গোপাল মিস্ত্রি
জন্ম ২৬ মে, ১৯৬৩। মেমারির এক উদ্বাস্তু কলোনিতে। শ্রীরামপুর কলেজ থেকে দর্শনে সাম্মানিক স্নাতক। পেশা সাংবাদিকতা। বারো বছর বয়সে প্রথম কবিতা লেখা, প্রায় একইসঙ্গে গল্প লেখায় হাতেখড়ি। ২০১২ সালে শারদীয়া পত্রিকায় উথালপাথাল উপন্যাস প্রকাশ। এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছোটবড় সাতটি উপন্যাস এবং অসংখ্য গল্প প্রকাশিত।

জজসাহেব, আপনার কাছে সব সত্যি কথা বলব। একটুও মিথ্যে বলব না। খুনটা আমিই করেছি। ভেবেছিলাম, কেউ টের পাবে না। কিন্তু পুলিশের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার সাধ্য নেই আমার। তবে বিশ্বাস করুন, জীবনে আর কাউকে আমি খুন করিনি। এইসব রক্তারক্তি আমি সহ্য করতে পারি না। তাই খুনটা করে নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর পালিয়ে দেশের বাড়িতে চলে যাই।

গোড়া থেকেই বলি তাহলে। আমার নাম চন্দ্রকান্ত দাস। বয়স ছাব্বিশ। বাড়ি হাঁসখালি, নদীয়া। আমি যদি পাকা খুনি হতাম তাহলে কি আর বাড়ি গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম? পুলিশ আমাকে ধরতেই পারত না। সত্যি কথা বলতে কী, খুনটা করার কয়েকদিন পর থেকে খুব ভেঙে পড়ছিলাম। আমিই হয়তো ধরা দিতাম। মনে মনে সেই কথাই ভাবছিলাম। তাই অন্য কোথাও পালিয়ে যাইনি। একদিন সক্কালবেলা পুলিশের লোক গিয়ে আমাকে ধরে নিয়ে এল। পুলিশ এসেছে জেনেও কিন্তু পালানোর চেষ্টা করিনি। তবে আমার মা আর ভাইবোনগুলো খুব কান্নাকাটি করছিল। ওরা কেউ কিছু জানত না। আমি খুনটা করে পালিয়ে গিয়েও বাড়িতেই ছিলাম। বাড়ির বাইরে কোথাও যেতাম না। চুপচাপ থাকতাম। আর কাজে আসারও নাম করছিলাম না। বাবা মা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, ‘কী হয়েছে।’ তখন তো কাউকে বলতে পারিনি, একটা খুন করে পালিয়ে গেছি। তাই যখন পুলিশ আমাকে ধরতে গেল ওরা বিশ্বাসই করতে চায়নি, আমি কাউকে খুন করতে পারি। মা বারবার বলছিল, ‘যে ছেলে খাসি পাঁঠা কাটা দেখলে অজ্ঞান হয়ে যায় সে কী করে খুন করবে?’ বাবা‌ প্রথমে পুলিশের ওপর খুব চেঁচামেচি করছিল। আমি কিছু বলিনি। পুলিশ, আমাকে ধরে নিয়ে এসেছিল।

আমি কীভাবে ওখানে গেলাম? হ্যাঁ জজসাহেব, বলছি। আমি ঘষটে ঘষটে কোনও মতে মাধ্যমিকটা পাশ করেছিলাম। তারপর আর পড়া হয়নি। আমার পড়তে ভালো লাগত না। বাবা বলল কাজ দ্যাখ, না হলে খাবার জুটবে না। তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম কাজের খোঁজে। কতজন দূরের দেশে চলে যায়। আমার তেমন ইচ্ছে হয়নি। তাই কাছাকাছি এখানে ওখানে কাজের খোঁজে যেতাম। টুকটাক কাজ করতাম। দিনমজুরির মতো। কিন্তু একটা পাকা কাজ খুঁজছিলাম। একদিন নৈহাটি স্টেশনে বসে দু’টো লোকের কথা শুনছিলাম। একজন আর একজনকে বলছে, ‘দোকানে ভিড় আর চাপ বাড়ছে। পেরে উঠছি না। অথচ একটা ভালো কাজের ছেলে পাচ্ছি না। যাকেই রাখছি সে চুরিচামারি করে পালিয়ে যাচ্ছে।’ তখন অন্যজন বলল, ‘আজকাল বিশ্বাসী কাজের ছেলে পাওয়া খুব কঠিন।’ আমি অনেকক্ষণ ধরে ওদের কথাবার্তা শুনে সাহস করে বললাম, ‘আমি কাজ করতে চাই।’ লোক দু’টো অনেকক্ষণ ধরে আমাকে দেখল। এটাওটা জিজ্ঞেস করল। তারপর একজন বলল, ‘ঠিক আছে কয়েকদিন কাজ করবে। যদি দেখা যায় পারছ তাহলে থাকবে। নাহলে কিন্তু বিদায়।’ আমি রাজি হলাম।

