স্কুলে পড়েছেন বৈদিক সভ্যতার সপ্ত ঋষির নামে আকাশে জ্বলজ্বল করে সপ্তর্ষিমণ্ডল | আকাশপাঠের পাশাপাশি আসুন একবার খোঁজার চেষ্টা করি সেই সাত ঋষিকে |

হিন্দু পুরাণের নানা উৎসে সাত ঋষির নাম পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে | তবে সবথেকে বেশি স্থানে যাঁদের নাম রয়েছে তাঁদের কথাই বলব | সেই সাত ঋষি হলেন ভৃগু‚ অত্রি‚ অঙ্গীরা‚ বশিষ্ঠ‚ পুলস্থ্য‚ পুলহ ও ক্রতু |

এই পর্বে বশিষ্ঠর কথা |

ঋষি বশিষ্ঠকে নিয়ে এত উপাখ্যান রচিত হয়েছে‚ কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি ! তিনি ছিলেন দশরথের চার পুত্রের গুরু | ব্রহ্মার মানসপুত্র এই ঋষিকে নিয়ে আর এক মহাকাব্য মহাভারতে আছে একাধিক চমকপ্রদ পর্ব | বশিষ্ঠের স্ত্রী ছিলেন অরুন্ধতী | আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডলের পাশেই থকে উজ্জ্বল অরুন্ধতী নক্ষত্র | হিন্দুশাস্ত্রে তিনি হলেন আদর্শ স্ত্রী‚ তাই অনেক জায়গায় এই রীতি প্রচলিত যেখানে বিয়ে সম্পন্ন হলেই নব পরিণীতাকে দেখানো হয় আকাশের অরুন্ধতী নক্ষত্র |

সরস্বতী নদী তীরে স্ত্রী অরুন্ধতীকে নিয়ে ঋষি বশিষ্ঠের মনোরম তপোবন ছিল | একদিন সেখানে চলে এলেন কুশ বা কৌশিক বংশীয় রাজা বিশ্বামিত্র | তাঁর সঙ্গে সুবিশাল বাহিনী | মৃগয়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে তাঁরা পৌঁছন বশিষ্ঠের তপোবনে |

অত্যন্ত ঔদ্ধ্যতের সঙ্গে তাঁরা ঋষির কাছে খাদ্য চান | রাজা বিশ্বামিত্র বলেন‚ প্রাসাদে যেভাবে রাজসিক খাবার তাঁরা পান‚ ঠিক সেইভাবে আপ্যায়িত করতে হবে তাঁদের | আসল উদ্দেশ্য ছিল‚ ঋষিকে পরিহাস করা | কারণ তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন নির্জন বনমধ্যে তপোবনে সম্ভব নয় রাজপ্রাসাদের আতিথ্য |

অতি সত্বর ক্ষত্রিয়ের এই অহঙ্কার চূর্ণ বিচূর্ণ হল | তাঁর পুরো বাহিনীর সামনে এসে উপস্থিত হল রাজসিক ভোজন | যুগপৎ বিস্মিত ও কৌতূহলী হয়ে পড়লেন রাজা বিশ্বামিত্র | তিনি ভোজন সমাপনে এর উৎস জানতে চাইলেন ঋষি বশিষ্ঠ সমীপে |

স্মিত হাস্যে ঋষি জানালেন সবই তাঁর নন্দিনীর কৃপা | গাভী নন্দিনী হলেন ইন্দ্রর কামধেনুর কন্যা | দেবরাজ ইন্দ্র নন্দিনীকে উপহার দিয়েছেন ঋষি বশিষ্ঠকে | সব শুনে বিশ্বামিত্র দাবি করলেন তাঁকে ওই গাভী দিতে হবে | তার জন্য তিনি মোট এক সহস্র স্বর্ণালঙ্কার-সজ্জিত গাভী দেবেন ঋষি বশিষ্ঠকে |

কিন্তু ঋষি রাজি হলেন না | বললেন‚ তিনি কোনও সম্পদের বিনিময়েই নন্দিনীকে বিক্রি করবেন না |

