বাংলালাইভ রেটিং -
The Bongs Again film review in Bengali

মাস কয়েক আগের কথা। সবে তখন ‘দ্য বংস এগেন’ ছবিটার টিজার আপলোড হয়েছে ইউটিউবে। একটা গানের কয়েকটা লাইন, সঙ্গে জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের ফুটেজ। ব্যাস – এটাই নাকি টিজার! বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে লোক চড়িয়ে খায়, এমন একজনের কাছে কথায় কথায় তখন এটুকু জানতে চেয়েছিলাম, দেখলে নাকি টিজারটা – লাগলো কেমন ওটা? উত্তর দেবে কী, কথাটা শোনা মাত্র সেই ভদ্রলোক বেঁকে-চুরে গিয়ে হাসতে শুরু করলো তুমুল।

আমি তো অবাক। আরে – সামান্য একটা কথা জানতে চাইলাম, এতে এত হাসির কী হল? জোকস বলে ফেললাম নাকি কিছু? হাসি-টাসি সামলে উঠতে মিনিট খানেক সময় লাগলো ভদ্রলোকের। দেখলাম তারপর হাত দুটো জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গী করছে একটা। ‘অঞ্জন দত্তের টিজার? আরে – ভদ্রলোককে তো আমি গুরু বলে মানি! ওঁর বানানো টিজার আবার দেখতে হবে কেন? না দেখেই একশোয় একশো দিয়ে দিলাম ওতে – যাও!’

আমারও তখন জেদ চেপে গেছে শুনে – ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি? ‘কী ব্যাপার বল তো? অঞ্জন দত্ত আবার কবে থেকে তোমার গুরু হল? যে না দেখেই এভাবে ফুল মার্কস দিয়ে দিচ্ছ?’

‘আরে – গুরু নয়তো কী? জানো তো বাজারে কথা বেচে বেচে খাওয়াই আমার কাজ। তো একটা পয়েন্টে গিয়ে দেখলাম, এই ব্যাপারটা আমার চেয়ে ওই লোকটা পারে আরও হাজার গুণ ভালো। আজ অবধি সিনেমা যে কটা বানিয়েছে, দ্যাখো, বেশিরভাগই ধেড়িয়ে লাট। ব্যোমকেশ ছাড়া আর একটাও তো দাঁড়াতে পারে নি বাজারে! লস খাইয়ে ডুবিয়ে ছাড়ে দুনিয়ার প্রোডিউসারগুলোকে। তবু দ্যাখো – ঠিক নতুন নতুন মুরগি পেয়ে যায় লোকটা। মুরগি মানে প্রোডিউসার। কেন পায় বল তো? কথা বেচে খেতে পারে বলেই তো পায়। একে গুরু মানবো না তো গুরু কী তোমায় মানবো নাকি?’

একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘তা এবার আবার নতুন কার মাথায় টুপি পরালো লোকটা, শুনি?’

নামটা শোনার পর থম মেরে গেল মুখটা যেন কিছুক্ষণের জন্য। তারপর গলার স্বর সিরিয়াস হয়ে গেল খুব, ‘আরেব্বাস – ওদের পাকড়েছে… ঠিকই শুনেছিলাম তাহলে! এতো চুনোপুঁটি নয় – সটান একেবারে রুই কাতলার দিকে হাত! হেভি ক্যালি তো! কী বললাম তোমায়, গুরুদেব লোক না হলে হয়? বল না আমায় তুমি – ওই হাউস থেকে এর আগে তামিল রিমেক ছাড়া আর কিছু তৈরি হতে দেখেছ? শাবাশ বাঙালি।’

মুখের ওপর সপাটে এই সত্যিগুলো শুনে সেদিন তো আমি থ!

