কোপাই নদী

ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছিল সঙ্গীতভবন থেকে ভেসে আসা সমবেত গানের আওয়াজে। একেবারে লাগোয়া কলাভবন হোস্টেলের ঘরে শুয়ে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের গান শোনার কথা কোনওদিন ভুলব না। জীবনে সেই প্রথম শান্তিনিকেতনে যাওয়া – তখন আমি আর্ট কলেজের ছাত্র। সিনিয়র দাদা মনোজ সরকার ওখানে মাস্টার্স করছে। ওরই গেস্ট হয়ে ছিলাম ক’দিন। পকেটে রেস্ত কম। সস্তায় খেয়ে নিতাম ছাত্রদের ক্যান্টিনে। গেস্টদের জন্য বরাদ্দ শুধু ডিমের ঝোল আর ভাত। সেই ঝোল এতটাই জলবৎ যে ভাসমান পুঁচকে ডিমটাকে ভাতের থালায় তুলে আনতে রীতিমত কসরৎ করতে হত। তারুন্যের উত্তেজনা তখন তুঙ্গে, ফলে বারবার শান্তিনিকেতন আমায় টেনেছে। বসন্ত উৎসব, পৌষমেলা, কেন্দুলি বাদ যায়নি কিছুই। প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে সারাক্ষণ শুধু হুল্লোড় করেছি। ওখানকার শিল্পচর্চা ইত্যাদি নিয়ে আলাদা কোনও উৎসাহ ছিল না। হয়ত চলার পথে রামকিঙ্করের তৈরি মূর্তিগুলোর সামনে কিছুক্ষন দাঁড়িয়েছি – ওই পর্যন্ত। মানুষটাকে চাক্ষুষ করার কথা মাথাতেই আসেনি। কালো চশমা পরা বিনোদ বিহারী লাঠি হাতে কলাভবনে ঘুরছেন – এমন দৃশ্যও আমার চোখ এড়িয়ে গেছে। এ সব ভাবলে আজ কী আফশোষটাই না হয়।

ক্যানালের মোড়

মাঝে প্রায় বছর দশেকের ব্যবধান পেরিয়ে শান্তিনিকেতন গেছি নিছক প্রকৃতির টানে। নব্বই দশকের গোড়াতেও শ্যামবাটি পেরিয়ে ক্যানালের চারপাশটা অদ্ভুত নির্জন ছিল। প্রান্তিকের দিকে কয়েকপা হাঁটলেই যে সেচ বাংলো রয়েছে সেখানে সপরিবারে ছিলাম একবার। মনে আছে সন্ধের পর বেশ গা ছম ছম করত। আশেপাশে ছোট ছোট কিছু ঝুপড়ি আর চা-সিঙ্গাড়ার দোকান ছাড়া কিছুই ছিল না। ওখানেই দেখা হয়ে গিয়েছিল আশিসের সঙ্গে। আর্ট কলেজের জুনিয়র। কাছেই এক আদিবাসী গ্রাম বনেরপুকুরে ওরা কয়েকজন আর্টিস্ট মিলে বাড়ি বানিয়ে রয়েছে। ঘুরে এলাম – সুন্দর, ছোট্ট মাটির দোচালা আশিসের। পিছনেই রয়েছে মস্ত পুকুর, তালগাছের সারি, অনেক দুর অবধি ধানক্ষেত, খোলা নীল আকাশ – মনে মনে ভাবলাম দেখার এই তো শুরু।

আরও পড়ুন:  সাকিন বা মনের খবর শুধু নয়, বাংলা চলচ্চিত্রে যোগ্য সম্মানও কি পেয়েছিলেন জীবনপুরের পথিক ?
ক্যানালের ধারে পাখিরালয়

কয়েক বছরের মধ্যেই বেড়াবার সঙ্গী হয়ে দাঁড়াল রঙ-তুলি আর স্কেচখাতা। এক বর্ষাকালে শ্যামবাটির এক মাঝারি হোটেলে গিয়ে উঠলাম আমি আর অভিজিৎ। উদ্দেশ্য একটাই। ইচ্ছেমত ছবি এঁকে বেড়াব,শান্তিনিকেতন ও তার আশেপাশের। বছর পনেরো আগেও কোপাই নদী পর্যন্ত চলে যাওয়া লম্বা রাস্তাটার দু-ধারে পাকাবাড়ি চোখেই পড়ত না।

