যাচ্ছিলাম মুম্বাই। এয়ারপোর্টে পৌঁছে শুনলাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্যারিস যাচ্ছেন। দূর থেকে দেখলাম উনি বসে বই পড়ছেন। খবর নিয়ে জানলাম ওনার প্লেন দু-ঘন্টা লেট। ওনার সঙ্গে আরও অনেকে রয়েছেন। ভাবলাম যদি একটু কথা বলতে পারি। আগামী কাল ২১শে ফেব্রুয়ারি, সেই সম্পর্কে যদি দুচার কথা বলেন। সাহসে ভর করে এগিয়ে গেলাম। 

 

জলদ – নমস্কার, আপনাকে এভাবে এয়ারপোর্টে পেয়ে যাব ভাবি নি। আমরা আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস নিয়ে আপনার একটা সাক্ষাৎকারের জন্য গত মাসে ফোন করেছিলাম..

ঈশ্বরচন্দ্র –আপনাদের কোন পত্রিকা যেন ?    

জলদ – বাংলালাইভ ডট কম, এটা একটা ওয়েব ম্যাগাজিন….( আমাকে থামিয়ে দিয়ে)

ঈশ্বরচন্দ্র – … হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়েছে, দুঃখিত আমি সময় দিতে পারি নি, আসলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভাষা নিয়ে একটা সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম। বেশ কিছু বিষয় নিয়ে একটু পড়াশুনা করতে হচ্ছে…তাই…

জলদ – আপনাকে এখনও পড়াশুনা করতে হয় ?

ঈশ্বরচন্দ্র – অবশ্যই। পড়াশুনা না করলে আপনি ভাববেন কীভাবে ? দেখুন, সচেতনে বা অবচেতনে পড়াশুনা কিন্তু আমরা সবাই করি। কিন্তু সবাই সেটাকে সংরক্ষণ করে রাখতে পারি না, এই সংরক্ষণ করাটা কিন্তু খুব জরুরি। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করতে পারলে আপনি আপনার জীবনে বা আপনার সমাজের জীবনে সেটাকে ব্যবহার করবেন কী করে ? সঠিক সংরক্ষণের অভাবে আমাদের কত ইতিহাস আমরা হারিয়ে ফেলেছি, ফেলছি। মনে রাখতে হবে একটা জাতির মেরুদণ্ড হল তার ইতিহাস, সেটা যদি দুর্বল হয়ে যায় তবে জাতিটাও সামগ্রিকভাবে দুর্বল হতে বাধ্য।    

জলদ – কিন্তু তার জন্য তো সঠিক মানুষদের দরকার, যারা সংরক্ষণ করবে, বা কী সংরক্ষণ করতে হবে সেটা ঠিক করবে।

ঈশ্বরচন্দ্র –আপনার কি মনে হয়, এখন সঠিক মানুষ নেই ?

জলদ- না ঠিক তা বলছি না, কিন্তু…

ঈশ্বরচন্দ্র – দেখুন সঠিক মানুষ সব যুগে সব সময়ই ছিল, এখনো আছে কিন্তু প্রেক্ষাপট বদলানোর জন্য আমাদের ভাবনার পরিবর্তন ঘটছে। যেমন ধরুন, ১৮৫৫ সালে বিধবাবিবাহ নিয়ে আমার প্রস্তাব যখন পুস্তক আকারে প্রকাশিত হল তখন সেটা সবার কাছে একেবারেই নতুন একটা বিষয়। বিরোধিতা আসবে আমি জানতাম কিন্তু এই প্রস্তাবের বিপক্ষে জোরদার আন্দোলন শুরু হল। কিছু সাহসী মানুষ অনেক মানসিক অত্যাচার সহ্য করে আমার পাশে ছিলেন। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। একটা নতুন ভাবনাকে (সে ভাল বা খারাপ যাই হোক) প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে বিরোধিতা আসবেই তখন সঠিক মানুষেরা সঠিক পথ দেখাবেন, সাধারণ মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এটা এখনও স্বাভাবিকভাবেই ঘটছে বলে আমার বিশ্বাস, নাহলে সমাজটা থেমে যেত।

জলদ – কিন্তু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও কি এই নিয়ম খাটে ? আপনি, কবিগুরু এবং আপনাদের মতো বেশ কিছু মানুষ যে ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্তরে একটা উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, যে ভাষাকে মাতৃভাষা করার দাবিতে বহু মানুষ প্রাণ দিল, যে ভাষার জন্য আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে একটা দিন ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়, যে ভাষাকে ইউনেস্কো পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ভাষা বলেছে…সেই ভাষার এমন দুরবস্তা হয় কীভাবে ?

ঈশ্বরচন্দ্র – দুরবস্থা বলতে আপনি কী বলতে চাইছেন ?

