না, এটা কোন সাক্ষাৎকার নয় । এটাকে একটা স্টিং অপারেশন বলতে পারেন । অনেকদিন ধরেই পাপারাৎজিদের মতো বিষ্ণুলোকে ঘুরঘুর করছি, যদি কিছু টুকরো কথা বা ছবি পেয়ে যাই তাহলে একটা জমাটি স্টোরি হতে পারে, কিন্তু আমার কপাল কখনই অত ভাল নয় । স্কুলে পড়তে দু-একবার আচারের লটারি পাওয়া আর বামন পীরের মেলায় রিং খেলে একটা ময়লা কুড়ি টাকার নোট…ব্যস, লটারিতে এই আমার সার্বিক সাফল্য । এই কেরিয়ার নিয়ে বিষ্ণুলোক থেকে খবর তুলে আনা আর কপিল দেবদের সরিয়ে ভরত অরুণের সেরা বোলার হওয়া একই ঘটনা । তবু হাল ছাড়ি নি, চারদিকে যেভাবে সাংবাদিক ছাঁটাই চলছে তাতে কাজ না দেখাতে পারলে যেকোন মুহূর্তে বেকার । ওখানকার এক সাফাইকর্মীকে ম্যানেজ করলাম । ও বললো বিষ্ণুলোকের সুলভ কমপ্লেক্স’এর আশপাশে ওর সঙ্গে থাকতে । ওখানে অনেকেই আসেন, অনেক কথাবার্তাও হয় । যদি কিছু পাওয়া যায়…। তবে কিছু পেলে ওকে একটা ফ্রি সিমকার্ড দিতে হবে । ওখানে ওইসব পাওয়া যায় না । ওখানে কথা বলার ইচ্ছে হলে চোখ বুজিয়ে নির্দিস্ট মানুষটাকে ভাবলেই হবে । কিন্তু হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক এসব কিচ্ছু নেই । এই সিস্টেমে মাধুর্য থাকলেও নাকি মজা নেই । যাকগে, আমার ওসব মাধুর্য বা মজা নিয়ে ভেবে লাভ নেই । আমার একটা স্টোরি চাই, বেশ জমাটি একটা স্টোরি, যেটা পেলে আমি ওকে অনেক কিছুই দিতে পারি সেখানে একটা সিম তো কোন ছার । আরে বাবা একটা সিম দিয়ে যদি আমার হিমশিম অবস্থাটা কাটে তাতে অসুবিধা কোথায় ? অন্তত কিছুদিনের জন্য আমি আমার জীবনের মাধুর্য, মজা সব ফিরিয়ে আনতে তো পারবো ।

কপাল ঠুকে ওর সঙ্গে লেগে পড়লাম । ছদ্মবেশে সকাল থেকে ওর সঙ্গে সুলভ কমপ্লেক্স পরিস্কার আর ডিক্টাফোনটাকে রেডি রাখা, যদি কিছু টুকরো কথা… না, টানা তিন চারদিন ওখানে যাদের পেলাম তারা সবাইই লোকাল, আঞ্চলিক । আন্তর্জাতিক বা দেশীয় স্তরে বিখ্যাত কাউকে পেলাম না । ক্রমশ হতাশা বাড়ছিল । অবশেষে আমিও পেলাম । আমার মতো কেরিয়ারের কপালেও শিকে ছিঁড়লো । জ্যেঠু বলতেন, সঠিকভাবে লেগে থাকতে পারলে ভগবানকেও পাওয়া যায় । পঞ্চম দিন ছদ্মবেশে সুলভ কমপ্লেক্স সাফ করতে করতে আন্তর্জাতিক স্তরে বিখ্যাত দুজন ব্যাক্তিত্বের কথোপকথন শুনে ফেললাম । যেটি একেবারে অসম্পাদিত অবস্থায় আপনাদের কাছে পেশ করছি ।

আরও পড়ুন:  শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সমীপে...

বিষ্ণু – কী ! এবার শান্তি তো ?

