তিনি জন্মেছিলেন ১৮৫৯-এর ৫ জুলাই |

৫ জুলাই তাঁর বিয়ের দিনও বটে |

কথায় বলে‚ জন্মদিনের দিন বিয়ে করতে নেই |

কিন্তু কে-ই বা মনে রেখেছে বাড়ির বাজার সরকার শ্যাম গাঙ্গুলির এই তিন নম্বর কন্যার জন্মদিন !

সেই ন’ বছরের মেয়ের বিয়ে হল উনিশ বছরের দীপ্যমান বিদগ্ধ পুরুষ‚ রবীন্দ্রনাথের নতুনদাদা‚ তখন ঠাকুরবাড়ির মধ্যমণি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে‚ ১৮৬৮-র ৫ জুলাই |

যে মেয়ের বংশপরিচয়ে বলবার মতো কিছুই নেই ‚ তার আবার জন্মদিন ! বাবা তো বাজার সরকার‚ ঠাকুরদা কী ?

মেয়ের ঠাকুরদা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মেজোদাদা সত্যেন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘ তিনি একপ্রকার আমাদের বাড়ির দ্বারপাল ছিলেন | ‘ বাবা বাড়ির বাজার-সরকার‚ ঠাকুরদা বাড়ির দারোয়ান গোছের কিছু একটা‚ —-এমন মেয়েকে ভাইয়ের বউ করে পরিবারে নিয়ে আসা সম্পর্কে সত্যেন্দ্রর অভিমত একবার শোনা যাক—-‘শ্যাম গাঙ্গুলির আট বছরের মেয়ে—-আমি যদি নতুন (জ্যোতিরিন্দ্র) হইতাম‚ তবে কখনওই এই বিবাহে সম্মত হইতাম না | কোন হিসাবে যে এ কন্যা নতুনের উপযুক্ত হইয়াছে জানি না |’

এই মেয়েটি সম্পর্কেও কী অবিশ্বাস‚ অশ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে সত্যেন্দ্রর আর একটি চিঠিতে—‘শ্যামবাবুর মেয়ে মনে করিয়া আমার কখনই মনে হয় না যে ভাল মেয়ে হইবে | কোনও অংশেই জ্যোতির উপযুক্ত তাহাকে মনে হয় না | ‘

মেয়েটির প্রতি প্রথম থেকেই অশ্রদ্ধা‚ তাকে হেয় করার মূল কারণ হল‚ সে খুব গরিব ঘরের মেয়ে | তার বাপ-ঠাকুরদা ভাতকাপড়ের জন্যে ঠাকুরবাড়িতে ফরমাশ খাটার কাজ করেন | আরও একটা কারণ খুঁজতে কিছুটা পিছনে যেতে হবে‚ মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির সম্পর্কের সুতো ধরে | মেয়েটির ঠাকুরদা জগন্মোহনের কলকাতায় কোনও ‘বাসা’ ছিল না | কলকাতার তাঁর থাকার জায়গা হল রামপ্রিয়াদেবীর সৌজন্যে |

কে রামপ্রিয়া ? এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই আছে এই মেয়েটির প্রতি ঠাকুরবাড়ির আচরণের মূল কারণ |

ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ জটিল | সহজ করে না বললে গুলিয়ে যেতে পারে | রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা দ্বারকানাথের ঠাকুরদা হলেন নীলমণি ঠাকুর | নীলমণির ভাই গোবিন্দরাম | গোবিন্দরামের বউ রামপ্রিয়া | অর্থাৎ রামপ্রিয়া দ্বারকানাথের ঠাকুমাই তো হলেন | রামপ্রিয়ার কোনও সন্তান হল না | রামপ্রিয়ার স্নেহ বর্ষিত হল তাঁর ভাইয়ের ছেলে জগন্মোহনের ওপর | তিনি জগন্মোহনের বিয়ে দিলেন দ্বারকানাথের মামাতো বোন শিরোমণির সঙ্গে | বউ নিয়ে জগন্মোহন থাকবেন কোথায় ? রামপ্রিয়া তখন জগন্মোহনকে একটি বাড়ি দিলেন কলকাতার নিষিদ্ধপল্লী হাড়কাটা গলিতে |

