ভজহরি বোকাসোকা মানুষ | বড্ড বোকা | সবাই জানে ভজহরির মাথায় ভর্তি গোবর | ‘বাঁ’ বললে ‘ডান’ বোঝে; ‘হ্যাঁ’ বললে ‘না’ বোঝে | সবাই তাই বলে, ভজা তুই তো দেখি ভারি বোকা; একটা গরুরও যে তোর থেকে বুদ্ধি বেশি | ভজহরি শোনে | শুনে হাসে | সে হাসিও বোকার মতো হাসি |

ভজহরি বোকা | তাতে কিছু মানুষের ভারি মজা | এই তো সেদিন, যতীনবাবু ডেকে বললেন, ভজা তুই আমার বাগানটা পরিষ্কার করে দে, বড্ড আগাছা; পয়সা দেব তোকে |

ভজহরি এক কথায় রাজি | খাটা পেটা শরীর তার | কাজে ভয় পায় না সে | সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত খেটেখুটে একেবারে তকতকে করে ফেলে বাগানটা | সন্ধের পর হাত-পা ধুয়ে যতীনবাবুর কাছে পয়সা চায় | যতীনবাবু বলেন, এটা কী করলি ভজা, তোকে তো আগাছা ওপড়ানোর কথা বলেছিলাম | তা তুই আপেল গাছগুলোও উপড়ে দিলি ! দুটো আপেল গাছ ছিল আমার | আপেল খুব দামি গাছ রে | তা ধর দুটো গাছের দাম একশ টাকা | তোর মজুরি ধরলুম পঞ্চাশ টাকা | তাহলে গিয়ে দাঁড়ায়, আমি তোর কাছে পঞ্চাশ টাকা পাই | থাক গে, তুই চেনা মানুষ, তোকে ভালবাসি, টাকাটা মকুব করে দিলুম |

ভজহরি ফিরে গেল | যেতে যেতে ভাবল, আহা যতীনবাবু বড্ড ভাল মানুষ; কেমন দিলেন টাকাটা মকুব করে |

সব শুনেটুনে বউ বলল, আচ্ছা হাঁদা মানুষ তো তুমি ! আপেল গাছ ছিল যদি আগে বলেনি কেন? সব বাজে কথা | তোমাকে ঠকিয়েছে |

ভজহরির মনে হল, ঠিকই তো; আপেল গাছ ছিল যদি আগে বলেনি কেন | একটু মনখারাপ হয়ে যায় তার | মন খারাপ হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে ভজহরি | আকাশ দেখে, গাছপালা দেখে, প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখে, পাখির ডাকা শোনে, দেখে এই সূর্যটাকে ঢেকে দিল কালো মেঘ, ঝমঝম করে বৃষ্টি হল, তারপর আবার রুপোর মতো রোদ উঠল | এসব দেখে দুঃখের কথা আর মনে থাকে না তার |

কিছুদিন পর যতীনবাবু আবার বললেন, ভজা বাগানে যে আগাছা হয়েছে ফের | পরিষ্কার করে দে, পয়সা পাবি |

ভজহরি বলল, বাগানে আপেল গাছ নেই তো? যতীনবাবু বললেন, না না, আপেল গাছ টাছ নেই | ভজহরি ভাবল, আপেল গাছ নেই যখন তখন আর চিন্তা কী | সে আবার উদয়াস্ত খাটান দিল | সন্ধের সময় বাগান তকতকে | ভজহরি পয়সা চাইল | যতীনবাবু বললেন, ভজা করেছিস বটে, কিন্তু দুটো কমলালেবু গাছ ছিল, তুই উপড়ে ফেলেছিস | দুটোর দাম দুশো টাকা | তোর মজুরি যদি হয় পঞ্চাশ টাকা তাহলে দেড়শ টাকা পাওনা হয় তোর কাছে | থাক গে, তুই চেনা মানুষ |

আরও পড়ুন:  ঝঞ্ঝাকাল

ভজহরি বউকে বলল, জানো, যতীনবাবুর শরীরে দয়া বেড়ে গেছে আরও | আগেরবার পঞ্চাশ টাকা মকুব করে দিয়েছিলেন, এবার দেড়শ টাকা |

বউ রেগে বলল, যতীনবাবু এবারও ঠকিয়েছে তোমাকে | তুমি বড় অপদার্থ | আমি চললুম |

বলে, বউ নিজের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল বাপের বাড়ি |