লোকটার মুদিখানা দোকানে কাজ পেলাম। পাড়ার মধ্যে হলেও বেশ বড় দোকানটা। মালিক বলল, আপাতত শুধু তিন বেলা খাবার। কাজ পারলে মাইনে ঠিক হবে। দোকানের পিছনে একটা ঘরে মালটাল রাখা হয়। সেখানেই থাকার জায়গাও দিল। মালিকের বাড়ির একতলায় দোকানটা। অতএব বাড়িরও এটা ওটা করিয়ে নিত মালিক। আমি করতাম হাসি মুখেই। অল্পদিনের মধ্যেই মালিক বুঝল আমার হবে। তখন আমার মাইনে ঠিক হল মাসে দেড় হাজার টাকা। এই বাজারে কিছুই নয়। তবু তিনবেলা খাবার আর থাকার জায়গা পেয়ে আমি এককথায় রাজি হলাম।

দোকানে অনেকেই মাসকাবারি জিনিস নিত। মাসের প্রথমেই ব্যাগ আর ফর্দ দিয়ে যেত। আমি ফাঁকা সময়ে ফর্দ মিলিয়ে জিনিস ভরে রাখতাম। কোনও কোনও বাড়িতে সেই ব্যাগ  দিতেও যেতাম। মালিক একটা সাইকেল দিয়েছিল। দিনের বেলায় ভিড়ে সময় না হলে কখনও কখনও রাতেও  দিতে যেতাম। কোনওদিন এক বাড়ি, কোনএ দিন দু’বাড়ি এইভাবে।

হ্যাঁ হুজুর, এই দোকানেই মাল নিতে আসত অলকা রায়। টুকটাক এটা ওটা নিজেই হাতে করে নিয়ে যেত। কিন্তু মাস কাবারি বাজারটা আমাকে দিয়ে আসতে হত। কখনও দিনের বেলায়, কখনও রাতের দিকে।

ওর বয়স কত হবে আমার ঠিক আন্দাজ নেই। তবে মনে হয় পঞ্চাশ বাহান্ন হবে। একটু বেশিও হতে পারে। আমি প্রথম প্রথম মাসিমা বলতাম। কিন্তু ওর সেটা পছন্দ হত না। বলত, ‘এই আমাকে মাসিমা বলবি না তো। আমার কী এমন বয়স রে। আমাকে দিদি বলিস।’ অলকার বয়স আমার মায়ের চেয়েও বেশি হবে। তো আমি আর কী করি, দিদিই বলতে লাগলাম। ডাকতাম অলকাদি বলে। ও বাড়িতে একাই থাকত। একটা কাজের বউ ছিল। সে সকালে এসে ঘরদোর পরিষ্কার করে রান্নাবান্না করে দিয়ে চলে যেত। আবার সন্ধ্যার পর এসে রান্না করে দিয়ে যেত। আমি যখন মাসকাবারি মালটা দিতে যেতাম তখন মাঝেমধ্যে তাকে দেখতাম। বেশিরভাগ দিনই সে চলে যেত। অলকা একা একা বসে টিভিতে সিরিয়াল কী সিনেমা দেখত। খুব কমদিনই আমি কাজের বউটাকে দেখতে পেয়েছি।

