বলা যায় তিনিই গত কয়েক বছরে বাংলা সিনেমার সবচেয়ে সফল পরিচালক | আগামী ছবি পোস্ত নিয়ে উন্মাদনা তো ছিলই পাশাপাশি নতুন শোরগোল তাঁর ছবি রামধনুর কনসেপ্ট নিয়ে তৈরি হিন্দি ছবি হিন্দি মিডিয়াম নিয়ে | এসব নিয়েই তন্ময় দত্ত গুপ্তর সঙ্গে কথা বললেন শিবপ্রসাদ মুখার্জি |

 

 

আপনাদের রামধনু ছবির কপি হচ্ছে হিন্দিতে এই খবরে টলিপাড়া সরগরম এই খবর আপনি কী করে পেলেন?

শিবপ্রসাদ : আমার খবর পাওয়ার আগেই সারা ইন্ডাস্ট্রি খবর পেয়ে গেছে । সাধারণ মানুষ খবর পেয়ে গেছে । সোশ্যাল মিডিয়া মানে ফেসবুক, টুইটারে এ নিয়ে মানুষ কথা বলতে শুরু করেছেন । প্রত্যেকেই ওই ছবির ট্রেলার দেখেছেন । পোস্টার দেখেছেন । আমার থেকেও বেশি সরব হয়েছেন সাধারণ মানুষ ।

আপনি ওই ছবির ট্রেলার দেখেছেন?

শিবপ্রসাদ : হ্যাঁ, আমি দেখেছি ।

সেটা দেখে কী করে বুঝলেন ছবিটা পুরো রামধনুর অনুকরণ?

শিবপ্রসাদ : ট্রেলার দেখে পুরো ছবি বোঝা সম্ভব না । কিন্তু ছবিটার কনসেপ্ট যে ‘রামধনুর’ থেকে নেওয়া সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় নি ।

একই রকম থিম তো অন্যজনও ভাবতে পারেন তিনি রামধনুনাও দেখতে পারেন সেক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?

শিবপ্রসাদ : ধরুন ভারতবর্ষে আমি টেস্ট টিউব বেবি নিয়ে একটা ছবি করলাম । কিন্তু তার পায়োনিয়ারের নাম অস্বীকার করলে অনৈতিক কাজ হবে । সুচিত্রা ভট্টাচার্য ২০০২ সালে যে গল্পটা লিখে গেছেন সেই গল্প অবলম্বনে আমরা রামধনু ছবি করেছি । একটা ছবি থেকে ইন্সপায়ার হয়ে কেউ আর একটা ছবি বানাতেই পারেন । কিন্তু ওই ছবির সৃষ্টিকর্তার প্রতি সম্মান জানানো কর্তব্য । ‘কোলাহল’ নাটক দেখে আমাদের ‘বেলাশেষে’-র ভাবনার উদ্রেক হয়েছিল । আমরা ‘কোলাহল’-এর কথা উল্লেখ করেছিলাম আমাদের সিনেমায় ।

ঠিক সেরকমই রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতা থেকে আমাদের ‘প্রাক্তন’ সিনেমার ভাবনার জন্ম । আমি যদি ‘প্রাক্তন’ সিনেমায় ‘হঠাৎ দেখা’-র কথা উল্লেখ না করতাম তাহলে সেটা সুবিচার হতো না । ধরা যাক আমি আমার কোনও সিনেমায় শঙ্খ ঘোষের কবিতা ব্যবহার করলাম । আমাকে সেখানে শঙ্খ ঘোষের কথা উল্লেখ করতেই হবে ।

আরও পড়ুন:  প্রেগন্যান্ট সোহা আলি খান‚ পতৌদি পরিবারে আসতে চলেছে নতুন অতিথি

এই বিষয়টা নিয়ে আপনারা কি কোনও আইনি পদক্ষেপ নেবেন?

শিবপ্রসাদ : এটা নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই । যদি কোনও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার থাকে সেটা আমার প্রযোজক অতনু রায় চৌধুরী ভাববেন । আসলে ‘রামধনু’ নিয়ে হিন্দিতে আমার কাজ করার ইচ্ছে ছিল । এটা নিয়ে আমার সঙ্গে অনেকের কথা হয়েছিল । কিন্তু আর হিন্দিতে ‘রামধনু’ করা যাবে না ।

একটা ছবির থেকে আর একটা ছবির পার্থক্য হয় স্টাইল অফ মেকিং-এ সেই দিক থেকে হিন্দিতে কি অন্যরকম ভাবে রামধনু করা যেতে পারে?