ভারি দুঃখ হল ভজহরির | সে বোকা বলেই বউ ছেড়ে চলে গেল তাকে | ভাবল, নাহ, আর বোকা থাকা চলবে না তার | চালাক হতেই হবে |

সে ভাবতে থাকে কী করে চালাক হওয়া যায় | খুব ভাবতে থাকে | ভেবে ভেবে কুলকিনারা করতে পারে না কিছু | হঠাৎ একদিন কানে আসে শ্মশানকালীর মন্দিরে এক সাধুবাবা এসেছেন | সাধুবাবার অনেক ক্ষমতা | সবার সব মনবাঞ্ছা পূর্ণ করে দেন |

গাঁয়ের শেষ প্রান্তে শ্মশানকালীর মন্দির | বড় বড় বট অশ্বত্থ পাকুড় নিম গাছে দিনের বেলাতেও অন্ধকার ছমছমে হয়ে আছে জায়গাটা |

তা ভজহরি একদিন গেল সেখানে | দেখল সাধুবাবা চোখ বুজে ধ্যানে বসে আছেন | মস্ত দাড়িগোঁফ মাথায়, জটা পরনে, রক্তাম্বর কপালে লাল তিলক | দেখলেই ভক্তি হয়, সেইসঙ্গে ভেতরটা একটু গুড়গুড় করে ওঠে ভয়ে |

ভজহরি ভয়ে ভয়ে ডাকল, বাবা!

সাধু চোখ খুলে বলল, কী চাস?

ভজহরি বলল, বাবা, বড্ড বোকা আমি; আমাকে একটু চালাক করে দাও |

হুম বুঝেছি; ব্যোম কালী ! বলে, সাধু মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে ভজহরির সামনে মুঠোটা খোলে | ভজহরি দেখে একটা মাদুলি |

সাধু বলে, কাল সকালে পূর্বদিকে মুখ করে খালি পেটে গলায় বেঁধে নিবি | মায়ের পুজো দে কুড়ি টাকা |

ভজহরি কুড়ি টাকা দিয়ে মাদুলি নিয়ে চলে আসে | পরদিন সকালে গলায় ঝোলায় | মনটা বেশ খুশি খুশি লাগে | এবার চালাক হয়ে গেল সে | আর কেউ বোকা বানাতে পারবে না তাকে | আনন্দে নাচতে নাচতে বেরিয়ে পড়ল সে | ভাবল, যাই বউকে গিয়ে নিয়ে আসি এবার |

আরও পড়ুন:  স্মৃতি ও সত্তা

পথে দেখা হল মহীনবাবুর সঙ্গে | মহীনবাবু বললেন, ভজা সাতসকালে চললি কথায়?

ভজহরি বলল, আমি এখন চালাক হয়ে গেছি কিনা, তাই বউকে আনতে যাচ্ছি শ্বশুরবাড়ি থেকে | মহীনবাবু বললেন, বাহ, চালাক হয়েছিস খুব ভাল কথা | কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিস খালি হাতে ! লোকে নিন্দে করবে যে !

ভজহরি বলে, এই রে, তাই তো! ভুল হয়ে গেছে বড় | কী করি এখন?

মহীনবাবু বললেন, আমার কাছে একটা জিনিস আছে নিবি?

ভজহরি বলে, কী জিনিস?

মহীনবাবু দুটো আমড়া দেয় ভজহরিকে | বলেন, ওগুলো সব জাদু আমড়া; মন্ত্র পড়া আছে | এগুলো নিয়ে যা শ্বশুরবাড়ি, যেতে যেতে দেখবি সব আমড়া আম হয়ে গেছে | গুড়ের চেয়েও মিষ্টি আম | দে, দশটা টাকা দে; সস্তায় দিয়ে দিলুম তোকে |

ভজহরি দশটাকা দিয়ে আমড়া দুটো নেয় | তারপর মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে পৌঁছে যায় শ্বশুরবাড়ি | বউকে ডেকে বলে, বুঝলে, আমি আর বোকা নেই, চালাক হয়ে গিছে | ফিরে চল তুমি |

বউ বলে, তাই নাকি; কী করে হলে চালাক?

ভজহরি সাধুবাবার মাদুলির কথা বলে | তারপর বলে, তোমাদের জন্য আম এনেছি আমি | গুড়ের চেয়েও মিষ্টি আম |

পকেট থেকে আমড়া দুটো বের করে ভজহরি | বউ দেখে বলে, এ আম কোথা, এ তো আমড়া !

ভজহরি বলে, তাই তো; কিন্তু মহীনবাবু যে বললেন শ্বশুরবাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে আমড়াগুলো আম হয়ে যাবে !

