ভারতীয় সভ্যতা তথা দর্শনকে পাশ্চাত্যের সমালোচনার নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছিলেন তিনি | তাঁকে বলা হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতু | তিনি শিক্ষকদেরও শিক্ষক | অথচ তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ছেলের বেশি পড়ে লাভ নেই | তার থেকে বরং যজমানি করে সংসারে দুটো পয়সা আনুক | কিন্তু জীবনের খাত সম্পূর্ণ অন্যদিকে বইয়েছিলেন ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ |

# অন্ধ্র ও তামিলনাড়ুর সীমান্তে থিরুত্তানির কাছে এক প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র তেলুগু পরিবারে জন্ম ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে |  বাবা সর্বপল্লী বীরাস্বামী স্থানীয় জমিদারের নায়েব | মা সীতাম্মা গৃহবধূ |

# ছেলের ইংরেজি শিক্ষায় মোটেও মত ছিল না বাবার | চেয়েছিলেন পুরোহিত বানাতে | অনেক টালবাহানার পরে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন আধুনিক স্কুলে |

# স্থানীয় স্কুলের পাঠ শেষ করে ১৭ বছর বয়সে ভর্তি হন মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজে | দর্শনশাস্ত্র ছাড়া অন্য বিষয় পড়ার উপায় ছিল না | তিনি মেধাবী হলেও সংসারে আর্থিক সঙ্গতি ছিল না | তাঁর এক আত্মীয় তখন সদ্য দর্শন নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন | তাঁর বইগুলো পেয়েছিলেন | চোখ বুজে ওই বিষয়টাকেই বেছে নিয়েছিলেন |

# স্নাতকোত্তরে থিসিস লিখলেন | প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল “The Ethics of the Vedanta and its Metaphysical Presuppositions” | পাশ্চাত্যের দার্শনিক যাঁদের ধারনা ছিল‚ বেদান্তে মূল্যবোধের কোনও জায়গা নেই‚ তাঁদের অন্ধ বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন তিনি |

# ভয় ছিল‚ যদি থিসিস রাগিয়ে দেয় সাহেব অধ্যাপক তথা দার্শনিক ডক্টর আলফ্রেড জর্জ হগকে ! কিন্তু রাধাকৃষ্ণনকে বিস্মিত করে হগ বলেছিলেন তিনি থিসিস পড়ে মুগ্ধ | প্রাচ্য সম্বন্ধে তাঁর সব অন্ধ ধারণা ভেঙে চৌচির | অধ্যাপকের এই শংসাপত্র যখন এসেছিল ছাত্র রাধাকৃষ্ণন তখন কুড়ি বছরের তরুণ |

# ছাত্রাবস্থা থেকে আজীবন তিনি হিন্দু ধর্ম ও দর্শনকে রক্ষাকবচ দিয়ে এসেছেন অবাঞ্ছিত আক্রমণ থেকে | বেদান্ত‚ অদ্বৈতবাদ‚ আদি শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ-সহ দর্শনের একাধিক শাখাকে নতুন ভাবে তুলে ধরেছেন |

# মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ১৯০৯-এ | তারপর মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়‚ মহীশূরের মহারাজা কলেজ‚ অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়‚ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ‚ বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি‚ হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি‚ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি-সহ দেশ বিদেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধন্য হয়েছে তাঁর অধ্যাপনার আলোকস্পর্শে | 

# ছাত্রমহলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় | মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে তিনি যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন‚ তখন ছাত্ররা তাঁকে ফুলসজ্জিত গাড়িতে বিদায় জানিয়েছিলেন | গাড়িটি টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্ররাই |

# কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এসেছিলেন বাংলার বাঘ স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণ ও উদ্যোগে | অলঙ্কৃত করেছিলেন King George V Chair of Mental and Moral Science |

# ১৯৩১ সালে সম্মানিত নাইটহুডে | ১৯৫৪ সালে ভূষিত ভারতরত্ন সম্মানে | ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল অর্ডার অফ মেরিট-এর সাম্মানিক সদস্যপদ | এছাড়াও তাঁর শিরোভূষণে যুক্ত হয়েছে একাধিক রত্নখচিত পালক | দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি নামের আগে নাইটহুডের  স্যর উপাধি ব্যবহার করতেন না | পছন্দ ছিল গবেষণার ডক্টর পরিচয়টিই |

# ১৯৭৫ সালে ভূষিত হন টেম্পলটন সম্মানে | কিন্তু পুরস্কারের পুরো অর্থই তিনি দিয়ে দিয়েছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে | এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর স্মৃতিতে রয়েছে স্কলারশিপও |

# ১৯৫২ সালে তিনি দেশের প্রথম উপ রাষ্ট্রপতি এবং ১৯৬২ সালে দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন | রষ্ট্রপতি থাকাকালীন তাঁর জমদিন পালনের উদ্যোগ নেন ছাত্ররা | তিনি তাঁদের বলেছিলেন তাঁর একার নয়‚ এই দিনটি পালিত হোক সকল শিক্ষককে সম্মান জানিয়ে | সেই থেকে ১৯৬২ সাল থেকে ভারতে শুরু হয় শিক্ষক দিবস পালন | তিনি বলতেন সমাজে সেরা মনের মানুষদের আসা উচিত শিক্ষকতার পেশায় |

# পারিবারিক ও তৎকালীন সামাজিক রীতি মেনে তাঁর বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১৬ বছর বয়সে | দূর সম্পর্কের আত্মীয়া শিবকামুর সঙ্গে | তাঁদের চার কন্যা ও এক পুত্র গোপাল সর্বপল্লী | গোপাল সর্বপল্লী একজন স্বনামধন্য ঐতিহাসিক | প্রাক্তন ক্রিকেটার ভি ভি এস লক্ষ্মণও তাঁর দূর সম্পর্কের পারিবারিক শাখার উত্তরসূরী |

# দাম্পত্যের ৫১ বসন্ত পরে ১৯৫৬ সালে প্রয়াত হন স্ত্রী শিবাকামু | তাঁর ১৯ বছর পরে ১৯৭৫ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন | আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যান চক-ডাস্টার-ও তাঁর জীবনদর্শন |

আরও পড়ুন:  ৯৭ বছর ধরে চিরশান্তিতে ঘুমিয়ে ফুলের মতো ঘুমন্ত সুন্দরী

NO COMMENTS