অলকার তিনটে ছেলেমেয়ে। মেয়েটা বিয়ের পর তার স্বামীর সঙ্গে বিদেশে চলে গেছে। ছেলেদু’টোও বাইরে চাকরি করে। ওর স্বামী মারা গেছে বছর পাঁচেক আগে। কিন্তু বিধবা বলে তার কোনও কষ্টটষ্ট ছিল না। সবসময় টিপটপ থাকত। ছেলেরা নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু যায়নি। পরের মেয়ের বাঁকা মুখ দেখে থাকতে পারবে না বলে যাওয়ার কথা উঠলেই বলত, ‘আমি নিজের মতো থাকব। তোরা তোদের মতো থাক।’

তো অলকা সত্যিই যায়নি। একা একাই থাকত। শহরের বুকে বড় দোতলা বাড়ি। অনেক টাকা আছে ব্যাংকে। ছেলেদের কাছ থেকে কিছু নিতেই হয় না। ওর স্বামী নাকি পুলিশ অফিসার ছিল। সে সারাজীবন বাইরে বাইরে চাকরি করেছে। আর অলকা এখানে থেকে ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছে।

আরও পড়ুন:  ঘুমের ওষুধ

অলকা যখন সেজেগুজে দোকানে আসত, কী অন্য কোথাও যেত, তখন বেশ সুন্দর লাগত। মনেই হত না অত বয়স। চুলে পাকও ধরেনি। গায়ের রংটাও বেশ ফর্সা ছিল। তবে সত্যি কথা বলছি হুজুর, আমার কোনওদিন অন্য কিছু মনে হয়নি। বয়স হয়েছে কিংবা বিধবা তো কী হয়েছে, কারও তো একটু সেজেগুজে থাকতে ইচ্ছে করতেই পারে। সবসময় থান কাপড় পরে শোক শোক মুখ করে থাকতে হবে কেন? কিন্তু লোকে অনেক কথা বলত। ও সেসব গ্রাহ্যই করত না।

বলছি জজসাহেব, সব বলছি। একটু জল খাব।

ও প্রায়ই দোকানে আসত। আর আমি সব মাসেই ওরকম ব্যাগ ভরতি মাসকাবারি মাল দিতে যাই। প্রথম প্রথম মালটা দিয়েই চলে আসতাম। কোনও কোনওদিন টাকা আমার হাতে দিয়ে দিত। কোনওদিন দিত না। পরে নিজে এসে দিয়ে যেত। এমনি করে বেশ কিছুদিন চলার পর থেকে আমাকে বসতে বলত। এটা ওটা খেতে দিত। অনেক গল্প করত। নানা রকম গল্প। নিজের ছেলেবেলার কথা। সংসারের কথা। জানতে চাইত আমার বাড়ির কথা। আমিও বলতাম। সারাদিন মুদিখানা দোকানের মাল মেপে মেপে ক্লান্ত হয়ে থাকতাম। আমার কথা বলার লোক বলতে তো দোকানে যারা মাল নিতে আসে তারাই। মাল দিতে দিতে কত কথা শুনতাম। আর আমার কথা তো সেই চাল ডাল তেল নুনের মধ্যেই আটকে থাকত। গল্প করার কোনও উপায়ই নেই। মালিক ক্যাশ সামলাত। আমি মাল দিতাম। কখনও দোকান ফাঁকা থাকলে মালিক অন্যকাজে ভিড়িয়ে দিত। কিন্তু বাইরে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার জায়গা নেই আমার। তাই অলকার বাড়িতে গিয়ে একটু সময় গল্প করতে করতে আমার ক্লান্তিটা চলে যেত।

এমনিভাবেই প্রায় বছর খানেক কেটেছে। আমাকে পুজোর সময় নতুন জামা প্যান্ট দিয়েছে। আমাকে খুব স্নেহ করত। বুঝতে পারতাম। অলকার বাড়ির দরজা আমার জন্য সব সময় খোলা। কিন্তু সবসময় তো যেতে পারি না। কারণ আমাকে তো কাজ করতে হয়।