বউ রেগেমেগে সেই মুহূর্তেই দূর করে দিল ভজহরিকে |

মনের দুঃখে ফিরে চলল ভজহরি | যেতে যেতে ভাবল, তাই তো বোকাই রয়ে গেলাম এখনও | সাধুবাবা যে বললেন, মাদুলি পরলেই চালাক হয়ে যাব, কী হল তার!

হাঁটতে হাঁটতে আবার শ্মশানকালী মন্দিরে চলে এল ভজহরি | দেখল, সাধুবাবা পোঁটলা কাঁধে ফেলে কথায় যেন যাবার উদ্যোগ করছেন | ভজহরিকে দেখে বললেন, কে তুই, কী চাস?

ভজহরি বলল, চালাক তো আমার হওয়া হল না বাবা; সেই বোকাই তো রয়ে গেলুম |

সাধু বললেন, তা আমি কী করব!

ভজহরি বলল, আপনি যে মাদুলি দিলেন চালাক হবার, কাজ তো হল না তাতে |

আরও পড়ুন:  হকার কাহারে বলে

সাধু একটু খিঁচিয়ে উঠে বলে, তুই পাপী, তাই কাজ হয়নি | যা ভাগ |

ভজহরি ভাবে, তাই হয়তো হবে; সে বোকাসোকা মানুষ কোথাও কোনও পাপ করে বসে আছে হয়তো | সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধুর পায়ে; পা দুটোকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদে আর বলে, পাপ যদি কিছু করে থাকি ক্ষমা করে দাও বাবা, ক্ষমা করে দাও |

সাধু বলেন, আরে করিস কী, করিস কী, ছাড় ! ভজহরি বলে, না বাবা, তোমার চরণে ঠাঁই দাও পাপ যদি করে থাকি….|

সাধু বলে ওঠে, নিকুচি করেছে, যেতে দে আমায় |

ভজহরি বলে, না বাবা…|

সাধু যত ছাড়াবার চেষ্টা করে ভজহরি তত শক্ত করে চেপে ধরে পা দুটো | মস্ত ঝটাপটি শুরু হয়ে যায় দুজনের | উলটে পড়ে সাধুবাবা |

হঠাৎ কে যেন বলে ওঠে, ছকা ওস্তাদ, তোমার খেল খতম |

ভজহরি অবাক হয়ে দেখে থানার দারোগাবাবু | সঙ্গে আরও কজন পুলিশ |

ভয়ে বুক গুড়গুড় করে ওঠে ভজহরির | সাধুর পা ছেড়ে সে উঠে দাঁড়ায় | দারোগাবাবু তার পিঠ চাপড়ে বলে, সাবাশ ভজহরি, তোমার জন্যই কুখ্যাত ডাকাত ছকা ওস্তাদ ধরা পড়ল | ব্যাটা সাধুর ভেক ধরে লুকিয়ে ছিল এখানে | তুমি অমনভাবে জড়িয়ে না ধরলে ব্যাটা পালাত ঠিক |

*******************************************************

চাঁদের আলোয় পথ হাঁটছিল ভজহরি | গলায় ফুলের মালা, হাতে মিষ্টির প্যাকেট, পাশে বউ ফুলমণি | আজ তাকে সম্বর্ধনা দিয়েছে গাঁয়ের লোক | ভজহরির নাম এখন চারদিকে | সবাই ভজহরির নামে কত ভাল ভাল কথা বলছে –ভজহরি সৎ, ভজহরি সাহসী, ভজহরির জন্যই অমন ভয়ংকর ডাকাত ধরা পড়ল | ছকা ডাকাত ডাকাতির মাল বিক্রি করত যতীনবাবু আর মহীনবাবুকে | পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে তাঁদেরও | সব শুনে বউ ফুলমণি ফিরে এসেছে আবার | বলেছে, আমারই ভুল বুঝলে, তুমি মানুষটা ভাল খুব |

ভজহরি বলেনি কিছু | হেসেছে শুধু | চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক | ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছে একটা | পাশে দিঘির জল ঝিকমিক করছে জ্যোত্স্নায় | এসব প্রাণ ভরে দেখতে থাকে ভজহরি | দেখতে দেখতে ভাবে, যে যতীনবাবু আর মহীনবাবু চালাক মানুষ, কিন্তু শেষ রক্ষা হল কি? তার চেয়ে এই আছি বেশ আছি; দরকার নেই চালাক হয়ে |

- Might Interest You

5 COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