শুধু বিজ্ঞাপনে আজকাল কি না হয়! শঙ্খ ঘোষের কলম থেকে সেই কবেই বেরিয়েছিল অমোঘ ওই চারটি শব্দ, মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। বহু প্রচারিত খবর কাগজের ষোল পাতার মধ্যে অন্তত চারটি পাতায় ভর্তি বিজ্ঞাপন থাকে। যদি সমস্ত বিজ্ঞাপনকে একত্রিত করা যায়, দেখা যাবে কাগজটির অর্দ্ধেকেরও বেশি শুধু বিজ্ঞাপন। খবরের কাগজের জন্য বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপনের জন্য খবরের কাগজ—এটি একটি চর্চার বিষয়। বিতর্কেরও বটে। সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। শুধু খবরের কাগজই কেন, বিজ্ঞাপনের কল্যাণে টেলিভিশনে একটি দু’ঘণ্টার চলচ্চিত্রকে রবার ব্যান্ডের মতো টেনে টেনে সাড়ে তিন ঘণ্টা বানিয়ে দেওয়া হয়। হয়তো কোমল গান্ধার দেখছেন। ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’ ডায়লগটির পরেই কাট টু বিজ্ঞাপন। সেটি হয়ত শুরুই হল এভাবে—ভাল ভাবে বাঁচার ঠিকানা অমুক গ্রুপের রেসিডেন্সি। অথবা ‘আপনি কিছুই দেখেননি মাস্টারমশাই’ সংলাপটা মুখ থেকে বেরোতে না বেরোতেই ‘সুপ্পার এলইডি। এবার দেখুন আরও বেহতর্।’ এমন উদাহরন দেওয়া যেতে পারে ভুরি ভুরি। তবে যে কোম্পানিগুলি বিজ্ঞাপন বানানো ও সেগুলির বিপননে কোটি কোটি টাকা খরচা করে, সেগুলি মূল হিন্দি থেকে বাংলাতে ডাব করার সময় এত কৃপণ হয়ে পড়ে কেন কে জানে! নাকি ঠিক ঠাক অনুবাদকই পাওয়া যায় না আজকাল। পেশ করা হল অমুক কোম্পানির তমুক রেজর, যা আপনাকে প্রতিদিন দেবে শানদার শেভের অনুভূতি। এমন বাংলা শুনলে প্রথমে হাসি পেলেও প্রতিবার একই জিনিস শুনতে শুনতে কপালে ভাঁজ পড়ে। অথবা ধরুন, আপনার চুলে সিল্কি সিল্কি ফিলিং উপলব্ধ করার জন্য আজই অবশ্য কিনুন অমুক শ্যাম্পু। ইনট্রোডাক্টরি অফার, দুশ মিলি রিফিলে পনেরো টাকা ছুট। প্রিন্ট মিডিয়ায় এমন বিজ্ঞাপনও চোখে পড়েছিল।

একটি নামকরা সর্বভারতীয় খুচরো ব্যবসার বিপণি তো বছরে দুবার মহা ধূমধাম করে উদযাপন করে সুপারসেভার উইক। অথচ দেখুন, ইংরিজি কাগজে সুপারসেভার বললেও বাংলা কাগজে এরই বিজ্ঞাপন বের হয় ‘মহাবাচত’ উইক বলে। একটি বাংলা শপিং চ্যানেলে স্ক্রিনে টোলফ্রি নম্বর দেখিয়ে ‘তুরন্ত খরিদ’ করার কথা বলা হয়। কিনে নেওয়ার বাংলা ‘আপনাইয়ে’ হয়ে যেতেও শুনেছি। নতুন কোনও ঠান্ডা পানীয় ‘প্রতিটি বুঁদে আত্মবিশ্বাস’ যোগানোর কথা বলে বুক বাজিয়ে। বাংলা শব্দভান্ডারের এমন অবস্থা দেখলে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়রা নির্ঘাৎ বিষম খেতেন। কিছু কিছু শব্দের বানান দেখলে পিলে চমকে ওঠে। দীঘায় সমুদ্রের ধারে ষাড়দা রোল সেন্টার দেখেছিলাম আগে। কিন্তু দিন কয়েক আগেও কলকাতায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখলাম, মাধ্যমিক পরিক্ষারথিদের উষ্ণ অভিনন্দন। সেই ব্যানারেই কিন্তু আলো করে ছিলেন তুমুল জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অনুপ্রেরণাদাত্রী। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে দেখেছি শীতবস্ত্র বিতাড়ন। অথবা অমুক মোড়ে উচ্চ অলোকস্তম্ভ। উদ্ভোধন করতে আসবেন মাননীয় সংসদ। এতগুলি ভুল কিন্তু ছিল একই ব্যানারে। সেটি প্রকাশ্য রাজপথে ছিল সবারই চোখের সামনে, মাসের পর মাস। আমবাঙালির শব্দবোধ-বানানবোধ হয়ত এতটাই তলানিতে! না হলে সেটি ঠিকই পাল্টে দেওয়ার কথা বলত কেউ।

