শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক চল্লিশ ছুঁই ছুঁই সাহিত্যপ্রেমী। পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক। জন্ম, বেড়ে ওঠা, ডানা গজানো সবই হাওড়া জেলার মহিয়াড়িতে। পছন্দের ক্ষেত্র মূলত গদ্য। চারপাশে ঘটে চলা, হারিয়ে যাওয়া সময়। তার সঙ্গে মজার মিশেল। এবং অবশ্যই গল্প। এখনো অবধি একমাত্র প্রকাশিত গল্পের বই 'জেড মাইনাস'। পেশাগত ভাবে এক অগ্রণী ইংরাজি প্রকাশনা সংস্থায় যুক্ত।

বোকাবাক্স

টিভিকে বোকাবাক্স বলে যাঁরা দেগেছিলেন, তাঁরা কি ভবিষ্যতের সোশ্যাল মিডিয়ার এমন প্লাবনের মতো চেহারা কিছুটা মাত্রও আঁচ করতে পেরেছিলেন?

ভারতীয় টিভির ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ার সময়কাল ওই উনিশশো একানব্বই পর পরই। তার বেশ কয়েক বছর আগেই অবশ্য ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ব্যান্ড তথা গৌতম চট্টোপাধ্যায় বেঁধে ফেলেছেন সেই অমর গানঃ পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে / স্যাটেলাইট আর কেব্‌লের হাতে / ড্রইংরুমে রাখা বোকাবাক্সতে বন্দি… 

টিভিকে কেন বোকাবাক্স বলা হয়? রেডিও বা মনোরঞ্জনের অন্যান্য প্রাচীন (টিভির পূর্বতন) শাখার সঙ্গে ‘বোকা’ শব্দটি কই কেউ জুড়ে দেয় না! সাধারণ বুদ্ধিতে এর উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ওই একানব্বই থেকে মাত্রই বছর চার-পাঁচ। এই বঙ্গে সাত সাগর উজিয়ে এসেছিল সাবানের ফেনা, ডেইলি সোপ, গোদা বাংলায়, মেগা সিরিয়াল।

ক্রমে এল বেসরকারি চ্যানেল। তার প্রাইম টাইম। আলাদা করে সিরিয়ালের চ্যানেল, যেখানে চৌপরদিন সিরিয়াল। সন্ধ্যের টাটকা সিরিয়াল পরের দিনমানে বাসি পরিবেশন। মানে যে পড়া আগের সন্ধ্যেয় কেউ মিস করেছে, তার ঘেঁটি ধরে পরের সকালে, মানে একটু বেলার দিক করে, দাও গিলিয়ে। ‘দাও গিলিয়ে’ – মানে আবার ভাববেন না যেন, এসব অসুর-টাইপ চ্যানেল কর্তৃপক্ষের বদ মতলব। একেবারেই না। দর্শক সবাই তো ‘এমনি এমনি খাই’ বলে জয়ধ্বনি দিচ্ছে দু-হাত তুলে।

এ-পর্যন্ত যাহোক একপ্রকার ছিল। মানুষ যা খাবে তাই তো খাওয়াবে বাণিজ্যক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ওয়েল এস্ট্যাবলিশড কনসেপ্ট…

 

সোশ্যাল মিডিয়া

এবার আসরে উপস্থিত হল সোশ্যাল মিডিয়া। এখানে নিজের কথা বলতে পারি স্বাধীনভাবে। এখানে অন্যের কথায় মন্তব্য করতে পারি স্বাধীনভাবে। এখানে অনায়াসে অন্যের বক্তব্য শেয়ার করে দিতে পারি। ছবির মতো বা ব্যানার-সাজে সাজানো বক্তব্য হলে তো অতি উত্তম। লোকজন জানিয়ে (সবাই জানবে অমুকের লেখা তমুক শেয়ার করেছে) বা চুপিচুপি টুকলি করে (সবাই জানবে এটা অমুকের নিজের বক্তব্য)। এখানে বিপদ।

আরও পড়ুন:  ‘জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা’

অর্থাৎ খাদ্যবস্তু হজম হবার আগেই বিতরিত। কথায় বলে, খাবার পরিবেশনের আগে নিজে দাঁতে কাটতে। এই শুনে রক্ত গরম আজকের তরুণ-তরুণীরা হয়তো বলবে, দূর মশাই, বলে নয়, বলত। এখন সময় কোথায় অত বাজিয়ে দেখবার?

