ডেঙ্গি অভিযান

সক্কাল বেলা উঠে থেকে লাফাই আর তার বাবার মতবিরোধ শুরু হয়। স্বল্পকেশ স্বল্পবেশ স্বাস্থ্যবান লাফাই যখন ওর ঘরে শরীরচর্চা করে, লাফাইয়ের বিপত্নীক পেটরোগা বাবা তখনই টিভি তে রামদেব চালিয়ে যোগচর্চা করেন। বলতে গেলেই বাবা পরিবর্ত চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে জ্ঞান দিতে শুরু করেন। অগত্যা ইয়ারফোন, তার জন্য মোবাইল, সেই মোবাইল রাখতে জিম করার উপযুক্ত জ্যাকেট আর তার জন্য প্রয়োজনীয় এসির মাসিক কিস্তির হিসাব; খিস্তি সহযোগে।

ঘরে টাঙানো ইলিশ-রবীন্দ্রনাথ-চিংড়ি-মমতা-ইস্টবেঙ্গল-মার্ক্সবাদের ছবি আর ইদানীংকালের জাত্যাভিমানের একমাত্র সম্বল দৈনিক বাংলা সংবাদপত্র নিয়ে বাবার বাকি দিনটা কেটে যায়। আর লাফাই নিজেকে ওর নিজের মাপকাঠিতে (যা আগে কখনো ডাউনলোড করা, যতদূর মনে পড়ে) অফিসে সমাজে বন্ধুনীদের কাছে সফল পুরুষ হবার লড়াই চালিয়ে যায়।

এ হেন অবস্থায় দেশের বাড়িতে এক নিঃসন্তান কাকা মারা যাওয়ায়, যিনি লাফাইকে পুত্র মেনেছিলেন, স্থিতপ্রজ্ঞ বাবার নজরদারিতে প্রবল অনিচ্ছুক লাফাই স্থানীয় মন্দিরে নাপিত ডেকে ন্যাড়া হয়। বাবাকে অমান্য করার মতো সাহস আর পদ্ধতি… লাফাই নেটে সার্চ মারে, বিপত্নীক গাঁট-ও-গোঁড়া বাবাকে সামলানোর সেরা দশটি উপায়… গুগ্‌লের সর্বজ্ঞানী চাকাও ঘুরতেই থাকে।

…মাথায় ছোট্ট একটা টিকি; লাফাই মনের অভিতে বাড়ির কাছের একটা ঝকঝকে কফি শপে ওর সবথেকে কাছের বন্ধুনী অম্বার সাথে দেখা করতে চেয়ে এসএমএস করে, উত্তর আসে ‘ডান’।

আঁটোসাঁটো পাঁচ সাড়ে সাত কড়া ধাঁচের অম্বা এসে লাফাইকে খুঁজে না পেয়ে মিসড্‌ কল দিতেই একটা ন্যাড়া মাথা লোক পকেট হাতড়ায়। অম্বা আকাশ থেকে পড়তে গিয়েও থমকে যায়… ওর দিকে লাফাইয়ের মতই জিম্‌-মার্কা প্রশস্ত পিঠ করে বসে থাকা লোকটা, হ্যাঁ, ওটা একদম লাফাই…, লাফাইয়ের মাথায় একটা পোকা, বোধহয় মশা… দিনের বেলায়………সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের প্রচার নিমেষে কাজ করে…… ডেঙ্গি… তাও এত নামী কফি শপে…!!!

আরও পড়ুন:  ইয়াকুবমামার ভারতবর্ষ

ভয়ে রাগে কাঁপতে থাকা রুদ্রাণী অম্বা সোজা ম্যানেজারের কাছে; শিগগিরই ফ্লাই ক্যাচার দিন!!

dengue-abhijan-2– ফ্লাই ক্যাচার? কেতাদুরস্ত ম্যানেজার ঠোঁটে হাসে; এ কি মিষ্টির দোকান পেয়েছেন নাকি?