একদিন রাতে আমাকে খাওয়ার নেমন্তন্ন করেছিল। দোকান বন্ধ করে খেতে যাই। আমি তো এখানে একা থাকি। মালিকের বাড়ি থেকে আমার খাবার দেয়। আমি কোনওদিন মালিকের ঘরে গিয়ে খাইনি। আমার খাবারটা টিফিন ক্যারিয়ারে করে নীচে দিয়ে দেয়। আমি নীচের গুদামঘরে বসে খেয়েদেয়ে, ক্যারিয়ারটা ধুয়ে আবার মালিকের ঘরে পৌঁছে দিই। আমার থালা গ্লাসটা নীচে থেকে যায়। মিথ্যে বলব না, মালিকের ঘরে ভালোমন্দ যাই হোক তার ছিটেফোটা আমি সব সময়ই পাই। কিন্তু কোনওদিন তাদের ঘরে গিয়ে এক টেবিলে বসে খাওয়ার সুযোগ হয়নি। সেই আদরটুকু প্রথম আমাকে দিল অলকা। আমাকে একসঙ্গে টেবিলে নিয়ে বসে খেল। খেতে খেতে অনেক গল্প করল। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। আমি জীবনে সেই প্রথম কোনও বাড়ির খাবার টেবিলে বসে খেলাম। আমাদের বাড়িতে তো খাবার টেবিলিফেবিল কিছু নেই। আমরা রান্না চালার একপাশে বসে খাই। সেই প্রথম টেবিলে বসে খুব ভালো ভালো পদ খেলাম, যা আগে খাইওনি কোনওদিন।

আর সেইদিনই একটা ঘটনা ঘটল। যা এর আগে কোনওদিন ঘটেনি। খেয়ে দেয়ে আমি চলে আসব। অলকা বলল, ‘থাকোতো একা নীচে একটা গুদামঘরে। দেরি করে গেলেও তো কেউ কিছু বলার নেই। অত তাড়া কীসের? বসো।’ আমাকে বসতে বলে সে শোবার ঘরে গেল। আমি টিভি দেখছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে কাপড় ছেড়ে একটা পাতলা নাইটি পরে আমার পাশে এসে সোফায় বসল। আমার খুব অস্বস্তি লাগছিল। ওরকম পোশাোক এর আগে তো কোনওদিন দেখিনি। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে অলকা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে  কেমন লাগছে? আমি খুব বুড়ি হয়ে গেছি মনে হচ্ছে?’

আমি বললাম, ‘না তো। তোমাকে ভালোই লাগছে।’ হ্যাঁ জজসাহেব, বলতে ভুলে গেছি, এরমধ্যে আর একটা জিনিস হয়েছে। আগে তাকে আপনি করে বলতাম। একদিন সে আমাকে ‘তুমি’ করে বলতে বলেছিল। আর সে প্রথম প্রথম তুই তোকারি করলেও কিছুদিন পর থেকে ‘তুমি’ই বলত।

আমার কথা শুনে খুব খুশিতে ঝকমক করে উঠল অলকা। একেবারে বাচ্চা মেয়ের মতো। সেই প্রথম পাশে বসে সে আমার গাল টিপে বলল, ‘সবকিছু দেখার চোখ থাকতে হয়। খালি মুদি দোকানের মাল মাপলে হবে? চোখ দিয়েও অনেক কিছু মেপে নিতে হয়।’ তারপর আমার গায়ে মুখে হাত বোলাতে লাগল। আচমকা এমন একটা ঘটনায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। কেমন যেন আমি পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অলকা হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করতে লাগল। আমি আস্তে আস্তে ভেঙে পড়লাম। সেদিন আমি অনেক রাতে আমার ঘরে ফিরেছিলাম।