সত্যি কথা! কোথায় যে চলে গেল সময়! কোনও কিছুর জন্য সময় দেওয়া দিনকে দিন বড় চাপের হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ‘বিপদ’ লিখলাম কেন?

কাল এই লেখাটা লিখছি সন্ধেবেলা। ২০১৭ সালের স্বাধীনতা দিবস। গত চার পাঁচ দিন যাবৎ হোয়াটসঅ্যাপে অনেকেই এই মেসেজ পাঠাচ্ছেন, মোদ্দা বক্তব্য – ভূটান ইংরাজিতে ভূটান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদিও তাই। ভারত তাহলে কেন ইন্ডিয়া? উত্তরও থাকছে একটি বিশেষ প্রকাশনার ডিকশন্যারির উল্লেখপূর্বক, ইন্ডিয়া শব্দটা আসলে অ্যাব্রেভিয়েশন। পুরোটা হল, ইন্ডিপেন্ডেন্ট নেশন ডিক্লেয়ারড ইন আগস্ট।

সঙ্গে অনুরোধ, মেসেজটিকে যত বেশি সম্ভব শেয়ার করুন, যাতে এই সত্তরতম স্বাধীনতা দিবসের আগেই প্রতিটি দেশবাসী এটি জেনে যায়। আবদার দেখুন। বিড়ম্বনা কাকে বলে!

পুরোটাই ভুল। এই যুক্তি ধরলে পাকিস্তানও ইংরাজিতে ইন্ডিয়া। এটুকুও কেউ না ভেবেই শেয়ার করে দেবে? সিন্ধু সভ্যতা, সিন্ধু থেকে হিন্দু শব্দটির উৎপত্তি, ইন্ডাস সিভিলাইজেশন থেকে ইন্ডিয়া শব্দ – এই সবের ওপর লহমায় যেন প্লাবনের জল গ্রাস করল।

আরও বিতর্কিত অনেক বিষয়ও আছে। সেসব নিয়ে বিশদে আলোচনা করা অনুচিত। ছুঁয়ে দেখা যেতে পারে। যেমন ইতিহাস থেকে রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে এক ফালি নিখুঁত কেটে তুলে আনলাম। বাংলার প্রাচীন আবেগকে উসকে দিলেম। বাংলার কোনও এক স্মরণীয় বরণীয় বিশিষ্ট মানুষের মুখে খানিক বেশিই আলো ফেলে লিখলাম, এখনও আপনি তাঁকে বা সেই আবেগকে ভুলে থাকবেন?

রাজনৈতিক বা ধর্মীয় তো এদানি একটু বেশিই। যেমন –

 

১) এতদিন তো অমুক দলকে এত ভালোবাসলেন। বিনিময়ে পেলেন কী? ভালোবাসা বদলে ফেলুন, নিজের প্রাপ্তি বাড়ান।

২) ওই ধর্মের প্রতি এত দরদ আপনার, নিজের ধর্মের এই এই সঙ্কটগুলো কি আপনার হৃদয়ে পৌঁছোবে না কখনো! আপনিও কি চান না নিজধর্মের ধ্বজাধারী হিসেবে নিজেকে দেখতে?

আরও পড়ুন:  পবনপুত্র হনুমানের পাঁচটি মুখ হল কী করে ?

এসব ছাড়া ডাক্তারিও কম নেই –

১) জানো কি, অমুক মাথাধরার মলম তমুক মারণ রোগ ডেকে আনছে?