ফুলডাঙা ছিল ধূ ধূ প্রান্তর

ফুলডাঙাটা ছিল ধূ ধূ প্রান্তর – তখনও মিনি সল্টলেক হয়ে ওঠেনি। আর ক্যানালের ধার ঘেঁষে লাল মাটির রাস্তা ধরে সোনাঝুরির জঙ্গল অবধি হেঁটে যাওয়াটা যে কী মনোরম ছিল বলে বোঝানো যাবে না। আঁকার জন্য মনের মত  Spot খুঁজে বের করতে গেলে আগে চারদিক চষে ফেলা দরকার। পায়ে হেঁটে সময় আর এনার্জি নষ্ট করার মানে হয়না, এর জন্য সাইকেল চাই। সে ব্যবস্থাও হল। ক্যানালের মুখটাতে গুটি কয়েক দোকানের একটাতে সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। অভিজিৎ চালাতে জানলেও প্রথমে কিঞ্চিৎ গাঁইগুঁই করল। ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করালাম। তারপর বেড়িয়ে পড়া গেল দু’চাকায় চেপে।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আদিবাসী গ্রাম

সে যাত্রায় প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম আদিবাসীদের গ্রামগুলো কী পরিষ্কার আর ঝকঝকে হয়। ওদের মাটির বাড়িতে জানালা প্রায় থাকেই না। বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে কেবল একটা দরজা অথবা দুটো বাড়ির ফাঁকে ছোট্ট এক ফালি গলিপথ। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা চারদিকে তিড়িং-বিড়িং করে খেলে বেড়াচ্ছে। মহিলারা নানা কাজে ব্যস্ত – খড় শুকোচ্ছে, মাটি লেপছে, রান্না করছে। এসব আঁকার লোভ থাকলেও চেষ্টা করিনি – যদি ব্যাপারটা ওদের পছন্দ না হয়। পরে অবশ্য এ সব কাটিয়ে উঠেছি।

শান্তিনিকেতন মানেই তালগাছ

এ অঞ্চলে তালগাছ ছাড়া ল্যান্ডস্কেপ ভাবাই যায়না – এত দেখা জিনিস অথচ আঁকতে গিয়ে প্রথমদিকে পাতার অ্যারেঞ্জমেন্ট-টা ধরতেই পারতাম না। শ্রীনিকেতন যেতে হাইওয়ের ধারে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ চোখে পড়ল। তখন ঠা ঠা দুপুর – তাও পাশের একটা কালভার্টের ওপর গুছিয়ে বসলাম আঁকব বলে। এখানেও কিছুতেই গুঁড়ির স্ট্রাকচারটা হচ্ছিল না – তাও বেশ মজা পাচ্ছিলাম – প্রকৃতিকে ভালোভাবে চেনার একটা চেষ্টা তো হচ্ছে। পরবর্তীকালে যা আমাকে শিল্পী হিসেবে ধীরে ধীরে অনেক বেশি ম্যাচিওর করে তুলেছিল বলা যায়।

আরও পড়ুন:  জেনে রাখুন তেঁতুলের ১০টি উপকারিতা

পরের শীতেই গেলাম বাড়ির সবাইকে নিয়ে। ক্যানাল যেতে রাস্তার ধারে ছোট্ট ছিমছাম দো’তলা বাড়ি – ‘বনপুলক’ – একতলাটা লজ। পেছন দিকে গোটাটাই ঝিল, পাখির মেলা। মিনিট দু’য়েক হাঁটলেই বৌদির ‘পূর্বাশা’ হোটেল তখন সবে জমে উঠছে। ভাত, মাছ, তরকারি – হালকা সুস্বাদু রান্না আর খুবই সস্তা। শান্তিনিকেতনে তখনও মোড়ে মোড়ে অত হোটেল, রেস্টুরেন্ট গজিয়ে ওঠেনি – যা কিছু সব বোলপুরে। ভালো মন্দ খেতে হলে আমরা চলে যেতাম টুরিস্ট লজ-এ। ওখানে রুই মাছের কালিয়াটা দারুন রাঁধত। আমার এক মাসতুতো দাদা থাকত ডিয়ার পার্কের পাশেই। যাওয়া আসার শর্টকাট রাস্তা ছিল লাল বাঁধ পেরিয়ে – টলটলে পুকুর – তবে কিছু লোক একটা অংশকে দিব্যি ধোবিঘাট বানিয়ে দিয়েছে।

লালবাঁধের ধোবিঘাট

সূর্যাস্তের সময় এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে চমৎকার লাগত। সেই দাদাও আর নেই, তাছাড়া কয়েক বছর হল পাঁচিল তুলে বাঁধে ঢোকার পথটাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যত দিন কেটেছে প্রকৃতির পাশাপাশি শান্তিনিকেতনের বহু মানুষজন এবং কাজকর্ম সম্পর্কে পরিচিত হয়েছি। আর সেই সঙ্গে চোখের সামনে বদলে যেতে দেখেছি এখানকার গোটা পরিবেশ – তবে সে সব কথা জানাব আগামী পর্বে।

- Might Interest You

1 COMMENT