সেখানে গেরস্থ হয়ে বসবাস করা বেশিদিন সম্ভব হল না | তিনি ঠাকুরবাড়ির দ্বারপাল | সেই সুবাদে তিনি ঠাকুরবাড়িতেই বসবাস শুরু করলেন | তাছাড়া তিনি তো স্বয়ং দ্বারকানাথের মামাতো বোনের স্বামী ! এই পরিচয় কিন্তু ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে তাঁকে হালে পানি দেয়নি | তাঁর নাতনির সঙ্গে স্বয়ং

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিয়ে হল বটে—কিন্তু তাঁরা তো থেকেই গেলেন বারমহলের ‘অনাত্মীয়’ কর্মচারী ! সত্যি কথা বলতে‚ এই মেয়ের সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিয়ে হওয়ার পর ঠাকুরবাড়ি থেকে সরিয়েই দেওয়া হল বাজার-সরকার বেয়াইমশাইকে দেবেন্দ্রনাথের গাজিপুরের বাড়িতে | সেখানে তো তাঁর বিশাল জমিদারি | সামান্য বেতনে সেখানে ঠাকুরবাড়ির কর্মচারী হয়ে পড়ে থাকলেন শ্যামলাল |

আচ্ছা‚ কী হল এই মেয়েটির মা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের শাশুড়ি‚ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেয়ানের ?

তাঁর পরিচয় কি আমরা জানি ? জানি কি তাঁর নাম ?

তাঁর নাম ত্রৈলোক্যসুন্দরী | আমি অন্তত তাঁর সম্পর্কে আর কিছু জানি না | এইটুকু বলা যায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর এই দরিদ্র শাশুড়িমায়ের কোনও দায়দায়িত্ব নেননি | জ্যোতিরিন্দ্রনাথের তিন শ্যালিকা, বরদা‚ মনোরমা শ্বেতাম্বরী | সবাই নির্বাসিত ঠাকুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনের তালিকা থেকে |

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ওই ন’ বছরের বউটির মতো হঠাৎ একা-হওয়া মেয়ে আমরা জীবনে বেশি দেখেছি কি ? ওই ছোট্ট মেয়েটাকে তার বাবা মা বোনেদের কাছ থেকে উপড়ে এনে‚ মাজা-ঘষা করে তৈরি করার নামে হেয় করে‚ ভয়ঙ্কর ভাবে নিঃসঙ্গ করে দেওয়া হল | কিছুটা খেয়ালখুশি মতো খেলাও করা হল মেয়েটির সঙ্গে | জ্যোতিরিন্দ্র তাঁর বৌকে নিয়ে ময়দানে ঘোড়া ছোটালেন | স্ত্রী-স্বাধীনতার স্বাদ দিলেন তাঁকে | তারপর তাঁকে দূরে সরিয়ে মেতে গেলেন থিয়েটার পাড়ায়, আর বসবাস করতে আরম্ভ করলেন মেজো বৌঠাকুরণ জ্ঞানদানন্দিনীর পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে | ঠাকুরবাড়ির মজলিস সরে গেল সেখানেই |

এই মেয়ের কোনও সন্তান হয়নি | ‘বাঁজা’ অপবাদ সহ্য করতে হল তাঁকে দিনের পর দিন | সন্তান-না হওয়ার কারণ কী ? এ-প্রশ্নের কোনও ডাক্তারি-খোঁজ হয়েছিল বলে জানি না | যেমন হয় আটপৌরে ভারতীয় সমাজে‚ তেমনই হল অভিজাত শিক্ষিত ঠাকুরবাড়িতেই—-ওই মেয়েটাই দায়ী সন্তান না-হওয়ার জন্য !