জলদ- দুরবস্থা মানে দুর্দশা। আপনি সবটাই জানেন তবু বলছি, বাঙালি বাংলা ভাষাকে বোধহয় আর ভালবাসে না। সে তার সন্তানদের বাংলা বই , বাংলা গান, বাংলা সিনেমা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে….আপনি জানেন, সন্তানের বাংলা বলতে না পারাটা শহুরে বাঙালি বাবা মায়ের কাছে এখন গর্বের বিষয় !    

ঈশ্বরচন্দ্র – জানি, কিন্তু এ সবকিছুই পশ্চিমবঙ্গ বা আরও নির্দিস্ট করে বললে বলা যায় কলকাতা শহরের চিত্র। এই বঙ্গের গ্রামাঞ্চল বা বাংলাদেশের ছবিটা কিন্তু একেবারেই আলাদা, সেখানে বাংলা ভাষা সম্পর্কে ভাবনাটাই অন্যরকম। অনেক সংগ্রাম, আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হবার কারণে এ ভাষা তাদের অহংকার, অলঙ্কার। আসলে শুধুমাত্র ভালবাসলেই কোন কিছুকে টিকিয়ে রাখা যায় না, তার জন্য দরকার হয় গর্বের, অহংকারের। বাংলাদেশিদের বাংলা ভাষা নিয়ে সেই গর্ব – অহংকার আছে। এই বাংলার মানুষ এ ব্যাপারে বোধহয় একটু হলেও উদাসীন।

এসবকিছুই কিন্তু কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই দুটি অঞ্চল একটা সময় একই দেশের মধ্যে থাকার জন্য এই আঞ্চলিক ভাষাটিকে বাঁচিয়ে রাখা বা তার আধুনিকীকরণের তাগিদ কেউই অনুভব করে নি। আমরাও যারা  ভাষাটিকে নিয়ে ভেবেছি, বা ভাষাটার একটা সামগ্রিক রুপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি তারা মুলত ভাষাচর্চা বা সাহিত্যের কথা ভেবেই এটা করেছি। আমরা কখনোই বোধহয় রাষ্ট্রব্যবস্থা বা প্রশাসনের কথা ভাবি নি। তাই বাংলা কখনোই কাজের ভাষা হয়ে উঠতে পারে নি। আজও বাংলা পশ্চিমবঙ্গে সামগ্রিকভাবে প্রশাসনের ভাষা নয়। কথ্যভাষা যদি প্রশাসনের ভাষা বা কাজের ভাষা না হয় তাহলে তার গুরুত্ব কমতে বাধ্য। এরপর আমাদের দেশের স্বাধীনতা, হিন্দীর রাষ্ট্রভাষা হওয়া। শুনলে হয়ত অবাক হবেন যে সে সময় বাংলা ভাষাই অখণ্ড  ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা হতে পারত। সেটা অবশ্য অন্য আলোচনা।

ক্রমে ক্রমে বাংলাদেশ একটু একটু করে ভারতবর্ষ, পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে এক স্বাধীন দেশের মর্যাদা পেল। পেল রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ? একসঙ্গে তিনটে ভাষাকেই মানতে হল তাকে। রাজধানীতে ছেড়ে যাওয়া ইংরেজদের ইংরাজি, রাষ্ট্রভাষা হিন্দী আর মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে সে তখন জেরবার। তিনটের মধ্যে দুটো বা তিনটে ভাষাকেই গুরুত্ব দিতে গিয়ে বাঙালি পড়ল বিড়ম্বনায়। এর মধ্যেই রাষ্ট্রভাষা এবং আন্তর্জাতিক ভাষার কূটনৈতিক  চাপে বাংলাভাষা সত্যি সত্যিই শীর্ণকায় হতে শুরু করলো।

জলদ – শুধু শীর্ণকায় ? আপনি শুনলে চমকে যাবেন খোদ কলকাতা শহরে মাত্র আঠাশ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলেন। এই শহরের প্রায় পঁচাত্তর শতাংশের বেশি ব্যানার, পোস্টার, হোর্ডিং, দোকান শপিং মল বা সিনেমা হলের নেম প্লেটে বাংলা নেই।

ঈশ্বরচন্দ্র –থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। এ শহর ইংরেজদের রাজধানী থাকার কারনে আমরা অনেক ইংরাজি শব্দকে খুব সহজে বাংলাতে একাত্ম করে নিয়েছি, তার বাংলা প্রতিশব্দ নিয়ে মাথা ঘামাই নি। যেমন আপনি এখনই বললেন ব্যানার, হোর্ডিং বা নেমপ্লেট ইত্যাদি। এগুলো বা এগুলোর মতো হাজার হাজার বিদেশী শব্দ বাংলা শব্দ হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। তাদের কোন জুতসই বাংলা প্রতিশব্দকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি নি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। দেখুন, ভাষার মধ্যে বিদেশী শব্দের আদানপ্রদান থাকবেই কিন্তু সেটার একটা ভারসাম্য থাকা উচিৎ। সেটা নাহলে ভাষার পরিচিতি দুর্বল হতে থাকে। আর সবাইকে সম্মান দিয়েই বলছি সঠিক মতকে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কিছু ক্ষেত্রে একটু কঠোর হতে হয় নাহলে আসল কাজটাই হয় না।

