন । আশ্রমের একেবারে শেষ মাথায় বোলপুর ঘেঁষা হিন্দি ভবন । সকালেই উঠে চলে যেতাম কারণ বারোটার পর বন্ধ হয়ে যায় । গঙ্গা নদীর দু’পাশে গড়ে ওঠা ভারতীয় সাধুসন্তদের আখড়া ও ধর্মীয় কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে এই বর্ণময় আঁকাটিকে সামনে থেকে দেখার জন্য অন্ততঃ শান্তিনিকেতনে একবার যাওয়া উচিৎ সবার । পাশের ঘরগুলিতে জোর কদমে হিন্দি লেখাপড়া চললেও – এই ঘরটা ওরা ফাঁকাই রাখে । যাতায়াতের পথে ছোট ছোট অবাঙালি ছেলেমেয়েরা আমাদের দেখে অবাক হয়ে ভাবে – কী এত মন দিয়ে দেখার – ছবি তোলার আছে এই দেওয়ালগুলোর । শান্তিনিকেতনে গাড়ি আর মানুষের ভিড় যতই বেড়েছে, ততই আমরা আরও বাইরের দিকে আস্তানা গেড়েছি । সোনাঝুরি জঙ্গলের ধারেই ‘তিতলি’ গেস্ট হাউসে থাকি । হপ্তার মাঝখানে নির্জনতা খুব । দোতলার বারান্দায় বসে অনেক দুর অবধি দেখা যায় ।

আরও পড়ুন:  মনের হাট পুকুরে : উষসী চক্রবর্তী
আশীষ

মিনিট তিনেক হাঁটলেই আশীষ চিতুদের বাড়ি । টুক করে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আসি । শীতের সকালে ঠাণ্ডা কনকনে খেজুরের রস মজুত থাকে । যত খুশি খাও । কপাল ভালো থাকলে রাতে কাঠের ঢিমে আঁচে চিতুর রান্না হাঁসের মাংস আর ভাত । একেবারে অমৃততুল্য । আশেপাশের আদিবাসী বাচ্চাদের ও পড়ায় সন্ধেবেলা । নিজে ওদের ভাষা চমৎকার বলে । আমরা দু-চারটে কথা শিখে পরদিনই ভুলে যাই ।   

আদিবাসী মহিলা

বছর কয়েক আগেও আশ্রম চত্বরে অবাধে ঘোরাঘুরি করা যেত । মোড়ে মোড়ে পাহারা বসেনি । ওদিকে যাবেন না, এখন যাবেন না, শুনতে হত না । কলাভবনের গাছের তলার বেদিতে বসে কত আড্ডা, আর্ট হিস্ট্রির প্রফেসর সৌমিক, পেন্টিং-এর অশোক ভৌমিক, রবীন্দ্র ভবনের শমীন্দ্র । স্কেচ খাতা বের করে এঁকে ফেলি সৌমিককে । পাল্টা আমারও স্কেচ করে ও ।

মাথার ঝুঁটি সমেত অশোক ভৌমিক

অশোকদা মাথার চুলে ঝুটি রাখছে । আঁকার সময় ঘুরে বসে বলল – ‘ঝুঁটিটা ঠিকঠাক আঁকিস’ ।

সত্যজিৎ রায় ছাত্র জীবনে যে একতলা হোস্টেল বাড়িতে থাকতেন তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম । বারান্দার দড়িতে কয়েকটা ময়লা লুঙ্গি আর দলাপাকানো জামা ঝুলতে দেখে মনটা উদাস হয়ে যেত ।

সেবার কলাভবনে শোরগোল । প্রাক্তন অধ্যক্ষ্য কে. জী. সুব্রামানিয়ন, সবার প্রিয় মানিদা ‘আর্ট’ হিস্ট্রির বাড়িটার গায়ে একটা মিউরাল করবেন । আপাতত তার ডামি বানাতে ব্যস্ত, ক্যান্টিনের দোতলার বড় হলঘরটায় ।