কয়েকমাস আগের এই সিনটা থেকে কাট টু আসুন দিন দুয়েক আগের একটা দুপুরবেলায়। ‘দ্য বংস এগেন’ দেখে মাল্টিপ্লেক্স থেকে বেরতে গিয়ে কানে আসছে হাতে-গরম ‘হল’-রিয়্যাকশন। ‘লোকটার মধ্যে তোরা পাস কী বল তো? সিনেমা যা করছে, তার মধ্যে তো জাস্ট কোন মুণ্ডু মাথা নেই। যেমন স্ক্রিপ্ট, তেমন গল্পের ছিরি। সেই লোকটাকে কিনা মাথায় তুলে নেচে নেচে সেলিব্রিটি বানিয়ে ছাড়লি।’ শুনে হকচকিয়ে গিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, দুটো বছর চব্বিশ-পঁচিশের ছেলে। একজন কথা বলছে, আর অন্যজন শুনে একটু ভ্যাবলা টাইপ হাসছে। ফের আমি ধাঁধা খেয়ে গেলাম একচোট। তবে যে শুনেছিলাম, এই আর্বান এজ গ্রুপটা নাকি হেভি অঞ্জন দত্তের ফ্যান?

‘দ্য বংস এগেন’ নিয়ে লিখতে বসেছি, ঠিক আছে, কিন্তু তার আগে নিজেকে এইটে বুঝে নিতে হবে তো যে অঞ্জন দত্তের মধ্যে লুকনো ম্যাজিকটা আসলে কী। একটা লোক, এক গোয়েন্দা-সিরিজের ছবিগুলো ছাড়া যার আর বাকি সব সিনেমা ফ্লপ। তবু এরপরেও লোকটা ফের নতুন নতুন সিনেমা করতে রাঘব বোয়াল মার্কা প্রোডিউসারদের ম্যানেজ করছে কী করে? একটা সময় মনে হচ্ছিল, লোকটা কি প্রোডিউসারের সামনে গিয়ে ম্যানড্রেক মার্কা কোন হিপনোটিজম করে-টরে নাকি?

নিজের বেশির ভাগ সিনেমাই ফ্লপ, এটা অঞ্জন নিজে কিছুতে মানতে চান না জানি। এসব তিতকুটে কথাবার্তা কেই বা মানতে চাইবে, বলুন? বাংলা সিনেমার কোথাও কোন নির্ভরযোগ্য বক্স-অফিস রিপোর্ট অবধি পাওয়া যায় না, যেটা দেখিয়ে এই ফ্লপ-হিটের ব্যাপারটা নিমেষে প্রমাণ করা যাবে। তবে আপনাদের এ ব্যাপারে সারকমস্ট্যানশিয়াল প্রুফ দিতে পারি কিছু। মন দিয়ে একটু স্টাডি করুন ভদ্রলোকের কেরিয়ারটা। ব্যোমকেশ সিরিজের ব্যতিক্রমটুকু বাদ দিন। দেখবেন ওটা বাদ দিলে আর এমন খুব একটা নজির পাবেন না যে, অঞ্জনের সঙ্গে একটা ছবি করার পর ফের সেই প্রোডিউসার অঞ্জনের কাছে ফেরত আসছেন তাঁর পরের ছবির অফার হাতে নিয়ে।

আরও পড়ুন:  জায়রা ওয়াসিম শ্লীলতাহানি - জামিন পেলেন না অভিযুক্ত বিকাশ সচদেব

এর মানে কি হরে-দরে তাহলে এইটে দাঁড়াল না যে একটা ছবি করতে গিয়েই ভালমতো শিক্ষা হয়ে যায় প্রোডিউসারের যে তিনি ভুলেও আর এ পথে পা বাড়ানোর কথা ভাবেন না?