জজসাহেব, সত্যি বলছি। তারপর থেকে আমাকে যেন ভুতে পেয়ে বসল। আমি রোজ রাতে অলকার ঘরে যেতে লাগলাম। আমার মালিকের ঘরের খাবার তখন প্রায় রাতেই আমি নষ্ট করে ফেলতাম। ক্যারিব্যাগে ভরে নিয়ে রাস্তার কুকুরকে খাইয়ে দিতাম। আমি অলকার ঘরে গিয়ে খেতাম। সে আমার জন্য খাবার সাজিয়ে বসে থাকত। কাজের বউটা যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য সে চলে যাওয়ার পর আমার জন্য আলাদা কিছু করত। কোনও কোনও দিন আমাকে টাকা দিয়ে দিত হোটেল থেকে স্পেশাল খাবার নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর আমি দোকান বন্ধ করে একটু ঘুরতে যাওয়ার নাম করে চলে যেতাম অলকার ঘরে। মালিক কিছুই বুঝতে পারত না। সে জানত, অনেকদিন এখানে এসেছি, আড্ডা দেওয়ার জায়গা তো হবেই।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

জজসাহেব, বিশ্বাস করুন, আমি মোহে পড়লাম। মেয়েমানুষের দেহের মোহ। ও আমার সঙ্গে ব্যবহার করত একদম একটা অল্পবয়সি মেয়ের মতো। বয়স হলে কী হবে, আমাকে যখন আদর করত তখন মনেই হত না ওর অত বয়স। আমার চেয়ে অনেক বড়। প্রথমদিনের ঘটনার পর আমাকে বলেছিল, নাম ধরে ডাকতে। তাতে নাকি ওর মধ্যে অন্যরকম ভাব আসে। নিজেকে ছোট্টবেলার অলকা মনে হয়। নিজেকে নতুন করে চেনে। আমি অতসব বুঝতে পারতাম না। আমার লোভ জন্মে গেল শুধু শরীরটার প্রতি। রোজ সন্ধে হলেই আমি কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়তাম। আমার শরীরের মধ্যে আনচান শুরু হত। রাত সাড়ে ন’টার মধ্যে দোকান বন্ধ হয়ে যেত। ওপর থেকে আমার খাবার দিয়ে দেওয়া হত। আমি তারপর বেরিয়ে পড়তাম। কী যেন বলে? অভিসার। আমাকে জেরা করার সময় পুলিশের লোকেরা বলেছিল, ‘শালা অভিসারে যেতিস।’ বিশ্বাস করুন জজসাহেব, আমি কম লেখাপাড়া জানা ছেলে, আমি ওই সব শব্দের মানেও জানি না। কিন্তু নিশুত রাতে নিঃশব্দে যেতাম ওর বাড়িতে।  

এমনি করেই চলছিল। কেউ কিছু টের পায়নি। ওর বাড়ির কাজের বউটাও কিছু বুঝতে পারেনি। কারণ তার সঙ্গে আমার দেখাই হত না। পাড়ার লোকেদের সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই। দিনের বেলায় সবার সামনে আমি তো অলকাদি বলেই ডাকতাম। আর রাত নামলেই সে হয়ে যেত শুধু অলকা।

না, ওর ছেলেময়েদের আমি কোনওদিন দেখিনি। আমি যতদিন ধরে ও বাড়িতে যাচ্ছি কোনও দিন কেউ আসেনি। তাদের সঙ্গে ফোনেই যোগাযোগ রাখে ও।

হ্যাঁ, ওর অনেক টাকা আছে। দোতলা বাড়ি। ব্যাংকে, বাড়িতে আলমারি ভরতি অনেক টাকা। ওর বর পুলিশে চাকরি করত তো। ঘুষের টাকা হবে হয়তো।  আমাকে মাঝে মাঝে টাকা দিত। বলত, ইচ্ছে মতো বাইরে খাবেদাবে। তো আমি আর কোথায় গিয়ে কী খাব? টাকাগুলো আমার কাছেই জমত।  