এ বার বিরোধ দেখা দিল ব্রহ্মতেজ ও ক্ষাত্রতেজের মধ্যে | রাজা বিশ্বামিত্র বললেন তিনি যখন চেয়েও পেলেন না | তখন হরণ করবেন নন্দিনীকে | বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন গাভীকে গোশালা থেকে নিয়ে আসতে তাঁর সামনে |

পোষ্য নন্দিনী কাতর নয়নে জানতে চাইল ঋষি বশিষ্ঠের কাছে | কোন অপরাধে তাকে বিতারণ করা হচ্ছে ? উত্তরে ঋষি জানালেন তাকে বলপূর্বক নিয়ে যাচ্ছেন রাজা বিশ্বামিত্র |

এরপরেই দেখা গেল এক আশ্চর্য দৃশ্য | গাভী নন্দিনীর লেজ থেকে জ্বলন্ত অঙ্গার ছুটে গেল | রাজা বিশ্বামিত্রর বাহিনীর দিকে ছত্রখান হয়ে গেল | গাভীকে একবিন্দুও সরানো গেল না | তার চোখ ক্রোধে জ্বলতে লাগল | তার দেহ থেকে একের পর এক বাহিনী উদ্ভূত হতে লাগল |

গাভী নন্দিনীর লেজ থেকে জন্ম নিল পহ্লব | উদর থেকে দ্রাবিড় | অন্য অংশ থেকে শক | গর্ভ থেকে যবন | গোবর থেকে শবর এবং গোমূত্র থেকে জন্ম হল কাঞ্চীদের | এছড়াও কীরাত‚ পৌন্ড্র-সহ কত শত উপজাতি | তাদের সম্মিলিত আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল বিশ্বামিত্রের বাহিনী | তিনি পরাজিত হয়ে ফিরতে বাধ্য হলেন | তাঁর উপলব্ধি হল‚ ব্রহ্মতেজের কাছে ক্ষাত্রশক্তি নস্যমাত্র |

তিনি ক্ষত্রিয় ধর্ম ছেড়ে পর্যবসিত হলেন ব্রাহ্মণ্যে | রাজ্যপাট ছেড়ে চলে এলেন ঋষি-জীবনে | কিন্তু মনে মনে রাগ পুষে রাখলেন ঋষি বশিষ্ঠের বিরুদ্ধে | ক্ষমতার বলয়ে পরস্পরের শত্রু হয়ে গেলেন দুই ঋষি‚ বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্র |

বশিষ্ঠের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন বিশ্বামিত্র | একদিন বনের মধ্যে মুখোমুখি হয়ে গেলেন ইক্ষ্বাকু বংশীয় রাজা কল্মাষপদ ও বশিষ্ঠের পুত্র শক্তি | সরু পথে কে আগে যাবেন তাই নিয়ে দেখা দিল বিরোধ | কেউ পথ ছাড়বেন না | ক্রোধান্বিত ঋষিপুত্র অভিশাপ দিলেন‚ রাজা এ বার থেকে নরখাদক রাক্ষস হয়ে যাবেন |

ঘটনাচক্রে সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে পড়েন ঋষি বিশ্বামিত্র | তাঁর মনে দুষ্টুবুদ্ধি খেলে যায় | বহুদিন ধরে তিনি আর বশিষ্ঠ দুজনেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন কল্মাষপদকে শিষ্য বানানোর | কিন্তু কেউ সফল হননি | শক্তির দেওয়া অভিশাপ শুনে সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন বিশ্বামিত্র |

তিনি কিঙ্কর বলে এক নরখাদক রাক্ষসকে প্রবেশ করালেন কল্মাষপদের দেহে | রাজার বিপথগামী হওয়া আর কে আটকায় ! অভিশাপের বশে রাজা এক ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণকে নরমাংস খেতে দিলেন | রাজা নির্দেশে দিলেন ভাতের সঙ্গে নরমাংস মেখে ব্রাহ্মণকে দিতে | সেটা করা হল | কিন্তু ব্রাহ্মণ বুঝতে পারলেন তাঁর সঙ্গে কী করা হয়েছে | তিনিও অভিশাপ দিলেন রাজা কল্মাষপদ নরখাদক হয়ে যাবেন |