প্রায় বছর কুড়ি আগে অঞ্জনের প্রথম ছবি ‘বড়াদিন’ (১৯৯৮) ছিল কলকাতায় তৈরি হিন্দি সিনেমা। সে ছবির প্রোডিউসার ছিল ‘গ্রামকো ফিল্মস’ অর্থাৎ বকলমে ‘সারেগামা’। পরে ফের ফেরত আসা তো দূরের কথা, সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়ার পর ছবি তৈরির ব্যবসাটাই ওরা উঠিয়ে দিয়েছিল চুপচাপ! পরের ছবি ‘বো ব্যারাক্‌স ফর এভার’ (২০০৪) প্রোডিউস করেন প্রীতিশ নন্দী। তারপর ‘দ্য বং কানেকশন’ (২০০৬) তৈরি হল জয় বি গাঙ্গুলীর প্রযোজনায়। ‘চলো লেটস গো’ (২০০৮) বানালেন অরুণ পোদ্দার। ‘ম্যাডলি বাঙালি’ (২০০৯) নমিত বাজোরিয়া। ‘রঞ্জনা আমি আর আসবো না’ (২০১১) রানা সরকার। ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’ (২০১২) পূর্ণেন্দু রায়, নীলাক্ষী রায়। ‘গণেশ টকিজ’ (২০১৩) রিল্যায়েন্স এনটারটেনমেন্ট। ‘শেষ বলে কিছু নেই’ (২০১৪) ভি থ্রি জি ফিল্মস আর টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ। আর এই গেল বছর ‘হেমন্ত’ (২০১৬) তৈরি হল শ্যামসুন্দর দে আর প্রমোদ লুন্ডিয়ার প্রযোজনায়। এতটা তো পড়লেন, একটা এমন প্রোডিউসারের নাম পেলেন, যিনি একটা ছবি করার পর অঞ্জনের সঙ্গে ছবি করতে ফেরত এসেছেন ফের?

বুঝুন তাহলে অবস্থা!

পুরনো নাম পালটে নতুন প্যাকেজিং দিয়েও রিলিজ করে নি এই ছবি

একটা-আধটা ব্যতিক্রমও আছে। অঞ্জনের সঙ্গে ‘রঞ্জনা’ বানিয়ে জাতীয় পুরস্কার জেতার পর রানা সরকার ফেরত এসেছিলেন বক্স অফিসে সেফ গেম খেলতে, মানে একটা ‘ব্যোমকেশ’ বানিয়ে লাভ লোকসানের ক্ষীর ননী সব উসুল করে নিতে। তৈরি হয়েছিল আগাপাস্তলা ভুলে ভরা ‘আবার ব্যোমকেশ’ (২০১২)। পুরো ছবিটাই হয়ে উঠেছিল আম-পাবলিকের হাসির খোরাক। তারপর আর কখনো এ পথে ফেরেন নি রানা সরকার। এরপর পারসেপ্ট পিকচার কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে মোক্সি এনটারটেনমেন্ট মানে জয় বি গাঙ্গুলীর কোম্পানি একবার গিয়েছিল অঞ্জনের সঙ্গে ‘বিবিডি’ (২০১৩) নামে একটা ছবি বানাতে। সে ছবিটা আর রিলিজই করে নি কখনো, বছরখানেক পর ছবির নাম-টাম পালটে ফেলে ‘থ্রিল অ্যাট কলকাতা জংশন’ নামে রিলিজ করানোর চেষ্টাটাও মাঠে মারা গিয়েছিল পুরো।

অঞ্জনের এই ছবিটা কোথায় হারিয়ে গেল, এখনও রহস্য

রিলিজ না হওয়া ছবি অবশ্য আরও আছে। ‘চৌরাস্তা, ক্রসরোডস অফ লাভ’ (২০০৯) অঞ্জন বানিয়েছিলেন সুধীর ডি আহুজার প্রযোজনায়। রিলিজ না হয়ে জাস্ট ভ্যানিশ হয়ে গেল ছবিটা। এরপর একসময় অঞ্জন বাংলাদেশে গিয়ে সেখানে ছবি তৈরি করবেন বলে ঠিক করেন। কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল ‘মধ্যম এনটারটেনমেন্ট’ নামে একটি সংস্থার সঙ্গে। বাবা আর মেয়ের গল্প, বাবার রোলে অঞ্জন নিজেই নাকি থাকবেন আর মেয়ের রোলে সে দেশের নামী নায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম। ছবির নাম ‘মন বাক্স’। জানেন নিশ্চয়, হচ্ছে-হবে করে সেই ছবিটাও আর তৈরি হল না কখনো!