এক্ষেত্রেও বোধহয় একটু কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। আমরা কেন সবাইকে এটা বোঝাতে পারব না যে, আপনার দোকানের নাম আপনি দশটা ভাষাতে লিখতে পারেন কিন্তু বাংলাতে আপনাকে লিখতে হবেই। কেন আমরা আইন করতে পারবো না যে, পশ্চিমবঙ্গের সব স্কুলে বাংলা বাধ্যতামূলকভাবে পড়াতে হবে। প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সতস্ফুর্তভাবে কেন বাংলাভাষা ব্যবহৃত হবে না ? উত্তরাধিকার সূত্রে বা জীবিকার প্রয়োজনে বছরের পর বছর এই বাংলায় থাকা অন্য রাজ্যের মানুষটি কেন বাংলা জানবেন না ? আর আমরা কেন তার সঙ্গে হ্যাংলার মতো হিন্দী বলে কলার তুলবো ? কলকাতা শহরের মধ্যেই কেন আমাকে হিন্দী বা ইংরাজী ভাষায় অনর্গল কথা বলতে হবে ? কথাগুলো একটু মৌলবাদীর মতো শোনালেও ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য এটুকু করতেই হবে। কিছুদিন আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এ ব্যাপারে খুব ভাল উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বেশ ভাল কাজও করছিলেন। এখনও বেশ কিছু কৃতি মানুষ এ ব্যাপারে এগিয়ে আসছেন দেখে ভাল লাগছে। কিন্তু কঠোর নাহলে এই এগিয়ে এসে খুব একটা কিছু লাভ হবে বলে মনে হয় না। মনে রাখতে হবে ইংরাজি বা হিন্দীর সঙ্গে আমাদের কোন বিরোধ নেই। পেশাদারি অপেশাদারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য বা আন্তর্জাতিক স্তরে কোন বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে ইংরাজীটা জানতেই হবে। এই বাংলাতেই এমন অনেক মানুষ ছিলেন বা আছেন যারা ইংরেজদের থেকেও ভাল ইংরাজি জানতেন… জানেন, কিন্তু তার সঙ্গে বাংলা ভাষা জানা বা না জানাটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। এই বাংলায় থাকা মানুষদের এটা বুঝতে হবে যে, তুমি দশটা ভাষা জানতে পারো, সেই ভাষায় তুমি কথাও বলতে পারো কিন্তু বাংলায় থাকতে গেলে বাংলাটাকে জানতে হবে, বাংলা বলতে হবে।

জলদ – কাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা পৃথিবীই এই দিনটাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে। এই বাংলায়ও অনেক অনুষ্ঠান, উৎসব… ( আমাকে থামিয়ে দিয়ে )

ঈশ্বরচন্দ্র – লাভ নেই, উৎসব মানুষকে কিছুদিন বা কিছুক্ষনের জন্য মাতিয়ে রাখতে পারে, আনন্দ দিতে পারে কিন্তু নিত্যদিনের সঙ্গী হতে পারে না। এ অনেকটা দুর্গাপুজার মতো, বছরে একবার আসে…মাতিয়ে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু দুর্গা আমাদের ঠাকুরঘরে নিত্যপুজোর অংশীদার হয়ে উঠতে পারে না । অন্যদিকে পরিবারের ঠাকুরঘরের সিংহাসনে রাখা ছোট্ট একটা নারায়ণ শিলাকে রোজ চান করাতে হয়, ভোগ দিতে হয়…পুজো করতে হয়। এই শিলাটি ওই পরিবারের নিত্যদিনের সুখদুঃখের সঙ্গী। মনে রাখতে হবে ২১শে ফেব্রুয়ারি  কিন্তু বৎসরান্তের দুর্গোৎসব নয় সে বাঙালির নারায়ণ শিলা।

( এ সময় বিমান ছাড়ার ঘোষণা শোনা যায়।)         

জলদ – অসাধারন বললেন … জানি না আমরা আপনার ভাবনাকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো ! আমাদের পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে প্রনাম।

ঈশ্বরচন্দ্র – আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। শেষে একটা কথাই বলবো, মাতৃভাষাকে মা’য়ের মতো ভালোবাসুন, তাকে নিয়ে গর্ব করুন। তবেই সেটা প্রকৃত অর্থে আপনার মাতৃভাষা হয়ে উঠবে।                                      

- Might Interest You

1 COMMENT

  1. ekhanakaar chhele meyera nijer ma kei bhalobasena to matRibhashha. bayas hale ma babake paThiye dichchhe bRiddhashrame. bideshe nijer kachhe niye Jabo bale dhappa diye barhi bikri kariye , Taka pakeTastha kare burhi ma ke air port e basiye champaT dichchhe. ei sbartha sarbasba santaner dal matRibhashha ba matRibhoomi ke samman karbe erakam bhbar kon karaN nei