অভিশাপের এই আধিক্যে রাজা কল্মাষপদ সত্যিই হয়ে উঠলেন ভয়ঙ্কর নরখাদক | তিনি ফিরে গেলেন ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রমে | ঋষির অবর্তমানে ভক্ষণ করলেন শক্তি-সহ তাঁর শতপুত্রকে | তপোবনে ফিরে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন বশিষ্ঠ | যোগবলে বুঝতে পারলেন সব কিছুর নেপথ্যে অনুঘটকের মতো সক্রিয় বিশ্বামিত্র | কিন্তু তিনি ক্ষমা পরম ধর্ম মেনে ক্ষমা করে দিলেন বিশ্বামিত্রকে |  

মহত্বের গুণে ঋষি বশিষ্ঠ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন রাজা কল্মাষপদকেও | যোগবলে তিনি রাজাকে শাপমুক্ত করেন | ভুল বুঝতে পেরে রাজা ক্ষমা চান মহর্ষির কাছে | প্রার্থনা করেন তাঁকে পুত্রলাভে সাহায্য করতে | কারণ নরখাদক অবস্থায় কল্মাষপদ খেয়ে নিয়েছিলেন সঙ্গমরত ঋষিকে | অভিশাপ পেয়েছিলেন তিনি কোনওদিন নিজ বীর্যে পুত্রলাভ করতে পারবেন না | শত্রুবীর্যে পুত্রলাভই তাঁর নিয়তি | শেষ অবধি তাঁর প্রার্থনায় ঋষি বশিষ্ঠ মিলিত হন রানি মন্দয়তীর সঙ্গে | ঋষির সঙ্গে যৌনমিলনে গর্ভবতী হন রানি | দীর্ঘ ১২ বছর ছিল গর্ভকাল | ধৈর্যচ্যুত রানি নিজেই পাথর দিয়ে স্ফীত উদর উন্মোচন করে ভূমিষ্ঠ করান পুত্রকে | তাঁর নামকরণ হয় অস্মক |

কল্মাষপদর তো পুত্রলাভ হল | ঋষি বশিষ্ঠের বংশধারার কী হবে ? শতপুত্র তো নিহত | তাঁর পুত্রবধূ অদৃশ্যন্তি তখন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা | ঋষি বশিষ্ঠ শুনতে পেলেন পুত্রবধূর গর্ভে কে যেন শিশুকণ্ঠে বেদপাঠ করছে | তিনি আশ্বস্ত হলেন বংশরক্ষা নিয়ে | জন্ম নিল বশিষ্ঠের পৌত্র পরাশর | পরে চতুর্বেদজ্ঞ ঋষি পরাশর নিজের পিতৃহত্যার সম্বন্ধে জেনে বহু রাক্ষস নিধন করেন | চেয়েছিলেন পৃথিবী রাক্ষসমুক্ত করতে | কিন্তু তাঁকে বিরত করেন পিতামহ বশিষ্ঠই | স্মরণ করিয়ে দেন ক্ষমাধর্ম | পরাশরের পুত্র হলেন বেদব্যাস | যিনি রচনা করেছিলেন মহাভারত |

এই প্রসঙ্গে :

আরও পড়ুন:  মাতৃভূমি থেকে কয়েক হাজার কিমি দূরে বিদেশ বিভুঁইয়ে ম্যালেরিয়ায় বেঘোরে প্রাণ হারালেন রানির সহচরী‚ বড়লাটের স্ত্রী

ব্রহ্মার বীর্য পড়েছিল জ্বলন্ত অঙ্গারে, তার থেকেই আবির্ভূত হলেন অঙ্গীরস বা অঙ্গীরা http://banglalive.com/who-was-sage-angira/

ঋষিপত্নীর সতীত্বের পরীক্ষা নিতে এসে ত্রিদেবকে জন্মাতে হল এই ঋষির পুত্র হয়েই http://banglalive.com/brahma-vishnu-shiva-were-born-as-sons-of-rishi-atri/
তাঁর শাপে ব্রহ্মা নরলোকে পুজো পান না‚ বিষ্ণুকে জন্ম নিতে হয় নানা অবতারে‚ শিব পূজিত হন লিঙ্গরূপে http://banglalive.com/why-is-rishi-bhrigu-famous-in-hindu-mythology/

- Might Interest You

NO COMMENTS