নারদ – (ধুতি ঠিক করতে করতে) হ্যাঁ, মানে খুব জোরে পেয়েছিল তো, বয়সও তো হচ্ছে তাই ঠিকঠাক সামলাতে পারি না । 

বিষ্ণু – ধুর, তোমার ওই সামলানোর কথা কে জিজ্ঞেস করেছে ? ও তো তুমি ছোট থেকেই সামলাতে পারো না ।  

নারদ – না, আপনি একটু আগেই শান্তি হল কিনা জিজ্ঞেস করলেন তো তাই ……

বিষ্ণু – হ্যাঁ, আমি জানতে চাইলাম, এবার শান্তি পেয়েছ ? সব সময় কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করো যে তুমি এখান থেকে কিচ্ছু পাও নি, তোমাকে ডিপ্রাইভ করা হয়েছে, তোমার কথা নাকি আমরা কেউ ভাবি নি … 

নারদ – (চারদিকে তাকায়,মাথা চুলকোয় ) না স্যার … মানে কী বলছেন আমি ঠিক …

বিষ্ণু – আরে বাবা প্রচার … সব সময় তো তুমি বল যে বিশ্বে তোমার কোনো প্রচার নেই । এখানকার প্ল্যাটিনাম আধার কার্ড হোল্ডার হয়েও পৃথিবীতে তোমার কোন সম্মান নেই, অর্ধেক মানুষ নাকি তোমাকে চেনেই না ।

নারদ – সে তো স্যার মিথ্যা বলি নি, ওখানে কে আমাকে মানে বলুন ? কেউ একটু ফুল, জল, নকুলদানা দেয় ? তারপর ধরুন ঘেঁটু, বনবিবি, পেঁচোপাঁচি বা দক্ষিন রায়ের মত দুদিনের যোগীরও মন্দির আছে ওখানে, কিন্তু আমার ? একটা আড়াই বাই সাড়ে তিন থানও হয় নি । আপনি প্রতিটা ঠাকুরঘরে খোঁজ নিয়ে দেখুন, আমার একটা ছোট ছবিও পাবেন না । একটা ভাল বাহন পর্যন্ত পাই নি আমি… একটা অ্যান্টিক এগ্রিকালচারাল ইন্সট্রুমেন্ট ঢেঁকি নাকি আমার বাহন ! এরপরও বলবেন যে আমি …

বিষ্ণু – আরে আমার কথা ছাড়ো, আমি আর কী বলবো, বলছে তো পৃথিবীর মানুষ । ওখানে এখন শুধু তোমারই নাম । শোন, মানুষ যদি একবার তোমায় প্রচার দেয়, মেনে নেয় তাহলে এই বিশ্বে আর কোন শক্তিই তোমাকে আড়াল করতে পারবে না ।  আমি এই তো সবে দোল খেলে ফিরলাম । ওখানে তোমার জনপ্রিয়তা দেখে অবাক হয়ে গেছি । আট থেকে আশি সবার মুখেই এখন তুমি, বিশ্বের আকাশে বাতাসে এখন শুধু নারদ… নারদ আর নারদ ।

আরও পড়ুন:  সব দোষ কি তাহলে শুধুই রাম রহিমের ?

নারদ – স্যার, প্রস্টেট অপারেশনের জন্য আমি অনেকদিন বাইরে বেরোই নি । ফলে অনেক কারেন্ট অ্যাফেয়ারসই আমি জানি না । আপনি যা বলছেন এসব কি সত্যি ? নাকি এই অধমকে নিয়ে অফটাইমে একটু ঠাট্টা মশকরা করছেন । অবশ্য সে আপনি করতেই পারেন । বাঁচালে আপনি বাঁচাবেন আর মারলেও আপনিই মারবেন । আমি তো এখানে নিমিত্ত মাত্র … নারায়ণ … নারায়ণ … নারায়ণ … (প্রণাম করে)।

বিষ্ণু – না নারদ, আমি যা বলছি সেটা ঠাট্টা নয়, সম্পূর্ণ সত্যি । পৃথিবীর ঘরে ঘরে তোমার নাম । সকালে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় তুমি । রান্নাঘর, শোওয়ার ঘর, পাড়ার চায়ের দোকান, গ্রামের বটতলা, স্কুল, কলেজ, হাইকোর্ট এমনকী সুপ্রিম কোর্টেও তোমাকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে ।