এবার মজাটা শুনুন, এবারের এই ‘দ্য বংস এগেন’ দেখতে বসে দেখি কী কাণ্ড, এও তো সেই ঘুরে ফিরে বাবা আর মেয়ের গল্প, আর বাবার রোলে ঘুরে-ফিরে সেই অঞ্জন দত্ত নিজেই। তখন দেখছি আর ভাবছি, কী জানি ভাই, চুপচাপ সেই ‘মন বাক্স’র গল্পখানাই তুলে এনে একটু এধার-ওধার করে ফের এখানটায় বসিয়ে দিলেন না তো ভদ্রলোকটি নিজে? যা দিনকাল পড়েছে, কিছুই তো আর বিচিত্র না! আর সেরকম কিছু যদি করেই থাকেন, ধরতে যাবেই বা কে, আর ধরাটা আদৌ যাবেই বা কী করে!

বাংলার যে বড় প্রোডাকশন হাউস এবার অঞ্জনের ছবির প্রযোজক, সেখানে এগুলো সব ছান-বিন করে দ্যাখার মতো কেউ ছিল না? আসলে ওই যে আগেই বলেছি না, এতগুলো ফ্লপ তৈরির পরেও যে একটা আশ্চর্য ক্যারিশমা আছে ভদ্রলোকের আর অদ্ভুত একটা স্পেল। প্রোডিউসারেরা তাতেই বোধহয় দলে দলে সব কাত হয়ে থাকে, নাকি!

আরও পড়ুন:  নাচেন ভালো‚ সলমনের পরিবর্তে তাই নতুন ছবিতে বরুণ ধাওয়ান?

এটা নাকি সেই দশ বছর আগের সেই ‘দ্য বং কানেকশন’ ছবিটার জের টেনে এনে তৈরি। এদিক-ওদিক তেমন কথাই বলে বেড়াতে শুনছি অঞ্জনকে, গান শুনছি, ‘দ্য কানেকশন স্টিল রিমেনস’। তা সত্যি বলতে কী, সেই ‘দ্য বং কানেকশন’ও তো যথেষ্ট হেলাফেলা করে আর ফেলে-ছড়িয়েই বানানো! কলকাতা থেকে আমেরিকা যাচ্ছে যে ছেলেটা জোর করে তার নাম ‘অপু’ রেখে দেওয়া যেন এর মানেই ওটা ‘পথের পাঁচালী – পার্ট টু’ হয়ে গেল। সৌমিত্রের মতো অভিনেতাকে সাজিয়ে দিলেন কিনা থ্রম্বোসিসের রোগী। গোটা সিনেমায় বিছানায় স্থবির হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া তাঁর অন্য কাজ নেই। ইললিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট ট্যাক্সি ড্রাইভার হাসান ভাঙা পা নিয়ে মার্কিন দেশের হাসপাতালের পুলিশ পাহারা থেকে যে ভাবে পালাল, সেটা দেখতে দেখতে তো মনে হচ্ছিলো প্রোডিউসারের পয়সা লুটে এটা কোন লেভেলের ফচকেমি হচ্ছে অঞ্জন? আর অঞ্জনের দশটার মধ্যে সাড়ে ন’খানা সিনেমাতেই যেটা থাকবে, মানে বাংলা একটা রক ব্যান্ড, আর তাদের ধুম ধাড়াক্কা গান বাজনা সেটা তো সেখানে রইলোই, তার ওপর তড়কা মারবেন বলে বোধহয় সেটার সঙ্গে আবার হেভি স্টাইল মেরে পাঞ্চ করে দিলেন সেই ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে…’টাও।

