তাঁর বাবা বাংলার বাঘ | তিনি নিজে ব্যাঘ্রশাবক হয়েছিলেন শুধু পিতৃপরিচয়ে নয় | নিজ গুণ‚ পাণ্ডিত্য‚ প্রতিভা ও কর্মদক্ষতায় | তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় | জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ তাঁরই জীবনকথায় | গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর মতো | 

# জন্ম ১৯০১ সালের ৬ জুলাই‚ কলকাতায় | বাবা স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অলঙ্কৃত করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির পদ | মা যোগমায়া দেবী | বাঙালি গৃহবধূ হলেও কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী ছিলেন |

# আশুতোষ-যোগমায়ার সেজো ছেলে শ্যামাপ্রসাদ | বড় ছেলে রমাপ্রসাদ | পরে হাইকোর্টের বিচারপতি হন | মেজো ছেলে উমাপ্রসাদ ছিলেন হিমালয় পরিব্রাজক | ছোট ছেলের নাম ছিল বামাপ্রসাদ | এছাড়াও তিন মেয়ে‚ কমলা‚ অমলা ও রমলা |

# পারিবারিক ধারা মেনেই শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী | ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশনের পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক স্তরে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম | পরে বাংলা নিয়ে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ | ১৯২৩ সালে হন সেনেট সদস্য | ১৯২৪ সালে সম্পূর্ণ করেন BL | 

# ১৯২৪ সালেই কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে নথিভূক্ত হন | সে বছরই পিতৃবিয়োগ | অত্যন্ত মানসিক শোক পান শ্যামাপ্রসাদ | তবে অচল ছিলেন বিদ্যা সাধনায় | দু বছর পরে ইংল্যান্ড পাড়ি | আইন পড়তে |

# ১৯৩৪ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ ভাইস চ্যান্সেলর | তাঁর মেয়াদকালেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে বাংলায় বক্তৃতা দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ইতিহাসে প্রথমবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলায় ভাষণ দেওয়া হয় |

# ১৯২৯ সালে শুরু তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার | Bengal Legislative Council-এ প্রবেশ কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে ‚ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে | কিন্তু মতানৈক্যের জেরে পরের বছর তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন নির্দল প্রার্থী হিসেবে | জয়ী হন | ১৯৪১-৪২ সালে এ কে ফজলুল হকের Progressive Coalition Government-এ তিনি ছিলেন অর্থমন্ত্রী |

# ১৯৩৯ সালে যোগ দেন হিন্দু মহাসভায় | সংস্থার সভাপতি পদের দায়িত্বভার সামলান | ১৯৪৩ সালে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভারও সভাপতি নির্বাচিত হন | প্রেসিডেন্ট ছিলেন মহাবোধি সোসাইটির সঙ্গেও |বাংলার হিন্দু-প্রধান জেলা যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে না চলে যায় তাই নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি |

# স্বাধীনতার পরে অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় সরকারে শিল্প মন্ত্রকের দায়িত্ব পান তিনি | এই সময়ে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে বাড়তে থাকে মতাদর্শের দূরত্ব | তা চরমে ওঠে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার পরে | সারা দেশে তখন হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত হয়েছে | শ্যামাপ্রসাদ প্রস্তাব দিয়েছিলেন অহিন্দুদেরও সদস্য করা হোক | কিন্তু সেই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায় | ১৯৪৮ সালে তিনি হিন্দু মহাসভা ছেড়ে দেন | ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জন সঙ্ঘ | যার বর্তমান রূপ ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি |  

# তাঁর মৃত্যু রহস্যাবৃত | ১৯৫৩ সালের ১১ মে কাশ্মীরে ঢোকার মুহূর্তে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় | শ্রীনগরের সেন্ট্রাল জেল থেকে তাঁকে পাঠানো হয় একটি আলাদা কটেজে | বন্দিদশায় দ্রুত অবনতি হয় শরীরের | ডাক্তার বলেন‚ উনি ড্রাই প্লুরিসিতে আক্রান্ত | এই রোগ আগেই বাসা বেধেছিল শরীরে |

# সরকারি নথি অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু হয় ২৩ জুন রাত ২ তো ২৫ মিনিটে | মৃত ঘোষণা করা হয় রাত ৩ টে ৪০ মিনিটে | শেষ সময়ে পাশে ছিলেন রাজদুলারি টিকু বলে এক নার্স | তাঁর বয়ান অনুযায়ী যন্ত্রণায় কাতর শ্যামাপ্রসাদকে ওষুধ দিয়েছিলেন চিকিৎসক জগন্নাথ জুৎসি | বিজেপি-র দীর্ঘদিনের অভিযোগ‚ বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে |

# শ্যামাপ্রসাদ অনুরাগীরা অনেকেই মনে করেন জুৎসি তাঁর দেহে বিষপ্রয়োগ করেছিলেন | অভিযোগ‚ এসবই হয় নেহরুর চক্রান্তে | প্রসঙ্গত তাঁর মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে তদন্তের দাবি বহুবার উঠেছে | তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর কাছে আবেদন করেছিলেন স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের মা যোগমায়া দেবী | কিন্তু সরকারি তরফে বারবার জানানো হয়েছে‚ তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক | কোনও তদন্ত করা হয়নি | 

# ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন শোকবিধ্বস্ত | ২১ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল | স্ত্রী ছিলেন সুধা দেবী | মাত্র ১১ বছর পেয়েছিলেন দাম্পত্য স্বাদ | ১৯৩৩ বা ১৯৩৪ সালে ডাবল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন সুধা দেবী | রেখে যান ছোট ছোট ৪ জন সন্তান | অনুতোষ‚ দেবতোষ‚ সবিতা ও আরতি | পঞ্চম সন্তানের মৃত্যু হয়েছিল শিশু অবস্থাতেই | মাতৃহীন শিশুদের কোলে টেনে নেন রমাপ্রসাদের স্ত্রী | বড় করে তোলেন নিজের সন্তানদের সঙ্গে | জেঠিমার কাছেই মানুষ হন পাঁচ ভাইবোন |   

আরও পড়ুন:  সারাজীবনে মোট ২৭ বার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ৬৯ জন সন্তানের জন্ম দিয়েছেন যে মা

NO COMMENTS