কাছেই পতিতপাবন মা গঙ্গা | রাস্তার ধারেই ট্যাপ খুললে গঙ্গাজল | কিন্তু কোনওভাবেই কি মোছা যাবে তাঁদের পাপ ? মা গঙ্গার পড়শি তাঁরা | কিন্তু সমাজের চোখে গঙ্গাজল যতটা পবিত্র‚ তাঁরা ততটাই অপবিত্র | কারণ তাঁরা সোনাগাছির বাসিন্দা |

এখন যেখানে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া তথা ভারতের বৃহত্তম লালবাতি এলাকা‚ কিংবদন্তি বলে, বহু আগে সেখানে ছিলেন এক সুফী সাধক | পরিচিত ছিলেন সানাউল্লাহ গাজি নামে | ক্রমে সেই নামের অপভ্রংশ হয় সানা গাজি বা সোনা গাজি | সেখান থেকেই এলাকার নাম সোনাগাছি | এখনও রয়েছে তাঁর মাজার |

বর্তমানের কালো ছায়ায় মুখ লুকিয়েছে অতীত স্থানীয় ইতিহাস | সোনাগাছি শব্দটা কার্যত এখন পৃথিবীর আদিমতম পেশার সমার্থক হয়ে গেছে |

অলিগলিতে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি বাড়ি | অন্তত ১৬ হাজার যৌনকর্মীর বাস | প্রতি বছর গড়ে হাজার জন বিভিন্ন বয়সের মেয়ে পাচার হয়ে আসেন এখানে |

বেশিরভাগই ফাঁদে পা দিয়ে এসে পড়েন এখানে | থাকতে হয় জীবনভর | ফিরতে পারেন না স্বাভাবিক জীবনে | কেউ কেউ স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে বেছে নেন এই জীবন | দু বেলা দু মুঠো খাবার তো জুটবে | পেটের সন্তান স্কুলে তো যেতে পারবে | আবার কখনও বাড়ির লোকই বাধ্য করে এই পেশায় নাম লেখাতে | সেই টাকায় চলে সংসার |

কিন্তু শুধু টাকাই আদর পায় সংসারে | যে টাকা দিচ্ছে‚ সে নয় | তার অধিকার থাকে না চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাড়ির লোকের কাছে যাওয়ার | কত এরকম উদাহরণ আছে | ছেলেমেয়ে বা ভাইবোন বড় হয়ে চাকরি করছে | কিন্তু যাঁর জীবনপাত রোজগারে সেটা সম্ভব হয়েছে‚ তিনি ব্রাত্য বৃদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন সেই সোনাগাছিতেই |

সেই বৃদ্ধা হয়তো এখন সত্তরোর্ধ্ব | অভ্যাসবশত বিকেল হলেই সাজতে বসেন | দাঁড়িয়ে পড়েন নির্দিষ্ট জায়গায় | কেউ তাকায় না | কিন্তু অভ্যাস ছাড়ে না | অভাবও যে নিস্তার দেয় না | যাওয়ার জায়গাও নেই কোথাও |

বেশিরভাগ যৌনকর্মীই আপ্রাণ চান তাঁর সন্তান যেন এই জীবন থেকে মুক্তি পায় | কিন্তু কেউ কেউ নিজের পায়ের ঘুঙুর পরিয়ে দেন মেয়ের পায়েও | তাঁদের বিশ্বাস‚ দেহ পসারিণীর মেয়ে কোনওদিন ভদ্র সমাজে জায়গা পাবে না |

এভাবেই এগিয়ে চলে জীবনের মধ্যে আর এক জীবন | উত্তর মধ্য কলকাতার সোনাগাছিতে | যেখানে মন্দির আছে | নিয়ম করে আসেন মা দুর্গাও | কিন্তু এই যৌনপল্লীর মায়েরা এর চৌহদ্দির বাইরে কোনওদিন মাবলে পরিচিতি পান না | রয়ে যান খারাপ মেয়ে হয়েই |

আকাশে জ্বলে উত্তর ফাল্গুনী | গান ধরেন উমরাও জান | মন্দ মেয়ের উপাখ্যান বলবেন বলে |

আরও পড়ুন:  যখন নারীর অহঙ্কারের জিনিসই হয়ে ওঠে তাঁর অত্যাচার-লাঞ্ছনা-নিগ্রহের মাধ্যম

NO COMMENTS