বেশ ছিলাম। তাহলে খুন করলাম কেন? সেকথাই বলছি জজসাহেব। এমনি চলতে চলতে আস্তে আস্তে ওর মধ্যে অন্য পরিবর্তন আসছিল। ও নিজেকে অল্পবয়সি একটা যুবতী মেয়েই ভাবতে শুরু করেছিল, যে আমার সঙ্গে লুকিয়ে প্রেম করছে। আমি কখনও দেশের বাড়ি গেলে নতুন প্রেমিকার মতো খুব অভিমান করে থাকত। এক দু’দিন পর ফিরে এসে তার অভিমান ভাঙাতে হত। কিছুদিন পর থেকে আমাকে চাপ দিচ্ছিল বিয়ে করার জন্য। বলেছিল এই সব সম্পত্তি আমার নামে করে দেবে। বদলে ওকে বিয়ে করতে হবে। আমাকে রোজ চাপ দিতে লাগল। আমি বোঝাতে লাগলাম, লোকে কী বলবে তুমি আমাকে বিয়ে করলে? তোমার ছেলেদের বয়সই তো আমার চেয়ে বেশি। ও সেসব বুঝতে চাইত না। বলত, সেসব নিয়ে তোমার ভাবার কী আছে। আমরা বিয়ে করবে, তানিয়ে অন্য কে কী ভাবল তাতে কী আসে যায়? তাছাড়া বয়স্ক লোকেরা যদি যুবতী মেয়েদের বিয়ে করতে পারে, বয়স্ক মহিলারা যুবক ছেলেদের বিয়ে করতে পারবে না কেন? তুমি আর আমি বিয়ে করে সবাইকে দেখিয়ে দেব।

আমি মনে মনে ভাবলাম, না এবার সরতে হবে। কিন্তু সহজে পাওয়া ওর শরীরটার প্রতি আমার এত লোভ বেড়ে গিয়েছিল যে না গিয়েও পারতাম না। রাত নামলেই আমার কেমন নিশি পাওয়া মানুষের মতো অবস্থা হত। কেউ যেন আমাকে ডেকে নিয়ে যেত অলকার বাড়িতে।

না জজসাহেব, ওর টাকা, বাড়ি বা সোনার গয়না, কোনও কিছুর প্রতিই আমার কোনও লোভ ছিল না। আমি ইচ্ছে করলে ওর অনেক টাকা হাতিয়ে নিতে পারতাম। চাইলেই ওকে বিয়ের ছলনা করে সব কিছু আমার নামে লিখিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু কিছুই করিনি। আমি শুধু ওকে বোঝাতে লাগলাম, ‘তুমি যতদিন আমাকে সাথ দেবে আমি আসব তোমার কাছে। তারজন্য বিয়ে করার দরকার কী? আর আমি তো এখনই অন্য কাউকে বিয়েও করছি না। তোমার ভয়ের কী আছে?’ কিন্তু ও শুনত না। অভিমানী হয়ে উঠত আর বলত, ‘ও, তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তাই আমার শরীর যতদিন তোমায় সাথ দেবে তুমি আসবে?’ আমি বোঝাই, ‘তা কেন, তোমাকে ভালোবাসিতো।’ ও যুবতী প্রেমিকার মতো বলত,  ‘তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে আমি সহ্য করতে পারব না। আমাকে বিয়ে করতেই হবে।’ আমাকে দিয়ে দিব্যি করিয়ে নিল বিয়ে করব বলে।

কিন্তু তখনই মনে মনে ঠিক করলাম, আমাকে এই মোহ থেকে বেরোতেই হবে। আমি তো সত্যি সত্যি ওকে ভালোবাসি না। শুধু ওর দেহটার প্রতি আমার লোভ। আপনিই বলুন হুজুর, আমার ডবলেরও বেশি বয়সি একটা মেয়েমানুষের শরীর ভোগ করা আর তাকে বিয়ে করে ফেলা কি এক কথা হল?

কিন্তু বেরিয়ে আসার কোনও রাস্তা পাচ্ছিলাম না। ওর বাড়ি আর যাব না ভেবেও রাত হলেই আবার চলে যেতাম। শেষে ঠিক করলাম মোহমুক্ত হতে ওকে খুনই করব। একদিন রাতে প্ল্যান করেই আমি ওকে খুন করেছি। কেমন করে গলায় ফাঁস দিয়ে খুনটা করেছি পুলিশকে তা আবার অভিনয় করে দেখিয়েছি। পুলিশ বলেছিল, ওটা নাকি ঘটনার পুনর্নিমাণ, তাই করেছি। সেদিনও খুন করার আগে ওর শরীরটা আমি ভোগ করেছিলাম। তারপর ও যখন পরম তৃপ্তিতে চোখ বুজে শুয়েছিল ঠিক সেই সময় আমি ওর গলাটা চেপে ধরি। খুব জোরে। কোনও কথা বলতে পারেনি। ছটফট করতে করতে একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মৃত্যুটা নিশ্চিত করতে আমি রান্নাঘর থেকে নোড়াটা এনে মাথায় মারি। ঠিক তালু লক্ষ্য করে পরপর। তারপর বিছানা পরিপাটি করে গুছিয়ে দিয়ে বেরিয়ে চলে যাই, যেন ও সুন্দর বিছানায় ঘুমিয়ে আছে।