আরও পড়ুন:  স্বাধীন ভারতে নিদারুণ অনটনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন এই বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী

এই হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়া ভাষাবোধ বদলানোর কোনও সম্ভাবনা নেই আপাতত। দশটির মধ্যে আটটি বাচ্চাই এখন টাই বেঁধে ইংলিশ মিডিয়ামে যায়। একটি ছড়ায় ছিল, ‘টেগোরের পুরো নাম? সরি স্যার, আই অ্যাম ইংলিশ মিডিয়াম।’ এদের প্রায় সিংহভাগেরই বাংলাটা বিশেষ ‘আসে’ না। এই বাংলা না আসার ব্যাপারটি কিন্তু বেশ গর্বের। রাস্তাঘাটে রোজই তো দেখছেন। তেলাপিয়া মাছের দর করে আর পঞ্চাশ আদা কিনে হাতে বাংলা কাগজ মুড়ে নিয়ে হাঁটছেন যে আপাত বিধ্বস্ত পিতা, তিনিই কিন্তু তাঁর সন্তানটি রাস্তার ধারে চলে গেলে বলে উঠছেন, ‘কাম হিয়ার। হু টোল্ড ইউ টু গো দেয়ার?’ শিশুদের মায়েদের মধ্যে এই প্রবণতাটি বেশি দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরা আবার কথায় কথায় সন্তানদের ‘বেবি’ বলেন। বাসে একবার দেখেছিলাম, সানগ্লাস পরা মধ্য তিরিশের এক মহিলা বাছা বাছা বাংলা শব্দে ফোনে ‘দজ্জাল’ শাশুড়ির গালমন্দ করলেন। ফোনটি রেখেই তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘শো মি ইওর হোমটাস্ক খাতা বেবি। ইয়েসটারডে ম্যাথ অল রাইট অর এরর্?’ বেবি বলল, ‘জল খাব।’ মা বললেন, ‘ওয়াটার বল, তা হলে আই উইল গিভ।’ বাড়ির একটাই স্নানঘর হাঘরে বাংলা মিডিয়াম বাবার কাছে পায়খানা কিংবা বড়জোড় বাথরুম, আধুনিকা মায়ের কাছে ওয়াশরুম আর এস ফর স্যামসুঙ বাচ্চার কাছে লু হয়ে যায় জাদু মহিমায়! বইমেলায় এই বাচ্চাগুলিকে বাংলা বইয়ের স্টলে পারতপক্ষে ঢুকতে দেন না তাদের বাবা-মায়েরা। পাছে বাংলার ছোঁয়াচ লাগে! এরা ফেলুদা পড়ে ইংরিজি অনুবাদে। টেনিদা-ঘনাদা-কিরীটি-ব্যোমকেশের কপাল খারাপ। এই দাদাদের তো তেমনভাবে ইংরিজিতে অনুবাদ হয়নি এখনও। এই প্রজন্মের অধিকাংশ শিশুদের কাছে তাঁরা অধরাই থেকে গেলেন। শিশুদের বাংলা ‘আসে’ না, তাই দাদারাও তাদের কাছে আর আসেন না।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলি অনেকটা হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো। সারা পৃথিবীতেই এরা বাঁশি বাজায়। কিন্তু জানে, হিন্দুস্তানে বাঁশি বাজালে বাঁশিওয়ালার পিছনের লাইনটি হবে সবচেয়ে লম্বা। আর মগজধোলাইয়ের জন্য শিশুদের থেকে বড় অবজেক্ট আর কিই বা হতে পারে! এ দুর্ভাগা দেশ শিশুদের আঁতুড়ঘর। হাত ধোয়ার সাবানের বিজ্ঞাপন দেখে শিশুরা ভাবে, আতসকাচ দিয়েই বুঝি জীবানু দেখা যায়। কিংবা মশা মারার মেশিনগুলি থেকে বেরোয় এমন এক মিসাইলের মতো জিনিস, যা মশাগুলিকে খুঁজে খুঁজে পেটে গিয়ে মারে। বুড়ো খোকা খুকিরা ফর্সা হওয়ার ক্রিম মেখে চলে জীবনভর। ত্বক ঝকমকে হলে জীবনও ঝলমলে হবে, এই আপ্তবাক্যটি আমাদের রক্তে মেশাচ্ছে বিজ্ঞাপনগুলি, নিয়ম করে, প্রতিদিন।

আরও পড়ুন:  আর একটু হলে সদ্যোজাত অবস্থায় পাল্টাপাল্টি হয়ে জেলেনীর কোলে চলে যাচ্ছিলেন এই মহা তারকা

বলা বাহুল্য, সেটিও ভুল বাংলায়। নিজের স্কিন ঝমকাও, লাইফ জগমগাও।

তবে এ কথাও তো ঠিক। ভাল জীবন কাটানোর থেকে ঝিংগালালা জীবন বিতানোর মজা, ভুল বললাম, মস্তি অনেক বেশি!

- Might Interest You

NO COMMENTS