শিবপ্রসাদ : ধরুন তিনটে বাচ্চা মেলাতে হারিয়ে গেলো ।বড় হয়ে তারা আবার ফিরে এলো । এবং তাদের বাবা মা তাদেরকে চিনতে পারল । এই ফরমুলায় অজস্র হিন্দি ছবি হয়েছে । তাতে কোনও অসুবিধা নেই । বিষয়টা অন্য জায়গায় । আপনি বাড়ি বানানোর পরের কথা বলছেন । আমি বলছি বাড়ি বানানোর আগের কথা । বাড়ি বানানোর আগে নকশাটা কোথা থেকে পাওয়া গেলো সেটা তো বলতে হবে । আমরা ‘মুক্তধারা’ বলে একটা ছবি করেছিলাম । সেখানে আমরা অলকানন্দা রায়ের কথা বলেছিলাম । ওনার কথা না বললে ক্রাইম হতো । কেউ ‘মুক্তধারা’ হিন্দিতে বানাতেই পারেন । কালচার থেরাপি সারা ভারতবর্ষ জুড়ে শুরু হয়েছে । কিন্তু মূল মডেল কোথা থেকে এলো সেই রুটের কথা স্বীকার করতে হবে । নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতি সমস্ত মানুষ চায়।

আপনার আপত্তিটা ঠিক কোথায় — আপনার ছবি কপি হয়েছে বলে?

শিবপ্রসাদ : আমাদের ছবির রাইটস  কিনে অনেকে ছবি করেছেন । রিমেক করেছেন । তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি ছিল না । কিন্তু একজনের সৃষ্টি বিনা অনুমতিতে কপি করা ক্রাইম । এক্ষেত্রে অর্থটা বড় কথা নয় । আমি মনে করি আমি যদি অন্যের সৃষ্টি দেখে অনুপ্রাণিত হই তাহলে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ।

তপন সিংহের গল্প হলেও সত্যি থেকে হিন্দিতে বাবুর্চি সিনেমা হয়েছিল আবার ছদ্মবেশীথেকে হিন্দিতে “চুপকে চুপকে” হয়েছিল অতীতে এরকম একাধিক বাংলা সিনেমার কনসেপ্ট থেকে হিন্দি সিনেমা হয়েছে আবার এখন আপনাদের ছবির কনসেপ্ট থেকে হিন্দিতে ছবি করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এই জায়গা থেকে কোথাও কি গর্ব বা আনন্দের জায়গা আছে?

শিবপ্রসাদ : অবশ্যই আছে । এখন বাংলা সিনেমা প্রায় মুভমেন্টের পর্যায়ে চলে গেছে । কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘শব্দ’,সৃজিত মুখার্জীর ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর মতো সিনেমা ভারতবর্ষের মতো দেশে খুব কম হয়েছে । আদিত্য বিক্রমের ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ এবং অরুণ রায়ের ‘চোলাইয়ের’ মতো সিনেমা কটা লোক বানাতে পারে বলুন তো! চোলাইয়ের মতো ছবি করতে গেলে যে সৎ সাহস দরকার,সেটা কটা লোকের আছে!?

আরও পড়ুন:  একসঙ্গে সময় কাটালেন‚ দুই ছেলেকে নিয়ে সিনেমা হল-এ হৃতিক-সুজান

এই সৎ সাহস কি আপনার পোস্ত ছবির মধ্যেও দেখা যাবে?

শিবপ্রসাদ : প্রাইম টাইমে ‘পোস্ত’য় মিমি চক্রবর্তী মায়ের চরিত্র করতে রাজি হয়েছে । এটা কম কথা নয় । আমি বাদেও গৌতম ঘোষ ‘মনের মানুষ’-এর মতো ছবি বানিয়েছেন । আসলে কি হয় জানেন,আমরা আমাদের ফ্রেটারনিটির মানুষদের ঠিক চিনতে পারিনা । মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে গেলে বোঝা যাবে আমাদের বাংলা সিনেমা সম্পর্কে ওদের কী অগাধ শ্রদ্ধা । আমার মনে হয় রিজিওনাল সিনেমা এখন খুব ভালো হচ্ছে । ন্যাশনাল লেভেলে কিন্তু এরকম সিনেমা হচ্ছে না ।

পোস্ত ছবিতে মা ছেলের সম্পর্ক রয়েছে এই সম্পর্ক আপনাদের ইচ্ছে এবং রামধনু’তেও রয়েছে এই সম্পর্ক কেন আপনাদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ?