আরও পড়ুন:  প্রেসক্রিপশন

জজসাহেব, আমি ওকে খুন করেছি। কিন্তু ধর্ষণ করিনি। ময়নাতদন্ত নাকি বলেছে খুনের আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল। না জজসাহেব, আমি যা করেছি, ওর ইচ্ছায়। তারজন্য আমার একটুও পাপবোধ নেই। ও আমাকে ফাঁসিয়েছিল। আমি ফেঁসে গিয়েছিলাম। কোনও মেয়েমানুষ যদি স্বেচ্ছায় কাউকে শরীর দিতে চায় কোনও পুরুষ মানুষ কি অতসহজে তা এড়িয়ে যেতে পারে? আমি তো সাধু পুরুষ নই।

প্রথমে পুলিশ ভেবেছিল খুন করে ডাকাতি। কিন্তু পরে বোঝে তা হয়নি। হুজুর, আমি ওকে শুধু খুন করেছি। কিন্তু ওর ঘর থেকে কিছু নিয়ে যাইনি। ইচ্ছে করলে ওর ঘর থেকে নগদ টাকা সোনাদানা অনেক কিছু নিয়ে যেতে পারতাম। ওর ঘরের আলমারির চাবি কোথায় থাকে তা আমি জানতাম। আমাকে আলমারি খুলে অনেক কিছু দেখিয়েছে। কিন্তু কিছু নিইনি। আমি শুধু মোহমুক্ত হতে চেয়েছি।

তবু ওকে খুন করে সেদিন সারারাত ঘুমোতে পারিনি। ভয়ে। পরদিন সকালে দোকানের মালিককে বললাম, অনেকদিন বাড়ি যায়নি, বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে। মায়ের জন্য মন কেমন করছে। মালিক জানত, আমি খুব একটা বাড়ি যাই না। তবু বলল, ঠিক আছে কালকে যাস। আমি আর জোর করলাম না। কারণ জোর করে চলে গেলে মালিক অন্য কিছু ভাবতে পারে।

একটু বেলার দিকে জানাজানি হল অলকা খুন হয়েছে। কাজের বউটা এসে ঘরে ঢুকে দেখে বিছানায় মরে পড়ে আছে। অন্যদিনের মতো দরজা খোলা বলে সে ঘরে ঢুকে যায়। কিন্তু সে দরজা তো আমিই খুলে বেরিয়ে এসেছিলাম। ও ভেবেছিল বুঝি অলকা খুলেছে। ডেকে সাড়া না পেয়ে ওর চিৎকার চেচামেচি শুনে লোকজন জড়ো হয়। তারপর পুলিশ আসে। আমি অবশ্য শুনেও আর ওদিকে যাইনি। সে রাতটা কোনওরকমে কাটিয়ে পরের দিন ভোরে আমার জামাকাপড় টাকা পয়সা নিয়ে বাড়ি চলে যাই।

কিন্তু পুলিশ আমাকে ঠিক সন্দেহ করেছে। আমি ওই বাড়িতে নিয়মিত মালপত্র দিতে যেতাম, অথচ ঘটনার পর থেকেই আমি এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ হয়েছিল। মালিক সঠিক ঠিকানা জানত না। তবু হাঁসখালিতে গিয়ে খোঁজ করে করে পুলিশ ঠিক আমার বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল। আমি কোনও বাধা দিইনি। এক কথায় পুলিশের কাছে সব স্বীকার করে নিয়েছি।

