শরৎ-হেমন্তে ভারতবর্ষ জুড়ে পূজিতা হন দেবী দুর্গা | এক এক অঞ্চলে তাঁর রূপ এবং নাম ভিন্ন | মাতৃপূজা আর্যদের তুলনায় দ্রাবিড় সভ্যতায় বেশি প্রচলিত ছিল | পরে তা রূপ পরিবর্তিত হয়ে প্রবেশ করে আর্য সংস্কৃতিতে | শরৎকালে ভারতের পূর্বপ্রান্তে যখন দুর্গাপুজো হয়‚ তখন পশ্চিম ভারত মেতে ওঠে নবরাত্রিতে | মূলত গুজরাতিরা এই উৎসব পালন করেন | হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এখানে উপাসিত হয় দেবী দুর্গার ৯ টি রূপ | সেখান থেকেই নবরাত্রি | প্রতি দিন পূজিতা হন দেবীর এক একটি রূপ |

১| শৈলপুত্রী : নবদুর্গার প্রথম রূপ হল এটি | শৈল মানে হল পাহাড় | হিমালয় পর্বতের কন্যা দুর্গা | তাই তিনি এখানে শৈলপুত্রী | যাঁর অপর নাম সতী ভবানী‚ পার্বতী বা হেমবতী | হিমালয়ের এক নাম হেমবাহন | তাই‚ তাঁর কন্যা হলেন হেমবতী | ব্রহ্মা‚ বিষ্ণু এবং মহেশ্বরের শক্তির একত্রিত রূপ এই দেবী ষাঁড়ের পিঠে আরোহিতা | তাঁর এক হাতে থাকে ত্রিশূল | অন্যহাতে পদ্ম |

২| ব্রহ্মচারিণী : নবরাত্রির দ্বিতীয় রাতে দেবী উপাসিত হন এই নামে এবং এই রূপে | তিনি এখানে শান্তির প্রতিভূ | তাঁর ডান হাতে থাকে রুদ্রাক্ষের জপমালা | বাঁ হাতে তিনি ধরে আছেন কমণ্ডলু | তিনি ভক্তদের সুখ‚ স্বস্তি‚ শান্তি দান করেন | সুখ শান্তির সঙ্গে দেবী মোক্ষ বা মুক্তির প্রতীক |

৩| চন্দ্রঘণ্টা : তৃতীয় রাতে দেবী অসীন হন এই নামে | তাঁর মাথায় থাকে একফালি চাঁদ | চাঁদের আকার আবার ঘণ্টার মতো | উজ্জ্বল বর্ণের দেবীর বাহন সিংহ | দশভুজা দেবীর দশ হাতে ধরা অস্ত্র | ত্রিনয়নী দেবী শক্তি এবং সাহসের প্রতীক | তিনি অসুরের সঙ্গে যুদ্ধরত | এই রূপের সঙ্গে অনেক দিক দিয়ে মিল আছে বঙ্গদেশে পূজিতা দেবী দুর্গার |

৪| কুষ্মাণ্ড : সংস্কৃতে কু মানে স্বল্প | উষ্ম বা উষ্ণ হল গরম এবং অণ্ড মানে ডিম | তিনটি কথা মিলে হল কুষ্মাণ্ড | এই রূপে দেবী হলেন সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টির প্রতীক | অর্থাৎ তাঁর থেকেই জন্ম হয়েছে এই মহাবিশ্বের | নবরাত্রির চতুর্থ রাতে পূজিতা এই দেবীর কোথাও আট‚ কোথাও আবার দশ হাত | সিংহবাহিনী দেবী দশ হাতে ধারণ করে আছেন আয়ুধ এবং কমণ্ডলু |