রবীন্দ্রনাথের লেখা লিরিকে ‘উ লা লা’ মার্কা কিছু অ্যাড করে দিলে অমনি যে সেটা চার্ট-বাস্টার হয়ে ওঠে, বাঙালির সেই পরম-আবিষ্কার তো অঞ্জনের ওই ছবির থেকেই শুরু।

কে বলবে অলিপ্রিয়া অচেনা শহরে বাবাকে খুঁজতে এসেছে এবং এই লোকটির সঙ্গে তার সবে মাত্র আলাপ

কাণ্ড দেখুন, তার ১০ বছর পরে তৈরি এই ‘দ্য বংস এগেন’টাও যেন একেবারে কাট-পেস্ট সেই ফর্মুলা! আগের পার্টটা দুটো ছেলেকে নিয়ে তৈরি ছিল মানে, গায়ের জোরে এবারের গল্পটা তাহলে দুটো মেয়ের গল্প হতেই হবে। আর সেটাও হবে একদম খাপে খাপে ফিটিং, মানে একটা মেয়ে কলকাতা থেকে ইউ কে যাবে বাবাকে খুঁজতে আর আরেকটা মেয়ে ফরেন থেকে কলকাতা আসবে মাকে খুঁজতে। এখন নামেই এগুলো বাবা-মাকে খুঁজতে আসার গল্প, আসলে তো কোথাও কোন সিরিয়াসনেস থাকবে না কারুর। দুটো মেয়েই হবে জাস্ট হ্যা-হ্যা করে নেচে বেড়ানো টাইপ মেয়ে। একা একলা অচেনা শহরে অচেনা লোকদের কোলে উঠে ধুম ফুর্তি মারতে বসবে এমন ভাবে যে দেখতে গিয়ে মনে হবে এদের নিজেদের মাথার গণ্ডগোল হল নাকি অঞ্জনের মাথার।

অলিপ্রিয়ার (পার্নো মিত্র) কথাই ধরুন। ওকে এক বছর বয়সে কলকাতায় ফেলে রেখে ওর বাবা নাকি লন্ডনে চলে এসেছিল। সেই বাবাকে খুঁজতে হবু বর অনিন্দ্যর (গৌরব চক্রবর্তী) সঙ্গে লন্ডনে এল অলি। এরপর সোহো-র একটা মদের আড্ডায় জেরি নামে একজনের সঙ্গে আলাপ হল ওর। পরদিন সেই জেরির সঙ্গে অলি কিনা সটান সোজা নিরুদ্দেশে ধাঁ?

যাবে না কেন বলুন, জেরি যে বলেছে ওঁর কাছে অলি’র বাবার হদিশ রয়েছে নাকি! মজা দেখুন, খোঁজাখুঁজির নামে এই ধ্যাস্টামি করতে গিয়ে একদিনের জায়গায় কেটে গেল পাক্কা তিনদিন। আর এই পুরো সময়টা সেই জেরি আর তার বন্ধুগুলোর সঙ্গে নেচে-গেয়ে ফুর্তি করতে থাকল অলি। সবে আলাপ হওয়া অচেনা লোকের সঙ্গে দিন-রাত এক করে বিদেশ-বিভুঁয়ে এমন বেদম ফুর্তি মারার ব্যাপারটা আদৌ রিয়্যাল কিনা, কিংবা এই পুরো সময়টায় একবারও নিজের উড-বি হাজব্যান্ড অনিন্দ্যকে ফোন করতে চাইল না কেন অলি, এই কথাগুলো জানতে চেয়ে আর লজ্জা দেবেন না প্লিজ!

