শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক চল্লিশ ছুঁয়ে ফেলা সাহিত্যপ্রেমী। পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক। জন্ম, বেড়ে ওঠা, থাকাথাকি সবই হাওড়া জেলার এক বর্ধিষ্ণু মফস্‌সল জনপদে। পছন্দের ক্ষেত্র মূলত গদ্য। চারপাশে ঘটে চলা আর হারিয়ে যাওয়া সময়। মজার মিশেল অথবা অন্যভাবে ভাবা। গল্প লেখার ব্যাপারে আলসেমি। এখনো অবধি একমাত্র প্রকাশিত গল্পের বই 'জেড মাইনাস' (২০১৪)। পেশাগত ভাবে একটি অগ্রণী ইংরাজি প্রকাশনা সংস্থায় যুক্ত।

কোনও এক চটি রামায়ণ বইতে পড়েছিলাম অসময়ে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙানোর গপ্পো। হয়তো অতিরঞ্জিত ছিল তা। ঢাক ঢোল কাঁসর ঘণ্টা শিঙা শাঁখ ভেঁপু বাজাতে হত টানা। এবার তার ঘুম ভাঙবে। কীভাবে? প্রথমে পায়ের, তারপর হাতের, এবারে পেট বুক হয়ে সব শেষে মাথা। ঘুম ভেঙেই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে যাবে সে, সে অন্য কথা।

কখনও কখনও মনে হয়, আমাদের দেশটার ঘুমও ধাপে ধাপে ভাঙে। প্রথমে শব্দবাজি ক্ষতিকর বলা হল, অন্যান্য বাজি নয়। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে ‘নিষিদ্ধ’ দেগে দেওয়া হল বেশিমাত্রার শব্দবাজিকে। শব্দের সীমানা বেঁধে দিতে হয় অতএব। ৩৬-২৪-৩৬-এর অপার মায়াজাল কেটে ধাঁধার থেকেও জটিল মনে হল ১২৫-৬৫-৯০ নিয়ে সবাকার দ্বন্দ্ব। শুরু হল পক্ষ-বিপক্ষের তরজা। পরিষ্কার ফয়সালা হয়নি আজও। এদিকে এক কুড়ি বছর পার।

বছর কুড়ি পর বোঝা যাচ্ছে নবরূপে, শব্দবাজি নয় কেবল, আলোবাজিও আদতে পাজি। এবার এটার পরিষ্কার ফয়সালা হলেই ভালো। না হলে ওই দু’নৌকোয় পা রেখে জানি না কত এগনো সম্ভব!

নিজের ভালো সবাই বোঝে – কহবত এমনই বলে। মানুষ বোঝে? খারাপ, ক্ষতিকর যা কিছু তাৎক্ষণিক হলে বুঝবে। এই পড়ল ওই ছড়ল হলে, বুঝে যাবে মানুষ, আর এভাবে এ পথে হাঁটা যাবে না।

কিন্তু যদি বলা হয়, ‘এমন করলে ক্রমে এই পৃথিবী…’

ব্যস থাক থাক হয়েছে — বলে মানুষ, হ্যাঁ শিক্ষিত সচেতন সকলেই, আপন বর্তমান খুশিতে ডগমগ করে ওঠে। আনন্দ উছলে উঠুক আপনার। ভবিষ্যৎ আনন্দময় থাকুক, আপনি থাকা অবস্থায়, এবং না থাকা অবস্থাতেও, চাইবেন না?

আমাদের দেশে দলীয় রাজনীতি করতে হলে পরিস্থিতি সাপেক্ষে নিজের রঙ বদলে অবস্থান বদলে নিতে দক্ষ হতেই হয়। মনে রাখবেন, দলীয় রাজনীতির কোন মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, পাকস্থলী, ক্ষুধা, নিদ্রা থাকে না। কেবল ভোটব্যাঙ্ক। দিবারাত একেই জপে যেতে হয় টিকে থাকতে হলে। ফলে রাজনৈতিক চোখে আমাদের আলোচ্য বস্তু ‘বাজি’ পরিস্থিতি মাফিক হয়ে যায় ভয়ানক পাজি বা লো জি শুনো জি।

আরও পড়ুন:  ভেজাল মাছ খাচ্ছেন না তো ? ক্যান্সার হতে পারে কিন্তু

সৃষ্টির আদি থেকেই মানুষ লড়েছে প্রকৃতির সঙ্গে। যুগের পরে যুগ ধরে চলা সে লড়াইতে মানুষ পৃথিবীর অন্য জীবজগতের থেকে অনেক কদম এগিয়েছে। এসেছে দেমাক। যতই সুনামি, আয়লা, ফিলিন বা হার্ভে এসো, ক্যাটরিনা বা নার্গিস, চেন্নাই বা মুম্বই শহর বানভাসি হোক, মানুষকে তুমি হজম করে ফেলতে পারবে না – ভাবখানা এমন। ফলে উন্নয়নের কাছে দশ গোল খেয়ে শূন্য হাতে ফেরে প্রকৃতি। থমথমে মুখ করে বসে থাকে এক ঘরের কোণে। রাত বাড়লে আলো কমিয়ে ছলছল চোখে মানুষের কাছে নিজের হেরে ফেরার দুখভরা কাহিনী শোনায় এল নিনো এবং লা নিনা-কে। প্রতিশোধের আগুন ঠিকরে ওঠে ছোট ছোট দু’জোড়া চোখে।        

একটু মুখ বদলানো যাক।

আমাদের দেশ এদানি ঘনঘন উত্তাল হয়ে উঠছে গরু পাচার, গরুর মাংস খাওয়া, গরুর মাংস বিক্রির ঘটনায়। হাতাহাতি থেকে খুনোখুনিও। মর্দাঙ্গি দেখিয়ে ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে যত একলষেঁড়েরা। সব দলেই থাকে এরা কমবেশি। অঘটন ঘটিয়ে ফেললে দলের পরিচ্ছন্ন পোশাকি নেতানেত্রীরা একান্ত না এড়াতে পারলে প্রকাশ্যে এসে ব্যাখ্যান দেন। এই গরু-মার্কা বিষয়ে একটা প্রচলিত ব্যাখ্যান বাজারে চলছে খুবঃ লাইসেন্স-প্রাপ্ত স্লটার হাউস থেকে বের হওয়া মাংস ছাড়া বাকি সবই বেআইনী, অপরাধ, শাস্তিযোগ্য। কথা তো ফেলনা নয়। জোঁকের মুখে নুন।     

লাইসেন্সধারী বাজি প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা কজন আছেন আমাদের দেশে? এই যে পাড়ায় গলিতে বাজারে বা রাস্তার পাশে ডালা সাজিয়ে বিক্রি শুরু হয়েছে বাজির, তার কী হবে? আহা থাকগে, দীপাবলির উৎসবের মরশুম। পরিবেশ-প্রকৃতির ক্ষতি তো চোখে দেখা যাচ্ছে না। ও ছাড়ুন। অত কি আর আইন মেনে চলা যায়? এমনই ভাবছেন হয়তো… 

যদি ধরুন বাজির বদলে ওইসব ‘ছাইপাঁশ’, ‘নিঘিন্নে’ মাংস বিক্রি করতে বসে যেত!                   

ভাবুন। ভাবা রোজের দু’বেলার রুটিনে রাখুন। দেখবেন, আপনার ভাবনা যেন অন্যে না ভেবে দিয়ে যায়।

আরও পড়ুন:  কুমোরটুলির কড়চা

NO COMMENTS