শিবপ্রসাদ : ‘পোস্ত’ ঠিক মা-ছেলের সম্পর্কের গল্প নয় । পোস্ত হলো একটা ছেলের বেড়ে ওঠার গল্প । এটা সম্পূর্ণ অন্যরকম সিনেমা । যে বিষয় নিয়ে ‘পোস্ত’ হয়েছে,সেই বিষয় নিয়ে ভারতবর্ষে কোনও সিনেমা হয়নি ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নায়কের মতো আপনাদের অনেক ছবিতে অভিনয় করছেন আপনারা কি এখনও সৌমিত্র বাবুকে নিয়ে এক্সপিরিমেন্ট করছেন?

শিবপ্রসাদ : ভবিষ্যতেও আমাদের ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থাকবেন । আমার মনে হয় এখনও ওনার অনেক কিছু দেওয়ার বাকি ।

বাঙালি মধ্যবিও সেন্টিমেন্ট আপনাদের সিনেমার বিষয় হয়ে উঠছে আর একরকমের বাঙালি আছে যারা বং বাঙালি মানে যারা আধা ইংরাজি আধা বাংলায় কথা বলেন সেই বাঙালি জীবন আপনাদের ছবিতে আসে না কেন?

শিবপ্রসাদ : আমাদের প্রথম ছবি ‘ইচ্ছে’ । সেটা মা-ছেলের সম্পর্কের ওপর । দ্বিতীয় সিনেমাটা রোড অ্যাক্সিডেন্টের ওপর । এই ছবিতে সামান্য রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এসেছে । সারা ভারতবর্ষ কি এই বিষয় নিয়ে সিনেমা করেছে? জেল নিয়ে আমরা ‘মুক্তধারা’ করেছি । সারা ভারতবর্ষ এইরকম সিনেমা নিয়ে ভাবেনি । ‘মুক্তধারা’তেও রাজনৈতিক পরিবেশ এসেছে । জেলের মধ্যে রাজনীতি চলে । জেলের ভেতর সমস্ত নাচ গান নিয়ন্ত্রণ করে জেল ইউনিয়ন । ২০১৩ সালে ‘অলীক সুখ’ করেছি । সেটা সমকালীন ছবি । ‘রামধনু’ ছবিতে সিস্টেমের একটা দিক দেখানো হয়েছে । এই ছবির ট্যাগ লাইন ছিল —‘বেস্ট স্কুল নয় । বেস্ট এডুকেশন’ । আমাদের সব ছবির মধ্যে সোশ্যাল মেসেজ রয়েছে । দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর আমরা তৈরি করেছিলাম ‘বেলাশেষে’ । আর কি ভ্যারাইটি দেব!

আরও পড়ুন:  জাস্টিন বিবারের কনসার্টে ঢুকতেই পারলেন না বিপাশা-করণ‚ কিন্তু কেন?

অমিতাভ বচ্চনের মতো মানুষ বেলাশেষে দেখে প্রশংসা করেছেন এই খবর যখন প্রথম পেলেন তখন ঠিক কেমন লেগেছিল?

শিবপ্রসাদ : এটা আমার কাছে খুব বড় একটা সম্মান । একটা ফ্রেটারনিটি থেকে আর একটা ফ্রেটারনিটিকে সম্মান জানানোর ব্যাপারটা আজকাল প্রায় উঠেই গেছে । ভাবতে ভালো লাগে এখনও অমিতাভ বচ্চনের মতো অগ্রজর মধ্যে এই স্বীকৃতি জানানোর মানসিকতা রয়েছে ।

আপনারা বলেছেন আপনারা তরুণ পরিচালকদের সুযোগ দেবেন একজন তরুণ আপনাদের ব্যানারে করছে রসগোল্লা বলে একটা ছবি আর অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় করছেন প্রজাপতি বিস্কুট বলে ছবিটা প্রজাপতি বিস্কুট,রসগোল্লা,পোস্ত — তিনটে ছবির নামের সঙ্গে খাবার জড়িত নামগুলো দেখে সুকুমার রায়ের ছড়ার কথা মনে পড়ে যায় —“খাই খাই কর কেন/এসো বোসো আহারে” এধরনের নামের পেছনে কি কোন সচেতন সমীকরণ রয়েছে?

শিবপ্রসাদ : না, না কোনও ক্যালকুলেশন নেই । বিষয় অনুযায়ী প্রত্যেকে প্রত্যেকের ছবির নাম রাখবেন । এর মধ্যে কোনও লিঙ্ক নেই ।

- Might Interest You

NO COMMENTS