ইন্ডিয়ায় লোকে নাকি অপরিচিতকে খুব হেল্প করতে আসে, এ ছবিতে বলতে শোনা যায় যীশুকে

আরও সরেস হল সেকেন্ড মেয়েটা, মানে ‘সারাহ্‌’ (নেহা পাণ্ডা)। সেই ছোট্ট থেকে সে বড় হয়েছে বিদেশে তার পালক মায়ের কাছে। রিয়্যাল মায়ের খোঁজ পেতে সে হুট করে এই অচেনা শহরে কলকাতাতে হাজির। এখানে পা রাখতে না রাখতে প্রায় যেন স্বর্গ থেকে তার জীবনে খসে পড়লো পরোপকারী যীশু (যীশু সেনগুপ্ত)। কিন্তু পরোপকারের তো একটা সীমা রাখবেন আপনি, অঞ্জন? সবে দিনকয়েকের আলাপ, এর মধ্যে যীশুর বাড়ি রাতের বেলা হামলা করে ওর থেকে লাখ টাকা ডিমান্ড করছে সারাহ্‌, আর যীশুও দিব্যি নিজের টাকা, বাবার টাকা আর মায়ের গয়না মিলিয়ে-টিলিয়ে সেই অ্যামাউন্ট তুলে দিচ্ছে ওর হাতে? পয়সার এমন হরির লুট কোন কালে এই শহরটাতে শুরু হয়েছিল, দাদা?

আরও পড়ুন:  অভিনেত্রী সাগরিকা ঘাটগেকে বিয়ে করলেন জাহির খান

এই সিনখানা দেখছি, আর খালি মনে হচ্ছে, হয় অঞ্জন দত্ত এই স্ক্রিপ্টখানা নামাতে বসার আগে গাঁজায় দম দিয়ে নিয়েছিল চুটিয়ে আর না হলে লোকটার স্ক্রিপ্ট লেখার অরিজিনাল দৌড়টাই বোধহয় এইটুকু, ভদ্রলোকের থেকে এর চেয়ে বেশি লজিক্যাল কিছু এক্সপেক্ট করাটাই হবে ভুল। গাঁজার কথাটা লিখলাম বলে কিছু মনে করবেন না প্লিজ, অঞ্জন নিজেই তো ছবির একটা সিনে গাঁজা টেনে, মাল খেয়ে ধুম নেশা করে ঘরময় হুল্লাট করে বেড়ানোর ব্যাপার-স্যাপার জুড়ে দিয়েছেন দিব্যি। ও হ্যাঁ, সিনটায় হুল্লাট করছিল কারা জানেন তো? সেই সারাহ্‌ নামের মেয়েটা, লোকাল বস্তির ছেলে নিতাই (শুভ্র সৌরভ) আর তার কয়েকটা সাঙ্গ-পাঙ্গ। এখানে আবার জানতে চেয়ে বসবেন না যে, সারাহ্‌ তো শহরে এসেছিল নিজের মাকে খুঁজতে, হঠাৎ সেই সব ভুলে এসব বেহুদা আমোদ শুরু করলো কী বলে? আর ছেলেগুলোই বা এসে জুটল কোত্থেকে, সারাহ্‌ ওদেরকে নিজের রুমে এন্ট্রিই বা দিলো কেন?

এরকম খটকা তো শুধু একটা নয়, আরও বিস্তর আছে ভাই! ভাড়াটিয়া সারাহ্‌’কে বাড়িতে একলা রেখে ওর বাড়িওয়ালি মহিলা (খেয়ালি দস্তিদার) যে তিনদিনের জন্যে পুরী বেড়াতে চলে গেলেন, সেই তিনি আর তারপরে কখনো ফিরে আসলেন না কেন? এবং সেটা নিয়ে স্টোরি লাইনে কোথাও কারুর কোন রিয়্যাকশন হল না কেন। আরে ধুস দাদা, কথায় কথায় অত যদি হিসেব মেলাতে বসেন তাহলে অঞ্জন দত্তের সিনেমা তো আপনার হজমই হবে না!