কেন জানেন জজসাহেব? আমার মন খারাপ। অলকার রক্তমাংসের শরীরটাকে খুন করার জন্য আমার একটুও অনুশোচনা নেই। কিন্তু আমার মন খারাপ, আমি যে একটা ভালোবাসাকে খুন করেছি। বিশ্বাস করুন, অলকা আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসত। ঠিক যেমন করে একটা ছেলেকে একটা মেয়ে ভালোবাসে। কিংবা একটা মেয়েকে একটা ছেলে। অলকা আমাকে বলত, ‘চন্দ্র, আমার সব আছে। টাকা পয়সা সোনা দানা, আমার ছেলেমেয়ে, সব। আমার স্বামীও ছিল। কিন্তু আমার জীবনে ভালোবাসা নেই। ছিল না কোনওদিন। অথচ আমার খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করত। একটু বড় হয়ে আমি যখন ভালোবাসার মানে বুঝতাম, কাউকে ভালোবাসার জন্য খুব ছটফট করতাম। স্কুলে যেতে যেতে ভাবতাম কেউ আমাকে ভালোবাসার কথা বলুক। কেউ বলুক আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু কেউ বলেনি। কেন বলেনি জানি না। আমার খুব হতাশা লাগত। আমি তো দেখতে খারাপ ছিলাম না। অথচ আমাকে কেউ ভালোবাসার কথা বলত না। তারপর কলেজে যাওয়ার শুরুতেই একদিন আমার বাবা পুলিশে চাকরি করা, মোটা মাইনে আর ঘুষ পাওয়া একটা লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে দিল। আমি তাকেই ভালোবাসতে চাইলাম। কিন্তু সে ওসব বুঝত না। তার ভালোবাসা ছিল ঘুষের প্রতি। আমার প্রতি ছিল শুধু কর্তব্যটুকু, ভালোবাসা নয়। সে ভাবত, আমাকে অনেক টাকা আর গয়না এনে দিলেই আমার সব পাওয়া হয়ে যাবে। তাই প্রচুর ঘুষ খেত। আর ছিল শরীরের চাহিদা। বাড়ি এলে শুধু শরীরটা ভোগ করে চলে যেত। আমি তার সংসার করেছি, তার ছেলেময়ের মা হয়েছি। কিন্তু কখনও সেই ভালোবাসা পাইনি, যে ভালোবাসার জন্য আমি বুঝতে শিখেই ছটফট করেছি। আমার অতৃপ্ত আত্মাটা সব সময় হাহাকার করত। ভালোবাসার জন্য। তোমাকে দেখে আমার সেই ভালোবাসা আবার ফিরে এসেছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি চন্দ্র। তুমি আমাকে ভালোবাসার স্নিগ্ধ আলো দাও। আমাকে ভালোবাসো। এসো না আমরা মানুষকে বুঝিয়ে দিই, ভালোবাসা যে কোনও বয়সেই হতে পারে।

জজসাহেব, আমি এক মহিলার দেহের আকর্ষণ থেকে মুক্তি পেতে তাকে খুন করে দিয়েছি। কিন্তু তারপর থেকে আমার মনটা কাঁদছে শুধু ওর ভালোবাসার জন্য। এতদিন মনে হত আমি শুধু ওর শরীরের মোহে পড়েছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমিও বোধহয় ভালোবেসেছিলাম। আমিও তো ছোটবেলা থেকে কারও ভালোবাসা পাইনি। কেউ আমাকে বলেনি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আধপেটা খাওয়া পরিবারে বড় হয়েছি। দিনমজুরি করেছি। মুদিখানা দোকানের সামান্য কর্মচারী হয়েছি। আমাকে কে ভালোবাসবে? অলকাই প্রথম আমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল। ও আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আমাকে ভালোবাসার অমৃত দিয়েছে। কিন্তু এরপর তো আমাকে আর কেউ ভালোবাসবে না। ঘেন্না করবে। আমি এমন সাজা চাই জজসাহেব, পরজন্মেও যেন এই ভালোবাসাটুকু পাই।         

 

শেষ

এটি একটি কাল্পনিক কাহিনি।  কারও জীবনের সঙ্গে সামান্যতম মিল থাকলেও তা নেহাতই কাকতালীয়।

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