এখানে রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর মেয়ে সরলা দেবীর আত্মজীবনী ‘ জীবনের ঝরাপাতা’-র কাছে না গিয়ে পারছি না | সরলার সবথেকে ছোট বোন ঊর্মিলাকে বুকে টেনে নিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নিঃসন্তান স্ত্রী—-সরলা লিখছেন‚ ‘ ঊর্মিলা ছিল নতুন মামীর আদরের | তিনিই তাকে দেখতেন‚ শুনতেন‚ খাওয়াতেন‚ পড়াতেন | তাঁর সঙ্গে সে বাইরের তেতলাতেই থাকত | একদিন নতুন মামীর ছাদের বাঁকা সিঁড়ি দিয়ে গোলাবাড়ির দিকে আপনাআপনি নামতে গিয়ে নীচে পড়ে গিয়ে Brain Concussion-এ মৃত্যু হয় তার | সারা বাড়িতে সেদিন এক ঘোর কালো ছায়া |’

এই কালো ছায়া ঠাকুরবাড়ি থেকে সরে গেলেও সরে যায়নি বাজার-সরকার শ্যামলালের মেয়ের জীবন থেকে | একে বাঁজা‚ তায় অপয়া—-এই হল সেই নির্জন নির্বাসিত মেয়ের পরিচয় |

এক সময়ে কিন্তু এই মেয়েটি কিছুদিনের জন্যে সুখী হয়েছিল | সে মনের আদর পেয়েছিল একমাত্র তার দু-বছরের ছোট দেওর রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই | কিন্তু সে-গল্প আমরা সবাই জানি | তাই সে প্রসঙ্গে একেবারেই যাচ্ছি না |

যে কথাটা এখানে সবচেয়ে জরুরি‚ তা হল‚ এইভাবে নির্বাসিত‚ অপমানিত‚ অপবাদ-লাঞ্ছিত এবং ভালবাসা-বর্জিত হয়ে কোনও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে কি ?

আত্মহত্যার ভাবনা ধীরে ধীরে বাসা বাঁধল মেয়েটির মনে | সে আত্মহত্যার চেষ্টাও করল |

কিন্তু ব্যর্থ হল |

এ বার সেই মেয়ের নির্জনতা‚ নির্বাসন‚ অপমান‚ অপবাদের সঙ্গে মিশল ব্যর্থ আত্মহনন-প্রচেষ্টার গ্লানি আর লজ্জা |

সে মাটিতে মিশিয়ে গেল | সবার এখন সে ঠাট্টার পাত্রী |

সেদিন ছিল তার বিয়ের দিন |

সেদিন ছিল তার জন্মদিন |

সেদিন স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রকে সেই মেয়ে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছিল |

যে কারণেই হোক‚ জ্যোতিরিন্দ্র ফেরেননি |

ইতিমধ্যে এই মেয়েটি জানে‚ তার স্বামী এক নটীকে ভালবাসে | ইতিমধ্যে এই মেয়ে হঠাৎ পেয়েছে হাতে তার স্বামীকে লেখা এক নটীর ‘ ঘনিষ্ঠ চিঠি’ |

এর চেয়ে বিপন্ন বিষণ্ণ তার কখনও লাগেনি |

এই অভিশপ্ত জীবন নিয়ে সে আর চলতে পারছে না |

এত চুরমার নিয়ে বেঁচে থাকা যায় ?

মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে দ্বিতীয়বার আত্মহত্যার চেষ্টা করল রবীন্দ্রনাথের নতুন বউঠান কাদম্বরী |

এবার আর তাকে ব্যর্থ চেষ্টার লজ্জা পেতে হয়নি |

এ বার ঈশ্বর তার সঙ্গে ছিলেন !

দিনটা ছিল ১৮৮৪-র ১৯ এপ্রিল | আজ থেকে ১৩৩ বছর আগে |

( পুনর্মুদ্রিত )

আরও পড়ুন:  ওষুধ না খেয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু ? ছেলের জন্মদিনের ঠিক পরের দিন মৃত্যু অতীতের এই নায়কের
- Might Interest You

NO COMMENTS