৫| স্কন্দমাতা : আমরা যেমন দেবীকে গণেশজননী হিসেবে বেশি পুজো করি‚ পশ্চিম ভারতে আবার দেবী মান্যতা পান কার্তিকেয়র মাতা হিসেবে | কার্তিকের অরা এক নাম স্কন্দ | নবরাত্রির পঞ্চম রাতে দুর্গা পূজিত হন স্কন্দমাতা রূপে | ত্রিনয়নী দেবী চার হাতবিশিষ্টা | ডানদিকের উপরের হাতে ধরে আছেন শিশু কার্তিককে | প্রস্ফুটিত পদ্ম থাকে আর এক দক্ষিণ হস্তে | বাঁ দিকের একটি হাত বরাভয় দিচ্ছে | আর এক হাতে ধরে আছেন পদ্ম | এই রূপে দেবী দুর্গা কোনও বাহনে উপবিষ্ট নন | তিনি বসে থাকেন ফুটে থাকা কমলে | পূজিত হন নবরাত্রির পঞ্চমদিনে |

৬ | কাত্যায়নী : এই নাম এবং রূপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক পৌরাণিক কাহিনি | বৈদিক যুগে কাত্যায়ন নামে এক ঋষি ছিলেন | এক পুত্রের পিতা কাত্যায়নের ইচ্ছে হয় একটি কন্যসন্তান লাভের | দেবী দুর্গার তপস্যা করে তিনি অভীষ্ট পূর্ণ করেন | তাঁর স্তবে তুষ্ট হয়ে স্বয়ং দেবী দুর্গা জন্ম নেন মহারিশি কাত্যায়নের কন্য রূপে | তখন তাঁর নাম হয় কাত্যায়নী | নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে আরাধিতা হন ভক্তদের কাছে |

৭ | কালরাত্রি : এখানে দেবী কৃষ্ণবর্ণা | আলুলায়িত কেশে তিনি ধাবিত শত্রুর দিকে | তাঁর কণ্ঠে বিদ্যুতের মালিকা | ত্রিনয়নী দেবীর শ্বাস প্রশ্বাসে বেরিয়ে আসে আগুনের হলকা | ভীষণদর্শনা দেবীর তিন হাতে অস্ত্র | এক হাতে ভক্তদের প্রতি বরাভয় | এই রূপই উপাসিত হয় কালিকা রূপে | তবে এই রূপেও দেবী ভক্তের শুভ করেন | তাই অন্যদিকে তিনি শুভঙ্করী | দেবীর বাহন গর্দভ | ভক্তরা তাঁর পুজো করেন নবরাত্রির সপ্তম রাতে |

৮| মহা গৌরী : হিমায়লকন্যা নাকি ছিলেন কৃষ্ণা | মহাদেব যখন গঙ্গাজল দিয়ে তাঁকে স্নান করান‚ তখন তিনি হয়ে ওঠেন ফর্সা | তাঁর এই রূপের নাম হয় মহাগৌরী | প্রচলিত বিশ্বাস‚ নবরাত্রির অষ্টম রাতে তাঁর পুজো করলে সব পাপ ধুয়ে যায় | সাদা পোশাক পরিহিতা‚ চার হাত বিশিষ্টা দেবীর বাহন ষাঁড় | দেবীর এক হাত শোভিত বরাভয় মুদ্রায় | বাকি তিন হাতে থাকে পদ্ম‚ ত্রিশূল এবং ডমরু |

৯ | সিদ্ধিদাত্রী  : নবদুর্গার নবম তথা শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী  | সিংহবাহিনী দেবীর চার হাতে আশীর্বাদী মুদ্রা | তিনি সিদ্ধি দান করেন | অর্থাৎ তাঁর উপাসনায় সংসারে আসে সুখ এবং সমৃদ্ধি | সবাইকে বরাভয় দেন এই মাতৃকামূর্তি | দেবী ভগবৎ পুরাণে আছে‚ স্বয়ং মহাদেব দেবী দুর্গাকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন | এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন | সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদেই অর্ধনারীশ্বর রূপ লাভ করেন মহাদেব |

(পুনর্মুদ্রিত)

আরও পড়ুন:  মাথার কেশরাশি থেকে পায়ের পাতা অবধি হিন্দু কনেকে ঢেকে রাখে ষোল শৃঙ্গার

NO COMMENTS