সবার প্রিয় মানিদা

সৌমিক আগেই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল, গেলাম দেখতে । মধ্য আশির একজন শিল্পীর কী এনার্জি । কাঁচি দিয়ে সাদা কাগজ কেটে নানারকম ডিজাইন বানিয়ে খয়েরি বোর্ডের ওপর বসিয়ে বসিয়ে দেখছেন । পছন্দ হলে জুড়ে দিচ্ছেন । মাঝে মাঝে চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন । সেই ফাঁকে ওর স্কেচ হয়ে গেল । এর বেশ কয়েক বছর আগে একবার চলে গিয়েছিলাম দিনকর কৌশিক-জির বাড়ি । কলাভবনে সত্যজিৎ রায়ের সহপাঠি, হোস্টেলে একই ঘরে থাকতেন । ভেবেছিলাম অনেক কথা হবে, কিন্তু উনি এখন বেশ অসুস্থ। চোখেও ঝাপসা দেখেন। দু-একটা কথা যা বললেন সবই জানা ছিল । ওঁরা দুজনেই চলে গিয়েছেন । আরও অনেকেই আজ শুধু স্মৃতি ।

আরও পড়ুন:  দিলওয়ারা দেখতে মাউন্ট আবু
সৌমিক

সব থেকে বেশি মনে পড়ে ২০০৮ সালের সেই অষ্টমীর কথা । শিল্পী বন্ধু অরূপকে নিয়ে সেবার গিয়েছিলাম আশীষদের পুজো দেখতে । তিতলিতেই উঠেছি । সন্ধের পর অরূপ সঙ্গে করে নিয়ে এল সুদর্শন, হাসিখুশি এক ছোকরাকে । আলাপ হল । গায়ক মোহন সিং-এর বড় ছেলে বিক্রম । ও নিজেও তখন গানে বেশ নাম করেছে জানা ছিল না । বিক্রম সেদিন ছিল গভীর রাত অবধি । জমিয়ে আড্ডা মারতে ওস্তাদ । গানবাজনা নিয়ে কত রকমের গল্প যে শুনিয়েছিল আর ফাঁকে ফাঁকে উদাত্ত গলায় গেয়ে যাচ্ছিল গানের পর গান । মুগ্ধ হয়ে যাওয়ার মত । সেই বিক্রমও চলে গেল বড্ড অকালে । তবু মন কিন্তু ভারি হয়ে ওঠে না । সুবর্ণরেখার সামনে ইন্দ্রদাকে দেখতে না পেলে মনকে বলি – হয়ত কলকাতায় গেছেন, কালই চলে আসবেন । জানি রতনপল্লীতে গিয়ে দেখব কালোর দোকানের ঝাঁপ বন্ধ । তাও পাশের দোকানটার বেঞ্চে বসি চা আর ঠাণ্ডা নিমকি নিয়ে । মনে পড়ে যায় কোনও এক বসন্তোৎসবের সকালে দঙ্গল বেঁধে এখানে হুল্লোড় করার কথা । আজও পূর্বপল্লীর নির্জন রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে । শীতের দিনে একতলা বাড়িগুলোর বাগান তখন ফুলে ফুলে ভরে থাকে ।

কোপাই নদী ধারে কাশ ফুল খুঁজেছি

কখনও শরৎকালে কোপাই নদীর পাড়ে কাশফুলের ছবি তুলতে গিয়ে কাদায় মাখামাখি হয়ে ফিরি । আজও ভোরের ট্রেনটা গুসকরা ছাড়লেই বাউলেরা তারস্বরে গান জুড়ে দেয় । বেশ খুশি খুশি লাগে – বোলপুর এসে গেল ।

 

গত পর্বের লিংক – http://banglalive.com/shantiniketan-travel-sketch/

Sponsored
loading...

1 COMMENT

  1. khub sundar legechhe parte. chhabigulo0o khub bhalo. bishes kare “manida”-r chabita. soft bhabta khub sundar.