যে সময় তাঁর বিশ্বনন্দিত হওয়ার কথা‚ সে সময় তিনি ঝুলছিলেন সিলিং ফ্যান থেকে | যে সময় অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার কথা‚ সে সময় তাঁর অকালে শেষ হয়ে যাওয়া প্রতিভাবান জীবন নিয়ে সিনেমা হয় এক ডক্টর কি মউত ! তিনি ডক্টর সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বড় ভুল সময়ে এসেছিলেন | সময়ের থেকে এগিয়ে থাকাই ছিল তাঁর অপরাধ |

তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ১৬ জানুয়ারি‚ হাজারিবাগে | ১৯৫৫ সালে ফিজিওলজিতে সাম্মানিক স্নাতক হয়েছিলেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে | তখন সেটি ছিল কলকতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত | এরপর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই রিপ্রোডাক্টিভ ফিজিওলজিতে ডক্টরেট | তারপর এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রিনোলজিতে ডক্টরেট |

১৯৭৮ সালে ৩ অক্টোবর জন্ম হয়েছিল এক কন্যাসন্তানের | নাম কানুপ্রিয়া আগরওয়াল | দুর্গা পুজোর আবহে জন্ম বলে আর এক নাম ছিল দুর্গা | এই হল ভারতের প্রথম তথা সারা বিশ্বের দ্বিতীয় টেস্ট টিউব বেবি | পুরো কর্মযজ্ঞের প্রধান ছিলেন ডক্টর সুভাষ মুখোপাধ্যায় | সহযোগী ক্রায়োবায়োলজিস্ট সুনীত মুখার্জি এবং স্ত্রী বিশেষজ্ঞ সরোজকান্তি ভট্টাচার্য |

স্বীকৃতি তো দূর অস্ত ! অভিযোগ‚ প্রথম IVF চিকিৎসাকে নিয়ে প্রহসন করেছিল তৎকালীন বাম সরকার | ডক্টর মুখোপাধ্যায় দলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন না | শাসক দলকে জানানোর আগে তিনি প্রেসকে জানিয়েছিলেন | এটাই চক্ষুশূল ছিল সরকারের | এই ঔদ্ধত্য মেনে নিতে পারেননি তাঁরা |

তৈরি হয়েছিল কমিটি | শীর্ষে বাম ঘনিষ্ঠ এক রেডিও ফিজিসিস্ট | বাকিরা স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ‚ সাইকোলজিস্ট‚ ফিজিসিস্ট ও নিউরোলজিস্ট | অভিযোগ কমিটি যেটা করেছিল সেটা হল চূড়ান্ত অপমান আর হেনস্থা |

ডক্টর সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল‚ আপনি ভ্রূণ কোথায় রেখেছিলেন ? উত্তরে অ্যাম্পুল শুনে আবার প্রশ্ন এসেছিল‚ অ্যাম্পুলের মুখ বন্ধ করার সময়ে ভ্রূণ মরে যায়নি !

লজ্জা ঘৃণা সঙ্কোচে স্রষ্টা শুধু বলতে পেরেছিলেন‚ পার্ডন !’

শেষে কমিটি রায় দিয়েছিল‚ উনি যা বলছেন সব ফালতু | তাবড় তাবড় চিকিৎসকরা পারলেন না‚ আর ইনি কিনা লঝঝড়ে যন্ত্রপাতি দিয়ে এই যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন পরিণামে তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল অপথ্যালমিক বিভাগে |

এই অপমান সহ্য করতে পারেননি তিনি | ১৯৮১ সালের ১৯ জুন আত্মহত্যা করেছিলেন নিজের বাড়িতে |

দুর্গার জন্মের মাত্র ৬৭ দিন আগে আমেরিকায় জন্ম হয়েছিল বিশ্বের প্রথম নলজাতক শিশুর | এর নেপথ্য কারিগর ২০১০ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন |

ভারতে প্রথম নলজাতক শিশুর তকমা পায় হর্ষবর্ধন রেড্ডি | জন্ম ১৯৮৬ সালের ১৬ আগস্ট | নেপথ্য কারিগর হিসেবে সব কৃতিত্ব কুর্নিশ পান টি সি আনন্দ কুমার | তবে তিনি তাঁর পূর্বজকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হননি | ১৯৯৭ সালে কলকাতায় এক কনফারেন্সে এসে স্বীকার করেছিলেন ভারতের প্রথম নলজাতক শিশুর কৃতিত্ব সম্পূর্ণ ডক্টর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের | তাঁর গবেষণাপত্র দেখে তাঁকে প্রাপ্য স্বীকৃতি সম্মান দিতে দ্বিধা করেননি টি সি কুমার | পরে ২৫ বছর বয়সী কানুপ্রিয়া ওরফে দুর্গাকে হাজির করা হয়েছিল জনসমক্ষে | তিনি এখন জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত | কর্মরতা দিল্লির এক বহুজাতিক সংস্থায় |

প্রয়াত সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে একটি গবেষণা কেন্দ্র তৈরির প্রচেষ্টা চলছে | এই পোড়া দেশে আমলাতান্ত্রিক সরকারের জন্য কত অকালে স্মৃতি হয়ে যেতে হয় এই রত্নদের | যাঁরা আরও অনেক অনেক আলো বিকশিত করবেন বলে আসেন সমাজে | কিন্তু হারিয়ে যান অদূরদর্শীদের অঙ্গুলিহেলনে |

আরও পড়ুন:  চলছে বাতানুকূল যন্ত্র‚ মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটে অভিনেত্রীর পচা‚ বিকৃত দেহ উদ্ধার
- Might Interest You

2 COMMENTS

  1. 34 Bochhor-er Baam Shason-er (REIGN OF C.P.M.-LED LEFT-FRONT GOVERNMENT) Aar-o Ekti Mahaan Abadaan (ONE OF THE GREATEST CONTRIBUTIONS) > > >