২) চায়ের সঙ্গে সকালে বিস্কুট না-খেয়ে বরং পেঁপেসেদ্ধ খান, এতে আপনার ওইসব বিলকুল হবে না।  

৩) মাছভাত না-খেয়ে এবার থেকে ভাত-রুটি অথবা মাছ-মাংস একবারে যেকোনো একটি  জোড়ায় খান।  এতে আপনি একদম… এমন কত।

প্রতিফলিত বৈদগ্ধে চারদিক এতই ঝলমলাচ্ছে যে আসল আলো, আসল আয়না খুঁজে পাওয়াই ভার।         

এর সঙ্গে আবির্ভূত হয়েছে নীল তিমি, ব্লু হোয়েল গেম। ইন্টারনেটে তো আমার জ্ঞানগম্যিতে জানি, দেশীয় বা রাজ্যসরকার চাইলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। মানে এই এই ব্যাপার ইন্টারনেটে সার্চ করলেও আসবে না। তেমন কিছু করা যায় না এই মারণ খেলা বন্ধ করতে? আমি নিশ্চিত, এটা নিয়ে বিধানসভায় বা লোকসভায় কোনও দলীয় মতানৈক্য হবে না। সত্তর বছরের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতায় এই বিশ্বাস আমার আছে, আমার মাতৃভূমির ওপর।

 

জয়ধ্বনি

বিপদের কথা লিখেছিলাম। বিপদ তো বিপথ থেকেই। তেমন কিছু কথাও লিখি।

হুগলী জেলার তারকেশ্বরে শ্রাবণ মাস জুড়ে যা হয় তেমনই হয় হাওড়ার গ্রামীণ অঞ্চল নারনার-এ। নারনারেরও প্রসিদ্ধি শিবের মন্দিরের জন্য। চৈত্র মাসে এখানে দূরদূরান্ত থেকে ঝাঁকা বয়ে শিবের মাথায় জল দিতে আসে ভক্তরা। চৈত্রের প্রখর গরম এড়াতে সন্ধ্যে থেকে রাতভর চলে এই দলে দলে পরিক্রমা। সঙ্গে থাকে এইসব জয়ধ্বনিঃ

ভোলেবাবা পার করেগা।

ব্যোম ব্যোম তারক ব্যোম।

বাবা নারনার পঞ্চানন্দের চরণের সেবা লাগি, মহাদেব।

জয় বাবা / পঞ্চা বাবা / পঞ্চা বাবা / নারনার / বার বার / প্রতি বার।

তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে – জয় শ্রীরাম।

শুনে আমার মনে পড়ে পরিচিত এক বিয়েবাড়ির কথা। ছেলের বিয়ে। সে বছর কুমার শানুর পুরনো বাংলা গানের রিমেক ক্যাসেট খুব জনপ্রিয় হয়েছে। উল্লাসে পাত্রপক্ষ বক্স লাগিয়ে সেই ক্যাসেট চালিয়ে দিয়েছে সকাল সকালঃ ‘এই কি গো শেষ দান, বিরহ দিয়ে গেলে…’

আরও পড়ুন:  ৫৭ টি বসন্ত পেরিয়ে শ্রীমান হংসরাজ এখন বড় পর্দায় ছেলের অভিনয় দেখার অপেক্ষায়

অভিভাবক-বয়সী এক প্রতিবেশী পাত্রকে ডেকে গানটির বক্তব্য এবং প্রেক্ষাপট বিস্তারে বলার পরে আর বাজেনি ও-ক্যাসেট।

জয়ধ্বনি উচ্চারণেও জয়নিশান থাকা চাই, অহেতুক আগ্রাসন নয়। এই ফারাকও করতে হবে আধুনিক যুবকযুবতীকে, নিজের বুদ্ধিতে। ধরা যাক, মহাভারত রচয়িতা ঋষি ব্যাসকে আমার খুব পছন্দ, খুব খুব ভালো লাগে। আমি দিতেই পারি জয়ধ্বনি তাঁর নামে – জয় শ্রীব্যাস। কিন্তু গলা চিরে প্রকাণ্ড স্বরে ‘জয়শ্রীব্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাস’ উচ্চারণে পুরো বিষয়টিতেই কি ‘ব্যাস’ টেনে দেওয়া হয় না?

NO COMMENTS