ড্রোনে ক্যামেরা বসিয়ে এভাবেই হয় শুটিং

আচ্ছা, স্ক্রিপ্টের এত বড় বড় ছ্যাঁদাগুলো ম্যানেজ দেওয়ার জন্যেই কি অঞ্জন যেখানে পেরেছেন ক্যামেরাটাকে ড্রোনে তুলে দিয়েছেন অমনি আর আকাশ থেকে ক্যামেরা দিয়ে চোখ রেখেছেন দুনিয়াদারির ওপর? হালে এই টেকনোলজিটা এসে পৌঁছেছে টালিগঞ্জে আর তারপর থেকে দেখি, যে যেখানে পারছে এই ড্রোন-ক্যামেরা লাগাচ্ছে! ঈগলের চোখ বানাবে? ড্রোন নামাও মাঠে। ব্যোমকেশপর্ব বানাতে গিয়ে শোনাতে হবে সেই ১৯৪৮ সালের গপ্পো? ব্যাস, ড্রোন চালিয়ে দাও জঙ্গলের ওপর দিয়ে। অ্যাকশন আর লাভ স্টোরি চটকে মেখে নাচ দ্যাখাবে তুর্কিস্থানের বাঙালি গ্যাংস্টার? বেশ বেশ, দাও চালিয়ে ড্রোন গোটা টার্কি’র ওপর দিয়ে! আর এগুলোর পর এবার এই ‘দ্য বংস এগেন’-এ তো একেবারে পাইকারি হারে ড্রোন। এই ইউ কে-র সি সাইড তো এই হাওড়া ব্রিজের ফাঁক। ড্রোনের থেকে মুক্তি নেই কারুর! এভাবে টানা ঘষতে থাকলে একটা এফেক্ট যে খুব শিগগিরি ফিকে মেরে যায়, শুধু সেটুকু বোধই বোধহয় বাংলা ইন্ডাস্ট্রির কোন মহাপ্রাণের মাথায় আসে নি এখনও!

আর একটা কথা বলি শুনুন। হারিয়ে যাওয়া মা কিংবা বাবাকে খোঁজার জার্নি নিয়ে সিনেমা তো কিছু কম হয় নি মশাই। এক্ষুনি ঝট করে মাথায় আসছে বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সোহরা ব্রিজ’-এর (২০১৬) কথা। কিংবা আরেকটু পিছিয়ে গেলে জোয়া আখতারের ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’ (২০১১) বা মণিরত্নমের ‘কান্নাথিল মুথামিত্তাল’-এর (২০০২) নাম। গুচ্ছের ড্রোন শট লাগিয়ে, এক ছটাক হোমোসেক্সের সিন চিপকে আর তার সঙ্গে আনতাবড়ি ‘হৃদমাঝারে…’র মতো গানের রিমিক্স ভার্সন গুঁজে  বকচ্ছপ জিনিষ না বানিয়ে মন দিয়ে ওই ছবিগুলো একটু স্টাডি করে দেখতে পারতেন আপনি?

আর কিছু না হোক এটা তো বোঝার চেষ্টা করা যেত যে কীভাবে পেশাদার পরিচালকেরা হ্যান্ডেল করেন এমন গোছের কনসেপ্ট, আর কীভাবেই বা দক্ষ রাইটাররা সামলে ওঠেন ক্যারেক্টারগুলোর মন-পবনের ঝড়। কী মনে হয়, তাতে আপনার এই প্রোডাক্টটাই কি আখেরে অনেক বেটার হয়ে যেত না?  

অবশ্য এভাবে লেখা ঠিক নয়, কে বলতে পারে, পঞ্চাশ বছর পরে আপনার বানিয়ে যাওয়া এই বেহেড সিনেমাগুলোর জন্যেই হয়তো একটা স্পেশ্যাল জায়গা থাকবে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে।

আর সেই স্পেশ্যাল চ্যাপটারের নামটা হবে ‘অঞ্জন দত্ত মডেল’। প্রায় মরতে বসা একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও যে এভাবে নিত্য নতুন মুরগি ধরা যায়, আর পরম কেত মেরে কাটিয়ে দেওয়া যায় একটানা বিশ-বিশটা বছর, সেই ক্লাসে পড়ান হবে সেটাই।

NO COMMENTS