– কিসের দোকান তা আপনি কনজ্যুমার ফোরামে ব্যাখ্যা করবেন… আপাততঃ…, আপাততঃ… বলতে বলতে অম্বা একবার দোকানের ম্যাপটা মেপে নিয়ে সোজা কিচেনে গোঁত্তা মারে।

– আরে ম্যাডাম দাঁড়ান, আমাদের একটা প্রাইভেসি, একটা ডেকোরাম, একটা কমপ্লেইন বুক আছে; … আপনি কনজ্যুমার…

– আরে মশাই আপনার প্রাইভেসি আর কমপ্লেইন বুকের একশো আট তিনে তিনশো তেত্রিশ। আমার বন্ধুর মাথায় ডেঙ্গির মশা আর আপনি কমপ্লেইন বুক নাড়াচ্ছেন?

dengue-abhijan-3— এ দিক ওদিক তাকিয়ে যুৎ মতো কিছু না পেয়ে অম্বা একটা ফ্রাইং প্যান তুলে নেয় উনুন থেকে। তাতে ভাজা হতে থাকা বিদেশী মশলায় জাড়ানো দেশী মুরগীর কিমা রান্নাঘরের ছাদ থেকে রাধুনির টুপি আর ম্যানেজারের সামার কোটে নিমেষের মধ্যে ম’ম’ করে মাখামাখি।

লাফাই ব্যাজার মুখ করে অম্বাকে খোঁজে; ও সাড়া দিয়ে যে চলে গেল…। পরের লাইন গুনগুনানোর আগেই দোকানের ভেতর থেকে ধেয়ে আসে যুদ্ধং দেহি অম্বা। হাতে ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধী ফ্রাইং প্যান। পেছন পেছন কাতরকন্ঠী ম্যানেজার, দোহাই দিদি আমার… বোনটি; মা আমার … অম্বা অর্জুনের মতো স্থির লক্ষ্য।

লাফাই, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, বুঝতে চেষ্টা করে কি কেন কোথায় ইত্যাদি। অম্বা, ওর প্রিয় বান্ধবী; এক হাতে উদ্ধত ফ্রাইং প্যান, যার সাথে এই মাহেন্দ্রক্ষণে ওর দুরত্ব মাত্র হাত তিনেক! লাফাই লাফিয়ে ওঠে। কেতা দূর অস্ত, দাপুটে ম্যানেজার চিঁ চিঁ করে, স্যার আপনার মাথায় ডেঙ্গির মশা আর ম্যাডাম সেটা মারবেনই মারবেন; আর আমার নামে … কন্‌… ম্যানেজারের কন্ঠস্বর অম্বার প্রবল গতিষ্মতী দশাতেই শ্যাঅ্যাঅ্যাট অ্যাঅ্যাপ ধ্বনিতে গ্রাসিত হয়।

পেছন পেছন চিফ কুক, ম্যাডাম, ওটা ৩৬০ ডিগ্রী তে ছিল, আমি একটা ঠান্ডা প্যান এনেছি।

আরও পড়ুন:  বিদায়কালের পরিহাস : বাইশে শ্রাবণের ‘কেচ্ছা’

dengue-abhijan-4লাফাই ‘বাআবাআআ, তোমায় কইছিলাম—’ আর্তধ্বনি সহ ফাল কাইট্যা ৪০ মিমি. কাচের সদর দরজায় সামনে পরে এবং ধাক্কা খাওয়ার ঠিক আগেই অভ্যাস মতো সেলাম ঠুকে দরজা খুলে দেওয়া দারোয়ানকে বাকরুদ্ধ করে লাফাই, তার পেছনে অম্বা, তার পেছনে ম্যানেজার, আর তার পেছনে কুক সাঁ-ই-ই-ই করে বেড়িয়ে যায়।

দারোয়ান গম্ভীর হয়ে ভাবতে চেষ্টা করে ওপর মহলে রিপোর্ট করা দরকার কি না।

– কিন্তু আগে ব্যাপারটা জানা দরকার, ভেবে দারোয়ানও ফ্রাইং প্যানের গন্ধ অনুসরণ করে দৌড় মারে।

উঠে বা না উঠে সব দেখে শুনে বাকি খদ্দেররা কফি-পেস্ট্রিতে মন দেয়।

রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা।

Sponsored
loading...

2 COMMENTS

  1. বেশ ছোটো অথচ জমাটি একটা গল্প, পড়তে পড়তে মুখটা হাসি হাসি হয়ে যায়|
    বেশ enjoy করলাম|