নারদ – কী বলছেন স্যার, আমি …আমি … দেখুন স্যার, আমার গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠছে, আমার শরীরের মধ্যে কীরকম একটা হচ্ছে … আনন্দে ব্লাড প্রেশার নেমে যাচ্ছে মনে হচ্ছে, আমি …আমি …

বিষ্ণু – শান্ত হও নারদ, ঘরে গিয়ে এক গ্লাস নুন চিনির জল খেয়ে নিও । দেখো, এটা তোমার পাওয়ারই ছিল, এ তোমার পুরস্কার । উইল পাওয়ার বলে একটা বিষয় আছে জানো তো ? বাংলায় যাকে বলে ইচ্ছাশক্তি । তুমি তোমার সারাটা জীবন ধরে চেয়েছো আমাদের মতো তোমার একটু নাম হোক, তোমাকে নিয়ে চর্চা হোক, মানুষ তোমাকে সম্মান করুক । বহুদিন পর তুমি সেটা পেতে চলেছো । এ তোমার এতদিনের ধৈর্য, সততা আর সহিষ্ণুতার পুরস্কার ।     

নারদ –  স্যার আমি এসব বিশ্বাস করতে পারছি না ! সত্যিই মানুষ আমাকে নিয়ে ভাবছে ? আমার সম্পর্কে আলোচনা করছে ? স্যার আমি আর কৌতুহল চাপতে পারছি না । ঢেঁকিটা একটু সার্ভিস করাতে হবে, বহুদিন চড়ি নি (চোখে-মুখে খুশি), স্যার আমি এক্ষুনি মানুষের কাছে যাব ।

আরও পড়ুন:  সব দোষ কি তাহলে শুধুই রাম রহিমের ?

বিষ্ণু – আরে যাবে যাবে, অবশ্যই যাবে । এখন তোমাকে আটকে রাখে এমন সাধ্যি কার আছে ? আসলে কী জান নারদ, নাম করতে গেলে সবারই কিছু একটা ঘটনার দরকার হয়, যার মাধ্যমে মানুষ তোমাকে চিনবে, জানবে । শিববাবুর যেমন দক্ষযজ্ঞ, আমার যেমন কংসবধ । আমাদের ফাইফরমাশ খেটে আর ঢেঁকি নিয়ে এধার ওধার ঘুরেই জীবনটা কাটিয়ে দিলে, নিজের জন্য তো কিছুই করলে না । জীবনে প্রেম ট্রেমও তো কিছু করলে না । এতদিন বাদে একবার যখন সুযোগ এসেছে তার সদ্ব্যবহার করো । দেখ, তাকিয়ে দেখ … তোমার নাম এখন মানুষের মুখে মুখে । পানের দোকানদার থেকে শপিং মল, সুন্দরবন থেকে সান্দাকফু সব জায়গায় শুধু তুমি । তোমার জন্যই শাসক রাজা, প্রজা, স্বামী, আসামী সবাই পাঁই পাঁই করে ছুটছে । দেখতে পাচ্ছ নারদ, মানুষ কেমন যেন উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে, এ ভাবা যায় না নারদ । এতদিন বিশ্ব চালিয়ে এমন ইস্যু আমরাও পাই নি । যাও, আর সময় নষ্ট কোরো না । নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করো । আশীর্বাদ করি তোমার কর্মকাণ্ডে আমাদের নাম উজ্জ্বল হোক ।

নারদ – আপনার আশীর্বাদ যখন পেয়েছি তখন কোন বাধাই আর আমার কাছে বাধা নয় । আমি চললাম স্যার । একেবারে নতুন এক উৎসব – ‘সর্বজনীন নারদোৎসব’ দেখার জন্য সবাই প্রস্তুত থাকুন । যাওয়ার সময় আপনার কাছে শুধু একটাই অনুরোধ দয়া করে আমার পুজোর কটা প্যান্ডেল উদ্বোধন করে দেবেন ।

 বিষ্ণু – তথাস্তু …        

নারদ হাঁটু গেড়ে প্রণাম করে । বিষ্ণু আশীর্বাদ করেন ।

NO COMMENTS